শাসক শ্রেণি শ্রমিকের ভোট চায়, অধিকার দিতে চায় না

সাইফুল হক
০১ মে ২০২৬, ১২:০০আপডেট : ০১ মে ২০২৬, ১২:০০
পহেলা মে মহান মে দিবস। এটি শ্রমিক শ্রেণির আন্তর্জাতিক সংহতির দিন। শ্রমিকের অধিকার ও মুক্তির লক্ষ্যে এটি তাদের একটি প্রতীকী দিবস। প্রায় দেড়শ বছর দুনিয়াব্যাপী শ্রমিক শ্রেণির অধিকার, মুক্তি ও তার যাবতীয় মানবিক যে দাবি, সেই দাবির লক্ষ্য নিয়ে দিবসটি পালিত হয়ে আসছে।

১৮৮৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ‘হে মার্কেটে’ শ্রমিকদের যে আন্দোলন, তাদের দাবি ছিল ৮ ঘণ্টার শ্রমের দাবি, মজুরির দাবি এবং একটা মানবিক জীবনের দাবি। সেই দাবির আন্দোলনে শিকাগোর হে মার্কেট রক্তগঙ্গায় ভেসে গিয়েছিল। এরপরে ক্রমেই ১৮৮৯ সালে প্রথম একটা আন্তর্জাতিক সম্মেলনে সাম্যবাদী আদর্শের মহান পুরুষ ফ্রেডরিক এঙ্গেলসের নেতৃত্বে—প্রথম ‘মে দিবস’ শ্রমিকের অধিকার অর্জনের দাবি হিসেবে উচ্চারিত হয়।

তারপর থেকেই দুনিয়াব্যাপী এই মে দিবস পালিত হয়ে আসছে। কথা ছিল শ্রমিকরা ৮ ঘণ্টা শ্রম, ৮ ঘণ্টা বিনোদন এবং ৮ ঘণ্টা বিশ্রাম নেবে। এটা ছিল প্রধান বিষয় এবং শ্রমিকের ন্যায্য মজুরি তার অধিকার। এটাই ছিল আন্দোলনের প্রধান বিষয়। কিন্তু পর্যায়ক্রমে মে দিবসের যে চেতনা বা চৈতন্য, ট্রেড ইউনিয়নের দাবি ছাড়িয়ে এটা বাস্তবে একটা রাজনৈতিক চেতনার আন্দোলনে পর্যবসিত হয়। কেবল মজুরির লড়াই, অথবা শ্রমঘণ্টা কমানোর লড়াই দিয়ে তো আখেরে শ্রমিক শ্রেণির মুক্তি হয় না। কালক্রমে এই উপলব্ধিটা দুনিয়াব্যাপী শ্রমিক শ্রেণির মধ্যে বাড়তে থাকে এবং এই পথ ধরে পরবর্তীকালে শ্রমিক শ্রেণি রাজনৈতিকভাবে সচেতন হয়ে উঠতে থাকেন।

শ্রমিক শ্রেণি যেটা আলাদা শ্রেণি, পুঁজিবাদী দুনিয়াতে পুঁজিবাদ বা ধনতান্ত্রিক বিশ্ব ব্যবস্থার পরিবর্তে শ্রমিক শ্রেণির নেতৃত্বে তারা একটা নতুন বিশ্ব ব্যবস্থা তৈরি করতে পারেন। এই বোধ চেতনা ক্রমান্বয়ে প্রবল থেকে প্রবলতর হতে থাকে। সেই জায়গা থেকেই প্রথম লেনিনের নেতৃত্বে রাশিয়াতে মহান অক্টোবর বিপ্লব, শ্রমিক শ্রেণির নেতৃত্বে যে বিপ্লব সংঘটিত হয় এবং তারপর থেকেই শ্রমিক শ্রেণি রাজনৈতিকভাবে আরও সংগঠিত হয়। আরও অধিকার সচেতন হয় এবং ইউরোপ, আমেরিকা, এশিয়া, অস্ট্রেলিয়া, আফ্রিকা, মহাদেশ ছাড়িয়ে দুনিয়াব্যাপী যেখানে শ্রমিক শ্রেণি আছে, সেখানে তাদের আন্দোলন সংগঠিত হতে থাকে। এই পথ দিয়েই পরবর্তীকালে প্রায় ৮ দশক পৃথিবীর প্রায় ৪০ শতাংশ শ্রমিক শ্রেণির নেতৃত্বে যে সংগঠিত বিপ্লব, শ্রমিক বিপ্লব বা শ্রমিক কৃষকের পক্ষপাতী যে বিপ্লব, সেই বিপ্লব সোভিয়েত ইউনিয়ন ছাড়িয়ে চীন, ভিয়েতনাম, কিউবা, কোরিয়ায় সংগঠিত হয়।

পূর্ব ইউরোপের অনেক দেশেও এই শ্রমিক শ্রেণির নেতৃত্বে শ্রমিক-কৃষকের মৈত্রীর ভিত্তিতে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য নিয়ে এই বিপ্লব সংঘটিত হয়। তবে এর পথটা একেবারেই সরলরৈখিক ছিল না। এখানে নানা আঁকাবাঁকা পথ আছে। কখনও দুপায়ে গিয়ে আবার একবার শ্রমিক শ্রেণিকে আবার পিছিয়ে আসতে হয়েছে।

পৃথিবীর অন্যান্য অনেক দেশের মতো বাংলাদেশেও মে দিবসে সরকারি ছুটি। এখানেও রাষ্ট্রীয়ভাবে অনেক দিন ধরে, বিশেষ করে স্বাধীনতার পর থেকে মে দিবস কম বেশি উদযাপিত হয়ে আসছে। তো বাংলাদেশে যখন আমরা মে দিবস দিবস পালন করছি, তখন বাস্তবে শ্রমিক শ্রেণির অবস্থাটা খুবই নাজুক। তারা একের পর এক শোষণ, নির্যাতনসহ এক অমানবিক নিপীড়নের শিকার।

দেশের অভ্যন্তরে আমাদের যে শ্রমশক্তি, একদিকে শিল্প, কলকারখানায়, আমাদের ম্যানুফ্যাকচারিং শিল্পে এমনকি গ্রামাঞ্চলে আজকে ক্ষেতমজুর, গ্রামীণ শ্রমজীবীদের বিশাল উত্থান। বলা যায়, বাংলাদেশে উৎপাদনের চাকাটা সচল রেখেছেন কৃষকের পাশাপাশি বিশাল অংশের শ্রমিক, শ্রমজীবী ও মেহনতি মানুষ।

বাংলাদেশের বয়স ৫৫ বছর। এর মধ্যে অনেক সরকার বা দলের পরিবর্তন হয়েছে। কিন্তু শ্রমিকদের জীবনে বাস্তবে গুণগত কোনও পরিবর্তন হয়নি। নির্মম শ্রমশোষণ আছে। শ্রমিকরা শ্রমদাসত্বের একটা বেড়াজালে এখনও আবদ্ধ আছেন। গণতান্ত্রিক অধিকার অনেক ক্ষেত্রে অস্বীকৃত। মানবিক অধিকার নেই বললেই চলে। অথচ আমাদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ছিল সবার সমান অধিকার।

শ্রমিকরা যখন তার ন্যায্য দাবি নিয়ে, তার বাঁচার যে দাবি ও তার অস্তিত্ব রক্ষার দাবি নিয়ে আন্দোলন করেন, মালিকরা এটাকে চক্রান্ত ও ষড়যন্ত্র হিসেবে আখ্যায়িত করেন। তারা শ্রমিকদের ওপরে গুণ্ডা লেলিয়ে দেন। নানা হামলা আক্রমণ তারা করেন। গত কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশে ইন্ডাস্ট্রিয়াল পুলিশ চালু হয়েছে। শ্রমিক আন্দোলনে দেখা যাচ্ছে, রাষ্ট্র বা প্রশাসন শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকারের পক্ষে না দাঁড়িয়ে অধিকাংশ ক্ষেত্রে মালিকদের পক্ষে দাঁড়িয়ে যায়। শ্রমিক তখন বুঝতে পারে  আসলে রাষ্ট্র, সরকার এবং মালিক বাস্তবে শ্রেণিস্বার্থের প্রশ্নে একাকার এবং তারা দমন নিপীড়ন করে এবং শ্রমিক আন্দোলনকে বিভক্ত করে। শ্রমিকদের মালিকরা বিভক্ত রেখে তাদের প্রতি অমানবিক নিষ্ঠুর শোষণ, নিপীড়ন অব্যাহত রাখতে চায়।

আমাদের শ্রমিকদের এখানে মজুরি খুবই নিম্ন পর্যায়ের। অধিকাংশই মাসে যে মজুরি পান—এটা দিয়ে বাস্তবে ১৫ দিনের বেশি সংসার চালানো কঠিন। মাসের বাকি দিনগুলোতে ধারদেনা করে চলতে হয় এবং একটা অমানবিক জীবনযাপন করতে হয়।

শ্রমিকের ন্যায্য মজুরি মালিকের কোনও দয়া-দাক্ষিণ্য নয়। এটা আসলে তিনি যে শ্রমশক্তি বিক্রি করছেন, বিনিময়ে ন্যায্য পাওনাটা তাকে দেওয়া, এই বোধটা অধিকাংশ মালিকের নেই।

শ্রমিকের মজুরি বা অধিকার প্রদানকে আমি মনে করি এক ধরনের বিনিয়োগের মতো। শ্রমিকরা যদি শারীরিক ও মানসিকভাবে সুস্থ থাকেন, তখন উৎপাদনটা অনেক বেশি হতে পারে। অধিকাংশ উদ্যোক্তা বা মালিকরা এটা বিবেচনায় রাখেন না। ফলে বাস্তবে শ্রম মজুরি একটা বিরাট সমস্যা। এখন পর্যন্ত অন্যতম জাতীয় মজুরি স্কেল বাংলাদেশে এখনও নির্ধারণ হয়নি।

বিশেষ করে প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষেত্রে কিছু আইন-কানুন থাকলেও বিশাল অপ্রাতিষ্ঠানিক ক্ষেত্রে শ্রমিকের মজুরি ক্ষেত্রে রয়েছে সীমাহীন বৈষম্য। পুরুষদের পাশাপাশি নারী শ্রমিকদের মজুরি ক্ষেত্রে রয়েছে সীমাহীন বৈষম্য।

বাংলাদেশে এখন ১৯ থেকে ২০ লাখ শ্রমিক প্রতি বছর নতুন করে শ্রমবাজারে প্রবেশ করেন। তাদের একটা বিশাল অংশ নারী। কারখানাতে তাদের যে একটা নিরাপদ ও স্বাস্থ্যসম্মত কর্মপরিবেশ দরকার, এটা গত কয়েক দশকেও বাস্তবায়ন হয়নি।

জীবনের ঝুঁকি নিয়ে শ্রমিকদের কারখানায় যেতে হয়। রানা প্লাজার মতো ঘটনা আমরা জানি। অনেক এমন মর্মান্তিক ঘটনা জানি। পরিস্থিতির কিছু পরিবর্তন হয়েছে, কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রে এখনও পর্যন্ত শ্রমের কর্মপরিবেশ, কারখানার পরিবেশ নিরাপদ হয়নি।

সময়ের ব্যবধানে শ্রমিকের রাজনৈতিক ভূমিকার গুরুত্বটা অনেকখানি কমেছে। গত দেড় দশকে ভোটের অধিকার না থাকায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন শ্রমজীবী ও মেহনতি মানুষ। ভোটের অধিকার না থাকায় শ্রমজীবীরা যে আলাদা মানুষ, তিনি যে একটা সার্বভৌম ও মর্যাদাসম্পন্ন মানুষ, যিনি রাষ্ট্রের নাগরিক, তার কোনও আইনগত স্বীকৃতি অনেক ক্ষেত্রে থাকে না।

তবে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর এবারের নির্বাচনে অনেক শ্রমিক তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পেরেছেন।

অবশ্য শাসকশ্রেণির দলগুলো শ্রমিকের ভোট চায়, অধিকার দিতে চায় না।

জাতীয় সংসদে প্রকৃতপক্ষে শ্রমিকের পক্ষের কোনও প্রতিনিধি নেই বললেই চলে। বাস্তবে গোটা নির্বাচনি ব্যবস্থা টাকার খেলায় পর্যবসিত হয়েছিল। যেখানে ৪০ শতাংশ প্রার্থীই হচ্ছে বিত্তবান, ধনী, কালো টাকার মালিক, বিশাল ঋণখেলাপি এবং বহু ধরনের অর্থনৈতিক দুর্বৃত্তায়নের সঙ্গে যুক্ত। এই ধরনের অসংখ্য মানুষও নির্বাচিত হয়েছেন।

বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতারা শ্রমিকের ভোট ও সমর্থন চান, কিন্তু তাদের ন্যায্য অধিকার দিতে চান না। শ্রমিক যে একটা আলাদা মানুষ, তার যে পরিবার আছে, তার যেটা মানবীয় গণতান্ত্রিক জীবন দরকার, একটা সুস্থ স্বাভাবিক জীবন দরকার, অধিকাংশ মালিক বা রাষ্ট্র এটা বুঝতে চান না।

শ্রমিকদের অমানবিক জীবনের কঠিন প্রকোষ্ঠে আবদ্ধ করে রাখা হয়েছে। সেখান থেকে বের করতে গেলে আমি মনে করি শ্রমিকের মুক্তি আসলে তাদের নিজেদেরই করতে হবে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে সরকার-মালিক পক্ষ শ্রমিকদের বিভক্ত করে রেখেছে। সেই জায়গা থেকে মে দিবসে আমার ডাক হবে— শ্রমিক শ্রেণিকে একটা রাজনৈতিক শ্রেণি হিসেবে ঐক্যবদ্ধ হওয়া দরকার।

শ্রমিক শ্রেণির নেতৃত্বে একটা শ্রেণি সমাবেশ সংগঠিত করতে পারলে তারা জাতীয় রাজনীতিতে একটা নিয়ামক শক্তি হয়ে উঠতে পারেন। এটা আমার বিশ্বাস। এখানকার পরিবর্তনকামী বিপ্লবী ধারার বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির মতো যে রাজনৈতিক দল আছে, তারা আরও ঐক্যবদ্ধ হতে পারলে এ ক্ষেত্রে সাফল্য অবশ্যম্ভাবী।

একটি বিপ্লবী পরিবর্তন ছাড়া এই শ্রমদাসত্ব, অমানবিক জীবন, নিষ্ঠুর জীবন থেকে এই কোটি কোটি মানুষের আসলে কোনও মুক্তি নেই। মহান মে দিবসে বিশ্বের সব শ্রমিকের মঙ্গল কামনা করছি।

লেখক: রাজনীতিবিদ
/এপিএইচ/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
বিশ্বের সবচেয়ে পাতলা চকলেট ‘করতেচিয়া’, মুখে দিলেই হাওয়া
বিশ্বের সবচেয়ে পাতলা চকলেট ‘করতেচিয়া’, মুখে দিলেই হাওয়া
বিশ্বব্যাপী শান্তি প্রতিষ্ঠায় নারীর নেতৃত্ব বাড়ানোর আহ্বান বাংলাদেশের 
বিশ্বব্যাপী শান্তি প্রতিষ্ঠায় নারীর নেতৃত্ব বাড়ানোর আহ্বান বাংলাদেশের 
ক্যামেরার চোখে শুধু ট্রাফিক, নাকি অপরাধীও? 
ক্যামেরার চোখে শুধু ট্রাফিক, নাকি অপরাধীও? 
চার দিন ধরে পড়ে আছি, বাচ্চাগুলার মুখের দি‌কে তাকায় সরাই নেন
চার দিন ধরে পড়ে আছি, বাচ্চাগুলার মুখের দি‌কে তাকায় সরাই নেন
সর্বশেষসর্বাধিক