আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী ধর্মীয় রীতি মেনে ধর্ষণের শিকার নারীর সঙ্গে কারাগারের ভেতরেই বিয়ে হয়েছে ধর্ষণের দায়ে অভিযুক্ত ব্যক্তির। দুজনে মালাও বদল করেছে। যে ব্যক্তি তাকে ধর্ষণ করেছে, তারই গলায় ফুলের মালা পরিয়ে দিলো মেয়েটি। বিয়ের পর নববধূ কারাগার ছেড়ে চলে গেছে। জামিন হয়ে গেলে অভিযুক্ত আসামিও বের হয়ে আসবে। বাহ কী সুন্দর ব্যবস্থা। মামলা থেকে বাঁচতে ভুক্তভোগীর সঙ্গে অভিযুক্ত ব্যক্তির বিয়ের এমন ঘটনা ঘটেই চলেছে। বাংলাদেশের আইনে ধর্ষণের মামলা ‘বিয়ে করে মীমাংসা’ করার সুযোগ নেই বা এটি ‘আপসযোগ্য’ অপরাধ নয়।
অর্থাৎ, ধর্ষক যদি ভুক্তভোগীকে বিয়ে করেও ফেলে, তাতেও অপরাধ স্বয়ংক্রিয়ভাবে মাফ হয়ে যায় না। বিয়ে হয়ে গেলেও রাষ্ট্র এই মামলা চালিয়ে যেতে পারে, যদিও রাষ্ট্র এসব মামলা আর চালিয়ে নেয় না। অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়ের ক্ষেত্রে বিয়ে করলেও ধর্ষণের অভিযোগ থেকে রেহাই পাওয়া যায় না। কিন্তু আমরা দেখছি, শিশু ভিকটিমকেও ধর্ষণকারীর সঙ্গে বিয়ে দেওয়া হচ্ছে।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইল উপজেলায় ২০১১ সালে অভিযুক্তের সঙ্গে মাত্র সাড়ে ৬ বছর বয়সী ভুক্তভোগী শিশুকে বিয়ে দেওয়ার মতো ভয়াবহ ঘটনাও ঘটেছে। এর চাইতেও ভয়াবহ ঘটনা ঘটেছে ২০০৫ সালে হবিগঞ্জে। দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার কিশোরীকে তিন অভিযুক্ত ব্যক্তির মধ্যে অবিবাহিত ব্যক্তির সঙ্গে বিয়ে দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে গ্রাম্য সালিশে।
মে মাসে প্রকাশিত প্রতিবেদন বলছে, গত চার মাসে ১২ বছরের কম বয়সী ৫৬টি শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। এদেরও কি সালিশের মাধ্যমে ধর্ষণকারীর সঙ্গে বিয়ের ব্যবস্থা করা হবে? তাই ধর্ষকের সঙ্গে ভুক্তভোগীর বিয়ে দিতে স্বতঃপ্রণোদিত আদেশ দেওয়ার পরিবর্তে আদালতের উচিত ধর্ষকের সাজা নিশ্চিত করা।
আইন বিশেষজ্ঞরা বলেন, অভিযুক্তের সঙ্গে ভুক্তভোগীর বিয়ের মাধ্যমে আইন লঙ্ঘন করা হয়। সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হকও বিবিসি বাংলাকে এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘‘আইনে ধর্ষণের অপরাধ আপসযোগ্য নয়।’’ নারী অধিকার কর্মীরা বলেন, ধর্ষণ ফৌজদারি অপরাধ। যে ব্যক্তি মেয়েটিকে অসম্মান করলো, তার সঙ্গে বিয়ে খুবই মর্যাদাহানিকর সিদ্ধান্ত।
কিন্তু বাস্তব বড় নির্মম। সামাজিক চাপ, সালিশ, অভাব বা পরিবারের ‘সম্মান রক্ষার’ অজুহাতে ধর্ষণের শিকার মেয়েটিকে ধর্ষকের গলায় মালা দিতে হয়। মেয়েটির জীবনে এর চাইতে বড় লজ্জা ও কষ্ট আর কী হতে পারে। ধর্ষকের সঙ্গে বিয়ে মানে ভুক্তভোগীর ওপর দ্বিতীয়বার মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন। বিভিন্ন প্রতিবেদনে দেখা গেছে, এমন বিয়ের ক্ষেত্রে প্রায় সবগুলোর পরিণতি হয় নির্যাতন, বিচ্ছেদ বা আরও সহিংসতা। সেই সংসারে বাচ্চা হলে, সেই বাচ্চার ভরণপোষণও করে না। এক কথায় মেয়েটি অপাংক্তেয় হয়ে পড়ে।
তাহলে ধর্ষকের সঙ্গে ধর্ষণের শিকার শিশু ও নারীর বিয়ে কেন ও কীভাবে সম্ভব? আইন থাকার পরেও কেন কেউ কোনও উদ্যোগ নেয় না? রাষ্ট্র কেন নির্বিকার? যেকোনও ছুতায় নির্যাতিত মেয়েগুলোর সঙ্গে ধর্ষণের দায়ে অভিযুক্ত ব্যক্তির বিয়ে হয়ে যাচ্ছে কারাগারের গেটে, জেলখানার ভেতরে বা বাড়ির উঠোনে।
আমাদের দেশে সামাজিক অবস্থায় একজন ভিকটিম বা ভিকটিমের পরিবার ধর্ষণ ও যৌন হয়রানির ঘটনার পর খুব ট্যাবুর মধ্যে থাকেন। তারা ভাবতে বাধ্য হন ধর্ষণের ঘটনাটি সমাজের সামনে আনবেন কিনা, মামলা বা বিচারের মুখোমুখি হবেন কিনা, মামলার ব্যয়ভার বহন করতে পারবেন কিনা, আসামি পক্ষ শক্তিশালী কিনা ইত্যাদি। এসব ভাবনা চিন্তাতেই পার হয়ে যায় বেশ কিছুদিন।
ধর্ষণের শিকার মেয়েটির পরিবার যদি দরিদ্র হন, তাহলে ভাবেন বিয়ের মাধ্যমে মেয়েটির একটি হিল্লে হলো বা সমাজে মুখ দেখানোর একটা ব্যবস্থা হলো। তা না হলে মেয়েটিকে নিয়ে কোথায় যাবেন তারা, কে বিয়ে করবে তাকে? অথচ এটা যে কোনও সমাধান নয়, এর বহু প্রমাণ আছে।
গত চার বছরের মধ্যে অভিযুক্তের সঙ্গে বিয়ে হয়েছে এমন ৮ জন ভুক্তভোগী ও পরিবার জানিয়েছে—তাদের সংসার টেকেনি। উপরন্তু, ধর্ষণের ফলে জন্ম নেওয়া সন্তানের স্বীকৃতি নিয়ে বিপাকে পড়েছেন। একজন ভুক্তভোগী খুন হয়েছেন। এছাড়াও আরও কয়েকটি ভুক্তভোগী ও তাদের পরিবার বলেছে, লোকলজ্জার ভয়ে তারা নিজেরাই অভিযুক্ত ব্যক্তির সঙ্গে বিয়ের মাধ্যমে সমাধান চেয়েছেন। যে কিশোরী ও তরুণী ধর্ষণের ফলে অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়েছেন, তাদের পরিবারের সদস্যরা ‘বিয়ে ছাড়া উপায় নেই’ এমন অসহায়ত্ব প্রকাশ করেছেন। (প্রথম আলো)
২০০২ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত ৯ বছরে অভিযুক্ত ব্যক্তির সঙ্গে সাড়ে ৬ বছরের শিশু থেকে শুরু করে কিশোরী ও তরুণী ভুক্তভোগীর বিয়ের অন্তত ২০টি খবর প্রকাশ হয়। এর মধ্যে ১১টি বিয়ে টিকে না থাকার তথ্যের বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া গেছে। ১ জন নির্যাতনের শিকার হয়ে সংসার করছেন, আর বাকি ৮টি ঘটনার খোঁজ পাওয়া যায়নি (সূত্র: প্রথম আলো)। কাজেই ধর্ষকের সঙ্গে বিয়ে কোনও সমাধান হতে পারে না।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী শারমিন আক্তার ধর্ষকের সঙ্গে ভিকটিমের বিয়ে প্রসঙ্গে গণমাধ্যমকে বলেছেন, বিয়েটাকে ‘জামিনের একটা গ্রাউন্ড’ হিসেবে ব্যবহার করে অপরাধীরা। বিচারকরা যখন দেখেন যে বিয়ে হয়ে গেছে, কাজেই জামিন দিয়ে দেওয়া যায়। কিন্তু পরে এই মামলাগুলো আর এগিয়ে যায় না। তিনি মনে করেন, এর মাধ্যমে সমাজে একটা ভুল বার্তা যায়। যারা ধর্ষক, তারা মনে করে—আমি ধর্ষণ করলাম এবং যাকে ধর্ষণ করলাম, তাকে বিয়ে করার মাধ্যমে মুক্তি পেয়ে গেলাম। সেক্ষেত্রে ধর্ষণের জন্য যে বিচার ও শাস্তি, সেটা তাকে আর পেতে হয় না এবং কেসের কোনও ফলোআপ থাকে না।
আইন বিশেষজ্ঞরা প্রশ্ন রেখেছেন, আদালত কীভাবে ধর্ষণের অভিযোগে অভিযুক্ত পুরুষটির সঙ্গে ভিকটিমের আপসের রায় দিতে পারেন? যদিও আদালত চাইলে ভুক্তভোগীর স্বার্থে যেকোনও সিদ্ধান্ত দেওয়ার এখতিয়ার রাখেন। তবে সেটা মেয়েটির জন্য ভালো হবে কিনা, তা আগে বিবেচনায় নেওয়া দরকার। এভাবে বিয়ের মাধ্যমে মেয়েটিকে আইনগত অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়।
এমন বিয়ের বেশির ভাগ সিদ্ধান্ত সালিশে হয়। কখনও কখনও আদালত ‘বিয়ের শর্তে’ জামিন দেন। তবে জামিনের আদেশে ‘বিয়ের শর্ত’ বলে কিছু লেখা থাকে না। দুইপক্ষের আইনজীবীরা সমঝোতার কথা বলে এমনটা ঘটান এবং এমন জামিন অহরহই হচ্ছে।
প্রথম আলোতে প্রকাশিত বেশ কয়েকটি ঘটনার মধ্যে ২০টি ঘটনার সবগুলোতে বিয়ের সিদ্ধান্ত হয়েছিল গ্রাম্য সালিশে। একটি মেয়ে কীভাবে ধর্ষককে স্বামী হিসেবে মেনে নেবে? যখনই স্বামী হিসেবে ভাবার চেষ্টা করবে, তখনই তার সেই হিংস্র চেহারাটি চোখের সামনে ভেসে উঠতে বাধ্য। এই মানসিক যন্ত্রণা খুব কষ্টের, কিন্তু তাও মেয়েদের জীবনে এত বড় সর্বনাশকে সালিশের মাধ্যমে জায়েজ করা হয় সবসময়।
২০১৪ সালে প্রকাশিত ‘‘Landmark Judgements on Violence against Women of Bangladesh, India and Pakistan” শীর্ষক বইটিতে বিচারপতি গোলাম রাব্বানী মন্তব্য করেছিলেন, ধর্ষণ এমন একটি অপরাধ—যা শুধু ভিকটিমকে নয়, পুরো সমাজকে আঘাত করে। বিশ্বের আর কোনও সভ্য দেশে কি এরকম বিয়ে হয়? বিশ্বের কিছু দেশে এই ধরনের আইন বা সামাজিক প্রথা ছিল।
দেশগুলোতে মানবাধিকার ও নারী অধিকার আন্দোলনের চাপে এসব আইন বাতিল হয়েছে। যেমন- মরক্কো, তিউনেশিয়া, জর্ডান, লেবানন, ইতালি ও ফিলিপাইনস। অনেক দেশে এসব আইন ছিল মূলত ‘পারিবারিক সম্মান’ বা ‘নারীর সামাজিক মর্যাদা’ রক্ষার পুরোনো ধারণা থেকে। অর্থাৎ, সমাজ ধর্ষণকে ভুক্তভোগীর ‘লজ্জা’ হিসেবে দেখতো, অপরাধীর অপরাধ হিসেবে নয়। আধুনিক মানবাধিকারের দৃষ্টিকোণ এই ধারণা কঠোরভাবে প্রত্যাখ্যাত হয়েছে।
একটি মেয়ে বা নারী যখন ধর্ষণের শিকার হন, তখন সমাজ তাকেই সবচেয়ে আগে দায়ী করে। মেয়েটির পোশাক, চলাফেরা, কাজ, কঠোরভাবে পর্দা মেনে না চলা, পরিবেশ-পরিস্থিতি, স্বভাব-চরিত্র বা আচার-আচরণ, এমনকি চেহারাকেও দায়ী করে। অথচ সমাজের বেশিরভাগ মানুষ ধর্ষণকারীকে কখনোই দায়ী করে না।
আরও দুর্ভাগ্যজনক হচ্ছে যে ধর্ষকের সঙ্গে ভিকটিমের বিয়ে নিয়ে প্রকাশিত সংবাদের নিচে যে মন্তব্যগুলো ছাপা হয়, অধিকাংশ মানুষই এতে খুশির মনোভাব প্রকাশ করেছে। অনেকেই মন্তব্য করেছে—এই বিয়ে না হলে ধর্ষণের শিকার নারীর কী গতি হতো? কোথায় যেত ধর্ষণের শিকার মেয়েটি? তারা সবাই মনে করছে ধর্ষক বিয়ে করার মাধ্যমে ভিকটিমকে রক্ষা করে মহান দায়িত্ব পালন করেছে।
এই মন্তব্যকারীরা কি একবারও ভেবে দেখেছে, ধর্ষকের সঙ্গে বিয়ের ভয়াবহ এই অপরাধটি নিজের বা নিজের পরিবারের ক্ষেত্রে ঘটলে কী হতো। পরিবারে কারও সঙ্গে যদি এই অপরাধ ঘটে থাকে, তাহলে সেই পরিবার কি ধর্ষণের শিকার তার কন্যা বা বোনের সঙ্গে ধর্ষণকারীর বিয়ের রায়কে ঠিক এভাবেই স্বাগত জানাতে পারবে?
ধর্ষণ মামলার ক্ষেত্রে আমরা এমন রায় চাই, যেখানে ভিকটিমের সম্মান ও তার ভবিষ্যৎ প্রায়োরিটি পাবে। ধর্ষণের শিকার একটি মেয়েও যে সমাজে মাথা উঁচু করে বাঁচার অধিকার রাখে—এই দিকটিকে গুরুত্ব দিতে হবে। আপসের নামে ধর্ষকের সঙ্গে বিয়ের মতো জঘন্য কাজ যেন আর না হয়। ধর্ষকের সঙ্গে ধর্ষণের শিকার মেয়েটির বিয়ে কোনও সভ্য সমাজে হতে পারে না। এই বিয়ে দেওয়া মানে মেয়েটিকে আগুনে ছুড়ে ফেলা। ধর্ষণের পরে ভিকটিম খুব ভীতিকর স্মৃতি নিয়ে বাঁচেন। বাধ্য হয়ে যখন সেই লোকটিকেই বিয়ে করতে হয়, তখন মেয়েটির মনে হয় সে একজন ধর্ষকের সঙ্গে ঘুমাচ্ছে। নারীর এই অমর্যাদাকে প্রতিহত করতে হবে। প্রয়োজনে নতুন আইন করে বা সংস্কার করে ধর্ষকের সঙ্গে ধর্ষণের শিকার শিশু ও নারীর বিয়ের উদ্যোগ বন্ধ করতে হবে।
লেখক: যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ও কলাম লেখক




