হামে শিশুমৃত্যু: মোকাবিলা ও দায় নির্ধারণের সংকট

ড. হাসিনুর রহমান খান
২৩ মে ২০২৬, ১২:০০আপডেট : ২৩ মে ২০২৬, ২০:৩৮

দিন যতই যাচ্ছে হামে শিশুমৃত্যুর মিছিল তত বেড়েই চলেছ। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, ১৫ মার্চ থেকে ২১ মে পর্যন্ত ৪৮৮ জন শিশুর মৃত্যু হয়েছে সরাসরি হামে, কিংবা হামের উপসর্গ নিয়ে। বেসরকারি হিসাব, এছাড়াও প্রত্যন্ত অঞ্চলের যে মৃত্যুগুলো রিপোর্টিংয়ের বাইরে থেকে গেছে, সেগুলো একসঙ্গে করলে এই মৃত্যুর সংখ্যা আমার ধারণা নিশ্চিতভাবে আরও অনেক বেশি হবে। এমনকি কয়েক গুণও হতে পারে। অন্তত নিকট অতীতের করোনা মহামারির শিক্ষা থেকে এটি খুব সহজেই অনুমেয়।

এতগুলো প্রাণ না ফুটতেই ঝরে পড়লো। এতগুলো জাতির ভবিষ্যৎ গড়াতেই বিনষ্ট হলো। পিতা-মাতা, পরিবারের লালিত এতগুলো শ্রেষ্ঠ স্বপ্ন মুহূর্তেই ধূলিসাৎ হয়ে গেল। বিশ্বাস করা যায়! তারা প্রত্যেকেই তো স্ব-স্ব ক্ষেত্রে জাতি গঠনের সত্যিকারের নায়ক হতে পারতো। শেষমেশ জাতি গঠনের নায়ক না হতে পারলেও তারাই তো অন্তত ৪৮৮টি পরিবারের সত্যিকারের নায়কতো হতো। এতগুলো প্রাণ ঝরে যাওয়ার কথা ভাবতেই যে কারও গা শিউরে উঠবে। তাছাড়া এ পর্যন্ত প্রায় ৬০ হাজারের মতো শিশু উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। আক্রান্ত সন্তানদের নিয়ে হাসপাতাল থেকে হাসপাতালে ছোটাছুটি, সীমাহীন মানসিক এবং চরম আর্থিক দুর্ভোগ, আর প্রতিনিয়ত প্রাণপ্রিয় সন্তানের বেঁচে থাকার আকুতির মধ্য দিয়ে কী নিদারুণ সময় পার করতে হয়েছে প্রতিটি পরিবারকে এবং এখনও করতে হচ্ছে অনেক পরিবারকে।

এই মৃত্যু এবং এই সীমাহীন দুর্ভোগের দায় কার?  সাম্প্রতিক করোনা মহামারিতে বাংলাদেশে প্রায় সাড়ে ২৯ হাজার মানুষ মারা যায়। এর মধ্যে কতজন শিশু মৃত্যুবরণ করেছে তার প্রকৃত হিসাব কারও জানা নেই। তবে বৈশ্বিক হিসাব ধরলে সেটা হতে পারে শূন্য দশমিক চার শতাংশ। সে হিসাবে শিশুমৃত্যুর সংখ্যা হতে পারে ১০০ থেকে ১২০। ধরে নেওয়া যায় যে সেসময় অজানা অচেনা করোনাভাইরাসের কারণে এই মৃত্যু ঘটেছে, ঠেকানোর কোনও উপায় ছিল না, শুরুতে টিকাও ছিল না। কিন্তু হামের ভাইরাস ছিল চিরচেনা এবং টিকাও ছিল জানা। তারপরও দুঃখজনকভাবে ঝরতে দিলাম আমরা এতগুলো প্রাণ। দুর্ভাগ্যজনকভাবে এখনও তা দিয়েই চলেছি। করোনা মহামারির চেয়েও কয়েকগুণ বেশি শিশুমৃত্যু ঘটেছে এই হামের কারণে। এর দায় নিশ্চয়ই কারও না কারোর ওপর বর্তায়! অবশ্যই দায়ীদের চিহ্নিত করে দ্রুত জবাবদিহির আওতায় নিয়ে আসা উচিত।

প্রত্যেকটি মৃত্যুর ক্ষতিপূরণ কি আমরা দিতে পারবো? পরিবারগুলোর ক্ষতি সীমাহীন এবং তা কোনোভাবে পূরণ করা যায় না। হামের কারণে ৪৮৮ শিশুর মৃত্যুতে আসলে জাতির জন্য কতটা ক্ষতি হলো—তার একটা সাদামাটা পরিসংখ্যানের ব্যাখ্যা এখানে দিচ্ছি করোনা মহামারির সঙ্গে তুলনা করে। বাংলাদেশে করোনা মহামারিতে মৃতদের গড় বয়স ছিল ৬৩, আর সে সময় লাইফ এক্সপেক্টেন্সি ছিল ৭৩। সে হিসাবে সাড়ে ২৯ হাজার মানুষের মৃত্যুতে জাতি হারিয়েছে ২৯৫ হাজার পারসন ইয়ার লাইফ টাইম। অন্যদিকে বর্তমানে লাইফ এক্সপেক্টেন্সি ৭৫ ধরে হিসাব করলেও ৪৮৮ শিশু থেকে জাতি হারিয়েছে প্রায় ৩৬ হাজার বছর লাইফ টাইম। অর্থাৎ, করোনা মহামারিতে মোট  যত পারসন ইয়ার লাইফ টাইম হারিয়েছি—তার ১২ ভাগের এক ভাগ হারিয়েছি গত দুই মাস ধরে চলা হামের কারণে।

বাংলাদেশে বেশ কয়েক মাস আগ থেকে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে হামের প্রাদুর্ভাব দেখা দিলেও গত দুই মাসে আক্রান্ত এবং মৃত্যুর হার ব্যাপকভাবে বেড়েছে, প্রতিটি জেলা-উপজেলায় হাম ছড়িয়ে পড়েছে, হাসপাতালে পর্যাপ্ত আইসিইউ বেডের অভাব দেখা দিচ্ছে, এলাকা ভেদে অক্সিজেনের হাইফ্লো নাজালের ঘাটতি দেখা দিচ্ছে, সব হাসপাতালে ভর্তি না নেওয়ায় হাসপাতাল থেকে হাসপাতালে, গ্রাম থেকে শহরে, সরকারি থেকে বেসরকারি হাসপাতালে-ক্লিনিকে রোগীদের নিয়ে ছোটাছুটি করতে দেখা যাচ্ছে এবং তা অন্য সুস্থ শিশু এবং মানুষকে ব্যাপকভাবে সংক্রমণের ঝুঁকিতে ফেলছে। একজন আক্রান্ত শিশু অন্য ২০ জন শিশুকে আক্রান্ত করতে পারার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এরপরও হামের বর্তমান প্রাদুর্ভাবকে রাষ্ট্রের জরুরি জনস্বাস্থ্য ঘটনা কিংবা মহামারি হিসেবে সরকার ঘোষণা করছে না ভাবতেই অবাক লাগছে।

হাম শুধু একটি সাধারণ ভাইরাসজনিত রোগ নয়— এটি পৃথিবীর সবচেয়ে দ্রুত ছড়িয়ে পড়া এবং সবচেয়ে প্রাণঘাতী প্রতিরোধযোগ্য সংক্রামক রোগগুলোর একটি। Measles virus দ্বারা সৃষ্ট এই রোগ প্রধানত শিশুদের আক্রান্ত করলেও যেসব ব্যক্তি কখনও টিকা নেয়নি বা পর্যাপ্ত রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা অর্জন করেনি—তাদের যেকোনও বয়সেই হাম হতে পারে। বিশ্বের বহু দেশে হামকে এখনও শিশুমৃত্যুর একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কারণ একটি টিকা-প্রতিরোধযোগ্য রোগ হয়েও সময়মতো প্রতিরোধ না হলে এটি খুব দ্রুত একটি সাধারণ সংক্রমণ থেকে জীবনহানিকর বিপর্যয়ে রূপ নিতে পারে। আমরা এমন বিপর্যয়ে পড়েও সুষ্ঠু চিকিৎসা, বৃহত্তর সেবা এবং দ্রুত ও উন্নত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে শিশুদের জীবন বাঁচার উচ্চ সম্ভাবনাকে দূরে ঠেলে দিচ্ছি জরুরি অবস্থা কিংবা মহামারি ঘোষণা না করে। এটা মেনে নেওয়া যায় না।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, হামজনিত অধিকাংশ মৃত্যু ঘটে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের মধ্যে, এবং তাদের বড় অংশই অপুষ্টি বা অপর্যাপ্ত স্বাস্থ্যসেবার শিকার। এই কারণেই হামকে কেবল একটি রোগ হিসেবে নয়, বরং একটি সমাজের জনস্বাস্থ্য সক্ষমতার পরীক্ষাও বলা যায়। হাম পৃথিবীর সবচেয়ে দ্রুত ছড়িয়ে পড়া সংক্রামক রোগগুলোর একটি—এতটাই দ্রুত যে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা একে প্রায়শই “অদৃশ্য আগুন” বলে বর্ণনা করেন। কারণ, একটি আক্রান্ত শিশু বা ব্যক্তি বুঝে ওঠার আগেই তার আশপাশের বহু মানুষ সংক্রমিত হতে পারে। বাংলাদেশে শিশুদের এমন অদৃশ্য আগুনে পুড়ে যাওয়ার বিপজ্জনক পরিস্থিতি কেন তৈরি হতে দিলাম আমরা? এর উত্তর কে দেবে?

একসময় মনে হয়েছিল বাংলাদেশ হামকে প্রায় নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হয়েছে। নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচি, কমিউনিটি স্বাস্থ্যসেবা এবং দীর্ঘদিনের জনস্বাস্থ্য উদ্যোগ এই রোগের প্রকোপ উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে এনেছিল। এছাড়া, পোলিও, ডিফথেরিয়া, যক্ষ্মা, এইডসসহ অন্যান্য অনেক রোগের ব্যাপকভাবে নিয়ন্ত্রণমূলক বিস্তারের মধ্যে রাখা সম্ভব হয়েছিল। যা সম্ভব হয়েছিল নিয়মিত টিকা সংগ্রহ এবং প্রদানের মধ্য দিয়ে। কিন্তু পরিসংখ্যান বলছে গত এক দেড় বছরে সবগুলো রোগের প্রাদুর্ভাব বেশ তাৎপর্যপূর্ণভাবে বেড়েছে। সরকার স্বীকার না করলেও হামের ক্ষেত্রে তা রীতিমতো মহামারিতে রূপ নিয়েছে। এটা সত্যি যে শুধু বাংলাদেশে নয়, পাশাপাশি পৃথিবীর অন্যান্য দেশেও হামের ব্যাপক প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। বাংলাদেশে হামের সাম্প্রতিক পুনরুত্থানের পেছনে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি কারণকে দায়ী করা হচ্ছে। এ নিয়ে কারও সন্দেহ নেই। কিন্তু এর বাইরেও বেশ কতগুলো কারণ রয়েছে, যার সমন্বিত প্রভাবও গুরুত্বপূর্ণ হিসেবেও দেখা দিচ্ছে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কারণটি এখন সবার জানা। চব্বিশের আন্দোলনের পরে আসা অন্তর্বর্তী সরকারের একটি সিদ্ধান্তকে হামের এই বিস্তারের অন্যতম প্রধান কারণ বলে ভাবা হচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা প্রচলিত টিকা সংগ্রহ পদ্ধতি বাতিল করে উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে টিকা সংগ্রহ ব্যবস্থা চালু করা হয়। আওয়ামী লীগ সরকারের রেখে যাওয়া বরাদ্দকৃত পর্যাপ্ত পরিমাণ টাকা দিয়ে উন্মুক্ত দর পদ্ধতিতে যথাসময়ে টিকা সংগ্রহ করতে না পারায়—গত দেড় বছরে শিশুদের নয় মাসে প্রথম ডোজ এবং ১৫ মাসে দ্বিতীয় ডোজের টিকা ঠিকমত দেওয়া সম্ভব হয়নি। টিকা সংগ্রহ পদ্ধতির পরিবর্তন এবং সরবরাহে দেরির কারণে নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচিতে ঘাটতি তৈরি হয়েছিল। হামের ক্ষেত্রে হার্ড ইমিউনিটি অর্জনের যে ৯০-৯৫ শতাংশ কাভারেজের লক্ষ্যমাত্রা থাকে তা থেকে অনেক নিচে নেমে আসে। ফলে হাম দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার প্রকৃত ঝুঁকিতে পড়ে যায় বাংলাদেশ।

টিকা সংগ্রহ এবং ব্যবস্থাপনার অন্যতম স্টেক হোল্ডার ইউনিসেফ সে সময় সরকারকে বারবার হামের টিকা দ্রুত সংগ্রহ করে শিশুদের প্রদানের অনুরোধ জানিয়েছিল। গত ২০ মে এ বিষয়ে তারা পরিষ্কার বক্তব্য দিয়েছে। ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত অন্তত ১০ বার এ বিষয়ে সরকারের সাথে মিটিং করেছিল তারা। অফিসিয়ালি পাঁচ ছয়বার চিঠির মাধ্যমে এই অনুরোধ জানানো হয়েছিল। উন্মুক্ত দর পদ্ধতিতে বিলম্ব হতে দেখে প্রচলিত পদ্ধতিতে টিকা সংগ্রহ করে তা দ্রুত প্রদানের অনুরোধ জানিয়েছিল। প্রচলিত পদ্ধতিতে টিকা সংগ্রহ ব্যবস্থাপনায় যুক্ত থেকে ইউনিসেফ কোনও ধরনের লাভ করে না। শুধু তিন থেকে চার শতাংশ সার্ভিস চার্জ নেয় ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত ব্যয় মেটাতে। এই বিষয়টি পরিষ্কার করার পরও তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকার সেটা আমলে নেয়নি।

উদ্বুদ্ধ পরিস্থিতিতে বর্তমান সরকার হামের পরিস্থিতি দ্রুত মোকাবিলার জন্য টিকা সংগ্রহ করে দ্রুত দেওয়ার ব্যবস্থা করেছে। অবশ্য এ ক্ষেত্রে ইউনিসেফ দ্রুত টিকা সংগ্রহের ক্ষেত্রে দারুণ সহায়তা করেছে। তাদের মতে, তারা অন্য দেশের বরাদ্দকৃত টিকা বাংলাদেশের জন্য এক মাসের কম সময়ের মধ্যে নিয়ে আসতে পেরেছে। সেজন্য সরকার এবং ইউনিসেফকে অবশ্যই ধন্যবাদ দিতে হয়। হাম মোকাবিলায় আরও উন্নত ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি অবলম্বন করলে হয়তো আরও অনেক শিশুর মৃত্যু রোধ করা যেত। যেমন- হটলাইন ব্যবস্থা চালু করা এবং এর মাধ্যমে দেশের যেকোনও স্থান থেকে হামে আক্রান্ত শিশুর কোন কোন নিকটবর্তী হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে হবে, কীভাবে নিতে হবে, কখন আসতে হবে ইত্যাদির নির্ভরযোগ্য নির্দেশনার ব্যবস্থা করা।  তবে সবচেয়ে বেশি উদ্বেগ তৈরি করে আক্রান্ত শিশুদের বৈশিষ্ট্য। বিশ্লেষণে দেখা গেছে, সংক্রমিতদের মধ্যে প্রায় ৮১ শতাংশই পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু। সাম্প্রতিক সময়ে যেটা জানা যাচ্ছে, হামের কারণে ৯ মাসের নিচে শিশু মৃত্যুর ঘটনাও ঘটছে উল্লেখযোগ্যভাবে। যেটা সবাইকে ভাবিয়ে তুলছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশে ব্রেস্ট ফিডিংয়ের হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসায় মায়ের কাছ থেকে পর্যাপ্ত ইমিউনিটি থেকে শিশুরা বঞ্চিত হচ্ছে। সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, ছয় মাসের কম বয়সী শিশুদের প্রায় ৬২ শতাংশ শুধু মায়ের দুধ পায়। যার ফলে এমনটি ঘটছে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। ইফিকেসি এবং টলারেন্স ডোজ নিয়ে গবেষণা না থাকায় আবার একই টিকা ৯ মাসের নিচের শিশুদের দেওয়ার সিদ্ধান্তও নেওয়া যাচ্ছে না।

অন্য সব কারণগুলোর একটি হলো সার্বিক টিকাদান কভারেজ হ্রাস। বাংলাদেশে হাম প্রতিরোধে দ্বিতীয় ডোজ (এমআরটু) টিকার কভারেজ ২০১৯ সালে যেখানে প্রায় ৮৯ শতাংশ ছিল, তা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কমে প্রায় ৮১ শতাংশে নেমে এসেছে। সংখ্যাগতভাবে এই পার্থক্য খুব বড় মনে না হলেও জনস্বাস্থ্যের দৃষ্টিতে এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ হাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাধারণত ৯৫ শতাংশ বা তার বেশি টিকাদান কভারেজ প্রয়োজন হয়। এর নিচে নেমে গেলে “সামষ্টিক সুরক্ষা” দুর্বল হয়ে পড়ে এবং ভাইরাস দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার সুযোগ পায়। টিকা না পাওয়া শিশুরা আরেকটি উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ গোষ্ঠী। বিশেষ করে যারা এক ডোজ টিকাও পায়নি, তাদের শরীরে হাম প্রতিরোধের কোনও প্রস্তুতি থাকে না। ফলে সংক্রমণের পর রোগটি দ্রুত মারাত্মক রূপ নিতে পারে। এ কারণেই জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলেন, হামের বিরুদ্ধে সবচেয়ে কার্যকর সুরক্ষা এখনও টিকাই।

এছাড়াও রয়েছে কোভিড-১৯ পরবর্তী টিকাদান কর্মসূচির ব্যাঘাত। মহামারির সময় বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি শিশু নিয়মিত টিকা গ্রহণ থেকে বঞ্চিত হয়। বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম ছিল না। স্বাস্থ্যসেবার অগ্রাধিকার পরিবর্তন, চলাচলে সীমাবদ্ধতা এবং স্থানীয় পর্যায়ে সেবা ব্যাহত হওয়ায় অনেক শিশু নির্ধারিত সময়ে টিকা পায়নি। এর প্রভাব এখন ধীরে ধীরে দৃশ্যমান হচ্ছে।

অপুষ্টিও হামের ভয়াবহতা বাড়ানোর একটি নীরব কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ কারণ। বাংলাদেশে এখনও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিশু দীর্ঘমেয়াদি পুষ্টিহীনতায় ভুগছে। সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, দেশে পাঁচ বছরের নিচের প্রায় প্রতি চার জন শিশুর মধ্যে একজন খর্বাকৃতি, আর প্রতি ১০ জনের মধ্যে একজন মারাত্মক অপুষ্টিজনিত ক্ষয়ের শিকার। অর্থাৎ, দীর্ঘমেয়াদি অপুষ্টি ও তাৎক্ষণিক পুষ্টি ঘাটতি এখনও লাখ লাখ শিশুর বৃদ্ধি, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা এবং ভবিষ্যৎ বিকাশকে প্রভাবিত করছে।

অপুষ্ট শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল থাকে, ফলে হাম আক্রান্ত হলে নিউমোনিয়া, তীব্র ডায়রিয়া এবং মৃত্যুঝুঁকি কয়েকগুণ বেড়ে যায়। অর্থাৎ, একই ভাইরাস একজন সুপুষ্ট শিশুর তুলনায় একজন অপুষ্ট শিশুর জন্য অনেক বেশি প্রাণঘাতী হতে পারে। সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, ৬-৫৯ মাস বয়সী শিশুদের মধ্যে ভিটামিন ‘এ’ সম্পূরক গ্রহণের কভারেজ কমেছে। সেটাও হামকে ট্রিগার করতে পারে। বাংলাদেশে আগের জাতীয় স্কুল ফিডিং কর্মসূচি শিশুদের পুষ্টি সরবরাহের ক্ষেত্রে কার্যকর ভূমিকা পালন করেছিল, যেখানে পুষ্টিসমৃদ্ধ বিস্কুট সরবরাহ করা হতো। সেটি কার্যত ২০২২ সালের জুন মাসে শেষ হয়।

বাংলাদেশের উচ্চ জনঘনত্বও সংক্রমণ বৃদ্ধির আরেকটি বড় কারণ। বিশ্বের সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ দেশগুলোর একটি হওয়ায় এখানে মানুষ কাছাকাছি বসবাস করে, স্কুল, বাজার এবং বসতিপূর্ণ এলাকায় সংক্রমণ খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে। শরণার্থী, বাস্তুচ্যুত বা প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর শিশুরা সবচেয়ে অসুরক্ষিত অবস্থায় থাকে। রোহিঙ্গা ক্যাম্পের মাধ্যমে হামের দ্রুত বিস্তার ঘটা একটি প্রকৃষ্ট উদাহরণ। যেহেতু হাম পৃথিবীর সবচেয়ে সংক্রামক রোগগুলোর একটি—তাই সামান্য ফাঁকও বড় প্রাদুর্ভাবে রূপ নিতে পারে।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে প্রান্তিক অঞ্চলে স্বাস্থ্যসেবার সীমাবদ্ধতা। দুর্গম এলাকা, দরিদ্র পরিবার কিংবা অনিয়মিত স্বাস্থ্যসেবা পাওয়া জনগোষ্ঠীর অনেক শিশু নিয়মিত টিকাদানের বাইরে থেকে যায়। ফলে এসব এলাকায় ‘জিরো ডোজ চিলড্রেন’, অর্থাৎ যারা কোনও টিকাই পায়নি তাদের সংখ্যা বাড়ে। ধারণা করা হয়, সব সময় ১৫ থেকে ১৮ শতাংশ শিশু টিকার বাইরে থাকে। সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, হামে আক্রান্ত শিশুদের মধ্যে বড় অংশই ছিল এমন, যারা কোনও টিকাই নেয়নি। হামে মৃত্যুর কারণ খতিয়ে দেখার জন্য বর্তমান সরকারকে অবশ্যই অবিলম্বে একটি তদন্ত কমিটি গ্রহণ করতে হবে।

অন্তর্বর্তী সরকারের অপরিণামদর্শী এবং বেহাল অব্যবস্থাপনার সাথে যুক্ত সবাইকে চিহ্নিত করতে হবে। অন্তর্বর্তী সরকারের কারা কারা, এর বাইরেও যদি অন্য কারও সংশ্লিষ্টতা থাকে, এমনকি পূর্ববর্তী আওয়ামী লীগ সরকারের কেউ যদি দায়ী থাকে—তাদেরও বিচারের আওতায় নিয়ে আসতে হবে। সঠিক তদন্ত করে জবাবদিহির আওতায় নিয়ে এসে উপযুক্ত শাস্তির বিধান করতে হবে। তা না হলে সরকারের প্রতি মানুষের আস্থা দ্রুত কমতে শুরু করবে।

লেখক: অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

E-mail: [email protected]

/এপিএইচ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
মা-মেয়ে ম্যাচিং শাড়িতে কনক চাঁপা, নজর কাড়লো ঐতিহ্যবাহী সাজ
মা-মেয়ে ম্যাচিং শাড়িতে কনক চাঁপা, নজর কাড়লো ঐতিহ্যবাহী সাজ
পোস্টার থাকছে না, এআইতেও নজর: ইউপি নির্বাচনে কী কী বদলালো
পোস্টার থাকছে না, এআইতেও নজর: ইউপি নির্বাচনে কী কী বদলালো
যশোরে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের ঝটিকা মিছিল, ৮ জন আটক 
যশোরে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের ঝটিকা মিছিল, ৮ জন আটক 
পারমাণবিক শক্তির মজুতে উত্তর কোরিয়ার অবস্থান ‘অপরিবর্তনীয়’
পারমাণবিক শক্তির মজুতে উত্তর কোরিয়ার অবস্থান ‘অপরিবর্তনীয়’
সর্বশেষসর্বাধিক