কয়েকদিন আগে এক পড়ন্ত বিকালে আড্ডা দিতে আমার গ্রিন রোডের বাসা থেকে হেঁটে হেঁটে কনকর্ড মার্কেটের দিকে যাচ্ছিলাম। মাঝপথে হাতিরপুল বাজারে একজন পুলিশ অফিসারকে হকারদের সঙ্গে বচসা করতে দেখলাম। তিনি হকারদের তুলে দিচ্ছিলেন এবং ক্ষোভ প্রকাশ করে বলছিলেন— সকাল বেলা উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করার পর বিকাল বেলা যদি আবারও তোমরা বসে যাও, তাহলে উচ্ছেদ অভিযানের কোনও মানে নেই! কৌতূহলী হয়ে ওই পুলিশ অফিসারকে জিজ্ঞেস করলাম— আপনি কি মনে করেন এই উচ্ছেদ বজায় থাকবে এবং ফুটপাত হকারমুক্ত ও অবৈধ দখলমুক্ত হবে। তিনি জবাবে বলছিলেন— হবে কিনা জানি না, তবে চেষ্টা করতে দোষ কী! আমি এক কাঠি এগিয়ে বললাম— শুধু পুলিশ চাইলে হবে না, রাজনীতিবিদদেরও চাইতে হবে। তিনি এবার আমার ওপর ক্ষোভ উগরে দিয়ে বললেন, সব যখন জানেন তখন প্রশ্ন করছেন কেন? আমি মুচকি হেসে কথা আর না বাড়িয়ে আমার গন্তেব্যর পথ ধরলাম।
গন্তেব্যের সেই চেনা পরিসর আজ আর নেই। জুলাই বিপ্লব পরবর্তী সময়ে কনকর্ড মার্কেটের চিত্রও অনেকটা বদলে গেছে। পরিচিতজনদের অনেকেই আজ ওই মার্কেটের সামনে আড্ডা দিতে আসেন না। জুলাই পরবর্তী সময়ে অনেককে মব আতঙ্কে মিইয়ে যেতে দেখেছি। আওয়ামী লীগের ক্ষমতার দম্ভে যারা ধরাকে সরা জ্ঞান করতেন, তাদের অনেকে এখন গর্তে লুকিয়েছেন। কেউবা দেশ ছেড়েছেন, অথবা পলাতক জীবন বেছে নিয়েছেন— তাই তাদের আর দেখা যায় না। তবে যাদের দেখা যায়, তারা এখন বিড়াল হয়ে গেছেন। কথার মধ্যে সেই বাঘের হুঙ্কার আর তেজ নেই। কেউ কেউ দল ও মতাদর্শ বদল করেছেন। এক সময় কথায় কথায় তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগের বন্দনা করলেও জুলাই পরবর্তী সময়ে তাদের জামায়াত প্রীতি চোখে পড়েছে। এখন তাদের অনেকেই আবার বিএনপির সঙ্গে ভিড়তে বিএনপি বন্দনায় মেতেছেন।
আমার লেখা ‘বিপ্লবের গান’ কবিতাটি এই কনকর্ড মার্কেটে বসেই লেখা হয়েছিল, তাই এই মার্কেটের প্রতি আমার ভিন্ন দরদ আছে। ওই মার্কেটে একাকী বসে দেশ ও জাতির তৎকালীন পরিস্থিতি নিয়ে ভাবতে গিয়ে ২০২২ সালের মার্চের এক পড়ন্ত বিকালে মনটা বেশ বিষিয়ে উঠেছিল। হঠাৎ এক পরিচিত যুবককে দেখে আশার বাতি জ্বলেছিল প্রাণে। কবিতার ছন্দ ও সুর যেন নাজিল হয়েছিল মনে। সব ভুলে আকস্মিক ‘বিপ্লবের গান’ কবিতাটি মোবাইলের কিবোর্ডে লিখেছিলাম। শেয়ার করেছিলাম সেই যুবকের সঙ্গে। ওই যুবক যখন জেনেছিলেন— এই কবিতাটি তাকে নিয়ে লিখেছি, তখন তিনি ওই বছরের ১৫ আগস্ট কবিতাটি আমার কাছে থেকে সংগ্রহ করেন। ওই কবিতার প্রতিটি লাইন যাকে নিয়ে লেখা হয়েছিল, কবিতাটি তাকে কতটা বিপ্লবী হতে উৎসাহী করেছিল জানি না— তবে আমার এক সহকর্মী কবিতাটি পড়ে বলেছিলেন, কবিতা পড়লে মনে হয়— জুলাই বিপ্লবের মানচিত্র এই কবিতায় যেন ধরা দিয়েছে। আমার ওই সহকর্মীর কথা কতটা সত্য, তা পাঠক নিচের কবিতাটি পড়লে বুঝতে পারবে।
বিপ্লবের গান
দ্বীপ্ত পায়ে হেঁটে যায় এক তরুণ
কিবোর্ড হাতে অন্ধকার এই রাতে
স্বপ্ন দেখে পাল্টাবে দেশ
আনুগত্য নেই ধাতে।
জ্বোনাকি পোকার সংখ্যা বাড়ছে
বিপ্লব বিপ্লব স্লোগানে জাগছে রাত
মৌমাছিরা পালাচ্ছে ভেঙে চাক
ক্ষমতার প্রাসাদ হচ্ছে কাত।
শহুরে কোলাহলে সমুদ্রের নিরাবতা
মর্টার মেশিনগানে শ্বশানের ছায়া
ট্রিগার চেপে ছুটছে সেনা
বিস্মিত বালক, নেই তার দেনা
হঠাৎ থামলো ট্রিগার—
চোখে মুখে কি তার মায়া!
ঝন ঝন করে ভাঙল দেয়াল
চারিদিকে লক্ষ জনতার শক্ত চোয়াল
কৃষকের কাঁধে লাঙ্গল জোয়াল
রাজপথে শিক্ষক শ্রমিক মৌয়াল।
স্বাধীনতার চাঁদ উঁকি দেয়
নিরবতা ভেঙে মধ্যরাতে
দেশ রক্ষার দায়িত্ব পড়েছে
কিবোর্ড চালানো ওই তরুণের কাঁধে।
পারবে কি সে দ্বীপ্ত পায়ে হেঁটে
আসমুদ্রহিমাচল পাড়ি দিতে
মধ্যবয়সী তরুণ লিখছে এই গান
পথে যেতে যেতে।
-কনকর্ড, কাটাবন
৯ মার্চ ২০২২
জুলাইয়ে নামগন্ধহীন ওই যুবক জুলাই পরবর্তী বাংলাদেশে হঠাৎ আলোর পাদপ্রদীপে উঠে আসেন। তারপরের ইতিহাস প্রতিদিনের সংবাদপত্রের পাতায় পাতায় লেখা আছে। কবিতার লাইন সত্যি হয়ে ধরা দিয়েছিল জুলাইত্তোর বাংলাদেশে। কিবোর্ড চালানো ওই তরুণের কাঁধে দেশ রক্ষার দায়িত্ব সত্যি সত্যি পড়েছিল। কিন্তু তিনি দ্বীপ্ত পায়ে হাঁটতে এবং আসমুদ্রহিমাচল পাড়ি দিতে ব্যর্থ হয়েছেন। নিবোর্ধের মতো দেশ ও জাতিকে সমুদ্রের অতল গহবরে ডুবিয়েছেন।
বিপ্লবোত্তর বাংলাদেশে গণতন্ত্র, উদারতন্ত্র ও সুশাসনের বদলে মবতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। জুলাইয়ে যে প্রতিশ্রুতি ছাত্র-জনতা দিয়েছিল, লেখালেখির ক্ষেত্রে আর কখনও ব্যাকস্পেস চাপতে হবে না, তা ফানুসের মতো উড়ে গেছে।
জুলাইত্তোর বাংলাদেশে তার উল্টোচিত্র দেখা গেছে। লেখার কারণে, স্বাধীন চিন্তার কারণে ও মত প্রকাশের কারণে হাজার হাজার মানুষকে জুলুমের স্বীকার হতে হয়েছে— মবে পড়তে হয়েছে, জেলে যেতে হয়েছে, রুটি-রুজির ক্ষেত্র ব্যবসা অথবা চাকরি হারাতে হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে, ব্যাকস্পেস চাপতে হবে না প্রতিশ্রুতি দিয়ে কলম-কিবোর্ড কেড়ে নেওয়া হয়েছে। এটি যেন অনেকটা হিরেপান্না দেখিয়ে জোর করে পাথরনুড়ি গুঁজে দেওয়ার মতো ঘটনা ঘটেছে। জুলাইয়ের গণআন্দোলনে ছাত্র-জনতা যে পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখেছিলেন, যে প্রতিশ্রুতি শুনে তারা রাজপথে ও অনলাইনে প্রতিবাদে সরব হয়েছিলেন— তার প্রায় সব প্রতিশ্রুতির বেলুন ফুটো হয়ে চুপসে গেছে। পরিবর্তন— নতুন বন্দোবস্তের স্বপ্ন বাজপাখির নখরে পড়েছে। জুলাইত্তোর বাংলাদেশে গণতন্ত্রের বদলে মবতন্ত্র কায়েম হয়েছে। এককথায়, এ যেন এক অসমাপ্ত বিপ্লব, যা প্রকৃত বিপ্লবীরা না পারছে গিলতে না পারছে ফেলতে, যেন তারা এক মহাযন্ত্রণাময় জাহান্নামে পড়েছে।
কিন্তু পরিবর্তন যে একেবারে হয়নি তা নয়। জুলাই বিপ্লবের পর সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর উপাচার্যরা কয়েক দফায় পরিবর্তন হয়েছেন। যদিও সেই পুরোনো স্বৈরতান্ত্রিক কায়দায় এখনও অনেক বিশ্ববিদ্যালয় চলছে। ব্যক্তির পরিবর্তন হলেও ফ্যাসিস্ট কায়দায়ই অনেক বিশ্ববিদ্যালয় মানছে। অনেকে আবার আইন নিয়ম নীতির তোয়াক্কা না করে নিজেই নতুন রাজা সেজে নতুন ফর্মুলায় ফ্যাসিস্টতন্ত্র কায়েম করেছে। সরকারের কারোর কারোর আন্তরিক পরিবর্তনের প্রচেষ্টা সত্ত্বেও শুধু বিশ্ববিদ্যালয় নয়, আদালত ও অফিস পাড়া পুরোনো ছকে হিসাব কষছে। বিগত সতের বছরের ক্ষুধার্থ মানুষের পেট পুরে গলা পর্যন্ত না খাওয়া পর্যন্ত নাকি এমনই চলবে বলে অলিতে গলিতে জনতা ফিসফাস করছে।
পরিবর্তন হয়েছেও আমাদের প্রায় প্রতিদিনের আড্ডার স্টলেও। সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে মালিকানারও পরিবর্তন হয়েছে। রাজনৈতিক প্রভাবে মানুষের ভাগ্যের চাকা খোলে, তার ছাপ জনপথের প্রতিটি প্রান্তে পড়ছে। তাই ফুটপাতের হকার উচ্ছেদ কতটা নগরবাসীকে স্বস্তি দিতে চলছে, আর কতটা চাঁদাবাজির রেট বাড়াতে করছে, সেই প্রশ্ন সামনে আসে। বিগত সময়ের অভিজ্ঞতা বলে ক্ষমতার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে ঢাকঢোল পিটিয়ে ফুটপাতের হকার উচ্ছেদ করা হয়। ওই উচ্ছেদের উদ্দেশ্য হকার উচ্ছেদ নয়, বরং নতুন রেটে নতুন হকার বসানো। নানা কানাগলি হেঁটে পুরোনো হকারদের কেউ কেউ হয়তো ফিরতে পারেন, আবারও ফুটপাতে। তবে তাদেরকেও মেনে নিতে হয় নতুন রেটের বন্দোবস্ত। এবারও কি সেই পথে হাঁটবে হকার উচ্ছেদ, নাকি সত্যিই রচিত হবে জুলাইয়ের তেজের নতুন বন্দোবস্ত, কয়েকদিনের মধ্যেই বিষয়টি রাজপথের ফুটপথেই পরিষ্কার হবে।
ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের বার্ষিক বাসযোগ্য শহরের তালিকায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ১৭৩ শহরের মধ্যে ঢাকার অবস্থান ১৭১তম। ওই সূচক যে মিথ্যা নয়, তা আমরা যারা নিত্য ঢাকায় বসবাস করি, তারা হাড়ে হাড়ে জানি। আর ঢাকা শহরকে বাসঅযোগ্য করার ক্ষেত্রে ফুটপাত ও তার চরম বাস্তবতা হকারদের মেলার দায় কম নয়। তাই সরকারকে অবশ্যই কর্মসংস্থান নিশ্চিত ও আইনের যথাযথ প্রয়োগের মাধ্যমে ফুটপাতকে হকারমুক্ত করতে হবে। সরকারের বিকল্প কর্মসংস্থান নিশ্চিত ও পুলিশের কঠোর নজরদারিই পারে ফুটপাতকে হকারমুক্ত করতে।
ফুটপাতে হকার বসিয়ে চাঁদা আদায় সব সরকারের সময়েই রাজনীতিবিদদের প্রধান আয়ের উৎস। তাই সত্যিকারভাবে ফুটপাতকে হকারমুক্ত করার জন্য সরকারকে হকারদের পাশাপাশি সরকারি দলের রাজনৈতিক কর্মীদেরও বিক্ল্প কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে হবে। কারণ যদি রাজনীতিবিদ ও পুলিশ সম্মিলিতভাবে চায়— তবেই কেবলই ফুটপাত হকারমুক্ত হওয়া সম্ভব।
লেখক: সহকারী অধ্যাপক, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়




