রোহিঙ্গা সংকট কি যে তিমিরে ছিল, সেই তিমিরেই থাকবে?  

সাবির মুস্তাফা
০১ আগস্ট ২০২৬, ১২:০০আপডেট : ০১ আগস্ট ২০২৬, ১২:০০

রোহিঙ্গা শরণার্থীদের নিয়ে গত কয়েক দিনে  কিছু কথাবার্তা আবার শোনা যাচ্ছে। বিশেষ করে যেসব রোহিঙ্গা বাংলাদেশের বিভিন্ন ক্যাম্পে মানবেতর জীবনযাপন করছেন, তাদের জন্য একটি কথা অবশ্যই আশার সঞ্চার করবে—যদি সে কথা বাস্তবে প্রতিফলিত হয়।

তবে তার আগে অন্য একটা কথা না বললেই নয়। বৃহস্পতিবার (জুলাই ৩০) যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়া সংক্রান্ত দূত সার্জিও গোরের সঙ্গে ঢাকায় বৈঠকের পর বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান সাংবাদিকদের মিয়ানমার সংক্রান্ত এক প্রশ্নের জবাবে কিছুটা জ্বলেই উঠছিলেন। একজন সাংবাদিক মিয়ানমারের রাখাইনে ‘মানবিক করিডোর’ স্থাপনে যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবের কথা নিয়ে প্রশ্ন শেষ করার আগেই রহমান বলে উঠলেন, “কখনোই বলে নাই। আপনারা গুজব শুনে সে কথা ছাড়ছেন। কোনোদিন বলে নাই।”

অর্থাৎ, যুক্তরাষ্ট্র মানবিক করিডোরের কথা কখনোই বলে নাই, রহমান সেটাই বোঝাচ্ছেন এবং তিনি ভুল বলেননি। তবে করিডোর বিষয়ে তাঁর নিজের যে ভূমিকা ছিল, তাঁর তৎকালীন কর্তা মুহাম্মাদ ইউনূসের যে ভূমিকা ছিল, জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের যে ভূমিকা ছিল, সেগুলো তিনি ব্যাখ্যা করতে পারতেন। তাহলে নির্বাচিত সরকারের সদস্য হিসেবে জনগণের জানার অধিকারের প্রতি তাঁর দায়িত্ব পালন করতেন। 

রাখাইনের জন্য মানবিক করিডোর স্থাপনের বিষয়টি আলোচনায় আসে গত বছরের এপ্রিল মাসে। এরকম করিডোর স্থাপনের একটি প্রস্তাব যে বাংলাদেশ বিবেচনা করছে, তা প্রকাশ করেন অন্তর্বর্তী সরকারের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন। তখন সরকারের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ছিলেন খলিলুর রহমান, যিনি বিভিন্ন পররাষ্ট্র-সংক্রান্ত বিষয়ে তৌহিদ হোসেনের চেয়ে বেশি ভূমিকা রাখতেন।

গৃহযুদ্ধে লিপ্ত প্রতিবেশী রাষ্ট্রের একাংশে এ ধরনের কর্মতৎপরতার ঝুঁকি নিয়ে নানা মহল থেকে তীব্র সমালোচনা এবং সতর্কবার্তা আসার পর গত বছরের মে মাসের ৪ তারিখ খলিলুর রহমান জানান, মানবিক করিডোর নিয়ে কারও সঙ্গে কোনও চুক্তি হয়নি। সে সময়কার পত্র-পত্রিকা ঘেঁটে বোঝা গেল—এই বিতর্কিত করিডোরের প্রস্তাব দিয়েছিল জাতিসংঘ। জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস ২০২৫ সালের মার্চ মাসে ঢাকায় এসে যখন ইউনূসের সঙ্গে রোহিঙ্গা বিষয়ে আলোচনা করেন, সম্ভবত তখন এই করিডোর নিয়ে চিন্তাভাবনা এবং আলোচনা-প্রস্তাব করা হয়।

আনোয়ার ইব্রাহিমের বার্তা

খলিলুর রহমান বৃহস্পতিবারের সংবাদ সম্মেলনে এই করিডোর বিষয়ে তৎকালীন সরকারের ভূমিকা নিয়ে কোনও ব্যাখ্যা দেওয়ার প্রয়োজন বোধ করেননি। রোহিঙ্গা বিষয়ে কী হচ্ছে, সরকারের কোনও পরিকল্পনা আছে কিনা, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এ বিষয়ে আলোচনা হয়েছে কিনা, এসব বিষয় পর্দার আড়ালেই রয়ে গেল।

তবে পর্দার ফাঁক দিয়ে আলোর এক ঝলক দেখালেন মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম। স্থানীয় মিডিয়ার রিপোর্ট অনুযায়ী, ইব্রাহিম বলেছেন, বাংলাদেশ থেকে তিন লাখ এবং মালয়েশিয়া থেকে পাঁচ হাজার রোহিঙ্গা ফেরত নিতে রাজি হয়েছে মিয়ানমার। ইব্রাহিমকে উদ্ধৃত করে মালয়েশিয়ার দ্য স্টার পত্রিকা জানায়, তিনি এই সাফল্যের জন্য তাঁর নিজের কূটনৈতিক প্রচেষ্টার কৃতিত্ব দাবি করেছেন।

এই সুখবর নিয়ে বাংলাদেশ এখনও কোনও উল্লাস করতে পারছে না, কারণ মিয়ানমারের সঙ্গে তাদের সরাসরি কোনও আলোচনা হয়নি। বাংলাদেশে এখন প্রায় ১৫ লাখ রোহিঙ্গা অবস্থান করছেন, কাজেই তিন লাখ ফেরত যাবার সম্ভাবনাটা ঢাকা একটা বিরাট সুখবর হিসেবেই দেখবে। কিন্তু বাংলাদেশ জানে যে অতীতে বিশেষ করে অং সান সু চি’র নির্বাচিত সরকারের সঙ্গে প্রত্যাবর্তন নিয়ে চুক্তি হলেও বিষয়টি নানা জটিলতায় আটকে যায়।

সু চি’র সরকারকে হটিয়ে ২০২১ সালে সামরিক বাহিনী ক্ষমতা নেওয়ার পর থেকে রোহিঙ্গাদের ফেরত নিতে মিয়ানমারের অনীহা আরও বৃদ্ধি পায়। দুবছর পর বিভিন্ন বিদ্রোহী গোষ্ঠীর যৌথ, সমন্বিত অভিযান শুরু হলে রোহিঙ্গাদের বিষয়টি আলোচনা থেকে প্রায় হারিয়ে যায়।

তবে রোহিঙ্গা প্রত্যাবর্তনের বিষয় এখন আরও বেশি জটিল হয়েছে। বিগত শেখ হাসিনা সরকার কয়েকবার উদ্যোগ নিয়েছিল কিছু রোহিঙ্গাকে পরীক্ষামূলকভভাবে ফিরে যেতে রাজি করাতে। সফল হয়নি। রাখাইন সীমান্ত থেকে বহু দূরে সন্দ্বীপের কাছে ভাসানচরে আবাসন তৈরি করে, সেখানে কয়েক হাজার রোহিঙ্গাকে স্থানান্তর করেও তাদের মাঝে ফিরে যাবার আগ্রহ সৃষ্টি করা যায়নি।

রোহিঙ্গাদের জাতীয়তা আর নিরাপত্তা

সবকিছুর কেন্দ্রে আছে রোহিঙ্গাদের জাতীয়তা নিয়ে অনিশ্চয়তা আর নিরাপত্তাহীনতা। শরণার্থীরা চিরজীবন কক্সবাজারের ক্যাম্পে থাকতে চায় না। তারা চায় মিয়ানমার তাদের নাগরিক হিসেবে পূর্ণ অধিকার এবং নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দিক। তাহলেই তারা ফিরে যেতে আগ্রহী হবেন। কিন্তু মিয়ানমারের সামরিক জান্তা শুধু নয়, পূর্ববর্তী সু চি সরকারও রোহিঙ্গাদের নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি দিতে গড়িমসি করেছিল। গত তিন বছরে পরিস্থিতি আরও জটিল আকার ধারণ করেছে।

রাখাইনের যুদ্ধে আরাকান আর্মির সাফল্যের মুখে মিয়ানমার সেনাবাহিনী এই রাজ্যের বেশির ভাগ অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে। এমনকি বাংলাদেশের সঙ্গে মিয়ানমারের ২৭০ কিলোমিটার সীমান্তের পুরোটাই এখন আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণে। শুধু রাখাইন রাজ্যের রাজধানী সিতওয়ে এবং খিয়াকফিউ বন্দর ছাড়া প্রায় সব অঞ্চলই আরাকান আর্মির দখলে। এই আরাকান আর্মি নিয়ে রোহিঙ্গাদের মধ্যে কোনও মোহ নেই। আরাকান আর্মির মূল ভিত্তি হচ্ছে—রাজ্যের রাখাইন সম্প্রদায়, যারা মূলত বৌদ্ধ। যেসব রোহিঙ্গা গত দু-তিন বছরের মধ্যে বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছেন, তাদের অনেকেই বলেছেন মিয়ানমার সেনাবাহিনীর মতো আরাকান আর্মিও রোহিঙ্গা-বিদ্বেষী। কাজেই আরাকান আর্মি-নিয়ন্ত্রিত রাখাইনে তারা নিরাপত্তা পাবেন বলে মনে করেন না।

তাহলে প্রশ্ন তোলা যায়, আনোয়ার ইব্রাহিম যে তিন লাখ রোহিঙ্গা ফিরে যাবার কথা বলছেন, সেটা কোন ভরসায়? মিয়ানমার কি শুধু তাঁকে এবং আসিয়ান জোটকে শান্ত রাখার জন্য এই প্রতিশ্রুতি দিয়েছে? সামরিক জান্তা তো খুব ভালো করেই জানে, নাগরিকত্ব আর নিরাপত্তার নিশ্চয়তা না পেলে তিন লাখ কেন, তিন হাজার রোহিঙ্গাও ফিরতে রাজি হবে না।

আরাকান আর্মির গুরুত্ব

বাংলাদেশের জন্য পরিস্থিতি এখন এতই জটিল যে এর সমাধান করা একা ঢাকার পক্ষে সম্ভব না। মিয়ানমারের সামরিক জান্তার সঙ্গে ঢাকার সম্পর্ক খুব একটা ঘনিষ্ঠ না। অপরদিকে, আরাকান আর্মির সঙ্গেও বাংলাদেশ তেমন কোনও সম্পর্ক স্থাপন করতে পেরেছে বলে মনে হয় না। সে কথা পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ প্রকারান্তরে স্বীকারও করেছেন। মিয়ানমারে আটক বাংলাদেশি জেলেদের ফিরিয়ে আনা নিয়ে বৃহস্পতিবার সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “আরকান আর্মির হাতে যখন থাকে (আটক জেলে) তখন এটা খুবই একটা কমপ্লিকেটেড ব্যাপার হয়, কারণ ওনারা খুব সহজে আমাদের সঙ্গে এনগেজড হতে চান না।” 

শুধু বাংলাদেশি জেলেদের ফিরিয়ে আনার ব্যাপারটা যদি এত কমপ্লিকেটেড হয়, তাহলে লাখ লাখ রোহিঙ্গা ফেরত পাঠানো নিয়ে বাংলাদেশ সরকার কীভাবে আরাকান আর্মির সঙ্গে এনগেজ করবে? রাস্তা হয়তো একটা আছে। রাখাইনে দুই শক্তি আরাকান আর্মি এবং সামরিক জান্তা—এই দুটোর সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখেছে দুই প্রতিদ্বন্দ্বী আঞ্চলিক শক্তি ভারত ও চীন। বাংলাদেশ এদের একজনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রাখছে, আর অন্যজনের সঙ্গে সম্পর্ক দুবছর ধরে শীতল হয়ে আছে, উষ্ণতার কোনও লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। 

এখন সময় এসেছে চীনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক কাজে লাগিয়ে রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব আর নিরাপত্তা নিয়ে আরাকান আর্মি এবং সামরিক জান্তাকে নমনীয় হতে আগ্রহী করা। মিয়ানমারে চীনের ব্যাপক বিনিয়োগ আছে, বিশেষ করে খিয়াকফিউ বন্দরে। স্বাভাবিক কারণেই দুই দেশের মধ্যে রাজনৈতিক সম্পর্ক গভীর। আরাকান আর্মির সঙ্গে বেইজিংয়ের সম্পর্ক গভীর বলেও জানা যায়। এর আগে হাসিনা সরকার একবার চীনের মধ্যস্থতা চেয়েছিল, কিন্তু সেখানে হয়তো আন্তরিকতার অভাব ছিল। তারেক রহমানের সরকারকে শুধু আন্তরিকতা নয়, সমস্যা সমাধানে দৃঢ় সংকল্প দেখাতে হবে।

ভারতও এ ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে পারে। সামরিক জান্তার প্রধান, প্রেসিডেন্ট মিন অং হ্লাইং সম্প্রতি ভারত সফর করে গেছেন। আরাকান আর্মির সঙ্গেও ভারতের যোগাযোগ আছে বলে জানা যায়। বিশেষ করে ভারতের গুরুত্বপূর্ণ কালাদান ট্রানজিট প্রকল্পের নিরাপত্তার জন্য। এই প্রকল্পের অধীনে ভারতীয় পণ্য জাহাজ করে কলকাতা থেকে সিতওয়ে বন্দর হয়ে কালাদান করিডোর দিয়ে মিজোরামে পৌঁছে যায়।

আরাকান আর্মির সঙ্গে ঢাকা যদি কোনও চ্যানেল অব কমিউনিকেশন ইতোমধ্যে স্থাপন না করে থাকে, তাহলে সেটা হবে গত দুবছরের পররাষ্ট্রনীতি পরিচালনার একটি বড় ব্যর্থতা। তবে ভূ-রাজনীতিতে এ ধরনের ব্যর্থতা স্থায়ী হওয়ার কোনও কারণ থাকে না। মালয়েশিয়ার আনোয়ার ইব্রাহিম তাঁর কূটনীতি দিয়ে একটা দরজা হয়তো খুলে দিয়েছেন, এখন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব সাংবাদিকদের ওপর গরম না দেখিয়ে মিয়ানমারের দুই শক্তির সঙ্গে অর্থবহ আলোচনা শুরু করা, যাতে শুধু তিন লাখ নয়, ১৫ লাখ রোহিঙ্গাই নিজ দেশে ফিরে যেতে পারে। 

লেখক: একজন সাংবাদিক এবং পডকাস্টার

/এপিএইচ/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
বাংলাদেশের দাবায় ইতিহাসের হাতছানি, গ্র্যান্ডমাস্টার নর্মের দ্বারপ্রান্তে মনন
বাংলাদেশের দাবায় ইতিহাসের হাতছানি, গ্র্যান্ডমাস্টার নর্মের দ্বারপ্রান্তে মনন
ভারতকে আনতে কূটনৈতিক তৎপরতা, সরকারের সঙ্গে বৈঠকে তামিম
ভারতকে আনতে কূটনৈতিক তৎপরতা, সরকারের সঙ্গে বৈঠকে তামিম
অনেক সম্ভাবনা আছে, মার্কিন ব্যবসায়ীরা ঢাকায় আসছে: সার্জিও গোর
অনেক সম্ভাবনা আছে, মার্কিন ব্যবসায়ীরা ঢাকায় আসছে: সার্জিও গোর
হাওরে ডুবে গেলো অতিরিক্ত যাত্রীবোঝাই নৌকা, নিখোঁজ ৪
হাওরে ডুবে গেলো অতিরিক্ত যাত্রীবোঝাই নৌকা, নিখোঁজ ৪
সর্বশেষসর্বাধিক