এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে ২০২৪ সালের কোটা আন্দোলন, সেটিকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা সরকারবিরোধী আন্দোলন এবং পরবর্তী রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিসরে তরুণদের এক ধরনের দৃশ্যমান প্রভাব কিংবা জনপ্রিয়তা তৈরি হয়েছে। যদিও গত দুই বছরে সাংস্কৃতিক অঙ্গনে জনপ্রিয় হয়ে ওঠা তরুণ মুখ খুব বেশি নয়। হাতেগোনা যে কয়জন নির্দিষ্ট গণ্ডির বাইরে গিয়ে ভিন্ন ঘরানার শ্রোতার কাছেও পরিচিতি পেয়েছেন, আহমাদ আতাউল্লাহ সালমান তাদের একজন।
তার কণ্ঠ ও গায়কি এমন অনেক মানুষকেও মুগ্ধ করেছে—যারা তার রাজনৈতিক বা ধর্মীয় বিশ্বাসের সঙ্গে একমত নন। রাজনৈতিক পরিবারের সন্তান হওয়ায় তার গান কেবল বিনোদন কিংবা সামাজিক বার্তার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি, পেয়েছে বাড়তি রাজনৈতিক তাৎপর্যও। বিশেষ করে ৫ আগস্টের পর দেশের বিভিন্ন জায়গায় গান-বাজনা ও সাংস্কৃতিক আয়োজন নিয়ে আপত্তি বাধা কিংবা বিতর্কের মধ্যে বাদ্যযন্ত্রসহ সালমানের গান পরিবেশন করাটা এক ধরনের ইতিবাচক বার্তা হয়ে উঠেছিল।
এখন সেই সালমানই জানালেন, তিনি আর বাদ্যযন্ত্রের সঙ্গে গান করবেন না।
প্রথমেই একটি বিষয় পরিষ্কার করা দরকার। এটি তার একান্ত ব্যক্তিগত ও পারিবারিক সিদ্ধান্ত। একজন শিল্পী তার বিশ্বাস, ধর্মীয় উপলব্ধি কিংবা ব্যক্তিগত অবস্থান থেকে কী করবেন বা করবেন না—সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার পূর্ণ অধিকার তার আছে। সেই সিদ্ধান্তকে সম্মান করাই মুক্ত সাংস্কৃতিক পরিবেশের স্বাভাবিক দাবি।
কিন্তু প্রশ্নটা সেখানেই শেষ হয় না।
সমস্যা তৈরি হয় যখন একজন জনপ্রিয় শিল্পীর ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তকে তার ব্যক্তিগত পরিসরের বাইরে নিয়ে গিয়ে—বৃহত্তর কোনও সাংস্কৃতিক অবস্থানের প্রমাণ হিসেবে হাজির করা হয়। সালমানের ক্ষেত্রে সেই সম্ভাবনাটি একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় কি?
বাংলাদেশে গান-বাজনা নিয়ে ধর্মীয় বিতর্ক নতুন নয়। কিন্তু ৫ আগস্টের পর এই বিতর্ক যেন নতুন একটি সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট পেয়েছে। দেশের বিভিন্ন জায়গায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, গান, নাটক কিংবা শিল্পীদের অনুষ্ঠান নিয়ে আপত্তি ও বাধার ঘটনা সামনে এসেছে। কোথাও ধর্মীয় অনুভূতির কথা বলা হয়েছে, কোথাও ‘অশ্লীলতা’র অভিযোগ উঠেছে, আবার কোথাও সরাসরি গান-বাজনাই আপত্তির কারণ হিসেবে সামনে এসেছে।
এই বাস্তবতায় একজন জনপ্রিয় ইসলামী সংগীতশিল্পীর বাদ্যযন্ত্র ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত স্বাভাবিকভাবেই বাড়তি তাৎপর্য বহন করে। বিশেষ করে তিনি যদি এমন একটি রাজনৈতিক পরিবারের সন্তান হন, যার পরিচিতি দেশের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ। ফলে সালমানের সিদ্ধান্তের সামাজিক প্রভাব তার ব্যক্তিগত পরিসরে সীমাবদ্ধ থাকবে—এমন নিশ্চয়তা নেই।
সালমান নিজেই জানিয়েছেন, তার পরিবেশনায় বাদ্যযন্ত্র ব্যবহারের বিষয়টি অনেকেই পছন্দ করেননি, কেউ কেউ কষ্ট পেয়েছেন এবং তাকে বারবার তা থেকে বিরত থাকার পরামর্শ দিয়েছেন। এখানেই প্রশ্নটা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে—এটি কি কেবল একজন শিল্পীর নিজের বিশ্বাসে ফিরে যাওয়ার গল্প, নাকি ভবিষ্যতে বৃহত্তর সাংস্কৃতিক বিতর্কে ব্যবহার করার মতো একটি দৃষ্টান্ত হয়ে উঠতে পারে?
আশঙ্কার জায়গাটা এখানেই
যারা গান-বাজনাকে ধর্মীয়ভাবে নিষিদ্ধ মনে করেন, তারা চাইলে সালমানের সিদ্ধান্তকে নিজেদের অবস্থানের পক্ষে একটি ‘সফল উদাহরণ’ হিসেবে সামনে আনতে পারেন। বলতে পারেন, জনপ্রিয় একজন ইসলামী সংগীতশিল্পীও শেষ পর্যন্ত বাদ্যযন্ত্র থেকে সরে এসেছেন। তার জনপ্রিয়তা ও গ্রহণযোগ্যতা থাকায় এই সিদ্ধান্তকে অনুসরণীয় মনে করতে পারেন তার ভক্তদের একটি অংশও।
অর্থাৎ, একজন শিল্পীর ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত ধীরে ধীরে একটি সামাজিক প্রবণতার প্রতীকে পরিণত হতে পারে।
এখানেই ‘ট্রাম্পকার্ড’-এর প্রসঙ্গটি আসে।
সালমান এমন একজন শিল্পী, যার জনপ্রিয়তা শুধু একটি নির্দিষ্ট ধর্মীয় বা রাজনৈতিক পরিসরে আটকে নেই। রাজনৈতিক পরিচয় কিংবা ধর্মীয় অবস্থানের সঙ্গে একমত না হয়েও অনেকে তার গান শুনেছেন, তার কণ্ঠের প্রশংসা করেছেন। ফলে তার সিদ্ধান্তের প্রতীকী প্রভাবও স্বাভাবিকভাবেই ব্যক্তিগত সীমানা ছাড়িয়ে যেতে পারে।
তবে এর বিপরীত দিকটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। সালমান বাদ্যযন্ত্র ছেড়েছেন মানেই তিনি গান ছেড়ে দিয়েছেন, এমন নয়। তিনি বরং স্পষ্ট করেছেন, গান বা সাংস্কৃতিক চর্চাকে পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করছেন না, তার সিদ্ধান্ত নির্দিষ্টভাবে বাদ্যযন্ত্রের সঙ্গে গান পরিবেশন না করা নিয়ে। এই পার্থক্যটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
কিন্তু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে সূক্ষ্ম পার্থক্যের আয়ু খুব কম। ‘সালমান বাদ্যযন্ত্র ছেড়েছেন’ খুব সহজেই হয়ে যেতে পারে ‘সালমান গান ছেড়েছেন’ কিংবা ‘বাদ্যযন্ত্র হারাম’। শঙ্কার জায়গাটা সেখানেই।
একজন শিল্পী তার নিজের বিশ্বাসের কারণে কোনও নির্দিষ্ট শিল্পচর্চা থেকে সরে দাঁড়াতে পারেন। কেউ গান শুনবেন, কেউ শুনবেন না। কেউ বাদ্যযন্ত্র ব্যবহার করবেন, কেউ করবেন না। ধর্মীয় বিশ্বাসের কারণে কেউ কোনও ধরনের সাংস্কৃতিক প্রকাশ থেকে বিরত থাকবেন—এটিও তার অধিকার।
কিন্তু ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত যখন অন্যের সাংস্কৃতিক স্বাধীনতার মাপকাঠি হয়ে ওঠে, তখন বিষয়টি আর ব্যক্তিগত থাকে না।
সালমানের ক্ষেত্রেও তাই মূল প্রশ্ন তার বাদ্যযন্ত্র ছাড়া নয়। প্রশ্ন হলো, তার এই সিদ্ধান্তকে আমরা কীভাবে ব্যাখ্যা করছি এবং সমাজ এটি কীভাবে ব্যবহার করছে।
তিনি যদি মনে করেন, বাদ্যযন্ত্রের সঙ্গে গান করা তার ধর্মীয় বা ব্যক্তিগত বিশ্বাসের সঙ্গে আর সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়, সেটি তার সিদ্ধান্ত। কিন্তু সেই সিদ্ধান্তের দোহাই দিয়ে অন্য শিল্পীকে বাদ্যযন্ত্র ব্যবহার না করতে বলা, কোনও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়া, শিল্পীর স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করা কিংবা গান-বাজনাকে সামাজিকভাবে অগ্রহণযোগ্য করে তোলার চেষ্টা সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। দুটিকে গুলিয়ে ফেলা বিপজ্জনক।
আজ সালমান বাদ্যযন্ত্র ছাড়লেন। কাল অন্যকোনও শিল্পী হয়তো অন্য কোনও কারণে একটি নির্দিষ্ট গান গাওয়া ছেড়ে দেবেন। তার পরের দিন কেউ কোনও পোশাক পরা থেকে বিরত থাকবেন। প্রত্যেকের ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তকে সম্মান করা একটি মুক্ত সমাজের লক্ষণ। কিন্তু সেই সিদ্ধান্তকে অন্যের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার সংস্কৃতি তৈরি হলে ব্যক্তিস্বাধীনতার জায়গায় শুরু হয় সামাজিক নিয়ন্ত্রণ। আর সাংস্কৃতিক পরিসরে এই নিয়ন্ত্রণের ফল ভয়াবহ হতে পারে।
গান, নাটক, চলচ্চিত্র, চিত্রকলা কিংবা সাহিত্য কোনও সমাজের বিলাসিতা নয়। এগুলো সমাজের আত্মপ্রকাশের মাধ্যম। সেখানে ধর্মীয় মূল্যবোধ থাকবে, রাজনৈতিক বক্তব্য থাকবে, প্রতিবাদ থাকবে, বিনোদন থাকবে, প্রেম থাকবে, হাসি থাকবে, বিতর্কও থাকবে। কোনও একটি মতের সঙ্গে না মিললেই সেই প্রকাশকে বন্ধ করে দেওয়ার প্রবণতা শেষ পর্যন্ত পুরো সাংস্কৃতিক পরিসরকেই সংকুচিত করে।
সালমানের জনপ্রিয়তা এই জায়গায়ও গুরুত্বপূর্ণ। তিনি দেখিয়েছেন, ইসলামী ভাবধারার গান আধুনিক উপস্থাপনা, শক্তিশালী কণ্ঠ ও ভিন্নধারার পরিবেশনার মাধ্যমে বৃহত্তর শ্রোতার কাছে পৌঁছাতে পারে। অর্থাৎ ধর্মীয় পরিচয় এবং আধুনিক সাংস্কৃতিক প্রকাশ যে সব সময় পরস্পরের বিপরীত নয়, তার একটি বাস্তব উদাহরণও তিনি তৈরি করেছিলেন।
এখন তিনি সেই পথ থেকে সরে গেলেন।
এটি তার ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত হিসেবে অবশ্যই সম্মানযোগ্য। কিন্তু এই সিদ্ধান্তকে যদি গান-বাজনার বিরুদ্ধে সামাজিক চাপ তৈরির হাতিয়ার বানানো হয়, তাহলে সেটি শুধু সালমানের সিদ্ধান্তের অপব্যবহারই হবে না—বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক পরিসরের জন্যও একটি খারাপ নজির তৈরি করবে।
তাই সালমানের সিদ্ধান্তকে তার নিজের জায়গায় রাখাই সবচেয়ে জরুরি। তিনি বাদ্যযন্ত্র ব্যবহার করবেন না—এটি তার অধিকার। অন্য একজন শিল্পী বাদ্যযন্ত্র ব্যবহার করবেন—সেটিও তার অধিকার। একজন শ্রোতা সালমানের গান শুনবেন, অন্যজন অন্য শিল্পীর গান শুনবেন— দুটিই স্বাভাবিক। এই বহুত্বই সংস্কৃতির শক্তি।
সালমানের সিদ্ধান্তের প্রতি সম্মান দেখানোর সবচেয়ে ভালো উপায় সম্ভবত এটিই—তার ব্যক্তিগত পছন্দকে সম্মান করা, কিন্তু সেটিকে অন্যের পছন্দ নিয়ন্ত্রণের হাতিয়ার হতে না দেওয়া। তবু সাম্প্রতিক কিছু ঘটনার প্রেক্ষাপটে প্রশ্নটি তোলা কি একেবারেই অমূলক যে সালমান বাদ্যযন্ত্র ছেড়ে ‘তৌহিদি জনতার’ হাতে একটি ‘ট্রাম্পকার্ড’ তুলে দিলেন? হয়তো দিয়েছেন। হয়তো দেননি।
কিন্তু সেই সিদ্ধান্তকে কে, কীভাবে এবং কোন উদ্দেশ্যে ব্যবহার করছে—শেষ পর্যন্ত সেটিই আসল প্রশ্ন।
লেখক: সাংবাদিক ও সংস্কৃতিকর্মী




