পূর্বাচলের ভিডিওতে পুলিশ-মিডিয়ায় নৈতিকতার অভাবের প্রতিচ্ছবি 

সাবির মুস্তাফা 
২৪ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ আপডেট : ২৪ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০

বাংলাদেশে প্রাইভেসি বা ব্যক্তিগত গোপনীয়তা বলতে হয়তো কিছুই নেই। থাকলেও কর্তৃপক্ষ বা মিডিয়ার অনেকেই এর মানে বোঝেন না; বুঝলেও প্রাইভেসির সারমর্ম অনুযায়ী কাজ করতে তারা রাজি নন। এই নারাজ হওয়ার প্রবণতা সবচেয়ে প্রবল হয় যখন কোনও নারীর প্রাইভেসি লঙ্ঘন করার সুযোগ আসে। দেশের অনেক পুরুষের মনে নারীকে জনসমক্ষে হেয় করার যে অভিলাষ প্রায় মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে, তা দমন করার কোনও পথ যে এই সমাজ এখনও খুঁজে পায় নাই, তার প্রমাণ পাওয়া গেল গত দু-এক দিনে। 

মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) ভোরে ডিটেকটিভ ব্র্যাঞ্চের লোকজন ঢাকার কাছে পূর্বাচলে পুলিশের এক অতিরিক্ত ডিআইজি-এর বাসায় হানা দেয়। বলা হয়, মাদক-বিরোধী অভিযান। যদিও আজকাল ক্লাব বা বার-এ হানা দিলেই সেটিকে ‘মাদক-বিরোধী’ অভিযানই বলা হয়। কিন্তু অতিরিক্ত ডিআইজির বাসায় মাদকের খুব একটা উপস্থিতি ছিল বলে মনে হলো না। ডিটেকটিভ ব্রাঞ্চ যে ছবি প্রকাশ করেছে সেখানে দেড় বোতল মদ থাকলেও মাদকের অনুপস্থিতি ছিল লক্ষণীয়। তবে এই অভিযান নিয়ে সমস্যা সেখানে নয়। এই অভিযান যেভাবে মিডিয়াতে প্রচার করা হয়েছে বা প্রচার করার ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে; সেটাই হলো প্রশ্নের বিষয়। 

কিছু দিন আগে ঢাকায় জার্মান ক্লাব নামের এক ক্লাবে পুলিশের অভিযানের সময় প্রধান ফটকের বাইরে থেকে পুরো দৃশ্য ভিডিও করা হচ্ছিল। ক্লাবের অতিথিরা এক এক করে বের হয়ে আসার সময় তাদের ফিল্ম করা হলো এবং সেই ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হলো। বলাই বাহুল্য, একজন সুদর্শন নারীর ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হয়। কিন্তু পূর্বাচলে যা ঘটলো তা আরও ন্যাক্কারজনক এবং এখানে শুধু সামাজিক মাধ্যমের লাগামহীন কন্টেন্ট ক্রিয়েটররা না; এমনকি প্রতিষ্ঠিত মূলধারার সংবাদমাধ্যমও জড়িয়ে পড়ে। 

কোনটা ‘অনৈতিক কর্মকাণ্ড?’ 

পূর্বাচলের বাসার ভেতরে গিয়ে বিভিন্ন রুমে ভিডিও করা হয়। সিঁড়ি দিয়ে উপরতলা থেকে কয়েকজন মেয়ে নেমে আসলে তাদের মুখের ভিডিও করার সময় দুই-একজন ওড়না দিয়ে মুখ ঢাকার চেষ্টা করলেও বেশিরভাগ তা পারেনি। সেখানে উপস্থিত পুরুষরাও ভিডিওতে স্থান পায়, যদিও মনোযোগ বেশি ছিল নারীদের দিকে। অভিযানের বর্ণনা শুনে অনেকেই মনে করবেন সেখানে কোন ‘অনৈতিক কর্মকাণ্ড’ চলছিল। তারসঙ্গে একের পর এক নারীর চেহারা যদি ভিডিওতে ভেসে ওঠে, তখন পাবলিকের মনে কি দৃশ্য তৈরি হয়ে যায়; তা বোঝার জন্য কোন মনস্তত্ত্ববিদের প্রয়োজন নেই। 

এখানে প্রশ্ন করা যেতে পারে, অনৈতিক কর্মকাণ্ড কোনটা? ঘরের ভেতরে প্রাপ্তবয়স্ক নারী-পুরুষের মেলামেশা, নাকি নারীদের ভিডিও করে, বাসাটাকে ‘হারেম’ বলে তাদের সামাজিকভাবে হেয় করা? 

ভিডিও গ্রহণ এবং তা প্রচার করে নারীদের শুধু হেয়ই করা হয়নি; তাদের যেনে-শুনে-বুঝেই হেয় করা হয়েছে, এবং তাদের নিরাপত্তা হুমকির মুখে ফেলা হয়েছে। বাংলাদেশের কর্তৃপক্ষ এবং গণমাধ্যমের একটা অংশের মন-মানসিকতা, নারীর প্রতি তাদের মনোভাব, দেশের সাধারণ নাগরিকের অধিকার সম্পর্কে তাদের ধ্যান-ধারনার একটি চিত্র শুধু এই গুটি কয়েক ‘মাদক-বিরোধী’ অভিযানের মধ্যে দিয়েই উঠে এসেছে। চিত্রটি মোটেই সুখকর নয়, কারণ এখানে সমাজেরই মানসিক স্বাস্থ্য প্রশ্নের মুখে পড়েছে। 

একটা কথা পরিষ্কার করার প্রয়োজন। যেকোনও অভিযানে পুলিশ ভিডিও গ্রহণ করবে, সেটাই স্বাভাবিক। অভিযান যে পুলিশের নিজস্ব নিয়ম-কানুন মেনে করা হচ্ছে, আলামত কীভাবে, কোথায় পাওয়া গেল, আটককৃত লোকজনকে কীভাবে, কোথায় আটক করা হলো ইত্যাদি তথ্য ভিডিওর মাধ্যমে সংরক্ষণ করা জরুরি। কিন্তু সেই ভিডিও হবে পুলিশের নিজস্ব আলামত, নিজেদের তদন্তে সহায়তা করার জন্য, অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য-প্রমাণ সংগ্রহের গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়ার অংশ। 

এরকম ভিডিও আনুষ্ঠানিক চার্জ গঠনে এবং মামলা পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। একইভাবে, অভিযুক্তের আইনজীবীরা পুলিশের এই ভিডিও ব্যবহার করেই তাদের মক্কেলের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ খারিজ করার চেষ্টা করতে পারেন। কিন্তু সাম্প্রতিক অভিযানগুলোর ভিডিও মামলায় সহায়তা করার জন্য গ্রহণ করা হয়েছে বলে মনে হয় না।

মিডিয়ার কাজে পুলিশের ভূমিকা

প্রথমত, ভিডিওগুলো কে বা কারা ধারণ করেছে তা পরিষ্কার নয়। অন্তত জার্মান ক্লাবের ফটকের বাইরের ভিডিও দেখে মনে হয়েছে সেটা পুলিশের কেউ ছিল না। অর্থাৎ, অভিযানের খবর পেয়ে কেউ সেখানে গিয়ে ভিডিও করেছে। পূর্বাচলের ঘটনাও কি তাই? ভিডিওগুলো ঘরের ভেতরে এবং বাইরে তোলা। এক নারীকে দেখা গেলো ভিডিও গ্রহণকারীর দিকে আঙুল উঁচিয়ে কিছু বলতে। পুলিশের কেউ যদি ক্যামেরা হাতে থাকতো, ওই নারী হয়তো সেটা করতেন না। সবচেয়ে ন্যাক্কারজনক ঘটনা হলো সেই ভিডিওগুলো সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া, নারীদের চেহারা প্রকাশ করা, জনসমক্ষে তাদের হেয় করা। 

এরকম ঘটনা প্রথমবারের মতো ঘটছে না, কিন্তু বিশেষ করে পূর্বাচল আবার দেশের মিডিয়ার একাংশে নৈতিকতার অভাব সবার চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিল। এই অভ্যাস গড়ার পেছনে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীরও বড় ভূমিকা আছে। বহু বছর ধরে পুলিশ, পরবর্তীতে র‍্যাব বা বিজিবি কোন কথিত অপরাধের দায়ে আটককৃত ব্যক্তিদের ছবি এবং পরিচয় মিডিয়াকে সরবরাহ করে আসছে। আটককৃত ব্যক্তি শুধুমাত্র সন্দেহভাজন হলেও তার ছবি, অনেক সময় তার গলায় ‘অপরাধী’ সাইনবোর্ড টাঙিয়ে মিডিয়াকে দেওয়া হতো। এখনও অনেকসময় হয়। একজন ব্যক্তি যে আদালতে দোষী সাব্যস্ত না হয় হওয়া পর্যন্ত নিরাপরাধ, আইনের এই মৌলিক বিষয়টি যেন বাংলাদেশের আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে অজানা তথ্য।

বাংলাদেশের মিডিয় শিল্পে কখনও কোনও ধরনের ‘সম্পাদকীয় নীতিমালা’ বা এথিকাল স্ট্যান্ডার্ড নিয়ে কোনও কিছু ছিল না। কিছু কিছু বড় প্রতিষ্ঠান এথিকস নিয়ে আলোচনা করেছে, কোনও কোনও ক্ষেত্রে নিজেদের একটা নীতিমালা তৈরি করার চেষ্টা করেছে। যেমন, এক সময় ধর্ষণের শিকার নারীদের ছবি-পরিচয় ছাপা হতো। কিন্তু সেখানে পরিবর্তন এসেছে। ভিক্টিম-এর পরিচয় এখন বেশির ভাগ ক্ষেত্রে গোপন রাখা হয়। 

কিন্তু এই ধরনের সুরক্ষা অভিযুক্তেরও প্রাপ্য। কারও বিরুদ্ধে পর্যাপ্ত সাক্ষ্য প্রমাণ পেলেই তবে তাঁর বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক চার্জ গঠন করা যায়, এবং চার্জ গঠন না করা পর্যন্ত অভিযুক্তের পরিচয়ও গোপন রাখা উচিত। না হলে আদালতের আগে মিডিয়াতেই তাঁর বিচার হয়ে যাবে। এখানেই দেশের মিডিয়া এখনো বিভ্রান্তিতে ভুগছে। 

সম্পাদকীয় নীতিমালা এবং এথিকস

এখনও দেখা যায়, পুলিশের দেওয়া অভিযুক্ত বা সন্দেহভাজন ব্যক্তির ছবি পরিচয়সহ প্রকাশ করা হচ্ছে। আর সামাজিক মাধ্যমে কন্টেন্ট ক্রিয়েটদের কথা আলাদা। তাদের কাজে কোনও সম্পাদকীয় যাচাই-বাছাই, কোন ধরনের ‘গেট-কিপিং’ আছে কিনা সন্দেহ। অনেক ক্ষেত্রে, এ ধরনের ক্রিয়েটররা একাই একটা চ্যানেল চালান; তারা আয়ের জন্য পুরোপুরি ভিউ এর সংখ্যা এবং এনগেজমেন্টের উপর নির্ভর করে। সম্পাদকীয় ‘ভালো-মানুষী’ বা এথিকস-এর বিবেচ্য বিষয়গুলো নিয়ে মাথা ঘামানোর সময় তারা পান না। 

প্রতিষ্ঠিত, মূলধারার মিডিয়ার কথা ভিন্ন। তাদের লোকবল আছে, সাংবাদিকতার নিয়ম-কানুন, সম্পাদকীয় নীতি, এথিকস ইত্যাদি নিয়ে বিশ্বের অন্যান্য দেশে কী কাজ হয়েছে, তা নিয়ে পড়া-শোনা এবং চিন্তা-ভাবনা করার সক্ষমতা তাদের আছে। সাধারণ মানুষের অধিকার, প্রাইভেসি, নিরাপত্তা রক্ষা করে কীভাবে রিপোর্টিং করতে হবে, তা নিয়ে নিজেদের নীতিমালা তৈরি এবং সাংবাদিকদের এসব বিষয়ে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ দেওয়া তাদের পক্ষে সম্ভব। 

বিশেষ করে নারী, শিশু, ধর্মীয় বা জাতিগত সংখ্যালঘু এবং সমাজের অন্যান্য দুর্বল জনগোষ্ঠী নিয়ে স্পর্শকাতর স্টোরি কীভাবে কাভার করা উচিত, সে বিষয়ে সাংবাদিকদের সেন্সিটাইজ করার কাজ প্রতিষ্ঠিত গণমাধ্যমের পক্ষে করা সম্ভব। এগুলো নিয়ে কাজ অনেক আগেই করা উচিত ছিল। কিন্তু এখনও দেখা যায়, পুলিশের দেওয়া আটককৃত লোকের ছবি, নাম-পরিচয় প্রকাশ করা হচ্ছে। 

গণমাধ্যমের নৈতিকতা নিয়ে ভাবা দরকার; তাদের রিপোর্টিং সাধারণ মানুষকে কীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে, তা নিয়ে চিন্তা করা আবশ্যক। আইনের চোখে নিরাপরাধ লোক যেন মিডিয়া ট্রায়ালে ‘দোষী’ সাব্যস্ত হয়ে সামাজিকভাবে হেয় না হন, সেদিকে খেয়াল রাখা প্রয়োজন। 

যাদের কোনও ক্ষমতা নেই, যারা বিত্তবান নয়, উচ্চ মহলে কোনও যোগাযোগ নেই, রাজনৈতিক মহলে যাদের কোন প্রভাবশালী মামা-চাচা নাই, তাদের হেয় করা শুধু অন্যায় না, এটা রীতিমত আরেকটি অপরাধ। বিশেষ করে যখন নারীর সামাজিক মর্যাদা এবং নিরাপত্তার কথা তোয়াক্কা না করে তাদের ছবি বা ভিডিও প্রকাশ করা হচ্ছে। 

এই প্র্যাকটিস বন্ধের জন্য যেমন মিডিয়া শিল্প থেকে উদ্যোগ নেওয়া দরকার। তেমনি পুলিশের ওপর সরকারের বিধি-নিষেধ আরোপ করা প্রয়োজন যাতে তারা আদালতে বিচারের আগে মানুষকে হেয় করতে পারে এমন কোন কাজ না করে। 

লেখক: সাংবাদিক এবং পডকাস্টার। 
ইমেইল- [email protected]

/ইউএস/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
বাবার বাড়ি থেকে নাস্তা কম দেওয়ায় অন্তঃসত্ত্বাকে মারধর, ৯ দিন পর মৃত্যু
বাবার বাড়ি থেকে নাস্তা কম দেওয়ায় অন্তঃসত্ত্বাকে মারধর, ৯ দিন পর মৃত্যু
গাজীপুরে সুপ্রিম গার্মেন্টসে ভয়াবহ আগুন
গাজীপুরে সুপ্রিম গার্মেন্টসে ভয়াবহ আগুন
আসিফের গাড়িতে গুলি, ফেসবুক পোস্টে কী বললেন স্ত্রী
আসিফের গাড়িতে গুলি, ফেসবুক পোস্টে কী বললেন স্ত্রী
কণ্ঠশিল্পী আসিফের গাড়িতে গুলিবর্ষণ কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না: জামায়াত 
কণ্ঠশিল্পী আসিফের গাড়িতে গুলিবর্ষণ কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না: জামায়াত 
সর্বশেষ সর্বাধিক