এইচএসসির ফল বিপর্যয় ও আমাদের শিক্ষা নামক গোলকধাঁধা

চিররঞ্জন সরকার
০১ নভেম্বর ২০২৬, ১৬:০৪ আপডেট : ০১ নভেম্বর ২০২৬, ১৬:০৪

‘লেখাপড়া করে যে, গাড়িঘোড়া চড়ে সে’—মদনমোহন তর্কালঙ্কারের এই ছড়াটি ছোটবেলা থেকেই আমাদের শেখানো হয়। ফলে অনেকের মনেই ধারণা তৈরি হয়, লেখাপড়া শেষ করে একটি সার্টিফিকেট হাতে পেলেই বুঝি সাফল্যের দরজা খুলে যাবে। কাড়ি কাড়ি টাকা কামানোর সুযোগ সৃষ্টি হবে। কিন্তু এবারের এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফলাফল সেই স্বপ্নের সামনে বড় প্রশ্নচিহ্ন এঁকে দিয়েছে। প্রায় ছয় লাখ শিক্ষার্থী পাস করতে পারেনি। তাদের কাছে এখন গাড়িঘোড়ায় চড়ার স্বপ্নের চেয়েও বড় হয়ে উঠেছে পরবর্তী জীবনের অনিশ্চয়তা। আর আমাদের সামনে উঠে এসেছে আরও বড় একটি প্রশ্ন—এই বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর ব্যর্থতার দায় আসলে কার?

এবার মোট ১২ লাখ ৪০ হাজার ৭৯৮ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে পাস করেছেন ৬ লাখ ৪৬ হাজার ৬৮৫ জন, ফেল করেছেন ৫ লাখ ৯৪ হাজার ১১৩ জন। গড় পাসের হার ৫২ দশমিক ১২ শতাংশ, যা গত বছরের ৫৮ দশমিক ৮৩ শতাংশের তুলনায়ন ৬ দশমিক ৭১ শতাংশ কম। জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যাও কমেছে ২৯ হাজারের বেশি। অর্থাৎ শুধু পাসের হার নয়, সর্বোচ্চ ফল অর্জনকারীর সংখ্যাও কমেছে উল্লেখযোগ্যভাবে। এই ফলাফলকে নিছক সংখ্যার ওঠানামা বলে এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। এর পেছনে শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতি, পাঠদানের মান, মূল্যায়ন পদ্ধতি এবং সামগ্রিক শিক্ষাব্যবস্থার কার্যকারিতা—সবকিছুই নতুন করে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।

ইংরেজি ও তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ে শিক্ষার্থীদের দুর্বলতা বিশেষভাবে উদ্বেগজনক। এই দুই বিষয়ে প্রায় ৩ লাখ ৮২ হাজার শিক্ষার্থী পাস করতে পারেনি। শুধু ইংরেজিতেই ফেল করেছে ২ লাখ ৪৩ হাজার ৫২৮ জন। ইংরেজিতে দুর্বলতা আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার দীর্ঘদিনের সমস্যা। শিক্ষার্থীরা বছরের পর বছর ইংরেজি পড়ে, পরীক্ষা দেয়, নম্বরও পায়; কিন্তু বাস্তবে ভাষাটি ব্যবহার করতে গিয়ে অনেকেই সমস্যায় পড়ে। এর পেছনে দক্ষ শিক্ষকের অভাব, প্রাথমিক স্তরে দুর্বল ভিত্তি এবং মুখস্থনির্ভর পাঠদানের ভূমিকা রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে শ্রেণিকক্ষে ভাষা শেখার চর্চার বদলে পরীক্ষার আগে কোচিংয়ের ওপর নির্ভর করা হয়। অথচ ভাষা শেখা কোনো শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি নয়; এটি নিয়মিত অনুশীলনের বিষয়। শুধু পরীক্ষার আগে কিছু নিয়ম মুখস্থ করিয়ে ইংরেজিতে দক্ষতা তৈরি করা যায় না।

তবে এবারের ফল বিপর্যয়ের কারণ হিসেবে শুরু থেকেই দেখা যাচ্ছে, অসংখ্য ব্যাখ্যা। শিক্ষার্থীদের কেউ কেউ রাজনৈতিক পটপরিবর্তন, সামাজিক অস্থিরতা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং নতুন কাঠামোর কঠিন প্রশ্নকে দায়ী করছেন। শিক্ষকদের একটি অংশের অভিযোগ, শিক্ষার্থীরা পড়াশোনায় আগের মতো মনোযোগী নয়; সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ নানা বিষয়ে তাদের ব্যস্ততা বেড়েছে। শিক্ষা সংশ্লিষ্টদের কেউ বলছেন, কারিকুলামের দুর্বলতা, শিখন ঘাটতি বিবেচনায় না নেওয়া এবং মুখস্থনির্ভর মূল্যায়নই ফল খারাপ হওয়ার কারণ। এসব ব্যাখ্যার প্রতিটিতেই কিছু বাস্তবতা থাকতে পারে। কিন্তু একটি বিষয় লক্ষণীয়—সব পক্ষই সমস্যার কথা বলছে, অথচ নিজেদের দায়িত্বের জায়গাটি নিয়ে কথা বলছে তুলনামূলক কম। ব্যর্থতার কারণ খুঁজতে গিয়ে যেন সবাই অন্যের খাতা পরীক্ষা করতে ব্যস্ত।

আরও উদ্বেগের বিষয়, এবার দেশের ২৯৩টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কোনো শিক্ষার্থীই পাস করতে পারেনি। গত বছর এমন প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ছিল ২০২; অর্থাৎ এক বছরে বেড়েছে ৯১টি। একটি প্রতিষ্ঠানের সব পরীক্ষার্থী ফেল করলে সেটি শুধু শিক্ষার্থীদের অযোগ্যতার প্রমাণ হতে পারে না। সেখানে পাঠদান কতটা নিয়মিত হয়েছে, শিক্ষকরা যথাযথভাবে দায়িত্ব পালন করেছেন কি না, প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় কী ধরনের সমস্যা ছিল—এসব প্রশ্নও সামনে আসা উচিত। কোনো প্রতিষ্ঠানে একজন শিক্ষার্থীও পাস না করলে সেই প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার পরিবেশ নিয়ে তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। শিক্ষার্থীদের পরীক্ষার ফল প্রকাশিত হয়, কিন্তু শিক্ষকদের পাঠদানের মান কিংবা প্রতিষ্ঠানপ্রধানের দায়িত্ব পালনের মূল্যায়ন কতটা হয়? শিক্ষার্থীদের জন্য পরীক্ষা আছে, শিক্ষাব্যবস্থার দায়িত্বশীলদের জন্য জবাবদিহির পরীক্ষা কি থাকতে নেই?

এদিকে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় জিপিএ-৫ পাওয়ার গুরুত্বও কম নয়। কিন্তু উচ্চশিক্ষার ভর্তি পরীক্ষায় গিয়ে অনেক শিক্ষার্থীর মৌলিক জ্ঞান ও দক্ষতার ঘাটতি প্রকাশ পায়। বোর্ড পরীক্ষার ফল এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষার পারফরম্যান্সের মধ্যে এমন ব্যবধান থাকলে মূল্যায়ন পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন উঠবেই। শিক্ষার্থীরা কি পরীক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় উত্তর মুখস্থ করছে, কিন্তু বিষয়টি সত্যিকার অর্থে বুঝতে পারছে না? যদি তা-ই হয়, তাহলে জিপিএ-৫-এর সংখ্যা বাড়িয়ে শিক্ষার মান বাড়ানোর দাবি করা কঠিন। নম্বরের সাফল্য আর জ্ঞানের সাফল্য যে এক বিষয় নয়, সেটি আমাদের স্বীকার করতে হবে।

এই ব্যবস্থায় কোচিং ও ব্যক্তিগত পড়ানোর ব্যবসা স্বাভাবিকভাবেই বিস্তার লাভ করে। শ্রেণিকক্ষে প্রয়োজনীয় শিক্ষা না পেলে শিক্ষার্থীকে বাইরে গিয়ে বাড়তি অর্থ ব্যয় করতে হয়। কোনো কোনো শিক্ষকের বিরুদ্ধে শ্রেণিকক্ষে যথাযথভাবে না পড়িয়ে ব্যক্তিগতভাবে পড়তে উৎসাহিত করার অভিযোগও রয়েছে। এসব অভিযোগ সত্য হলে তা গুরুতর অনৈতিকতা। কারণ একজন শিক্ষক যে পাঠ শ্রেণিকক্ষে বোঝানোর জন্য বেতন পান, সেটিই যদি

 আবার আলাদা অর্থের বিনিময়ে শেখাতে হয়, তাহলে শিক্ষার দায়িত্ব ও ব্যবসার সীমারেখা কোথায় থাকে? অভিভাবকদের পকেট থেকে স্কুলের বেতন, কোচিংয়ের ফি ও ব্যক্তিগত শিক্ষকের সম্মানী—সবই যাচ্ছে; কিন্তু শিক্ষার্থীর শেখার নিশ্চয়তা কোথায়?

শিক্ষার মানোন্নয়নে নীতিনির্ধারকদের উদ্যোগ নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। শিক্ষাক্রম, পাঠ্যবই ও মূল্যায়ন পদ্ধতিতে পরিবর্তন প্রয়োজন হতে পারে। কিন্তু সেই পরিবর্তন কতটা পরিকল্পিত, শিক্ষকরা কতটা প্রস্তুত এবং শিক্ষার্থীরা কতটা সুবিধা পাচ্ছে—এসব বিবেচনা না করে বারবার নতুন ব্যবস্থা চালু করলে বিভ্রান্তি বাড়ে। শিক্ষক একটি পদ্ধতির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার আগেই আরেকটি পদ্ধতি এসে হাজির হয়। শিক্ষার্থীরাও বুঝে উঠতে পারে না, কোন নিয়মে তাদের শেখা ও মূল্যায়ন হবে। পরিবর্তন অবশ্যই দরকার, তবে পরিবর্তনের সঙ্গে প্রশিক্ষণ, উপকরণ

ও বাস্তবায়নের সক্ষমতা নিশ্চিত করাও জরুরি। শুধু নতুন নাম ও নতুন নিয়ম দিয়ে শিক্ষার পুরোনো সমস্যার সমাধান হয় না। এ অবস্থায় কেউ কেউ রসিকতা করে বলছেন যে,—ব্যর্থতাই সাফল্যের ভিত্তি!’ বিষয়টি নির্মম। ব্যর্থতা তখনই সাফল্যের ভিত্তি হতে পারে, যখন তা থেকে শিক্ষা নেওয়া হয়। একই ভুল বারবার করে সেটিকে অভিজ্ঞতা বলা যায় না। শূন্য পাস করা প্রতিষ্ঠানগুলোর সমস্যা চিহ্নিত করা, শিক্ষকদের দক্ষতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা, প্রাথমিক শিক্ষার ভিত্তি শক্তিশালী করা, ইংরেজি ও আইসিটিতে ব্যবহারিক দক্ষতা বাড়ানো এবং মুখস্থনির্ভরতার বদলে অনুধাবন ও বিশ্লেষণভিত্তিক মূল্যায়ন চালু করা জরুরি। পাশাপাশি পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীদের জন্য কার্যকর সহায়তার ব্যবস্থাও থাকতে হবে।

শিক্ষার উদ্দেশ্য কেবল পরীক্ষায় পাস করা কিংবা একটি সনদ অর্জন নয়। শিক্ষা মানুষকে চিন্তা করতে, প্রশ্ন করতে, যুক্তি দিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে এবং বাস্তব জীবনের সমস্যার সমাধান করতে শেখায়। অথচ আমাদের শিক্ষার্থীরা অনেক সময় পাঠ্যবইয়ের নির্ধারিত প্রশ্নের বাইরে চিন্তা করার সুযোগই পায় না। আমরা তাদের কাছ থেকে ভালো ফল চাই, কিন্তু সেই ফল অর্জনের জন্য যে মানসম্মত পাঠদান, স্বাধীন চিন্তার পরিবেশ ও নিয়মিত অনুশীলন দরকার, তা নিশ্চিত করতে পারি না। তারপর ফল খারাপ হলে শিক্ষার্থীদেরই কাঠগড়ায় দাঁড় করাই।

এবার প্রায় ছয় লাখ শিক্ষার্থী পাস করতে পারেনি। তাদের প্রত্যেকের ব্যর্থতার পেছনে আলাদা কারণ থাকতে পারে। কিন্তু এত বড় সংখ্যার ফল বিপর্যয়কে ব্যক্তিগত ব্যর্থতা বলে ব্যাখ্যা করা যাবে না। এটি আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার দুর্বলতাগুলো খতিয়ে দেখার একটি সতর্কবার্তা। শিক্ষার্থীদের ফলাফল নিয়ে আলোচনা হবে, তাদের জন্য সহায়তার ব্যবস্থাও করতে হবে। একই সঙ্গে শিক্ষক, প্রতিষ্ঠানপ্রধান, শিক্ষা বোর্ড ও নীতিনির্ধারকদেরও নিজেদের ভূমিকার হিসাব দিতে হবে।

‘লেখাপড়া করে যে, গাড়িঘোড়া চড়ে সে’—এই স্বপ্ন নিশ্চয়ই অমূলক নয়। তবে তার আগে শিক্ষার্থীদের এমন শিক্ষা দিতে হবে, যা তাদের জীবনে সত্যিকার অর্থে কাজে লাগবে। নইলে প্রতিবছর ফলাফল প্রকাশের পর আমরা পাসের হার নিয়ে আলোচনা করব, ব্যর্থতার কারণ খুঁজব, নতুন আশ্বাস শুনব; আর শিক্ষার গোলকধাঁধায় শিক্ষার্থীরা পথ হারাতেই থাকবে। ব্যর্থতা সাফল্যের ভিত্তি হতে পারে, কিন্তু ব্যর্থতাকেই সাফল্য বলে চালিয়ে দেওয়া কোনোভাবেই শিক্ষার সাফল্য নয়।

লেখক: গণমাধ্যমকর্মী ও কলামিস্ট

/এপিএইচ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কামালসহ পরিবারের চারজনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন শুনানি ২৩ নভেম্বর
সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কামালসহ পরিবারের চারজনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন শুনানি ২৩ নভেম্বর
ডিএমপির অভিযানে ২৪ ঘণ্টায় গ্রেফতার ৫০৫, সবচেয়ে বেশি মিরপুর জোনে
ডিএমপির অভিযানে ২৪ ঘণ্টায় গ্রেফতার ৫০৫, সবচেয়ে বেশি মিরপুর জোনে
যমুনা ব্যাংকের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হলেন মাহমুদুল হক
যমুনা ব্যাংকের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হলেন মাহমুদুল হক
সাউথইস্ট ইউনিভার্সিটিতে আন্তর্জাতিক প্রকৌশল সম্মেলন অনুষ্ঠিত
সাউথইস্ট ইউনিভার্সিটিতে আন্তর্জাতিক প্রকৌশল সম্মেলন অনুষ্ঠিত
সর্বশেষ সর্বাধিক