কৌতূহলের বিষয় ‘সংবাদ সম্মেলন’

Send
গোলাম মোর্তোজা
প্রকাশিত : ১৩:০৫, ফেব্রুয়ারি ২০, ২০১৮ | সর্বশেষ আপডেট : ১৩:১১, ফেব্রুয়ারি ২০, ২০১৮

গোলাম মোর্তোজাএটা খুব কম গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা নয় যে প্রধানমন্ত্রীর সংবাদ সম্মেলন দেশের মানুষের কাছে আগ্রহ বা কৌতূহলের বিষয়ে পরিণত হয়েছে। আলোচনা, প্রশংসা, সমালোচনা, হাসি-রসিকতার সব উপাদান বিরাজমান থাকে প্রধানমন্ত্রীর সংবাদ সম্মেলনে। ইতালি এবং ভ্যাটিকান সিটি থেকে ফিরে এসে প্রধানমন্ত্রী তার ফলপ্রসূ সফরের কথা বললেন। সাংবাদিকদের প্রশ্নেরও জবাব দিলেন স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে। সেসব প্রসঙ্গ নিয়ে আজকের আলোচনা।
১. আগামী নির্বাচন নিয়ে প্রধানমন্ত্রী যা বলেছেন, এটাই তার স্বাভাবিক বক্তব্য। এতে মোটেই অবাক হওয়ার কিছু নেই। একটি সুষ্ঠু গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের পরিবেশ সরকার তৈরি করবে, তারপর বিএনপি নির্বাচনে অংশ নেবে- এমন পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার কোনও সম্ভাবনা নেই। রাজনৈতিক বক্তব্যে সরকার, আওয়ামী লীগ বা নেতা-মন্ত্রীরা নির্বাচনে সব দলের অংশগ্রহণের যে কথা বলছেন, বাস্তবে তারা তা চাইবেন না- সেটাই স্বাভাবিক। বিএনপি নির্বাচনে না এলেই আওয়ামী লীগের সুবিধা। সুতরাং বিএনপি যাতে নির্বাচনে না আসে, তার জন্যে সরকার আরও অনেক কিছু করবে। বলা হচ্ছে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির মতো আরেকটি নির্বাচন বাংলাদেশে হবে না। অনেকে বলার চেষ্টা করেন, প্রধানমন্ত্রী নিজেও চান না যে এবারের নির্বাচনটিও প্রশ্নবিদ্ধ হোক। ৫ জানুয়ারির মতো আরেকটি নির্বাচন হবে না, সেটা ঠিক। একই ঘটনা দ্বিতীয়বার ঘটবে না। ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিতব্য নির্বাচনটি প্রশ্নবিদ্ধ হবে না, তা বলা যাবে না। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির ভোটারবিহীন নির্বাচন করেও যেহেতু সরকার দাপটের সঙ্গে ৫ বছর কাটিয়ে দিচ্ছে, সুতরাং প্রশ্নবিদ্ধ আরেকটি নির্বাচন করে ক্ষমতায় থেকে গেলে, আওয়ামী লীগের কোনও ক্ষতি তো নেই। দেশ-বিদেশ কোথাও তো বড় কোনও সমস্যায় পড়তে হয়নি। দেশের মানুষের ভোটের অধিকার, নীতি-নৈতিকতা? মানুষের ভোটের অধিকারের বিষয়, আওয়ামী লীগ ২০১৪ সাল থেকে বিবেচনায় নেওয়া বাদ দিয়ে দিয়েছে। নীতি-নৈতিকতা নিয়ে চিন্তা করারও প্রয়োজন মনে করবে না আওয়ামী লীগ। ক্ষমতায় থাকার জন্যে যা করা দরকার তাই করবে।

আদালত খালেদা জিয়াকে শাস্তি দিয়েছেন। সামনের কয়েক মাসে বিএনপি নেতাদের আরও অনেকের মামলার পরিণতি জানা যাবে। জানা যাবে খালেদা জিয়ার অন্য মামলাগুলোর পরিণতিও।

এমপিরা এমপি পদে থেকেই নির্বাচন করবেন। বিএনপির প্রতি সরকারের এই নমনীয় আচরণও সামনের সময়টাতে থাকবে না।

সুষ্ঠু গ্রহণযোগ্য নিরপেক্ষ নির্বাচনের যে পরিবেশের কথা বলা হচ্ছে, তার কোনও সম্ভাবনা আছে বলে আমার পর্যবেক্ষণ বলে না।

সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যে সরকার বা আওয়ামী লীগের অবস্থান পরিষ্কার করে দিয়েছেন। একদিকে অনেকটা উঁচু খেলার মাঠে বিএনপি থাকবে কিনা, টিকে থাকতে পারবে কিনা- তা পুরোপুরিভাবে নির্ভর করছে বিএনপির ওপর। বিএনপির জন্যে সরকার মাঠ সমান করে দেবে না।

২. প্রধানমন্ত্রীর সংবাদ সম্মেলনে প্রশ্ন ছিল মূলত একটি, এবং সেই প্রশ্নটি করেছিলেন রেজোওয়ানুল হক। এত ভিড়ে একজন সাংবাদিকের দেখা পাওয়ায় ছোট্ট একটা ধন্যবাদ তাকে জানাতেই হবে। তিনি প্রশ্ন করেছিলেন প্রশ্নপত্র ফাঁসের মহামারি নিয়ে। প্রধানমন্ত্রীর কাছে জানতে চেয়েছিলেন, মন্ত্রী- সচিবদের মতো ব্যর্থদের তিনি শাস্তির ব্যবস্থা করবেন কিনা?

উত্তরে প্রধানমন্ত্রী যা বলেছেন, তা একই সঙ্গে বিস্ময়ের এবং আতঙ্কের।

প্রধানমন্ত্রী জানতে চেয়েছেন, প্রশ্ন ফাঁস কখন হয়? সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত যারা ছিলেন, তারা কেউ এই প্রশ্নের উত্তর দেননি বা দিতে পারেননি। অথচ তারা সবাই প্রশ্নের উত্তর জানতেন। একটি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল আগের রাতে ফাঁস হওয়া প্রশ্ন একাধিকবার দেখিয়েছে। একটি অনলাইন সংবাদমাধ্যম সকালে অনুষ্ঠিত হবে এমন পরীক্ষার প্রশ্ন পেয়েছে আগের মাঝরাতে, এবং প্রকাশ করেছে। এর বাইরেও আরও অনেক উদাহরণ আছে। কিন্তু কেউ প্রধানমন্ত্রীর প্রশ্নের উত্তর দেননি। কেন দেননি, সেই প্রসঙ্গে না যাই।

উত্তর প্রধানমন্ত্রী নিজেই দিয়েছেন, প্রশ্ন ফাঁস হয় ২০ মিনিট বা এক ঘণ্টা বা দুই ঘণ্টা আগে। কারও মেধা এত ফটোজেনিক না যে একবার সেই ফাঁস হওয়া প্রশ্ন দেখেই সব মুখস্থ করে পরীক্ষা দেবে।

প্রধানমন্ত্রীর এই বক্তব্যের ব্যাখ্যা দুইভাবে করা যায়।

ক. প্রশ্নপত্র ফাঁস বিষয়ক প্রকৃত সত্য সংবাদ প্রধানমন্ত্রীর কাছে পৌঁছাচ্ছে না। ফলে প্রশ্নপত্র ফাঁসের প্রকৃত চিত্র প্রধানমন্ত্রী জানছেন না।

খ. প্রধানমন্ত্রীর কাছে সঠিক সংবাদ পৌঁছাচ্ছে না, এটা কোনও বিশ্বাসযোগ্য কথা হতে পারে না। প্রধানমন্ত্রী যা বলেছেন, জেনে-বুঝে দায়িত্ব নিয়েই বলেছেন।

৩. শিক্ষামন্ত্রী নূরুল ইসলাম নাহিদ বলেছিলেন, ১৯৬১ সাল থেকে প্রশ্ন ফাঁস হয়। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, যুগ যুগ ধরে প্রশ্ন ফাঁস হয়। প্রশ্ন ফাঁস নতুন কিছু নয়।

১৯৬১ সাল থেকে বা যুগ যুগ ধরে, প্রশ্ন দু-একবার যে ফাঁস হয়নি- তা নয়। প্রশ্নফাঁসের এমন মহামারি বাংলাদেশ-পাকিস্তান কোনও আমলেই হয়নি, এটাই প্রকৃত সত্য। তারপরও প্রধানমন্ত্রী যখন একথা বলেন, তখন বোঝা যায় প্রশ্নফাঁস বা শিক্ষাব্যবস্থা ধ্বংস হয়ে যাওয়া নিয়ে, সরকার একটুও চিন্তিত বা বিব্রত নয়। মন্ত্রীর কথা-কাজে ফাঁসকারীরা উৎসাহ-সাহস পেয়েছে, প্রধানমন্ত্রীর কথায় আরও বেশি পাবে– পেয়েছে।

যাদের সন্তান ইংরেজি মাধ্যমে পড়াশোনা করেন, তাদের চিন্তা নেই। যাদের সন্তান দেশের বাইরে থাকেন বা পড়াশোনা করেন, তারা আরও  চিন্তামুক্ত।

চিন্তার কারণ রয়েছে আপনার মানে দেশের ৯০ বা ৯৫ শতাংশ মানুষের, যাদের সন্তান পড়াশোনা করে সাধারণ মাধ্যমে। আপনাদের সন্তানদের নিয়ে চিন্তা করার অবস্থানে সরকার নেই। প্রধানমন্ত্রী পরিষ্কার করে তা বলে দিয়েছেন। আপনারা যেহেতু নিজের সন্তানের ভবিষ্যৎ ইস্যুতেও দলীয়ভাবে বিভক্ত, সন্তানের ভবিষ্যৎ ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে দেখেও যেহেতু আপনার বিবেক বিচলিত হচ্ছে না, সুতরাং সরকারের এত দায় পড়েনি যে আপনার জন্যে কাজ করবে। সন্তানের শিক্ষাকেও যেহেতু দলীয় বিভক্তি বা আনুগত্যের বাইরে রেখে সোচ্চার হতে পারছেন না, সুতরাং এটাই আপনার পরিণতি। অসৎ-অনৈতিক পথে যারা কিছু উপার্জন করছেন, তারা হয়ত ভাবছেন অর্থ দিয়ে সন্তানের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করবেন। এই নীতি-নৈতিকতা এবং পড়াশোনায়, বাবার মানে আপনার প্রতি নয়, সন্তান ইয়াবার প্রতি আসক্ত হয়ে বেড়ে উঠবে। সবার নয়, অনেকের।

৪. আর একটি তথ্য দেই, যা সংবাদ সম্মেলনের সঙ্গে সম্পর্কিত নয়। প্রশ্নপত্র ফাঁসের সঙ্গে সম্পর্কিত। সরকারের শিক্ষা মন্ত্রণালয় ভাবছে, কয়েক লক্ষ ট্যাব জাতীয় ডিভাইস কেনার কথা। সব শিক্ষার্থীর জন্যে একটি করে ট্যাব। কয়েক হাজার কোটি টাকার প্রজেক্ট। পাগলামি মনে হলেও, একেবারে কাল্পনিক কিছু বলছি না। এরকম প্রজেক্টের অপরিহার্যতা প্রমাণ করার জন্যেই প্রশ্নপত্র ফাঁস বিষয়টি বিস্তৃত হচ্ছে কিনা, ভেবে দেখার অবকাশ আছে। হাজার খানেক কোটি টাকা দোয়েল ল্যাপটপ প্রজেক্টের কথা তো আর দেশের মানুষ মনে রাখেনি। সুতরাং ডিভাইস কেনার প্রজেক্ট নিতে সমস্যা তো নেই।

৫. সংবাদ সম্মেলনের আরেকটি বিষয় ছিল, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন বিষয়ে। প্রধানমন্ত্রী খুব স্পষ্ট করে বলেছেন, সাংবাদিকরা এত ভয় পাচ্ছেন কেন? অপরাধ না করলে তো আর শাস্তির ভয় নেই। অপরাধ করলে শাস্তি তো পেতেই হবে। 

এই বক্তব্য থেকে বুঝতে কোনও অসুবিধা হয় না যে তথ্যের অনুসন্ধান হয়ে যেতে পারে গুপ্তচরবৃত্তির অপরাধ। আর অপরাধ করলে আইনের প্রয়োগ হবে, অপপ্রয়োগ নয়। কোনও প্রশ্ন বা প্রতিবাদ করার মতো অবস্থায় সাংবাদিক সমাজ বা সাংবাদিকদের সংগঠনগুলো আছে, বিশ্বাস করার কোনও কারণ নেই। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন কীভাবে পাস হবে, এবং ব্যবহার হবে–তা বোঝা কঠিন কিছু নয়। ৫৭ ধারার চেয়ে স্পষ্টভাবে ভয়ঙ্কর এবং নিপীড়নমূলক ডিজিটাল আইন থাকবে, চলবে সাংবাদিকতা!

৬. রোহিঙ্গা প্রসঙ্গে অনেক কথা বলেছেন প্রধানমন্ত্রী। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে পাশ কাটিয়ে চীনের চাপে বাংলাদেশ মিয়ানমারের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক চুক্তি করে যে বিপদকে আমন্ত্রণ জানিয়েছে, সংবাদ সম্মেলনে কেউ এমন প্রশ্ন করেননি, আলোচনাও হয়নি।

রোহিঙ্গা ইস্যুতে প্রধানমন্ত্রীর ইতালি সফরের সঙ্গে সম্পর্কিত একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রসঙ্গ ছিল, তাও আলোচনা হয়নি।

বিশ্ব খাদ্য সংস্থার নির্বাহী পরিচালক রোমে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করেছেন। নির্বাহী পরিচালক প্রধানমন্ত্রীকে জানিয়েছেন, রোহিঙ্গাদের পেছনে বিশ্ব খাদ্য সংস্থার প্রতি মাসে ব্যয় হয় ২৭.৩ মিলিয়ন ডলার, টাকার অঙ্কে যা প্রায় ২২৫ কোটি। এই অর্থ বিশ্ব খাদ্য সংস্থাকে দিয়েছে অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন, জার্মানি, ইতালি, জাপান, কুয়েত, লুক্সেমবার্গ, সুইজারল্যান্ড, নেদারল্যান্ড, নিউজিল্যান্ড, নরওয়ে, ইউএন সেন্ট্রাল ইমার্জেন্সি রিসোর্স ফান্ড, থাইল্যান্ড, ব্রিটেন, আমেরিকা প্রভৃতি দেশ। আশঙ্কার কথা যা নির্বাহী পরিচালক জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে, এসব দেশ বা আন্তর্জাতিক বিশ্ব রোহিঙ্গাদের জন্যে অর্থ সহায়তা দেওয়ার আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে। ডোনারদের থেকে অর্থ পাওয়া না গেলে, প্রতি মাসের ২২৫ কোটি টাকা তাদের জন্যে ব্যয় করা সম্ভব হবে না।

প্রধানমন্ত্রী বিষয়টি নিয়ে কী ভাবছেন, এমন কোনও প্রশ্ন কেউ করেননি।

উল্লেখ্য, শুধুমাত্র বিশ্ব খাদ্য সংস্থাই প্রতি মাসে রোহিঙ্গাদের খাওয়ানোর জন্যে ২২৫ কোটি টাকা খরচ করছে। আরও অনেক সংস্থা অনেক অর্থ ব্যয় করছে। সেসব ক্রমান্বয়ে সংকুচিত হয়ে আসার সম্ভাবনা দেখা দিচ্ছে। সম্ভবত আগামী দিনে রোহিঙ্গাদের পুরো দায়ভার বহন করতে হবে বাংলাদেশ সরকারকে।

আর একদিকে রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানোর ‘ফলপ্রসূ’ আলোচনা যেদিন চলছে, সেদিনও মিয়ানমার রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে পাঠিয়েছে। প্রশ্ন না করায়, তা নিয়েও প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য জানা যায়নি।

৬. কিছুদিন আগে প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন, অনেকে গায়ে ‘ইউজ মি’ লিখে রাখে। প্রধানমন্ত্রী আসলে ‘অনেকে’ বলতে কাদের বুঝিয়েছিলেন!

লেখক: সম্পাদক, সাপ্তাহিক

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ
X