কেন শহিদুল আলমের মুক্তি চাই?

Send
ওমর শেহাব
প্রকাশিত : ১৫:৩৬, আগস্ট ২৪, ২০১৮ | সর্বশেষ আপডেট : ১৯:২২, জানুয়ারি ০৮, ২০১৯

ওমর শিহাবআমি ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইমস স্ট্র্যাটেজি ফোরামের একজন সদস্য। সম্প্রতি গ্রেফতার হওয়া আলোকচিত্রী শহিদুল আলম যখন আরও  ৪৯ জনের সঙ্গে ২০১৪ সালে  বিতর্কিত ও দণ্ডিত সাংবাদিক ডেভিড বার্গম্যানের পক্ষ নিয়ে পত্রিকায় লিখেছিলেন (অধ্যাপক আনু মুহম্মদের বিবৃতির বক্তব্য না পড়ে সই করে দেওয়ার কথা মনে আছে?) আমরা এর তীব্র প্রতিবাদ করেছিলাম। আমি ব্যক্তিগতভাবে অনুমান করি শুধুমাত্র একই আর্থসামাজিক স্তরের অংশ হওয়ায় তারা খুব সম্ভবত ন্যায় অন্যায় না দেখেই ডেভিডের পক্ষ নিয়েছিলেন। বাংলায় একে কী বলে জানি না, ইংরেজিতে একে ট্রাইবালিজম বলে। এটি খুব খারাপ কাজ কিন্তু আমরা তাদের আইনি সাজা চাইনি। কেন?
যদি সক্রিয়ভাবে কোনও অপরাধে সহযোগিতা করা না হয়, তাহলে একজন খারাপ বা সন্দেহভাজনের পক্ষে নিজের মত প্রকাশ করা কোনও অপরাধ নয়। আপনার ব্যাপারটি খারাপ লাগতে পারে। কিন্তু আপনি যদি নিজেকে সভ্য মনে করেন, আপনার প্রধান কাজ হলো যাদের আপনি অপছন্দ করেন বা খারাপ মনে করেন তাদের গণতান্ত্রিক অধিকার নিশ্চিত করা। জাতি হিসেবে কি আমরা কখনও সেটি করতে পেরেছি? নিশ্চয়ই! যুদ্ধাপরাধী গোলাম আজমকে আমরা আদালতের মাধ্যমে বিচার করে শাস্তি দিয়েছি। শাহবাগ আন্দোলনের মানুষেরা দিনের পর দিন যে হাসপাতালে গোলাম আজম ভর্তি হয়েছিল তার পাশে দাঁড়িয়েই গলা ফাটিয়ে ফাঁসির দাবি করে গেছে কিন্তু একবারও বলেনি, ‘চল, ব্যাটাকে আমরাই হাইজ্যাক করে লটকে দেই’।

এটাই সভ্য সমাজের প্রমাণ।

আমি এই লেখাটি লেখার আগে আল-জাজিরায় শহিদুল আলমের দেওয়া বক্তব্যটি দেখলাম। এরমধ্যে অর্ধেকের বেশি কথা আমরা কাছে দায়িত্বজ্ঞানহীন বা ভুল মনে হয়েছে (সবচেয়ে খারাপ লেগেছে বাচ্চাদের আন্দোলনের বাচ্চাদের এজেন্ডার পিঠে বন্দুক রেখে নিজের সরকারবিরোধী মনোভাবের গুলি ছোড়া)। কিন্তু একটি সভ্য সমাজে যেটি সব মানুষের বাকস্বাধীনতা নিশ্চিত করে সেখানে যতক্ষণ পর্যন্ত একজনের বক্তব্য কোনও সংঘাতের সৃষ্টি করছে না, ততক্ষণ পর্যন্ত তার সবকিছু বলার অধিকার থাকতে হবে। বক্তব্য কার ভালো লাগলো বা লাগলো না সেটি এখানে গুরুত্বপূর্ণ নয়। একটি সভ্য সমাজে বাকস্বাধীনতার মানদণ্ড হবে এতটাই নিচে যে সেই ফিল্টার দিয়ে অধ্যাপক আনিসুজ্জামান যেমন পার হতে পারবেন, আমিও পার হয়ে যেতে পারবো যতক্ষণ পর্যন্ত আমাদের কথার কারণে মারামারি হচ্ছে না।

সেদিন শহিদুল আলম আসলে কী বলেছিলেন? শুরুতেই তিনি যেটি বলেছিলেন সেটি হলো বাচ্চাদের এই আন্দোলন তারা যে দাবি করেছে আসলে তারচেয়েও বেশি কিছু। এটি নাকি অনির্বাচিত অবৈধ সরকারের বিরুদ্ধে একটি বিদ্রোহ। এই বক্তব্যে সরকারের এত বিচলিত হওয়ার কী আছে? কারও যদি এই সরকারকে ‘অবৈধ’ মনে হয় সে সেটি বলবে, অসুবিধা কী? এরকম তো হরহামেশাই বিরোধীদলীয় লোকজন আর টকশোতে ‘সুশীল বুদ্ধি সমাজ’ গত আট বছর ধরেই বলে যাচ্ছে।

পত্রিকায় দেখলাম জুলাইয়ের ১৫ তারিখ বিএনপির মির্জা ফখরুল ইসলাম, জুলাইয়ের ২১ তারিখ ছাত্রশিবিরের সভাপতি (এই দল এখনও কেউ করে?), ২২ জুলাই শাহবাগ আন্দোলনের সময় ব্লগারদের হত্যাকাণ্ড উসকে দেওয়া সম্পাদক মাহমুদুর রহমান এরা সবাই বলেছে বর্তমান সরকার অবৈধ। পাঁচই জানুয়ারি তো বিএনপি গণতন্ত্র হত্যা দিবসও পালন করলো। এদের কাউকে তো গ্রেফতার করা হয়নি। গ্রেফতার করা হয়নি বলেই সরকারকে অবৈধ বলার যে গণতান্ত্রিক অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে। তাহলে শহিদুল ইসলাম একই কথা বললে সমস্যা কোথায়? ওনাকে কেন সবসময় সরকারের সঙ্গে একমত হতে হবে? আমাদের কাউকেইবা কেন হতে হবে?

অনেকের মনে খুঁতখুঁতানি থাকতে পারে যে শহিদুল আলম তো আল-জাজিরায় সাক্ষাৎকার দেওয়ার আগে ফেসবুক লাইভে আন্দোলন নিয়ে মন্তব্য করে গেছেন। সেগুলোর কী হবে? ঝিগাতলার ঘটনার দিন তিনি ফেসবুক লাইভে যে কয়েকটি ধারাবিবরণী দিয়ে গেছেন সেগুলো দেখবেন। আমি ফেসবুকে যাই ভিন্ন স্থানীয় সময়ে, কাজেই ঠিকঠাক সময় নির্ণয়ে ভুল হতে পারে। কিন্তু মোটামুটি এটি নিশ্চিত যে ঝিগাতলায় ঘটনার কাছাকাছি সময়ে তিনি সেখানে হাজির হন। সন্ধ্যার কয়েকটি লাইভ ভিডিওতে দেখা যায় তিনি জাপান-বাংলাদেশ ফ্রেন্ডশিপ হাসপাতাল আর পপুলার হাসপাতালে কতজন ভর্তি হয়েছে তার সংখ্যাটি বলছেন। এখানে ঠিক ষড়যন্ত্রটি কোথায়?

সরকার কি নাগরিক সাংবাদিকতা বলে যে একটি ব্যাপার আছে সেটি জানে না? মজার ব্যাপার হচ্ছে, তার আগে দুটো ভিডিও আছে সেখানে তিনি নিজেই বলেছেন অনেক ধরনের গুজব তার কানে আসছে যেগুলো নিশ্চিত করার কোনও উপায় তার কাছে নেই। শুধু তাই নয়, সন্ত্রাসীরা তার ক্যামেরা ভেঙে ফেলার পর তার ছবিও তিনি ফেসবুকে দিয়ে গেছেন।

এই কাজগুলো ঠিক কীভাবে কোনও আইন ভঙ্গ করে সেটি সরকারের কেউ বুঝিয়ে দিলে খুব ভালো হয়।  যদি ৫৭ ধারা ছাড়া আর কোনও কিছু না ভাঙা হয় তাহলে বলবো, যতবার  কাউকে আটক করার জন্য ৫৭ ধারার মতো একটি আইন ব্যবহার করতে হয় ততবার সরকারের লজ্জা হওয়া উচিত। প্রত্যেক সরকারের আমলে মনে হয় একটি করে ‘কালো আইন’ থাকে যেটির প্রয়োগের পরিমাণ থেকে বুঝা যায় সরকার কীভাবে দেশ চালাচ্ছে। এই সরকারের জন্য সেটি হলো ৫৭ ধারা। এভাবে চলতে থাকলে সত্যিকারের অপরাধীদের গ্রেফতার করার পরও সেটি মানুষকে বিশ্বাস করানো কঠিন হয়ে যাবে।

আমরা কোনও কিছু পড়ার সময় হেলমেট মাথায় দেই না, কারণ তাতে পড়তে অসুবিধা হয়। আওয়ামী লীগ সরকার যদি তাদের মাথার হেলমেটটি খুলে আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধের ঘোষণাপত্রটি আরেকবার পড়েন তাহলে দেখবেন সেখানে আমাদের পূর্বপুরুষেরা মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে যুক্তি দিয়েছিলেন–‘জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার অর্জনের আইনানুগ অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য’। কাজেই যতক্ষণ পর্যন্ত শৃঙ্খলা ভঙ্গ হচ্ছে না আমরা কী কথা বলবো, কী মত প্রকাশ করবো সেটি আমরাই ঠিক করবো, সরকার নয়।

ইতিহাস এই সরকারকে (বা যেকোনও সরকারকে) তাদের পক্ষে কে কে কথা বলেছিল সেটি দিয়ে মনে রাখবে না। ইতিহাস এই সরকারকে মনে রাখবে তাদের বিপক্ষে কে কে কথা বলতে পারেনি তা দিয়ে।

শহিদুল আলমের মুক্তি চাই!

লেখক: কোয়ান্টাম অ্যালগরিদম ডিজাইনার, আয়নকিউ, মেরিল্যান্ড, সংযুক্ত শিক্ষক, ইউনিভার্সিটি অফ মেরিল্যান্ড, যুক্তরাষ্ট্র। 

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ