রোহিঙ্গা সংকট ও আমাদের সফট পাওয়ার

Send
মো. সামসুল ইসলাম
প্রকাশিত : ১৭:১৩, সেপ্টেম্বর ২৫, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৭:১৩, সেপ্টেম্বর ২৫, ২০১৯

মো. সামসুল ইসলামরোহিঙ্গাদের নিয়ে বিভিন্ন ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে আমরা হয়তো যৌক্তিকভাবেই বেশ অধৈর্য হয়ে পড়েছি। সরকারি নীতিনির্ধারকদের বিভিন্ন বক্তব্য এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় সাধারণ জনগণের বক্তব্য থেকে এটা পরিষ্কারভাবেই বোঝা যাচ্ছে। রোহিঙ্গাদের বিভিন্ন অপরাধে জড়িয়ে পড়া, পাসপোর্ট এনআইডি জালিয়াতি বা সম্মেলন ইত্যাদি কারণে তাদের প্রতি আমাদের সহানূভূতির অনেকাংশই এখন অন্তর্হিত এবং সে জায়গায় ক্রমান্বয়ে আমাদের গ্রাস করছে একধরনের ভীতি ও অনিশ্চয়তা।
রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়ার কারণে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে আমাদের যে মর্যাদা বা সফট পাওয়ার বৃদ্ধি পেয়েছিল, তা আমার মতে হঠাৎ রোহিঙ্গাবিরোধী এই প্রচারণার ফলে বেশ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। আরো একটি কারণে আমি শংকিত, তা হচ্ছে আমাদের মিয়ানমারবিরোধী প্রচারণা একসময় হয়তো রোহিঙ্গাবিরোধী প্রচারণায় পর্যবসিত হবে, যা প্রকারান্তরে রোহিঙ্গাদের ব্যাপারে মিয়ানমারের দাবিকেই বৈধতা দেবে।
রোহিঙ্গাদের আমরা আশ্রয় দেওয়ার কারণে বাংলাদেশের সফট পাওয়ার যে বেশ বৃদ্ধি পেয়েছে, তা বাংলা ট্রিবিউনে আমি গত বছরের একটি কলামে বলেছিলাম। সেখানে আরো বলেছিলাম, সফট পাওয়ার হচ্ছে একটি রাষ্ট্রের ইমেজ, মূল্যবোধ বা সংস্কৃতির মাধ্যমে অন্য রাষ্ট্রকে প্রভাবিত করার ক্ষমতা। ‘হার্ড পাওয়ার’ বা সামরিক সক্ষমতার সঙ্গে সঙ্গে ‘সফট পাওয়ারের’ গুরুত্ব কিন্তু দেশের পররাষ্ট্রনীতি বা কূটনৈতিক দরকষাকষির জন্য কম গুরত্বপূর্ণ নয়।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশের প্রতি বৈদেশিক রাষ্ট্রগুলোর সহমর্মিতার সবচেয়ে সাম্প্রতিক উদাহরণটি দেওয়া যাক। গত ২২ সেপ্টেম্বর যুক্তরাজ্য রোহিঙ্গাদের প্রতি মানবিক সাহায্য অব্যাহত রাখার ঘোষণা এবং তাদের সহায়তায় আরও ৮৭ মিলিয়ন পাউন্ড দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়। পত্রিকায় প্রকাশিত তথ্য অনুসারে ব্রিটিশ হাইকমিশনার এ প্রসঙ্গে বলেন, রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে আশ্রয় দিয়ে বাংলাদেশ সরকার ও জনগণ যে উদারতা এবং মানবতা দেখিয়েছে তা অত্যন্ত প্রশংসনীয়। ব্রিটিশ কূটনীতিকদের ভাষ্য অনুযায়ী, ২০১৭ থেকে এ পর্যন্ত রোহিঙ্গাদের জন্য ২২৬ মিলিয়ন পাউন্ডের পাশাপাশি নতুন করে ৮৭ মিলিয়ন অনুদান রোহিঙ্গাদের ও রোহিঙ্গা সংকটের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত কক্সবাজারের স্থানীয় জনগণের উপকারের জন্য ব্যবহৃত হবে।

পশ্চিমা এই একটি দেশের উদাহরণের মাধ্যমে আমি রোহিঙ্গাদের কারণে বাংলাদেশের প্রতি বন্ধুরাষ্ট্রগুলোর চরম কূটনৈতিক সৌজন্যতা বোঝাতে চাইছি। বলাবাহুল্য, প্রায় প্রতিটি দেশ থেকে বাংলাদেশ ও বর্তমান সরকার এই সহমর্মিতা পেয়েছে। গত নির্বাচনের আগে নির্বাচন নিয়ে অন্য একটি লেখায় আমি নিরপেক্ষ বিশ্লেষণের মাধ্যমে ইঙ্গিত দিয়েছিলাম, অনেক বিষয়ের মধ্যে রোহিঙ্গাদের ব্যবস্থাপনার বিষয়টি পশ্চিমা বন্ধুরাষ্ট্রগুলো বিবেচনায় নেবে এবং সেইদিক থেকে একধরনের স্থিতিশীলতার জন্য বর্তমান সরকারের প্রতি তাদের সমর্থনের পাল্লা হয়তো ভারি থাকবে। যদিও সেটি ছিল নির্বাচনের বেশ কয়েক সপ্তাহ আগে নেহাতই এক অ্যাকাডেমিক বিশ্লেষণ। তবে এটা ঠিক, এত সমস্যার মধ্যেও এদেশে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় প্রদান প্রধানমন্ত্রী, সরকার তথা দেশের মানুষের ভাবমূর্তি বিশ্বদরবারে ব্যাপকভাবে উজ্জ্বল করেছে।

তবে শরণার্থীদের আশ্রয়দান বা তাদের প্রতি মানবিক আচরণ এখন বিশ্বদরবারে সফট পাওয়ার বৃদ্ধির একটি উপায় হিসেবে দেখছে অনেক রাষ্ট্র। এক্ষেত্রে প্রথমেই তুরস্কের কথা বলা যায়। সিরিয়ার গৃহযুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্তসহ প্রায় ৪০ লাখ শরণার্থীকে আশ্রয় দিয়ে তুরস্ক বিশ্বে নিজের কূটনৈতিক প্রভাব বাড়াতে চাইছে। এক গবেষণায় পড়লাম, বিশাল শরণার্থীকে আশ্রয় দিয়ে তুরস্ক নিজেদের একধরনের ব্র্যান্ডিং করতে চাইছে। শরণার্থীদের ব্যাপারে তাদের নেতাদের বক্তব্য বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে, তারা প্রমাণ করছে তারা একটি কল্যাণকামী রাষ্ট্র, ন্যায়ের পক্ষে আছে এবং সেই সঙ্গে তারা একটি বিশ্বশক্তি। এটিকে তারা একটি পাবলিক ডিপ্লোম্যাসির কৌশল হিসেবেই দেখছে।

এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেত্রে গতবছর সেন্টার ফর মাইগ্রেশন স্টাডিজ (সিএমাস)-এর এক গবেষণায় দেখা যায়, শরণার্থীদের পুনর্বাসন আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের সফট পাওয়ার এবং সেই সঙ্গে তাদের নিরাপত্তা বৃদ্ধি করেছে। বছর দুয়েক আগে হেরিটেজ ফাউন্ডেশনের এক ভাষ্যে বলা হয়, শরণার্থীদের কারণে পাঁচটি উপায়ে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ সংরক্ষিত হচ্ছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে পাবলিক ডিপ্লোম্যাসির মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের ইমেজ বৃদ্ধি।

আবার সফট পাওয়ার র‍্যাংকিংয়ে কানাডার সাম্প্রতিক উন্নত অবস্থানের একটি কারণ বলা হয়েছে রোহিঙ্গাসহ শরণার্থীদের প্রতি তাদের মানবিক আচরণ। মূল কথা যেটা বোঝাতে চাইছি তা হলো শরণার্থীদের প্রতি মানবিকতা এখন রাষ্ট্রের বৈদেশিক ভাবমূর্তি বৃদ্ধির একটি অন্যতম কৌশল হিসেবে বিবেচিত হয়। এটাকে কেউ কেউ ‘মাইগ্রেশন ডিপ্লোম্যাসি’ বলেও অভিহিত করছেন।

তবে বাংলাদেশের পরিস্থিতি তো নিঃসন্দেহে ভিন্ন। ১৬ কোটি মানুষের এদেশে আরও ১১ লাখ লোককে বছরের পর বছর জায়গা দেওয়া আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়। কক্সবাজার এবং আশেপাশের পরিবেশ স্থানীয় লোকজনের জন্য বসবাসের অনুপযোগী হয়ে উঠেছে। মিয়ানমার পরিবর্তিত আন্তর্জাতিক ও নিজ দেশে বিনিয়োগ পরিস্থিতিকে এমনভাবে কাজে লাগিয়েছে, যাতে অদূর ভবিষ্যতে প্রত্যাবাসনের সম্ভাবনা একেবারেই ক্ষীণ মনে হচ্ছে। ভূরাজনৈতিক কৌশলগত একটি গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় রোহিঙ্গাদের অপরাধপ্রবণতা ও বিদেশিদের সহায়তায় যেকোনও ধরনের অপতৎপরতা পুরো অঞ্চলকে ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিতে পারে। সুতরাং কিছু এনজিওর ব্যাপারে বাংলাদেশ সরকারের সতর্কতার ব্যাপারটি আবশ্যই বোধগম্য।

কিন্তু পশ্চিমা বিশ্বের নৈতিকতার কিছু মানদণ্ড রয়েছে। এই মানদণ্ডে দেখা যায়, অনেকসময় একজন একক ব্যক্তি এমনকি একটি প্রাণীও তাদের মিডিয়ার কাছে হঠাৎ করেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। দেশি-বিদেশি গণমাধ্যমে এনজিওদের বহিষ্কার বা একটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অধ্যয়নরত এক রোহিঙ্গা নারীকে বহিষ্কারের ঘটনা মানবাধিকারের ক্ষেত্রে ভুল বার্তা দিতে পারে। কিছু বিদেশি সংবাদমাধ্যমে এ বিষয়গুলো নেতিবাচকভাবেই উপস্থাপনা করা হয়েছে। আমরা ধরেই নিচ্ছি সরকারের কাছে নিশ্চয়ই এসবের যৌক্তিক কারণ রয়েছে। ভালো হয় এধরনের ঘটনাগুলোর ক্ষেত্রে বিশদ ব্যাখ্যা দেওয়া, যাতে দেশি-বিদেশি গণমাধ্যমে কোনও ভুল বার্তা না যায়।

আমাদের ভুলে গেলে চলবে না, অবৈধভাবে প্রচুর বাংলাদেশি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অবস্থান করছে। মালয়েশিয়াসহ বিশ্বের অনেক দেশেই অবৈধ বসবাসকারীদের বিরুদ্ধে অভিযানে প্রায়ই বাংলাদেশিরা বিপদে পড়েন। মালয়েশিয়ায় এবং বেশকিছু মুসলিম রাষ্ট্রে রোহিঙ্গাদের প্রতি একধরনের সহানুভূতি রয়েছে। রোহিঙ্গাদের কারণে বাংলাদেশের পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করে সেসব দেশে অবৈধ বসবাসকারীদের ব্যাপারে বাংলাদেশ কূটনৈতিকভাবে নমনীয়তা অর্জনের প্রচেষ্টা নিতে পারে।

আমরা কোনোভাবেই চাই না রোহিঙ্গারা অনির্দিষ্টকাল আমাদের দেশে থাকুক। মিয়ানমারের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক কূটনৈতিক যুদ্ধে আমাদের তাই রয়েছে পরিপূর্ণ সমর্থন। আমরা চাই দ্রুত ও কার্যকর প্রত্যাবসন। কিন্তু একমাত্র বিবেচ্য বিষয় হচ্ছে রোহিঙ্গাদের কারণে বহির্বিশ্ব আমাদের ইমেজ তথা সফট পাওয়ারের যে বৃদ্ধি ঘটেছে, সেটা যাতে কোনোভাবেই ক্ষতিগ্রস্ত না হয়।

লেখক: কলামিস্ট

ইমেইল: [email protected]

/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ