ভয়কে জয় করার মন্ত্রটাই এখন জরুরি

Send
রেজানুর রহমান
প্রকাশিত : ১৫:৪৩, নভেম্বর ২৭, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৫:৫৮, নভেম্বর ২৭, ২০১৯

রেজানুর রহমানবাংলাদেশের পক্ষে ব্যাটিং করলেন বিরাট কোহলি। প্রচারমাধ্যমে এই শিরোনাম দেখে রীতিমতো আঁতকে উঠেছিলাম। কলকাতার ইডেন গার্ডেনসে গোলাপি বলের টেস্ট ম্যাচে বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের শোচনীয় পরাজয়ের পরিস্থিতি দেখে মাঝপথে অনেক কষ্টে টেলিভিশনে খেলা দেখা থেকে নিজেকে নিবৃত্ত রাখি। আহারে! কতই না প্রত্যাশা ছিল! ভারতের মতো শক্তিধর ক্রিকেট দলের সঙ্গে লড়াই করে বাংলাদেশ ক্রিকেট দল জিতবে, এমন প্রত্যাশা নয়। তবে প্রত্যাশা ছিল বাংলাদেশ যেন শেষ পর্যন্ত লড়াই করে হারে। যেন গর্ব করে বলতে পারি, লড়াই করে হেরেছি। লড়াই করে হেরে যাওয়ার মধ্যেও এক ধরনের আনন্দ থাকে। সেই আনন্দটাই পেতে চেয়েছিলাম। প্রত্যাশা আরও একটা ছিল। আমাদের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা স্বয়ং এই ক্রিকেট ম্যাচ দেখতে যাবেন। কাজেই আমরা যেন একটি ভালো খেলা উপহার দিতে পারি। কিন্তু ঘটলো তার উল্টোটা। বাংলাদেশ ক্রিকেট দল মাঠের লড়াইয়ে নেমে যাওয়ার আগেই যেন হেরে বসে আছে। ব্যাটিং, বোলিং, ফিল্ডিং কোনও শাখাতেই বাংলাদেশ ক্রিকেট দল পেশাদারি সামর্থ্য দেখাতে পারছিল না। লজ্জা আর পরাজয়ের গ্লানি সহ্য করতে না পেরে একপর্যায়ে টিভিতে ভারত-বাংলাদেশের ক্রিকেট খেলা দেখা ছেড়ে দেই। ৫ দিনের টেস্ট ম্যাচ আড়াই দিনে শেষ। হঠাৎ একটি অনলাইন মিডিয়ায় শিরোনাম দেখে আঁতকে উঠলাম—‘বাংলাদেশের পক্ষে ব্যাটিং করলেন বিরাট কোহলি’। ঘটনা কী? শেষ পর্যন্ত কি বাংলাদেশের পক্ষে সত্যি সত্যি ব্যাটিং করেছেন বিরাট কোহলি। ক্রিকেটে কি এই নিয়ম আছে? পরাজিত হতে যাওয়া দলের পক্ষে কি জয়ী হতে যাওয়া দলের কেউ ব্যাটিংয়ে নামতে পারে? নাকি বিরাট কোহলি কৌতুক করার মানসিকতায় বাংলাদেশের পক্ষে ব্যাটিং করেছেন? বুঝিয়ে দিয়েছেন, ভাইয়েরা এই যে দ্যাখ, এইভাবে ব্যাটিং করতে হয়। এইভাবে ফিল্ডিং সাজাতে হয়।

খবরটা পড়ার পর আসল রহস্য উন্মোচিত হলো। বিরাট কোহলি বাংলাদেশের পক্ষে ঠিকই ব্যাটিং করেছেন। কিন্তু মাঠের ক্রিকেটে নয়। ক্রিকেট নিয়ে বাংলাদেশের পক্ষে কথা বলেছেন। এটাকেই প্রচারমাধ্যমগুলো আকর্ষণীয় শিরোনাম করেছে। ইডেন গার্ডেনসে ৫ দিনের ম্যাচ আড়াই দিনেই শেষ হয়ে যাওয়ায় বাংলাদেশের ক্রিকেট সামর্থ্য নিয়ে অনেক নেতিবাচক প্রশ্ন উঠেছে। অনেকে কৌতুকও করছেন। বাংলাদেশকে অর্ডিনারি দল হিসেবে উল্লেখ করে ভারতীয় ক্রিকেটের জীবন্ত কিংবদন্তি সুনীল গাভাস্কার প্রশ্ন তুলেছেন খেলোয়াড়দের নিবেদন নিয়ে। ক্রিকেটের প্রতি প্রবল আবেগ ও ভালোবাসা থাকা সত্ত্বেও বারবার দলের হার দেখতে পাওয়া সমর্থকদের প্রতি সহমর্মিতা জানিয়েছেন তিনি।

বিরাট কোহলি বলেছেন, সবাইকে বাস্তবতা মানতে হবে। প্রথমত, বাংলাদেশ দলে দুই অভিজ্ঞ খেলোয়াড় নেই। সাকিব নেই, তামিম নেই। শুধু আছে মুশফিক আর মাহমুদুল্লাহ। দু’জন খেলোয়াড় নিয়ে তো একটা দল সামনের দিকে যেতে পারে না। আমি মনে করি তারা যদি বেশি টেস্ট ক্রিকেট খেলতে পারে, তাহলে তারা অভিজ্ঞতা অর্জন করতে পারবে। যদি বছরে দুটি টেস্ট খেলা হয়, তাহলে বোঝা সম্ভব নয় কোন অবস্থায় কী করতে হবে। কীভাবে চাপের মধ্যে খেলতে হয়, কম খেললে তা জানা যাবে না।

ভারতীয় ক্রিকেট দলের অধিনায়ক বিরাট কোহলিকে ধন্যবাদ বাংলাদেশের পক্ষে ব্যাটিং করার জন্য। তিনি যথার্থই বলেছেন বছরে ২-৩টি টেস্ট খেলে দলের উন্নতি করা মোটেই সম্ভব নয়। তার চেয়েও বড় কথা, ভারতের মতো শক্তিধর ক্রিকেট টিমের বিপক্ষে টেস্ট খেলতে যাওয়ার আগে বাংলাদেশের কি সত্যিকার অর্থে গঠনমূলক কোনও পরিকল্পনা ছিল? বাংলাদেশ ক্রিকেট দল ভারতে খেলতে যাওয়ার আগে কতই না নাটক হলো। হঠাৎ ক্রিকেটাররা আন্দোলনে নামলেন। ক্রিকেট বোর্ডের সঙ্গে ক্রিকেটারদের এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক লড়াই শুরু হয়ে গেল। এ যেন ‘শত্রু শত্রু’ খেলা। পরে পরিস্থিতি শান্ত হলেও ক্রিকেটারদের মধ্যে মানসিক শক্তি ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়েছিল কী? বাংলাদেশ ভারতের সঙ্গে খেলতে গিয়ে নাস্তানাবুদ হয়েছে। বিভিন্ন মহল থেকে বাংলাদেশের ক্রিকেট ও ক্রিকেটারদের নিয়ে বিরূপ সমালোচনাও হচ্ছে। কিন্তু এটাই তো হওয়ার কথা ছিল। ভারতের মাটিতে পূর্ণশক্তির দল কি নিতে পেরেছে বাংলাদেশ? দলের পঞ্চপাণ্ডব বলে খ্যাত পাঁচ ক্রিকেটারের মধ্যে তিনজনই অর্থাৎ মাশরাফি, তামিম ও সাকিব দলে নাই। তার মানে দলে যারা সাহস জোগাবেন, তারাই অনুপস্থিত। অপরদিকে ভারত পূর্ণ শক্তির দল নিয়ে বাংলাদেশকে মোকাবিলা করতে নেমেছিল। একবার ভাবুন তো, একটি দলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন বিশ্বসেরা ক্রিকেটার বিরাট কোহলি। তার দলে আছেন বিশ্বসেরা সব ক্রিকেটার। আর অন্যদলের নেতৃত্বে আছেন একজন তরুণ ক্রিকেটার মমিনুল। তার সহযোগীদের মধ্যে দু’জন বাদে অন্যরাও অপেক্ষাকৃত তরুণ। বিশ্বসেরা ক্রিকেটারদের সঙ্গে তরুণরা লড়াই করে কতটা সাফল্য পেতে পারে, আমরা কি বিষয়টা একবারও ভেবে দেখেছি?

ভারতের সঙ্গে ক্রিকেট খেলায় বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের অসহায় আত্মসমর্পণ দেখে স্বয়ং বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের সভাপতি নাজমুল হাসান পাপন ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন। তিনি বলেছেন, ক্রিকেট খেলায় আমাদের ক্রিকেটারদের এত ভয় পেতে এত বছর দেখিনি। ব্যাটিংয়ের যে অবস্থা দেখলাম, তাতে খুব অবাক হয়েছি। সিনিয়র ক্রিকেটার থেকে শুরু করে সবাইকে দেখেই মনে হচ্ছিল খুব ঘাবড়ে গেছে। এত ভয় পেতে এত বছর দেখিনি।

ক্রিকেট বোর্ডের সম্মানিত সভাপতির প্রতি শ্রদ্ধা রেখেই বলছি, কেন ভয়ে ভয়ে খেলেছে আমাদের ক্রিকেটাররা? ক্রিকেট অনেকটা মানসিক শক্তির খেলা? সেখানে মাঠে নেমেই যদি কেউ প্রতিপক্ষকে ভয় পায়, তাহলে তো পরাজয় অনিবার্য। ১৯ বছর ধরে টেস্ট ক্রিকেট খেলছে বাংলাদেশ। এতদিনে তো ভয়কে জয় করার কথা! কেন ভয়কে জয় করা সম্ভব হচ্ছে না? ক্রিকেট বোর্ডের চেয়ারম্যান যখন স্বয়ং বুঝতে পারছেন আমাদের ক্রিকেটাররা ভয় পেয়েছে, তাহলে তো ভয়ের কারণটা দ্রুত খুঁজে বের করা দরকার। প্রসঙ্গক্রমে একটা বিষয় এসেই যায়। আমরা যখন ভারতের বিপক্ষে দল সাজিয়েছি তখন কি একবারও ভেবেছি আমাদের ক্রিকেটাররা প্রতিপক্ষকে ভয় পেতে পারে? বিরাট কোহলি, রোহিত শর্মা, শিখর ধাওয়ানদের সঙ্গে ক্রিকেট লড়াই করতে আমরা যাদের পাঠিয়েছিলাম, তারা কি সবাই সত্যিকার অর্থে মানসিকভাবে সাহসী ক্রিকেটার? আপনি যখন লড়াইয়ের মাঠে কোনও দলকে পাঠাবেন, তখন প্রতিপক্ষের শক্তি ও সামর্থ্যকে প্রথম বিবেচনায় আনতে হবে! এবং সেইভাবে নিজের দলকে তৈরি করতে হবে। তা নাহলে মাঠের লড়াইয়ে ভয় কাজ করবেই।

জানি না ভারত থেকে নাস্তানাবুদ হয়ে ফিরে আসার পর বাংলাদেশ ক্রিকেট দলকে নিয়ে কর্তৃপক্ষের ভাবনাটা কী? তবে বোর্ড সভাপতির কথার সূত্র ধরে বলি, ভয় কাটাতে হবে ক্রিকেটারদের। এ ব্যাপারে যত দ্রুত সম্ভব পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। ক্রিকেটে ভয়কে জয় করার মন্ত্রটাই এখন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন।

লেখক: কথাসাহিত্যিক, নাট্যকার, সম্পাদক আনন্দ আলো

 

/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ