ভোটার ‘হাওয়া’ কেন?

Send
তুষার আবদুল্লাহ
প্রকাশিত : ১৬:৩২, ফেব্রুয়ারি ০১, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৬:৩৪, ফেব্রুয়ারি ০১, ২০২০

তুষার আবদুল্লাহমেয়র প্রার্থী’র ভিটামিন ডি’র অফারে সাড়া দিলেন না ভোটাররা। ভোটের দিন ভোটকেন্দ্র ঘিরে ভোটার, কর্মীদের জড়ো হওয়া। প্রার্থীদের ক্যাম্পে নিজের ভোটার নম্বর মিলিয়ে নেওয়া, বুথের খোঁজ করা এমন দৃশ্য ঢাকার উত্তর-দক্ষিণের ভোটে এবার তেমন দেখা গেলো না। ভোটকেন্দ্রে ভোটারের দীর্ঘ লাইনের জন্য সকাল থেকে অপেক্ষায় থেকে নিরাশ হতে হয়েছে গণমাধ্যমকর্মীদের। বুথের সামনে নতুন, তরুণ ভোটার, নারী ও প্রবীণ ভোটারের যে বৈচিত্র্য, সেই বৈচিত্র্যও অনুপস্থিত। কিন্তু এবার নগরীর দুই প্রান্তে সিটি করপোরেশন নির্বাচন নিয়ে প্রচারণার যে উৎসব তৈরি হয়েছিল, তাতে ধারণা করা হচ্ছিল কেন্দ্রে এবার ভোটার উপচে পড়বে। ভোটের আগের রাতেও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রার্থীদের নিয়ে সমর্থকদের মাতম দেখেও আশার বেলুন ফুলে উঠেছিল। কিন্তু ভোট গ্রহণ শুরু হওয়া মাত্র সেই বেলুন চুপসে গেলো। এমন ফাঁকা ভোট কেন্দ্র সিটি করপোরেশনের আগের ভোটের দিনগুলোতেও ঢাকা এবং ঢাকার বাইরে দেখা যায়নি।  ভোটগ্রহণের একটি রেওয়াজ বা সূত্রের কথা আমরা জানি, সকালের প্রথম ধাপে সকাল দশটার মধ্যে ভিড় থাকে। তারপর ধীরে ধীরে কমে দুপুর দুইটার পর থেকে বিকাল চারটা পর্যন্ত কেন্দ্রে ভিড় করেন ভোটাররা। এক ফেব্রুয়ারির ভোট সেই রেওয়াজ ও সূত্রের বাইরে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার নিজেও কম ভোটার উপস্থিতির কথা স্বীকার করেছেন এবং বলেছেন এমন ভোট তিনি চাননি।

এবারেই প্রথম ইভিএম-এর মাধ্যমে দুই সিটি করপোরেশনের সব কয়টি কেন্দ্রে ভোট নেওয়া হলো। ইভিএম নিয়ে বিএনপি’র আপত্তি ছিল, ভোটের দিন সকালেও ঢাকা দক্ষিণে বিএনপির প্রার্থী আপত্তির কথা জানিয়েছেন। তবে বিএনপি’র বাইরে সাধারণ ভোটারদের মাঝে যে ইভিএম নিয়ে খুব একটা আগ্রহ ছিল, তা বলা যাবে না। কারণ, নির্বাচন কমিশন ইভিএম ভোটের যে মহড়ার আয়োজন করেছিল, তা নিয়ে সাধারণ ভোটারদের মধ্যে যে অনাগ্রহ দেখা গেছে, ভোটের দিন তারই ধারাবাহিকতা দেখা গেলো। ইভিএম নিয়ে প্রবীণ ভোটারদের অস্বস্তি থাকতে পারে, কিন্তু প্রযুক্তিবান্ধব তরুণ ভোটাররা গেলেন কোথায়? তাদের তো ইভিএমের প্রতি আগ্রহ থাকার কথা। তরুণ ভোটাররা যেমন আসেনি, তেমনি ভোটকেন্দ্রে এজেন্টদেরও উপস্থিতি ছিল কম। বিএনপির এজেন্ট দেখা যায়নি যেমন অনেক কেন্দ্রে, তেমনি কোনও কোনও কেন্দ্রে আওয়ামী লীগেরও এজেন্ট পাওয়া যায়নি। ইভিএমে প্রযুক্তিগত কারণে ভোটারের পরিচয় নিশ্চিত বা প্রমাণের প্রয়োজন কমে গেছে বলেই কি এজেন্ট দেওয়া নিয়ে অনাগ্রহ?

ভোটারদের নির্বাচনের প্রতি আগ্রহ কমে যাচ্ছে বা গেছে একথা প্রার্থীরাও অস্বীকার করেননি। তারা এ নিয়ে বিশ্লেষণ ও গবেষণার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন। সিটি করপোরেশন নির্বাচনে সাধারণত কাউন্সিলর প্রার্থীরা ভোটারের জোগান দেন। সীমিত আয়তনের এলাকার মধ্যে ভোট হওয়ায় ওয়ার্ডের ভোটাররাও প্রার্থীদের কাছে অপেক্ষাকৃত পরিচিত থাকেন। তাই তাদের আহ্বান উপেক্ষা করতে পারেন না ভোটাররা। কিন্তু ঢাকা যত আকাশমুখী হয়েছে, ততটাই সামাজিক বিচ্ছিন্নতা তৈরি হয়েছে। ফলে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের সঙ্গে  সাধারণ ভোটারদের তৈরি হয়েছে দূরত্ব। তাই এখন আহবান জানানোর অধিকারও হারিয়েও বসে আছেন রাজনৈতিক নেতা কর্মীরা। এছাড়া স্থানীয়ভাবে কাউন্সিলরদের দুর্নীতি ও অপরাধমূলক ঘটনার সঙ্গে জড়িয়ে পড়াও ভোটারদের নির্বাচন নিয়ে অনাগ্রহ তৈরি হওয়ার বড় একটি কারণ।

নাগরিক মাত্রই তার নাগরিক সুবিধার জন্য ওয়ার্ড কাউন্সিলরের মুখাপেক্ষী হয়ে থাকার কথা। এলাকাকে মাদক ও সন্ত্রাসমুক্ত রাখা, আবর্জনা অপসারণ, সড়কবাতি, ফুটপাত নিশ্চিত করাসহ যে কোনও সংকট ও দুর্ভোগের সমাধান খোঁজেন ওয়ার্ড কাউন্সিলরদের কাছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো অধিকাংশ ওয়ার্ডের কাউন্সিলর সাধারণ নাগরিকদের কাছে অধরা থাকেন। এই অভিজ্ঞতা থেকে সাধারণ ভোটাররা ভেবে নেন, যে জনপ্রতিনিধিকে প্রয়োজনের সময় নাগালে পাওয়া যায় না, তাকে ভোট দিয়ে কী লাভ?  শুধু মেয়রকে  ভোট দেওয়ার তাগিদ খুব কম ভোটারের মাঝেই দেখা যায়। আমরা আজ  সকাল থেকেই চার মেয়র প্রার্থী, প্রধান নির্বাচন কমিশনার, র‌্যাব মহাপরিচালকসহ সবাই ভোটারদের কাছে আকুতি জানিয়ে যেতে দেখলাম, কিন্তু তাদের সেই আকুতির প্রতি ভোটারদের সহানুভূতি জানানোর কোনও লক্ষণ দেখা গেলো না।

জনপ্রতিনিধিদের নাগরিক সেবার যে কৃপণতা ছিল, তারই কি প্রতিদান দিলেন ভোটাররা, এমন উৎসবমুখর প্রচারও ব্যর্থ হলো ভোটারদের উদার হতে?

লেখক: বার্তা প্রধান, সময় টিভি

 

 

/এমএনএইচ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ