সময়টা বীরত্ব দেখানোর নয়

Send
রেজানুর রহমান
প্রকাশিত : ১৪:৩৪, মার্চ ২৯, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৪:৪২, মার্চ ২৯, ২০২০

রেজানুর রহমানসময়টা কি বীরত্ব দেখানোর? নাকি সহমর্মিতার। করোনা ভাইরাসের প্রকোপ থেকে বাঁচতে সরকার সারাদেশে ১০ দিনের সাধারণ ছুটি ঘোষণা করেছে। এই সময়টায় বাড়ির বাইরে যেতে নিষেধ করা হয়েছে। দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ সরকারের এই নিষেধ মেনে চলছেন। অফিস আদালত বন্ধ, পথঘাট ফাঁকা। দূর অতীতেও এমনটা কারও চোখে পড়েনি। প্রচারমাধ্যমে বিশেষ করে টেলিভিশনের খবরে ঢাকার ব্যস্ততম সব সড়কের চিত্র দেখে অবাক হচ্ছি। সবটাই যেন খাঁ খাঁ মরুভূমি। তবে কোথাও কোথাও যে ব্যতিক্রম চোখে পড়ছে না, তা নয়। ঘরবন্দি জীবন কাটাবো। কিন্তু খাবো কী? নিম্ন আয়ের মানুষজনের আয়-রোজগার বন্ধ। আগে তো ক্ষুধার জ্বালা দূর করতে হবে। তাই পথে নামছেন নিম্ন আয়ের কিছু মানুষ। এই সুযোগে দেশের অনেক স্থানে স্বৈরাচারী কায়দায় তাদের ওপর চড়াও হচ্ছেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অতি উৎসাহী কিছু সদস্যসহ সরকারি কিছু কর্মকর্তা। ঘরের বাইরে মানুষকে দেখলেই লাঠিপেটা করছেন। কান ধরে ওঠবস করাচ্ছেন। যেন চুরি, ডাকাতির মতো মারাত্মক অন্যায় করেছেন তারা। হ্যাঁ, একথা ঠিক, সরকারি নিষেধ উপেক্ষা করে ঘরের বাইরে বের হয়ে তারা অন্যায় করেছেন। তাই বলে তাদের নির্দয়ভাবে লাঠিপেটা করতে হবে! কানধরে ওঠবস করাতে হবে! তাও আবার বয়স্ক লোকদের?

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দু’জন বয়স্ক লোককে কান ধরে ওঠবস করানোর দৃশ্য ভাইরাল হয়েছে। দেখেই বোঝা যায় দুই বৃদ্ধ অতিদরিদ্র মানুষ। জীবিকার প্রয়োজনে হয়তো বাড়ির বাইরে বের হয়েছেন। কাজটা তারা ভালো করেননি। তাই বলে কি তাদের কান ধরে ওঠবস করাতে হবে? কান ধরে ওঠবস করার মতোই কি সামাজিক অপরাধ তারা করেছেন? যশোরের সহকারী ভূমি অফিসার সায়েমা হাসানের কাছে বোধকরি সেটাই মনে হয়েছে। আর তাই তিনি অতিদরিদ্র এই দুই বৃদ্ধকে কান ধরে ওঠবস করিয়েছেন এবং সেই দৃশ্য 'বীরত্বে'র সঙ্গে মোবাইল ফোনে ধারণ করে তা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দিয়েছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া ছবিতে দেখা যায় অসহায়ের মতো রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে আছেন দুই অসহায় বৃদ্ধ। দু’জনেরই দুই হাত দুই কানে ধরা। 'বীরত্ব' প্রকাশের দৃপ্ত ভঙ্গিতে সেই দৃশ্য মোবাইল ক্যামেরায় ধারণ করছেন সহকারী ভূমি অফিসার সায়েমা হাসান। পাশে দাঁড়িয়ে এই অসহায় দৃশ্যটি দেখছেন আরও অনেকে। দুই বৃদ্ধকে দেখে চোখের পানি সংবরণ করতে পারলাম না। আর কিছু না হোক বয়সের কথা ভেবেও তো এই দুই বৃদ্ধকে ক্ষমা করে দেওয়া যেতো। দুই বৃদ্ধকে দেখলে যে কারও তাদের বাবার কথা মনে পড়বে। আমরা যারা গ্রামে বড় হয়েছি, তাদের বাবারা তো এমনই সহজ সরল মানুষ। নিদারুণ কষ্টের দিনে এমনই সংগ্রাম করে সন্তানদের মানুষ করেছেন। সেই বাবাকে এভাবে অসম্মান করতে সহকারী ভূমি কমিশনার সায়মা হাসানের বুক কি একবারও কাঁপেনি? কী করে তিনি এটা পারলেন? আবারও স্বীকার করছি ওই দুই বৃদ্ধ ঘরবন্দি না থেকে প্রকাশ্যে রাস্তায় বের হয়ে হয়তো অন্যায় করেছেন। কিন্তু তার শাস্তি কি এতটাই ভয়াবহ ও নিষ্ঠুর হতে পারে?

সায়মা হাসানের এই 'বীরত্বে'র ঘটনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক সমালোচিত হচ্ছে। বিশিষ্ট সাংবাদিক সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা তার ফেসবুক টাইম লাইনে লিখেছেন, ‘সায়মা হাসান। যশোরের সহকারী ভূমি কমিশনার। বোঝা যায় বেশি দিন হয়নি বিসিএস অফিসার হয়েছেন। এরই মধ্যে কী ভয়ংকর মানববিরোধী হয়ে উঠেছেন তিনি। এদের প্রশিক্ষণটাই কি এমন গণবিরোধী হওয়ার! কুড়িগ্রামের সুলতানা থেকে যশোরের সায়েমা...আমাদের মাঠপর্যায়ের প্রশাসনের চেহারাটা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে কি? নাকি এটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা!’

আসলেই কি এই ঘটনাকে বিচ্ছিন্ন ভাবার সুযোগ আছে? প্রজাতন্ত্রের এক কর্মকর্তা কক্সবাজারে দায়িত্ব পালন করতেন। তাকেও দেখেছি এক অসহায় বৃদ্ধের কান ধরে টানতে টানতে নিয়ে যেতে। ওই কর্মকর্তাই কুড়িগ্রামে সাংবাদিককে পিটিয়েছেন। যদিও এই ঘটনাই প্রমাণ করে না প্রজাতন্ত্রের দায়িত্বপ্রাপ্ত সব কর্মকর্তাই খারাপ। শতকরা ৯৯ ভাগ কর্মকর্তাকেও যদি সৎ ভাবি তাহলেও তো আশঙ্কার জায়গাটা পরিষ্কার হয় না। কথায় আছে এক বালতি দুধকে নষ্ট করার জন্য এক ফোঁটা লেবুর রসই যথেষ্ট। তেমনি প্রজাতন্ত্রের ৯৯ ভাগ কর্মকর্তাকে অসৎ ও দুর্নীতিবাজ প্রমাণ করতে এক ভাগ সায়মা হাসানরাই বোধকরি যথেষ্ট। সময় থাকতে সায়মা হাসানের 'বীরত্বে'র পুরস্কার প্রদান জরুরি। যাতে করে এই ধরনের অশোভন 'বীরত্ব' দেখানোর সাহস আর কেউ না পায়।

লেখাটি শুরু করেছিলাম ‘বীরত্ব’ দেখানো নিয়ে। সত্যি কথা বলতে কী, সময়টা মোটেই বীরত্ব দেখানোর নয়। বীরত্ব দেখানো মানে এক অর্থে ভীতি ছড়ানো। এমনিতেই করোনার ভয়ে ভীত হয়ে আছে দেশের মানুষ। সেখানে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বোঝাতে বীরত্ব দেখিয়ে বাড়তি ভীতি ছড়ানো ঠিক হবে না। যশোরের সহকারী ভূমি কমিশনার সায়মা হাসান এভাবে ভয়-ভীতি না দেখিয়ে বরং বুঝিয়ে বলতে পারতেন ওই দুই বৃদ্ধকে। তাতে বোধকরি একটা সচেতন বার্তা পৌঁছে যেতো সমাজে।

করোনা ভাইরাস বড়ই ছোঁয়াচে রোগ। হাতের মাধ্যমে এই ভাইরাস মানব দেহে প্রবেশ করে। সে কারণে বারবার সাবান পানি দিয়ে হাত ধোয়ার কথা বলা হচ্ছে। মানুষের হাঁচি, কাশির মাধ্যমেও এই ভাইরাস একজনের দেহ থেকে অন্যজনের দেহে ছড়ায়। সে কারণে জরুরি কাজ না থাকলে দেশের সকল মানুষকে ১০ দিনের সাধারণ ছুটিতে ঘরে থাকতে বলা হয়েছে। এর ফলে চরম বিপাকে পড়েছেন নিম্ন আয়ের মানুষেরা। দিনের রোজগারে যাদের সংসার চলে, তারা পড়েছেন চরম বিপাকে। মূলত সংসারের চাপে বাধ্য হয়ে তারাই পথে বের হচ্ছেন। বিষয়টি মানবিক। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উচিত পথে বের হওয়া সাধারণ মানুষের প্রতি চড়াও না হয়ে ভয়ভীতি না দেখিয়ে তাদের বুঝিয়ে ঘরে পাঠানো। অথচ দুর্ভাগ্যজন্যক হলেও সত্য, দেশের অনেক স্থানে নিম্ন আয়ের খেটে খাওয়া মানুষ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অতি উৎসাহী সদস্যদের হাতে লাঞ্ছিত হচ্ছেন। রাস্তায় বের হওয়া নিম্ন আয়ের মানুষকে লাঠিপেটা করে ঘরে পাঠানোর ‘বীরত্ব’ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচিত এখন।

আবারও বলি সময়টা মোটেই বীরত্ব দেখানোর নয়। সময়টা হলো সহযোগিতা ও সহমর্মিতার। বুঝিয়ে সুঝিয়ে যে কাজটি করা সম্ভব, সেই কাজে লাঠিপেটা করা ও কান ধরে ওঠবস করানোর কোনও যুক্তি নেই। আসুন মানবিক বিবেচনায় সময়কে সবিশেষ গুরুত্ব দিয়ে যার যার অবস্থানে থেকে করোনাকালের এই ভয়াবহ পরিস্থিতি মোকাবিলা করি। মহান সৃষ্টিকর্তা নিশ্চয়ই আমাদের পথ দেখাবেন।

লেখক: কথাসাহিত্যিক, নাট্যকার, সম্পাদক আনন্দ আলো

/এসএএস/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ