সাম্প্রদায়িকতার ভাইরাস করোনার চেয়েও ভয়ংকর

Send
মো. জাকির হোসেন
প্রকাশিত : ১৭:৫৬, এপ্রিল ০৭, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৭:৫৮, এপ্রিল ০৭, ২০২০

মো. জাকির হোসেনমানব সভ্যতার ইতিহাসের ভয়ংকরতম মহামারিগুলোর অন্যতম করোনাভাইরাস। ইতোমধ্যে ২০৬টি দেশ ও অঞ্চল করোনায় আক্রান্ত। বাংলাদেশ, পাকিস্তানের পাশাপাশি ভারতও করোনায় আক্রান্ত। ভারতে লাফিয়ে বাড়ছে করোনা আক্রান্তের সংখ্যা। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেছে, ইউরোপ ও আমেরিকার পর দক্ষিণ এশিয়া নতুন মৃত্যুপুরী হতে যাচ্ছে। করোনা আতঙ্কের মাঝেই দিল্লির রেশ না কাটতেই ভারতে নতুন করে চোখ রাঙাতে শুরু করেছে সাম্প্রদায়িকতা।
দিল্লি ট্র্যাজেডির সূত্রপাত হয় বিতর্কিত নাগরিকত্ব সংশোধনী আইনকে কেন্দ্র করে। আর এবার সাম্প্রদায়িকতার চোখ রাঙানি শুরু হয়েছে দিল্লির নিজামুদ্দিন মসজিদ তাবলিগ জামাতের সমাবেশ অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে। গত ১৩ থেকে ১৫ মার্চ দিল্লির নিজামুদ্দিন অঞ্চলে তাবলিগের মার্কাজে ধর্মীয় জমায়েতে দেশ-বিদেশ থেকে যোগ দিয়েছিলেন প্রায় চার হাজার প্রচারক। লকডাউনের জন্য যাদের অনেকেই এখনও রয়ে গিয়েছেন ভারতে। তেলেঙ্গানায় ছয়জনের করোনায় মৃত্যু হওয়ার পরে জানা যায়, তারা সকলেই নিজামুদ্দিনের ওই জমায়েতে যোগ দিয়েছিলেন। শুধু তাই নয়, খবর মেলে, ওই জমায়েত থেকে ফিরে যাওয়ার পরে কাশ্মিরেও একজনের মৃত্যু হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, ওই জমায়েতে যোগ দেওয়া বহু মানুষের শরীরেই করোনার জীবাণু রয়েছে।

জমায়েত শেষে বহু প্রচারক দিল্লি ছেড়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়েছেন। ফলে তাদের মাধ্যমে করোনার গণসংক্রমণের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। কিছু রাজ্য থেকে তেমন খবরও মিলছে। তাবলিগে অংশগ্রহণকারীদের মাধ্যমে ভারতে করোনা ছড়ানো হয়েছে, এমন প্রচার-প্রচারণার মাধ্যমে মুসলিম বিদ্বেষ ও সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প ছড়িয়ে দেওয়ার একটি সুস্পষ্ট প্রচেষ্টা লক্ষণীয়। তাবলিগ সদস্যদের বিরুদ্ধে গোটা ভারতজুড়ে যে বিদ্বেষের ঝড় বইছে তাতে সার্বিকভাবে একটা ‘ইসলামোফোবিয়া’র পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। এদিকে দিল্লির তাবলিগ জামাতকে ‘করোনা জিহাদ’ বলে আখ্যা দিয়েছেন কর্ণাটাকের বিজিবি মনোনীত এমপি শোভা কারানদলাজে। মহারাষ্ট্রের প্রভাবশালী রাজনীতিবিদ ও মহারাষ্ট্র নবনির্মাণ সেনার (এমএনএস) নেতা রাজ ঠাকরে ভারতে করোনাভাইরাস ছড়ানোর জন্য সরাসরি তাবলিগ কর্মীদের আক্রমণ করে বলেছেন, ‘আমার মতে এদের সোজা গুলি করে মারা উচিত। এমনকি এই অসভ্য লোকগুলোকে কোনও চিকিৎসা দেওয়াও উচিত না!’ করোনাভাইরাস সংক্রমণ ঠেকাতে তাবলিগের কিছু সদস্য অসহযোগিতা করছেন বলে কেউ কেউ অভিযোগ করছেন। উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ তাদের ‘মানবতার শত্রু’ আখ্যা দিয়ে ইতিমধ্যেই তাদের বিরুদ্ধে ন্যাশনাল সিকিউরিটি অ্যাক্ট প্রয়োগ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ফলে বিচার ছাড়াই তাদের কয়েক মাস আটক করে রাখা যাবে। কলকাতার অভিনেত্রী ও নির্মাতা অপর্ণা সেন নিজামুদ্দিনের তাবলিগ জামাতকে ‘ক্রিমিন্যাল অ্যাক্ট’ বলে তাদের কঠোর শাস্তি দাবি করেছেন।

রাজনীতিবিদসহ নানাজনের এমন উসকানিমূলক বক্তব্যের পাশাপাশি দিল্লির নিজামুদ্দিনে তাবলিগ জামাতের সমাবেশে অংশ নেওয়া ১২ বাংলাদেশি নাগরিকের বিরুদ্ধে ফরেনার্স অ্যাক্ট লঙ্ঘনের দায়ে ইতোমধ্যে মামলাও রুজু করেছে ভারতের উত্তরপ্রদেশের পুলিশ। শামলি জেলার পুলিশ বাংলাদেশিদের একটি সরকারি কোয়ারেন্টিন সেন্টারে আটক রেখেছে। আটক বাংলাদেশি নাগরিকরা সবাই পর্যটক ভিসা নিয়েই ভারতে ঢুকেছিলেন এবং ভিসার শর্ত ভেঙে তারা ধর্মীয় প্রচারণা ও ধর্মীয় কর্মকাণ্ডে যোগ দিয়েছেন, যা সম্পূর্ণ আইনবিরুদ্ধ। উসকানিমূলক বক্তব্য ও মামলা দায়েরের পাশাপাশি আরও ভয়ানক যে বিষয়টি পরিলক্ষিত হচ্ছে, তা হলো গণমাধ্যমের একটা অংশ এবং সামাজিক মাধ্যমে নানা মুসলিমবিদ্বেষী হ্যাশট্যাগ তৈরি হয়েছে। ‘করোনাজিহাদ’, ‘নিজামুদ্দিন ইডিয়টস’ নামে বিভিন্ন হ্যাশট্যাগও ছড়িয়ে পড়ছে। ছড়িয়ে পড়ছে মুসলিমবিদ্বেষী ভুয়া ভিডিও ও খবর। ভুয়া খবর যাচাই করে দেখে, এমন একটি ওয়েবসাইট অল্টনিউজের সম্পাদক প্রতীক সিনহা বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, ‘নিজামুদ্দিনের ঘটনাটার পর থেকে এরকম অনেক ভিডিও আর পোস্ট ভাইরাল হয়েছে, যেগুলোর টার্গেট মুসলমানরা। আমরা একটা ভুয়া ভিডিও খুঁজে পেয়েছি, যেখানে একদল মুসলমানকে থালা-বাটি চাটতে দেখা যাচ্ছে। বলা হয়েছে এভাবেই মুসলমানরা করোনাভাইরাস ছড়িয়ে দিচ্ছে। আমরা যাচাই করে দেখি, ওটি আসলে বোহরা মুসলমানদের একটি রীতি—খাওয়ার পরে যাতে থালায় একটিও খাদ্যকণা অবশিষ্ট না থাকে, সেজন্য তারা চেটে পরিষ্কার করে দেন। দু’দিন আগে আরেকটি ভিডিও আসে আমাদের কাছে, যেখানে দেখা যাচ্ছে একটি মসজিদের ভেতরে একদল মুসলমান কোনও একটা আওয়াজ বার করছেন। ভুয়া পোস্টটিতে বলা হয় ওভাবেই—হাঁচি দিয়ে নাকি মুসলমানরা করোনা ছড়াচ্ছে। অথচ এটি আসলে একটা সুফি আচার, যেখানে তারা শ্বাস-প্রশ্বাসের একটা অভ্যাস করেন, সেটাই তারা করছিলেন।’ মি. সিনহা বিবিসিকে আরও বলেছেন, ‘এসব ভুয়া ভিডিও ছড়িয়ে দিয়ে ভারতে করোনা ছড়িয়ে পড়ার জন্য মুসলমানরাই দায়ী, এরকম একটা বার্তা দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে।’ প্রশ্ন হলো, এর পরিণতি কী? আরেকটি দিল্লি ট্র্যাজেডি বা তারচেয়েও ভয়াবহ কিছু অপেক্ষা করছে? নিজামুদ্দিনের তাবলিগ জামাতই কি ভারতে করোনা সংক্রমণ করেছে? নিজামুদ্দিনের সমাবেশ ছাড়া অন্য ধর্মের অনুসারীরা কি সমাবেশ জমায়েত করেছে সে সময়ে?

বিশ্বব্যাপী করোনা আতঙ্কের মধ্যে ১৩-১৫ মার্চ মাওলানা সাদ কান্ধলভীর নেতৃত্বে দিল্লির নিজামুদ্দিনে তাবলিগের যে বিপুল জমায়েতের আয়োজন করা হয়েছিল, তা কেবল দায়িত্বজ্ঞানহীন কাজ নয়, এটি ধর্মান্ধতা। বিশেষ করে এ জমায়েতের পক্ষে মাওলানা সাদের একটি বক্তব্য ধর্মান্ধতারই নির্দেশ করে। তিনি বলেছেন, ‘করোনাভাইরাস সতর্কতা মুসলিম ভাইদের থেকে মুসলমানদের দূরে রাখার ষড়যন্ত্র। ডাক্তারের কথা শুনে নামাজ বন্ধ করে, পরস্পরের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ বন্ধ করে থাকার সময় নয়। হ্যাঁ, ভাইরাস আছে। কিন্তু আমার সঙ্গে ৭০ হাজার ফেরেশতাও আছে। তারা যদি আমাকে রক্ষা করতে না পারেন, তাহলে কে পারবেন? এখন এই ধরনের জমায়েত আরও বেশি করে করার সময়, পরস্পরকে এড়িয়ে চলার সময় নয়। আমরা একত্রিত হলে রোগ ছড়াবে, কে বলেছে?’

এনআরসি, সিএএ, রাম মন্দির মামলার রায় ও দিল্লি ট্র্যাজেডি নিয়ে মুসলমানদের উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা আর দুশ্চিন্তার এমন বিরুদ্ধ সময়ে তাবলিগ জামাতের আয়োজন করে মাওলানা সাদ মুসলমানদের ভয়ংকর বিপদে ফেলে দিয়েছেন। এর ফলে ইসলাম ধর্মের হাজার হাজার অনুসারী করোনায় সংক্রমণের শিকারে পরিণত হয়েছে, তাদের মামলা-হামলার মুখে ঠেলে দেওয়া হয়েছে এবং কোটি কোটি ভারতীয় মুসলমানকে ইসলামোফোবিয়ার হুমকিতে ফেলে দেওয়া হয়েছে। সকলকে বিপদে ফেলে মাওলানা সাদ নিজেই এখন সেলফ কোয়ারেন্টিনে থেকে অডিও বার্তায় সরকারি নির্দেশনা মেনে নিয়ে ভিড় এড়িয়ে চলার আহ্বান জানাচ্ছেন। তিনি বলেছেন, আমাদের বাড়িতে থাকা উচিত, আল্লাহর ক্রোধ প্রশমনের সেটাই একমাত্র পথ। প্রত্যেকের ডাক্তারের পরামর্শ মেনে চলা এবং প্রশাসনের সঙ্গে সহযোগিতা করা উচিত। আমাদের সদস্যরা যেখানেই থাকুন না কেন তারা প্রশাসনের আদেশ মেনে চলুন। কোথায় আছেন সেটা বিষয় নয়, নিজেকে কোয়ারেন্টিনে রাখুন। এটা ইসলাম ও শরিয়তবিরোধী নয়। কেন এমন অবিমৃশ্যকারিতা ও মানুষকে বিপদের মুখে ঠেলে দেওয়া ধর্মের নামে?

তাবলিগ জামাতে অংশগ্রহণকারীদের অনেকে করোনায় আক্রান্ত। ভারতে করোনা বিস্তারেও তাদের ভূমিকা অনস্বীকার্য। কিন্তু তাদের মাধ্যমে ষড়যন্ত্র করে ভারতে করোনা ছড়ানো হয়েছে এটি সঠিক নয়। রয়টার্স-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী ভারতে করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত প্রথম রোগী শনাক্ত হয় ৩০ জানুয়ারি কেরালায়, যা নিজামুদ্দিনের সমাবেশের প্রায় দেড় মাস আগে। ভারত সরকারের পক্ষ থেকে তখন বলা হয়েছে, প্রাণঘাতী করোনাভাইরাসে আক্রান্ত ওই রোগী চীনের উহান বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। অনলাইন জি নিউজের ২ ফেব্রুয়ারির খবর অনুযায়ী ভারতে কারোনায় আক্রান্ত দ্বিতীয় ব্যক্তিও কেরালার। আক্রান্ত ওই ব্যক্তিও চীন থেকে ভারতে ফিরেছেন। করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে ১২ মার্চ ভারতে প্রথম যে মৃত্যু হয়েছে, তিনি কর্নাটকের অধিবাসী। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম জানায়, গত ২৯ ফেব্রুয়ারি সৌদি আরব থেকে কর্নাটকের ওই ব্যক্তি দেশে ফেরেন। এদিকে ১২ মার্চেই করোনা আক্রান্তের আরও খবর এসেছে কেরালা, মহারাষ্ট্র, এবং উত্তরপ্রদেশ থেকে। এই তিনটি রাজ্যে যথাক্রমে ১৭, ১১ এবং ১০ জনের আক্রান্ত হওয়ার খবর প্রকাশিত হয়। তার মানে নিজামুদ্দিনের অংশগ্রহণকারীরা করোনা বিস্তারের আগেই বিভিন্ন রাজ্যে করোনা ছড়িয়েছে, মৃত্যু হয়েছে। প্রথম যে দেশে করোনার প্রদুর্ভাব হয় সে চীনে, তাবলিগের মাধ্যমে করোনা সংক্রমণ বা বিস্তার লাভ করেনি। করোনায় মৃত্যুপুরী ইতালি, স্পেন, ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য, জার্মানি, যুক্তরাষ্ট্র ও ইকুয়েডরে তাবলিগের মাধ্যমে করোনা ছড়ায়নি। এমনকি ভারতের প্রতিবেশী বাংলাদেশেও তাবলিগের মাধ্যমে ছড়ায়নি।

নিজামুদ্দিনের জমায়েতের মাধ্যমে ভারতে করোনা ছড়ানোর ‘ষড়যন্ত্র তত্ত্ব’ তাই সত্য নয়। কেননা একই সময়ে পাকিস্তান ও মালয়েশিয়ায়ও তাবলিগের জমায়েত হয়েছে, করোনাও ছড়িয়েছে। নিজামুদ্দিনে জমায়েতের পেছনে প্রকৃত সত্য হলো, ইসলামের দাওয়াত মানুষের মাঝে পৌঁছে দেওয়ার সুস্পষ্ট আদেশ-নির্দেশ পবিত্র কোরআন ও হাদিসে উল্লেখ করা হয়েছে। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘সে ব্যক্তির চেয়ে কার কথা উত্তম হতে পারে, যে মানুষকে আল্লাহর পথে দাওয়াত দেয় এবং নিজেও সৎ কাজ করে, আর বলে আমি মুসলমানদের অন্তর্ভুক্ত।(সুরা হা-মিম সিজদাহ্: আয়াত ৩৩)। পূর্ববর্তী সময়ে দাওয়াতের দায়িত্ব নবী ও রাসুলরাই পালন করতেন। কিন্তু মোহাম্মদ (সা.) সর্বশেষ রাসুল হওয়ায় দাওয়াতের এ দায়িত্ব এখন সকল মুসলমানের ওপর।

সাদ কান্ধলভী গত ১৩ থেকে ১৫ মার্চ দিল্লির নিজামুদ্দিন অঞ্চলে তাবলিগের সমাবেশের আয়োজন করে। কিন্তু যে সময়ে এটি আয়োজন করা হয়েছে তা দায়িত্বজ্ঞান, বিবেকবোধ, আইন ও ধর্মের বিধানের পরিপন্থী। ইসলামের মূলনীতি হলো—‘নিজের অথবা অন্যের কোনও ক্ষতি করা যাবে না ও যতটা সম্ভব ক্ষয়-ক্ষতি প্রতিহত করতে হবে।’ আবু হুরাইরাহ (রা.) থেকে বর্ণিত: রাসুল (স.) বলেছেন, ‘তোমরা কুষ্ঠরোগ হতে দূরে থেকো, যেমন বাঘ হতে দূরে পলায়ন কর।’ (বুখারি: হাদিস নং ৫৭০৭)

নিজামুদ্দিনের পরও ভারতে সমাবেশ হয়েছে। ১৬ মার্চ লকডাউন ঘোষণার পরও হিন্দু মহাসভা রাজধানী দিল্লিতে গোমূত্র পার্টি করে। কয়েক হাজার লোক সেখানে হাজির হন। ১৬ থেকে ১৯ মার্চ পর্যন্ত দক্ষিণ ভারতে খোলা ছিল তিরুপতি মন্দির। প্রতিদিন গড়ে অন্তত ৪০ হাজার দর্শনার্থী গিয়েছেন সেখানে। লাইনে দাঁড়িয়ে পুজো দিয়েছেন। খোলা ছিল কাশ্মিরের বৈষ্ণদেবী মন্দির। সেখানে আটকে পড়েছেন ৫০০ পুণ্যার্থী। ২২ মার্চ থালা, ঢোল, কাঁসর নিয়ে ‘করোনা যা যা মিছিল’ করেছে বিজেপি ভক্তরা। মার্চের গোড়ায় ইতালি এবং জার্মানি ঘুরে দেশে ফিরেছিলেন শিখ ধর্মগুরু বলদেব সিং। পাঞ্জাবে গিয়ে ডজনখানেক গ্রামে ঘুরে তিনি ধর্মপ্রচার করেছেন। কয়েকদিন আগে তার মৃত্যুর পরে জানা যায়, সেই গুরুও করোনা আক্রান্ত ছিলেন। ফলে ১৮ মার্চ পাঞ্জাবের অসংখ্য গ্রাম সিল করে দেয় প্রশাসন। ওই গুরুর সংস্পর্শে এসে অন্তত ৪০ হাজার মানুষ আক্রান্ত হয়ে থাকতে পারেন বলে আশঙ্কা। এখন পর্যন্ত ওই সমস্ত গ্রামের কয়েকশ ব্যক্তির শরীরে করোনার জীবাণু মিলেছে। লকডাউন ঘোষণা করার কয়েক ঘণ্টার মধ্যে অযোধ্যায় রামলালা যাত্রা করেন সপার্ষদ যোগী আদিত্য নাথ। লকডাউনের মাঝেই অনেক মানুষ নিয়ে মন্দিরে গিয়ে রাম নবমীর অনুষ্ঠান পালন করেন তেলেঙ্গানার দুই মন্ত্রী। পশ্চিমবঙ্গে লকডাউন অমান্য করে রাম নবমী পালনে মন্দিরে ভিড় করেন হাজার হাজার ভক্ত। এমন তো বলা যাবে না যে ইসলাম ধর্মের সমাবেশ থেকে করোনা ছড়ায়, অন্য ধর্মের সমাবেশ থেকে ছড়ায় না।

বাংলাদেশে করোনাভাইরাস সতর্কতায় জনসমাগম রোধে স্থানীয় প্রশাসন জারিকৃত নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে কুড়িগ্রামের চিলমারী উপজেলার ব্রহ্মপুত্র নদ, নারায়ণগঞ্জ বন্দরের লাঙ্গলবন্দসহ নানা স্থানে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের ‘অষ্টমী স্নান’ উৎসব পালিত হয়েছে। লগ্ন শুরুর পরপরই পুণ্যার্থীদের ঢল নামে ব্রহ্মপুত্র নদে। স্নানঘাটগুলোতে ছিল উপচেপড়া ভিড়। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে লক্ষাধিক পুণ্যার্থীর আগমন ঘটে। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত, শ্রীলংকা, নেপাল থেকেও প্রচুর দর্শনার্থী লাঙ্গলবন্দ স্নানে অংশ নিয়েছেন বলে স্নান উদযাপন পরিষদ সূত্রে জানা গেছে। স্নানোৎসব উপলক্ষে আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানেরও আয়োজন করা হয়। করোনাক্রান্ত বাংলাদেশের সরকার বা জনগণ এজন্য সনাতন ধর্মের কাউকে দায়ী বা দোষারোপ করেনি। এটাই সঠিক পথ। কোনও সম্প্রদায়ের ওপর দোষ চাপিয়ে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিঘ্নকারী উস্কানিমূলক বক্তব্য দিলে তা উগ্রবাদীদের সহিংসতা ও সন্ত্রাসের সুযোগ সৃষ্টি করে দেয়।

একসময় করোনা চলে যাবে। কিন্তু সাম্প্রদায়িকতা যুগ যুগ ধরে প্রবহমান থাকে। অবিশ্বাস, বিদ্বেষ, ঘৃণা আর সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় ঘৃতাহুতি দিয়ে ’৪৭-এ ভারতবর্ষ ভাগ হয়েছিল। ২০ লাখ মানুষের রক্তে ভেজা মাটির ওপর ভারত ও পাকিস্তান স্বাধীনতার পতাকা উড়িয়েছিল। দু’দেশের সেইসব নিহত মানুষের দীর্ঘশ্বাস আজও অনুরণিত হয়। সাম্প্রদায়িকতার সে বিষবাষ্প ৭৩ বছর পরও মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে সময়ে-অসময়ে। সাম্প্রদায়িকতার যে ভাইরাস চোখ রাঙাচ্ছে তা করোনার চেয়েও ভয়ংকর। করোনা এক দেশ থেকে অন্য দেশে ছড়াতে, সংক্রমিত হতে কয়েকদিন হতে কয়েক সপ্তাহ সময় লাগে। কিন্তু প্রাণঘাতী সাম্প্রদায়িকতা সংক্রমিত হয় মুহূর্তে।

হিন্দুর যিনি ভগবান, খ্রিষ্টানের যিনি ঈশ্বর, মুসলমানের যিনি আল্লাহ তিন তো একজনই। তিনজন নন। সেই একজন যত কিছু সৃষ্টি করেছেন তার মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ সৃষ্টি হলো মানুষ। সেই মানুষ ধর্মের মুখোশে সাম্প্রদায়িকতার নামে একে অপরকে পিটিয়ে, কুপিয়ে, পুড়িয়ে, জবাই করে, গুলি করে হত্যা করে। জীবিকা নির্বাহের শেষ সম্বলটুকু ভস্মীভূত করে। কোনোমতে মাথা গোঁজার অতিসামান্য আশ্রয়স্থলটুকুও ধূলিসাৎ করে দেয়। স্রষ্টাকে স্মরণ করার মন্দির, গির্জা, মসজিদকে, সিনাগগকে অবমাননা করে, অগ্নিসংযোগ করে। মানুষের এসব কাজে ভগবান, ঈশ্বর, আল্লাহ কি খুশি হন, না রাগান্বিত হন? ‘নারায়ে তাকবির, আল্লাহু আকবার’ স্লোগান দিয়ে বিনা বিচারে, নির্বিচারে মানুষ হত্যা যেমন ইসিলামবিরোধী তেমনি যিশুর নামে সন্ত্রাস কিংবা গৌতমবুদ্ধের অনুসরণের নামে গণহত্যা যীশু ও বুদ্ধের ধর্মের বিরুদ্ধাচরণ। জয় শ্রীরাম স্লোগান দিয়ে মানুষ হত্যা করলে তা কেবল রামচন্দ্রের নীতির বিরোধিতাই নয়, তার নামের চরম অবমাননাও হয় বটে।

লেখক: অধ্যাপক, আইন বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

ই-মেইল: [email protected]

/এসএএস/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ