এবারের ঈদ হোক সহযোগিতার, পাশে থাকার

Send
আশরাফ সিদ্দিকী বিটু
প্রকাশিত : ১৮:৩১, মে ২৩, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৮:৩৭, মে ২৩, ২০২০

আশরাফ সিদ্দিকী বিটুঈদ আমাদের সকলের আনন্দ-উৎসব করার দিন। মুসলমানদের ধর্মীয় উৎসব হলেও চিরায়তভাবে সকলে মিলেই এই উৎসব পালন করা হয়; ঈদে সব ধর্মের মানুষ একে অপরের সাথে আনন্দ ভাগাভাগি করে যা আমাদের ঐতিহ্য। ঈদ উপলক্ষে মানুষ নিজের প্রিয়জন, আপন ভিটাতে ফিরে (গ্রাম বা মফস্বলের জন্মস্থান বা বাবার বাড়ি অর্থে) আবার উৎসব, স্মৃতি রোমন্থন-আড্ডা, পুনর্মিলন শেষে ফিরে আসা-এই চলে আসছে আদিকাল থেকেই। এই বাড়ি যাওয়া-ফিরে আসা; এসব আমাদের সংস্কৃতির অনুষঙ্গ। আপনকে চেনা-আপনজনকে কাছে পাওয়া আবার উজ্জীবিত হয়ে কাজে যোগ দেওয়া-আমাদের ঈদ বরাবরই এমন-এ ধারাতে চলছিল গতবছর পর্যন্ত।
এবারের ঈদ সত্যিই অন্যরকম। সব কিছু অনেক ভিন্ন, সব চিত্র পাল্টে গেছে। আচমকা অদৃশ্য ক্ষুদ্র কিন্তু ভয়াল প্রাণঘাতী করোনাভাইরাস সমস্ত পৃথিবীর শরীরে ঠুকছে আঘাতের চিহ্ন আর ক্ষত-মানুষের প্রাণে সংহার করে মানবজাতিকে আহত করেছে-স্বজন হারানোর ব্যথায় কাতর করছে। করোনাভাইরাস বাংলাদেশকেও আক্রমণ করেছে। আমরা লড়ে যাচ্ছি। ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। বাঁচার সংগ্রাম চলছে। করোনাভাইরাসের সাথে আমাদের যুদ্ধ চলছে। মানুষ সুস্থ হচ্ছে।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সচেষ্ট আছেন। সংকটে সংগ্রামে লড়াকু তিনি। আমাদের ভরসা হয়ে তিনি সাহস জুগিয়ে যাচ্ছেন, অর্থনীতিতে ধাক্কা সামলাতে নানা প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছেন। মানুষের হাতে সরাসরি মোবাইলে ডিজিটাল পদ্ধতিতে অর্থ সহায়তা দিচ্ছেন। তিনি নিরন্তর চেষ্টা করছেন। স্বাস্থ্যকর্মী, ডাক্তার-নার্স, সংশ্লিষ্ট সকলে লড়ে যাচ্ছেন। দিন দিন পরীক্ষা বাড়ানো হচ্ছে-নতুন ডাক্তার নার্স নিয়োগ দেওয়া হলো। মসজিদগুলোতে বিশেষ অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। শিক্ষার্থীদের বৃত্তি-উপবৃত্তির টাকা পৌঁছানোর ব্যবস্থা করা হয়েছে। সময় বয়ে যাচ্ছে-কাঁদিয়ে ঝরে যাচ্ছে প্রিয় প্রাণ। যত কমই হোক -বেদনা জাগিয়ে পরপারে চলে যাচ্ছেন তারা-এমন বিদায় আকাশ বিদীর্ণ করে। তব্ওু আমাদের সংগ্রাম চলামান-কিছু বিষয়ে শিথিল করলেও স্বাস্থ্যবিধির বিষয়ে বারবার সবাইকে সচেতন করা হচ্ছে। এ শিথিলতা বাঁচতে ও বাঁচানোর জন্য-যেন কেউ অনাহারে না থাকে, পথে না বসে।

সংযমের মাস রমজান শুরু হয়ে পবিত্র ঈদ এসে গেছে। অথচ করোনা যেন কেড়ে নিয়েছে আমাদের মনের আনন্দ-উৎসব। এমন ঈদ আমরা কেউ চাইনি-কিন্তু মানতে হচ্ছে। বাঁচতে হলে মানিয়ে নিতেই হবে-দুর্যোগে মানিয়ে নিতেই হয়। এই ঈদ তেমনই স্বজনদের থেকে, বাড়ি থেকে দূরে থেকে মানিয়ে নেওয়া ঈদ। উৎসব আনন্দ সীমিত করে ঘরে থাকার ঈদ-ধরে নিতে পারি ঘরে থেকে ডিজিটালভাবে উদযাপনের ঈদ। যেমন আমরা ডিজিটাল উদযাপন করেছি আমাদের প্রাণের বৈশাখ উৎসব। আগামীতে ভালো থাকতে হলে কিছু বিধি, নিয়ম, বাধ্যবাধকতা আমাদের মানতেই হবে-সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে চলতে হবে-ঈদগাহ বা মাঠে ঈদের নামাজ এড়াতে হবে বরং মসজিদের নামাজ পড়তে হবে। নিজেদের মাঝে দূরত্ব রাখতে হবে। গণজমায়েত এড়াতে হবে। এ যেন জোর করে মনের বিরুদ্ধে চলা-তবুও এসব আমাদের জন্যই-আমাদের বেঁচে থাকার জন্য, যা করোনার বিরুদ্ধে সংগ্রামেরই অংশ।

জয়ী হতে হলে কৌশলী হতে হয়-এবার ঈদও আমাদের কৌশলী হয়ে পালন করতে হবে। তবে, আমাদের একে অপরের প্রতি সহনশীল ও সহানুভূতি প্রবণ থাকতে হবে। বাড়িয়ে দিতে হবে সাহায্য-সহযোগিতার হাত যা আমরা এই করোনা দুর্যোগে করে চলেছি-এই ধারা বহমান রাখতে হবে। এই অপরের জন্য এগিয়ে আসা-সহমর্মিতার চাদরে জড়িয়ে রাখা কিছুটা হলেও আফসোস ও দুঃখ লাঘব করবে। হয়ত অনেকের বাড়ি (গ্রামের বাড়ি বা জন্মস্থান) যাওয়া হবে না-বাড়ি যাওয়াও অনুচিত; কিন্তু ভবিষ্যতের জন্য মেনে নিতে হবে। আমরা তো অনেক কিছুই নানা তাগিদে মানিয়ে নেই-এবারও না হয় জোর করে মানিয়ে নিলাম। অনেকে বাড়ি যেতে চাচ্ছেন তাদের নিবৃত্ত হওয়া দরকার নতুবা আরও বিপদ ঘটবে-এই ছোটাছুটি দেশে করোনা রোগের সংক্রমণ বাড়াবেই। তাই চলাচলে বিধি-নিষেধ মানতে হবে। নিয়ম না মানলে এই মহামারিতে আমরা আরও আক্রান্ত হবো-প্রিয়জন হারাবো।

ঈদে আমরা একে অপরকে উপহার দেই-যাকাত দেই। আমাদের এই রেওয়াজ অটুট থাকুক তবে তা আমরা বিলিয়ে দিতে পারি যারা করোনার কারণে কর্মহীন হয়ে পড়ছেন, নীরবে দুর্দিন পার করছেন। সরকার করে যাচ্ছে-যতদিন শেখ হাসিনা আছেন, মানুষের পাশে তিনি থাকবেনই। আমাদেরও এগিয়ে আসতে হবে সহযোগিতা, সহমর্মিতা ও উদারতার প্রাবল্যে। আমাদের অল্প ঔদার্য্যের ছোঁয়ায় হাসি ফুটবে অনেকের-এই হাসি ফোটানোই তো আনন্দ, তৃপ্তি। এবার যেমন সব পাল্টে গেলো-ঈদের উপহারেও পরিবর্তন আসুক-হাসি ফোটানো হতে পারে সবার ঈদ আনন্দ। সকলে সাধ্যমত হাত বাড়ালে কারও হাত শূন্য থাকবে না। যারা করোনা বিস্তার রোধ ও চিকিৎসায় সাহসের সাথে কাজ করে যাচ্ছেন তাদের পরিশ্রম ও সেবা প্রদানের কথা চিন্তা করে এবং রোগের সংক্রমণ যেন না বাড়ে, গরিব মানুষ যেন আরও গরিব না হয়, তাই আমাদের উচিত একে অপরকে সহযোগিতা করা-স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা।

করোনাভাইরাসের এই সংকটের মাঝেই ঘূর্ণিঝড় আম্পান আরও ক্ষতি করে দিয়ে গেলো। প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা ক্ষতিগ্রস্তদের দ্রুত সহায়তা প্রদানের নির্দেশ দিয়েছেন। ক্ষতিগ্রস্তদের ত্রাণ সাহায্য দেওয়া শুরু হয়েছে। হয়ত এই ক্ষতিও আমরা কাটিয়ে উঠব। এভাবেই সংগ্রাম করে আমরা টিকে আছি। আমাদের টিকে থাকতেই হবে। 

সৃষ্টিকর্তা বিপদে আমাদের পরীক্ষা করেন। বিপদে যেন আমরা না করি ভয়। মনে যেন শক্তি ও সাহস রেখে চলি। একে অপরের পাশে থাকি। সবাই আমরা লড়ে যাচ্ছি। এবার সীমিত পরিসরে ঈদ উদযাপন করা আমাদের নৈতিক ও সময়োচিত দায়িত্ব। এই সংকট-দুর্যোগে সীমিত ও ঘরোয়া পরিবেশে সবকিছু পালন উপযুক্ত ও উত্তম।

আশা করি, আমরা পারব। আমরা যদি এবার সাবধানে থাকি, সতর্কতা মেনে চলি, তাহলে আগামী দিনের ঈদ আগের মতো আনন্দ করে পালন করার পথকে সুগম করবে। পাশাপাশি যদি সহযোগিতা করে যাই, গরিব-দুখীদের একটু সাহায্য-সহযোগিতা করি, তবে ভবিষ্যতে আমরা সকলে উপকৃত হবো।

এবার ঈদ হোক ঘরে থাকা, পাশের মানুষের প্রতি সদয় হওয়া এবং ঔদার্য্যের হাত প্রসারিত করা। এই সাময়িক ত্যাগ, মানিয়ে নেওয়া, সংযত থাকা এবং সহমর্মী হওয়া আমাদেরকেই সুরক্ষা করবে। বুকে সুতীব্র আশা-এই করোনাভাইরাসকে পরাস্ত করে আমরা জয়ী হবোই।

লেখক: প্রধানমন্ত্রীর সহকারী প্রেস সচিব

 

/এসএএস/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ