দন্তহীন বাঘ জাতিসংঘকে ‘দাঁত’ গজাতে হবে!

Send
রাহমান নাসির উদ্দিন
প্রকাশিত : ১৫:৪৮, জুন ২৫, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৫:৪৯, জুন ২৫, ২০২০

রাহমান নাসির উদ্দিনগত ২২ জুন, ২০২০ জাতিসংঘের মানবাধিকার পরিষদের ৪৩তম সভায় রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতনের জন্য মিয়ানমারে যেসব নাগরিক দায়ী তাদের জাতীয়, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক ফৌজদারির আওতায় আনতে তদন্ত জোরদার করার প্রতি গুরুত্ব আরোপ করে রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে ফেরত নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে ‘মিয়ানমারের মানবাধিকার পরিস্থিতি’ শিরোনামে একটি রেজ্যুলেশন বা প্রস্তাব গৃহীত হয়। ইউরোপীয় ইউনিয়ন মানবাধিকার পরিষদের সভায় এ প্রস্তাব আনে। উপস্থিত ৪৭ সদস্যের মধ্যে ৩৭টি দেশ এ প্রস্তাবে স্বাক্ষর করে, কিন্তু দুইটি দেশ (ফিলিপাইন এবং ভেনিজুয়েলা) এ প্রস্তাবের বিরোধিতা করে, এবং (ইন্দোনেশিয়া, ভারত, নেপাল এবং জাপানসহ) বাকি আটটি দেশ সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া থেকে বিরত থাকে। বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়া, মানবিক সহায়তা দেওয়া, এবং দশ লক্ষাধিক রোহিঙ্গাকে প্রায় তিন বছর ধরে আন্তরিকতার সঙ্গে দেখভাল করার জন্য এ গৃহীত প্রস্তাবে বাংলাদেশ এবং বাংলাদেশ সরকারের ভূয়সী প্রশংসা করা হয়। পাশাপাশি নিরাপত্তা এবং সম্মানের সঙ্গে তাদের রাখাইনের নিজ আবাসস্থলে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে মিয়ানমারের প্রতি আহ্বান জানানো হয়। এছাড়া আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (ইন্টারন্যাশনাল ক্রিমিনাল কোর্ট) চলমান বিচার প্রক্রিয়া ও আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচার আদালতে (ইন্টারন্যাশনাল কোর্ট অব জাস্টিস) গাম্বিয়ার করা মামলা প্রক্রিয়াকে স্বাগত জানানো হয়। জাতিসংঘ কর্তৃক গঠিত স্বাধীন তদন্ত কমিশন এবং মহাসচিবের বিশেষ দূতকে রাখাইনে প্রবেশের জন্যও মিয়ানমারকে আহ্বান জানানো হয়। আন্তর্জাতিক ফোরামে রোহিঙ্গা বিষয়ক নানান অ্যাক্টিভিজম, জাতিসংঘের বিভিন্ন পর্ষদের গৃহীত নানান প্রস্তাব, আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচার আদালতে গাম্বিয়ার করা মামলার সূত্র ধরে মিয়ানমারের নানান তালবাহানা এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের বহুমুখী ‘মানবাধিকার রক্ষা’র দৌড়ঝাঁপ প্রভৃতি থেকে আমি সবসময় বোঝার চেষ্টা করি: এতে বাংলাদেশের কী লাভ? রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে এসব কর্মকাণ্ড আদৌ কোনও কাজে আসবে কিনা? সর্বোপরি রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করতে এসব প্রস্তাব এবং আন্তর্জাতিক অ্যাক্টিভিজম বাংলাদেশের আদৌ কোনও কাজে লাগবে কিনা? জাতিসংঘের গৃহীত এ প্রস্তাবকে আমি সে বিবেচনায় বিচার করতে চাই।

জাতিসংঘের গৃহীত প্রস্তাবে মূল বিষয় পাঁচটি: এক. রোহিঙ্গাদের ওপর যে নির্বিচার জেনোসাইড হয়েছে, তার যথাযথ বিচার করতে মিয়ানমারকে আহ্বান, দুই. রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়ে বিরাট মানবিকতার পরিচয় দেওয়ার জন্য বাংলাদেশ এবং বাংলাদেশ সরকারের প্রশংসা, তিন. আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত এবং ন্যায়বিচার আদালতে জেনোসাইড সংঘটনের অভিযোগে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে যে বিচার চলছে তাকে সমর্থন এবং স্বাগত জানানো, চার. নিরাপত্তা ও সম্মানের সঙ্গে রোহিঙ্গাদের তাদের নিজ আবাসস্থলে ফিরিয়ে নেওয়ার জন্য মিয়ানমারের প্রতি আহ্বান, এবং পাঁচ. জাতিসংঘের স্বাধীন তদন্ত টিম, মহাসচিবের বিশেষ দূত, এবং মানবাধিকার পরিষদের স্পেশাল র‌্যাপোটিয়ারকে মিয়ানমারে প্রবেশের অনুমতি প্রদানের আহ্বান।

এক. ২০১৭ সালের আগস্টের ২৫ তারিখ থেকে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে বসবাসকারী রোহিঙ্গাদের ওপর যে নির্বিচার গণহত্যা, ধর্ষণ, নির্যাতন, অগ্নিসংযোগ, এবং জেনোসাইড সংঘটিত হয়েছে, তা নিয়ে গোটা দুনিয়ায় তীব্র প্রতিক্রিয়া হয়েছে কিন্তু মিয়ানমার এসবকে কোনও পাত্তাই দেয়নি। অথচ ২০১৭ সালে সংঘটিত জেনোসাইডের কারণে প্রায় সাড়ে সাত লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে নতুন করে শরণার্থী হিসেবে আশ্রয় নিয়েছে। পুরনো এবং নতুন মিলে বাংলাদেশের দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলে টেকনাফ ও উখিয়ার ৩৪টি অস্থায়ী শরণার্থী ক্যাম্পে এবং ক্যাম্পের বাইরে বর্তমানের প্রায় ১৩ লাখ রোহিঙ্গা বাস করছে। জাতিসংঘের তিন সদস্য বিশিষ্ট স্বাধীন তদন্ত কমিটির রিপোর্ট অনুযায়ী ২০১৭ সালের পর প্রায় সাড়ে সাত লাখ বাস্তুচ্যুত হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে, প্রায় হাজার দশেক রোহিঙ্গাকে হত্যা করা হয়েছে, প্রায় ২ হাজার নারী ধর্ষণের (বেশির ভাগ ক্ষেত্রে দলগত ধর্ষণ!) শিকার হয়েছে, এবং প্রায় ৪শত গ্রাম সম্পূর্ণ জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে। ২০১৮ সালে জাতিসংঘের তদন্ত কমিটির এরকম রিপোর্ট দেওয়ার পরও ২০২০ সালে জুন মাসে এসে জাতিসংঘ এসব অপরাধে জন্য ‘যেসব নাগরিক দায়ী তাদের বিরুদ্ধে জাতীয়, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক ফৌজদারি আওতায় আনতে তদন্ত জোরদার করার আহ্বান’ জানিয়েছে। এটা আমার কাছে স্রেফ মশকরা বলে মনে হয়েছে, কেননা এর মধ্য দিয়ে জাতিসংঘ কেবল ‘দায়িত্ব পালনের’ জন্য ‘দায়িত্ব পালন’ করেছে। এসব রেজ্যুলেশন নেওয়ার একটা প্রধান অর্জন হচ্ছে, ‘আমরা তো মিয়ানমারের বিরুদ্ধে রেজ্যুলেশন নিয়েছি’ এটা বলতে পারা এবং রেজ্যুলেশনের ভার্চুয়াল দেয়ালে সেটা প্রদর্শনীর জন্য টাঙানোর কৃতিত্ব অর্জন করা। কিন্তু রোহিঙ্গাদের প্রতি যে অন্যায় এবং অত্যাচার হয়েছে তার কোনও বিচার এর মাধ্যমে হবে না। ফলে এসব রেজ্যুলেশন রোহিঙ্গাদের সত্যিকার কোনও কাজেই আসবে না। পাশাপাশি, এ বিপুল সংখ্যক শরণার্থীদের কারণে উখিয়া-টেকনাফের স্থানীয় জনগণের যে অবর্ণনীয় ক্ষতি হয়েছে এবং ভুক্তভোগী হিসেবে বহুমুখী সংকটের মধ্যে তারা বাস করছে, তা থেকে উদ্ধার পাওয়ার ক্ষেত্রেও কোনও কাজে আসবে না।

দুই. প্রস্তাবে বাংলাদেশ এবং বাংলাদেশ সরকারের ভূয়সী প্রশংসা করা হয়েছে। আমরা জাতিসংঘের এ কৃতজ্ঞতাবোধকে স্বাগত জানাই। পাশাপাশি যতদিন না রোহিঙ্গারা মিয়ানমারে ফেরত যাচ্ছে, ততদিন পর্যন্ত তথাকথিত ‘উন্নত’ দেশগুলো যাতে বাংলাদেশের প্রতি সহায়তা অব্যাহত রাখে তার জন্য জাতিসংঘের মানবাধিকার পরিষদ আহ্বান জানিয়েছে। আমরা এটাকেও সাধুবাদ জানাই। কিন্তু এটা মনে রাখা জরুরি, বাংলাদেশ ২০১৭ সালে একটি ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় থেকে রোহিঙ্গাদের রক্ষার জন্য কেবল মানবিক বিবেচনায় রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে আশ্রয় দিয়েছে। কিন্তু সেটা অবশ্যই একটা সাময়িক সময়ের জন্য। রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়া বাংলাদেশের পক্ষ থেকে কোনও ‘চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত’ নয়। সুতরাং আমি মনে করি, চাল-ডাল-লবণ-তেল দিয়ে সহায়তা করে রোহিঙ্গারা যাতে খেয়ে পরে বেঁচে থাকতে পারে সে ব্যবস্থা করা সমস্যা সমাধানের চেয়ে সমস্যা জিইয়ে রাখায় অধিক ভূমিকা পালন করবে। তাই, সমস্যা সমাধানে কী কী কার্যকরী পদক্ষেপ নেওয়া যায়, সে বিষয়ে জাতিসংঘের মানবাধিকার পরিষদ কোনও সুনির্দিষ্ট প্রস্তাবনা নেই। এমনকি উন্নত দেশগুলো কীভাবে রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে বাংলাদেশের পাশে দাঁড়াতে পারে, নিজ দেশে ফিরে যাওয়ার ক্ষেত্রে উন্নত দেশগুলো কীভাবে রোহিঙ্গাদের পাশে দাঁড়াতে পারে, তা নিয়েও কোনও সুনির্দিষ্ট প্রস্তাবনা নেই। শুধু ‘প্রশংসার মুলা ঝুলিয়ে’ রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে এসব প্রস্তাব আদতেই কোনও কাজে আসবে না।

তিন. বিভিন্ন আন্তর্জাতিক আদালতে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে মামলা-মোকদ্দমা চলছে এবং এ মামলার প্রতি জাতিসংঘের সমর্থনকে আমরা সাধুবাদ জানাই। প্রসঙ্গত, মিয়ানমারের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে, আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচার আদালতে এবং আর্জেন্টিনার একটি ফৌজদারি আদালতে। তিনটি মামলার মধ্যে জেনোসাইডের অভিযোগে গাম্বিয়ার করা আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচার আদালতের (আইসিজে) মামলাকে মিয়ানমার আমলে নিয়েছে, কেননা মিয়ানমার এর বিধিবিধানে অনুস্বাক্ষরকারী একটি রাষ্ট্র হিসেবে এর প্রক্রিয়া আমলে নিতে বাধ্য। কিন্তু জানুয়ারিতে ‘প্রভিশনার মেজর’ বা ‘অন্তর্বর্তীকালীন ব্যবস্থা’ হিসেবে দেওয়া আইসিজের নির্দেশনা অনুযায়ী মিয়ানমার কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে এবং তার ভিত্তিতে আইসিজেতে একটা রিপোর্টও জমা দিয়েছে। কিন্তু শুরু থেকেই মিয়ানমার তার বিরুদ্ধে আনীত সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করছে। ফলে, এটা ধরেই নেওয়া যায়, মিয়ানমারের দেওয়া রিপোর্টে সমস্ত অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে কিছু রুটিন কথাবার্তায় সাজিয়ে দেওয়া হয়েছে। ফলে, এ মামলার কবে সত্যিকার একটা ইতিবাচক পরিসমাপ্তি ঘটবে তার কোনও হিসাব না থাকলেও এটা সহজেই অনুমেয়, কমপক্ষে আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে এ মামলার কোনও রায় হওয়ার কথা নয়। ফলে, জাতিসংঘ সমর্থন দিলেও এ মামলার রায় যাই হোক-না-কেন, রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে এটা আদৌ কোনও কাজে আসবে কিনা তা নিয়ে আমি গুরুতর সন্দিহান। তাই, মানবাধিকার পরিষদের প্রস্তাবে আন্তর্জাতিক আদালতের মামলা-মোকদ্দমার প্রতি সমর্থন একটা স্রেফ ‘কথার কথা’, কিন্তু কোনোভাবেই এটা কোনও ‘কাজের কথা’ নয়।

চার. রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করার জন্য জাতিসংঘের মানবাধিকার পরিষদের ‘আহ্বান’ বেশ হাস্যকর শুনায়। মিয়ানমারকে নানামুখী চাপ দেওয়া, মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর সিনিয়র অফিসারদের বিভিন্ন দেশে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া, সামরিক সহযোগিতা বন্ধ করে দেওয়া, বিভিন্ন দেশ কর্তৃক দেওয়া সু চি’র নানান সম্মাননা কেড়ে নেওয়া প্রভৃতি সত্ত্বেও মিয়ানমার যখন কোনও কিছু পাত্তাই দেয় না, সেখানে স্রেফ ‘আহ্বান’ মিয়ানমারের কান পর্যন্ত পৌঁছাবে কিনা আমি সন্দিহান। এটা সত্য, বেশিরভাগ রোহিঙ্গাও নিজ দেশে ফিরতে চায়, বাংলাদেশ সরকারও রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে ফেরাতে চায়, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলোও চায় রোহিঙ্গারা দেশে ফিরে যাক, কিন্তু সেটা অবশ্যই তাদের জীবনের যথাযথ নিরাপত্তা এবং মানবিক মর্যাদা দিয়ে। যারা নিজের জীবন বাঁচাতে নিজ দেশ ছেড়ে অন্যদেশে এসে আশ্রয় নেয়, তাদের সেখানে ফেরত পাঠাতে হলে যথাযথ নিরাপত্তা বিধান করতে হবে এবং জীবনের নিশ্চয়তা দিতে হবে। তাছাড়া, রোহিঙ্গাদের সঙ্গে যেভাবে আচরণ করা হয়েছে যেন তারা মানুষ (হিউম্যান) না তারা হচ্ছে ‘সাব-হিউম্যান’। তাই তাদের ফেরত পাঠাতে হবে মানবিক মর্যাদা দিয়ে। কিন্তু নিরাপত্তা এবং মানবিক মর্যাদা দিয়ে ফেরত পাঠানোর জন্য এসব আনুষ্ঠানিকতার ‘আহ্বান’ দিয়ে কোনও কাজ হবে না। কেননা, যাকে ঘর থেকে লাথি দিয়ে বের করে দেওয়া তাকে কেউ ফুলের মালা দিয়ে বরণ করে না! ফুলের মালা দিয়ে বরণ করার জন্য প্রয়োজন কার্যকর পদক্ষেপ এবং সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা। এটা জাতিসংঘের বোঝা উচিত, কল্পনা দিয়ে পরিকল্পনা হয় না। কেবল ‘আহ্বান’ দিয়ে আন্তর্জাতিক সমস্যার সমাধান হয় না।

পাঁচ. রেজ্যুলেশনের এ আহ্বানটাকে আমি স্বাগত জানাই। কেননা, রাখাইনে সত্যিকার কোন মাত্রার অত্যাচার নির্যাতন হয়েছে, কোন পর্যায়ের জেনোসাইড সংঘটিত হয়েছে, বর্তমানে সেখানকার অবস্থা কেমন, এবং যেসব রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী এখনও সেখানে বাস করছে তারা কোন অবস্থায় আছে, সে সম্পর্কে আমাদের কোনও ধারণা নেই। মিয়ানমারের রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত সংবাদমাধ্যমে আমরা যা জানতে পারি তার কোনও বিশ্বাসযোগ্যতা নেই কেননা সেটা সত্যিকার অবস্থাকে প্রতিভাত করে না। তাই, জাতিসংঘের স্বাধীন তদন্ত কমিটি, জাতিসংঘের মহাসচিবের বিশেষ দূত, এবং জাতিসংঘের মানবাধিকার পরিষদের স্পেশাল র‌্যাপোটিয়ারকে মিয়ানমারে এবং রাখাইন রাজ্যে প্রবেশের অনুমতি দিলে সেখানকার প্রকৃত চিত্র বিশ্ববাসী জানতে পারতো। আর সেখানকার পরিস্থিতি যদি ইতিবাচক হয়, তাহলে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়াও ত্বরান্বিত করতে সহায়তা করতো। কেননা, সেখানকার সত্যিকার পরিস্থিতি (যদি ইতিবাচক হয়) যদি বাংলাদেশে বসবাসরত রোহিঙ্গারা জানতে পারতো, তাহলে তাদের মধ্যে একটা আস্থা তৈরি হতো, যা স্বেচ্ছা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ায় ইতিবাচক ভূমিকা রাখতো। কিন্তু কেবল ‘আহ্বান’ জানিয়ে কোনও লাভ নাই, কীভাবে সেটা কার্যকর করা যায়, তার জন্য কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি।

পরিশেষে বলবো, রোহিঙ্গা ইস্যুতে জাতিসংঘ সবসময়ই রোহিঙ্গাদের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে এবং রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়ার জন্য বাংলাদেশের প্রশংসা করেছে। কিন্তু কেবল প্রশংসা দিয়ে পেট ভরবে না, জাতিসংঘকেই রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে সক্রিয় ভূমিকা নিয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। বাংলাদেশ রোহিঙ্গা সমস্যার স্রষ্টা নয়, ভুক্তভোগী। রোহিঙ্গারাও এ সমস্যার জন্য দায়ী হয়, তারাও ভিকটিমস। রোহিঙ্গারাও স্বেচ্ছায় বাংলাদেশে আসেনি, বরং নিজ দেশ, সহায়-সম্পত্তি, বসতভিটা, আত্মীয়-পরিজন ত্যাগ করে এদেশে আসতে বাধ্য হয়েছে। আবার রোহিঙ্গা শরণার্থীদের কারণে উখিয়া-টেকনাফসহ স্থানীয় জনগণের যে অবর্ণনীয় ভোগান্তি হচ্ছে সেটাও বিবেচনায় নিতে হবে। তাই, এসব কিছুর জন্য যে দায়ী, সে মিয়ানমারকেই কেউ কোনোভাবে ‘বশে’ আনতে পারছে না। কিন্তু মিয়ানমারকেই এর সব দায়-দায়িত্ব নিতে হবে। আর মিয়ানমারকে ‘বশে’ আনতে জাতিসংঘকেই এর মূল ভূমিকা পালন করতে হবে। কেননা রোহিঙ্গা সমস্যা বাংলাদেশের একার সমস্যা নয়, বা বাংলাদেশ-মিয়ানমারের দ্বি-দেশীয় সমস্যা নয়; এটা একটি আন্তর্জাতিক সমস্যা। সুতরাং এর সমাধান আন্তর্জাতিকভাবেই করতে হবে। তাই, জাতিসংঘের দন্তহীন বাঘের গর্জন দিয়ে কোনও কিছুই অর্জন করা যাবে না। জাতিসংঘকে দাঁত গজাতে হবে এবং মিয়ানমারকে জায়গামতো কামড় দিতে হবে!

লেখক: নৃবিজ্ঞানী ও অধ্যাপক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।  

 

 

/এসএএস/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ