‘চাকরি করলে সরকারি, ব্যবসা করলে তরকারি’

Send
প্রভাষ আমিন
প্রকাশিত : ১২:১১, আগস্ট ০৭, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৬:৫৬, আগস্ট ০৭, ২০২০

প্রভাষ আমিনফেসবুকে অসম্পূর্ণ স্ট্যাটাস দেওয়ার একটা প্রবণতা আছে কারও কারও। সুন্দর একটা ছবি দিয়ে লিখে দিলো, জায়গাটা চমৎকার। এরপর মন্তব্যের ঘরে একের পর এক প্রশ্ন, জায়গাটা কোথায়, কবে গেলেন, কীভাবে যেতে হয়? বা কেউ লিখলো, আজ মনটা খুব খারাপ বা খুব ভালো। তারপরই একের পর এক প্রশ্ন আসবে–কেন খারাপ বা কেন ভালো?
ক’দিন আগে আমার এক মেধাবী বন্ধু ফেসবুকে একটি সিনেমার বিশাল রিভিউ লিখলেন। কিন্তু কোথাও সিনেমার নামটি লেখেননি। তিনি ধরেই নিয়েছিলেন, তার সব ফেসবুক বন্ধুও তার মতোই মেধাবী, ‘ক’ লিখলেই কলকাতা বুঝে নেবে। কিন্তু সেখানে যে আমার মতো গণ্ডমূর্খরাও ঢুকে পড়বেন, সেটা হয়তো তিনি ভাবেননি। আমি অনেক চেষ্টা করেও সেই সিনেমার নাম উদ্ধার করতে পারিনি। অনেকেই ফেসবুকে পাবলিক পোস্টে এমন সব বিষয়ের অবতারণা করেন, যেন সবাই বিষয়টি জানেন। পাবলিক পোস্টে যাই লিখেন, পুরোটা লেখা উচিত; কিছু গোপন করতে চাইলে সেটাও উল্লেখ করে দেওয়া ভালো। ‘ফাইভ ডব্লিউ ওয়ান এইচ’ ফরমুলা সাংবাদিকতার প্রথম পাঠ। ফেসবুকের সবাইকে সেই পাঠ নিতে হবে এমন কোনও কথা নেই। তবে ফেসবুকে কিছু লিখলে তাতে কে, কবে, কখন, কোথায়, কীভাবে এবং কেন এই প্রশ্নগুলোর জবাব থাকলে ভালো। তাহলে আর আমাদের মতো মূর্খদের আবার মন্তব্যের ঘরে প্রশ্ন করতে হয় না। তবে ভয় পাবেন না আমি সাংবাদিকতা বা ফেসবুকিং শেখাতে আসিনি।

আসলে একটা কৌতুক বলবো বলেই এত লম্বা ভূমিকা। বেশ ক’দিন আগে ৩৮তম বিসিএস-এর ফল  প্রকাশিত হয়েছে। তখন ফেসবুক ভেসে গেছে অভিনন্দনের জোয়ারে। তখন অনেকেই স্রেফ ‘আলহামদুলিল্লাহ’ লিখে স্ট্যাটাস দিয়েছেন। যারা বোঝার তারা বুঝে নিয়েছেন। এমনই এক ‘আলহামদুলিল্লাহ’ স্ট্যাটাস দেওয়া যুবকের সঙ্গে এক তরুণী রাতভর চ্যাট করলো। তরুণীটি খুশিতে বাগবাগ, যাক একটা বিসিএসকে আটকানো গেছে। সকালে মেয়েটি সোহাগে গদগদ হয়ে জানতে চাইলো, হ্যাঁ গো তুমি কোন ক্যাডার? ছেলেটি জবাব দিলো, আমার করোনা পজিটিভ ছিল, নেগেটিভ হয়েছি, তাই ‘আলহামদুলিল্লাহ’ লিখেছিলাম। অসম্পূর্ণ স্ট্যাটাসের বিপদ বুঝেছেন? তাই সাধু সাবধান।

তবে বিসিএস-এর ফলাফলের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অভিনন্দনের জোয়ার আর গণমাধ্যমে নিউজের হিড়িক দেখে বোঝা গেছে, ‘এইম ইন লাইফ’-এর তালিকায় বিসিএস এখন সবার শীর্ষে। কে, কীভাবে পড়াশোনা করে টিকেছেন, কাকে কতটা তীব্র লড়াই করতে হয়েছে- সবই নিউজ আইটেম। বিয়ের বাজারে বিসিএস পাত্রই এখন ‘নম্বর ওয়ান’। অথচ তিন দশক আগে, মানে আমরা যখন কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ি, তখন পরিস্থিতি এমন ছিল না। তখন মধ্যবিত্ত পরিবারের বাবা-মার চাহিদা ছিল সন্তান ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ার হবে। বেশি উচ্চাকাঙ্ক্ষী হলে পাইলট, কেউ কেউ সন্তানকে সেনা কর্মকর্তাও বানাতে চাইতেন। আমরা খাতায় ‘এইম ইন লাইফ’ রচনায় ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ারের সঙ্গে শিক্ষকতার কথাও লিখতাম। কিন্তু খুব কম অভিভাবকই সন্তানকে সরকারি কর্মকর্তা বানাতে চাইতেন। তখন বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে বিসিএস ক্যাডারের চেয়ে নীরু-বাবলু-অভিদের মতো আর্মস ক্যাডারদের গ্ল্যামার ছিল বেশি। তখন অল্পসংখ্যক যারা সরকারি চাকরি করতে চাইতেন, তাদের যুক্তি ছিল, বেতন কম হলেও সরকারি চাকরিতে নিশ্চয়তা আছে, পেনশন আছে, চাকরি যাওয়ার ভয় নেই। ১০ বছর আগেও বিসিএস এত লোভনীয় ছিল না, অন্তত বেতনের অঙ্কে। এখন পুরো পরিস্থিতিটা বদলে গেছে।

আরেকটা গল্প বলি। এই গল্পটা দুই দশক আগের। আমি তখন প্রথম আলোর চিফ রিপোর্টার। খালেদ মুহিউদ্দীন আমাদের রিপোর্টিং টিমে ছিলেন। এর মধ্যে তিনি বিসিএস দিয়ে প্রশাসনে যোগ দিলেন। মেধাবী খালেদ যেদিন প্রথম আলো ছেড়ে যাবেন, সেদিন তাকে ছোট একটা সংবর্ধনার মতো দেওয়া হয়েছিল। প্রায় সবাই তাকে অভিনন্দন জানান, তার সাফল্য কামনা করেন। আমি বলেছিলাম, খালেদ সাংবাদিকতা ছেড়ে ম্যাজিস্ট্রেট হতে যাচ্ছেন, তার মানে তার নতুন পেশাটি আমার পেশার চেয়ে ভালো। যেটা আমি মনে করি না। বরং আমি মনে করি, তার এই যাওয়া আমার পেশাকে এক ধরনের হেয় করা। এখন বুঝি আমি কত বোকা ছিলাম। নিজের পেশা নিয়ে আমার মধ্যে মিথ্যা অহং ছিল। আর খালেদ ছিলেন ‘বোকার হদ্দ’। ক’দিন পরেই ম্যাজিস্ট্রেসি ছেড়ে আবার সাংবাদিকতায় ফিরে এসেছিলেন তিনি। খালেদ তার মেধা দিয়ে, যোগ্যতা দিয়ে নিজের সিদ্ধান্তের যৌক্তিকতা প্রমাণ করতে পেরেছিলেন। সবার সে সৌভাগ্য হয় না।

বলছিলাম গত এক দশকে হুট করে সরকারি-বেসরকারি চাকরির ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যাওয়ার কথা। সরকারি চাকরি একবার হলে আর সহজে যায় না, বেতন নিয়মিত, প্রমোশন-ইনক্রিমেন্ট নিশ্চিত, চাকরি শেষে পেনশন, গ্র্যাচুইটি, প্রভিডেন্ড ফান্ড- সব মিলিয়ে নিশ্চয়তা ছিল বলেই কম বেতনকেও মেনে নিতেন সরকারি চাকুরেরা। পাশাপাশি বেসরকারি চাকরি, বিশেষ করে করোপরেট চাকরিতে বেতন, সুযোগ-সুবিধা লোভনীয়, কিন্তু চাকরি নির্ভর করে বসের ইচ্ছার ওপর। এক করোপোরেট অফিসে দক্ষ এক কর্মীর চাকরি চলে গেলো। তিনি অবাক হয়ে বসের কাছে জানতে চাইলেন, কেন? উত্তরে বস বললেন, আপনার চেহারা আর পছন্দ হচ্ছে না। বাস্তবতা এমনই। একদমই বসের ইচ্ছা-অনিচ্ছায় চাকরি, প্রমোশন, ইনক্রিমেন্ট।

বেতন যত বাড়ে, চাকরি হারানোর শঙ্কাও তত বাড়ে। আর চাকরি শেষে একদম খালি হাতে বাড়ি ফিরতে হয়। এক জায়গায় বেতন কম, কিন্তু নিশ্চয়তা আছে। আরেকদিকে বেতন বেশি, কিন্তু চাকরি ‘কচু পাতা’র পানির মতো টলোমলো। কিন্তু গত এক দশকে সরকারি চাকুরেদের বেতন বাড়তে বাড়তে অনেক আগেই বেসরকারি চাকরিকে ছাড়িয়ে গেছে। এখন বরং উল্টো বৈষম্য তৈরি হয়েছে। বেতন বেশি, নিশ্চয়তা আছে, ক্ষমতা আছে, সুযোগ-সুবিধা আছে; তবে বিসিএস নয় কেন? সবাই এখন ছুটছে বিসিএস-এর সোনার হরিণ ধরতে। অভিভাবকরাও এখন নিশ্চয়ই তাদের পছন্দের তালিকায় ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার-পাইলট টপকে বিসিএসকেই এক নম্বরে তুলে এনেছেন। এখন অভিভাবক আর সন্তানের চাওয়া মিলে গেছে এক কাতারে।

সবার সব পড়াশোনা এখন বিসিএসকেন্দ্রিক। এই যে কোটা বাতিলের আন্দোলন এবং তাতে সর্বস্তরের শিক্ষার্থীদের এমন স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ, সেও কিন্তু বিসিএস-এর কারণেই। বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরিতে বা পাবলিক লাইব্রেরিতে জায়গা পাওয়া যায় না। ভাববেন না জাতি জ্ঞানী হয়ে গেছে। সবাই বিসিএস-এর প্রস্তুতি নিচ্ছে,গাইড বই মুখস্থ করছে। নীলক্ষেতে সবচেয়ে বেশি চাহিদা হলো বিসিএস গাইডের।

কেউ ভাববেন না, আমি বিসিএস-এর বিপক্ষে। বরং আমি চাই সবচেয়ে মেধাবী ছাত্ররাই সরকারি চাকরিতে আসুক। তারা এসে বদলে দিক আমলাতন্ত্রের দীর্ঘদিনের আদল। সততা, দেশপ্রেম, যোগ্যতা আর দক্ষতা দিয়ে চালাক দেশ। আর একজন মানুষ সরকারি চাকরি করবেন না বেসরকারি সেটাও তার ইচ্ছা। তবে ইচ্ছা করলেই তো আর পছন্দের চাকরি পাওয়া যায় না। কাঙ্ক্ষিত চাকরির জন্য নিজেকে যোগ্য করে তুলতে হয়। যোগ্য হওয়ার পরও তীব্র প্রতিযোগিতা। তবে সবাই যে বিসিএস দিতে চান, এটা আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার সমস্যা। এখন দেশের যে অবস্থা, সুযোগ থাকলে প্রায় সবাই বিসিএস দিয়ে সরকারি চাকরি করতে চাইতেন।

বৈষম্যটা শুধু সরকারি-বেসরকারি চাকরির মধ্যেই নয়। সরকারি চাকরির মধ্যেও রয়েছে আন্তঃক্যাডার বৈষম্য। বিসিএস উত্তীর্ণ হওয়াদের মধ্যে পছন্দের শীর্ষে প্রশাসন। এরপর আছে পররাষ্ট্র, পুলিশ, কর, কাস্টমস ইত্যাদি।

চিকিৎসা, প্রকৌশল, কৃষি, শিক্ষা ক্যাডার যেন দুয়োরানি। এগুলো হলো দুধভাত ক্যাডার, কেউ পাত্তা দেয় না, ভয় পায় না। সুযোগ-সুবিধায় আকাশ-পাতাল ফারাক। এইবার করোনাকালে আমলারা যেভাবে দেশ চালাচ্ছে, তাতে আগামীতে বিসিএস-এ প্রশাসনের চাহিদা আরও বাড়বে বলেই মনে হচ্ছে। সবাই বুঝে গেছেন, সব ক্ষমতা আমলাদের হাতে। আন্তঃক্যাডার প্রবল বৈষম্যের কারণে গত কয়েকবছর ধরে একটা দুঃখজনক প্রবণতা শুরু হয়েছে। ডাক্তার, প্রকৌশলী বা কৃষির মতো বিশেষায়িত পেশার লোকজনও বিসিএস-এ নিজেদের একাডেমিক ক্যাডার বাদ দিয়ে সাধারণ ক্যাডারে চলে আসছে। প্রতিবছরই এই সংখ্যা বাড়ছে। এবার অন্তত দুইশ শিক্ষার্থী তাদের পেশা বদল করেছেন। এবার পররাষ্ট্র ক্যাডারে সুপারিশ পাওয়া ২৫ জনের মধ্যে ৭ জনই বিভিন্ন মেডিক্যাল কলেজ থেকে পাস করেছেন। আর ১৩ জন পাস করেছেন প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। তার মানে শুধু পররাষ্ট্র ক্যাডারেই ২০ জন ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার তাদের সারাজীবনের সব পড়াশোনা ভুলে এখন ডিপ্লোম্যাসি করবে। তাহলে তারা এতদিন কষ্ট করলেন কেন? বিশেষ পেশার ছাত্রদের পড়াতে আলাদা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান লাগে, একেকটার বিনিয়োগ একেক রকম।

সাধারণ শিক্ষার চেয়ে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, কৃষিবিদ বানাতে বেশি টাকা লাগে। কিন্তু তারা যদি শেষমেশ প্রশাসনেই চলে আসেন, তাহলে পুরো বিনিয়োগটাই জলে যায়।

৩৮তম বিসিএস-এর ফল প্রকাশের দিনে এক ডাক্তারের ফেসবুক স্ট্যাটাসের কিছুটা তুলে ধরছি, ‘আজ ৩৮তম বিসিএস-র রেজাল্ট দিয়েছে। চিকিৎসক সহযোদ্ধা এক ছোটভাই ফোন দিয়ে জানালো সে বিসিএস-এ কোয়ালিফাই করেছে। প্রথমে কিছুটা ভিরমি খেলাম! আমি তো জানি সে ৩৬তম বিসিএসে স্বাস্থ্য ক্যাডারে জয়েন করে ইতিমধ্যেই চাকরির প্রায় দু’বছর পুরনো করে ফেলেছে! তাহলে আবার ৩৮তম তে কেন? কিছুক্ষণের মধ্যেই ব্যাপারটা জলের মতো পরিষ্কার হয়ে গেলো! কারণ ৩৮তম বিসিএসে সে যেটা পেয়েছে সেটা একটা সোনার হরিণ! ৩৬তম বিসিএসে সে যেটা পেয়েছিল সেটা ছিল ‘তামার হরিণ’! সোনার হরিণ (অ্যাডমিন ক্যাডার) পাওয়ায় তাকে ফুলেল শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন এবং নিরন্তর শুভ কামনা। এবার স্বাস্থ্য ক্যাডার থেকে ৩৮ জন চিকিৎসক ক্যাডার সুইচ করেছে! ভালো লাগছে, এই দেশের মেধাবীরা বারবার ঠেক খেয়ে আস্তে আস্তে বুঝতে শিখছে যে তাদের মেধার প্রকৃত মূল্যায়ন যদি তারা চায় তাহলে অবশ্যই তাদের প্রশাসন ক্যাডারে যেতে হবে।

যদি প্রশাসন ক্যাডার কোয়ালিফাই করা সম্ভব নাও হয় তাহলে ন্যূনতম পররাষ্ট্র, পুলিশ বা ট্যাক্স বা এরকম অন্য কোনও ক্যাডারে সুইচ করতে হবে তবুও স্বাস্থ্য ক্যাডারে না! ‘হে অনাগত মেধাবী প্রজন্ম, তোমরা যারা মেধাবী তারা যদি এই দেশে বসবাস করে এইদেশের মানুষ, সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থার কাছে মূল্যায়িত হতে চাও তাহলে দয়া করে স্বাস্থ্য ক্যাডার বাদে অন্য কোন ক্যাডারে যাও। সময় থাকতেই সিদ্ধান্ত বদলাও। চিন্তা করো না, তোমরা সবাই যদি স্বাস্থ্য ক্যাডার ছেড়ে চলে যাও তাহলে রাষ্ট্র বিদেশ থেকে চিকিৎসক ভাড়া করে এনে স্বাস্থ্য ক্যাডার চালাবে!’

ছোট্ট এই স্ট্যাটাসে একজন ডাক্তার তার পেশার বঞ্চনা আর অবমূল্যায়নের চিত্রটি সহজে তুলে ধরেছেন। সাধারণত সবচেয়ে মেধাবী শিক্ষার্থীরাই মেডিক্যাল বা ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে পড়ার সুযোগ পায়। কিন্তু বিসিএস দেওয়ার পর সেই মেধাবীরাই পেছনে পড়ে যায়। ক্লাসরুমে যারা সামনের বেঞ্চের, চাকরিতে তিনিই ব্যাকবেঞ্চার। প্রশাসন ক্যাডারে যারা চাকরি পান তাদের মাঠ পর্যায়ে প্রথম পদ হয় সহকারী কমিশনার, সেখানে তাদের ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা থাকে। চাকরি নিশ্চিত হওয়ার পর তারা পদোন্নতি পান সিনিয়র সহকারী কমিশনার হিসেবে। এই পদে থেকেই অনেকে দায়িত্ব পান উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে। আর প্রশাসন ক্যাডারের যারা সচিবালয়ে পোস্টিং পান, তাদের প্রথম পদ সহকারী সচিব এবং এরপর সিনিয়র সহকারী সচিব। এরপর উপসচিব, যুগ্ম সচিব, অতিরিক্ত সচিব, সচিব, সিনিয়র সচিব, মন্ত্রিপরিষদ সচিব, মুখ্য সচিব ধাপে ধাপে আকাশ ছোঁয়ার সুযোগ। পদোন্নতির পাশাপাশি শুরু থেকেই তারা নানা সুযোগ সুবিধা পেতে থাকেন। অন্যদিকে বিসিএস উত্তীর্ণ ডাক্তাররা প্রথম যোগ দেন সহকারী সার্জন বা জুনিয়র কনসালট্যান্ট হিসেবে। এছাড়া মাঠ পর্যায়ে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে মেডিক্যাল অফিসার হিসেবে তাদের পোস্টিং হয়। কিন্তু এরপর প্রমোশন পেতে তাদের মাথার ঘাম পায়ে ফেলতে হয়। উচ্চশিক্ষা নিতে পারলেই সহকারী অধ্যাপক, সহযোগী অধ্যাপক, অধ্যাপক হওয়ার সুযোগ। নইলে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, জেলা হাসপাতাল বা সিভিল সার্জন অফিসে ঘুরে ঘুরেই চাকরি শেষ করতে হয়। চাকরির পাশাপাশি উচ্চতর পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া কঠিন। ডিগ্রি পেতে পেতে অনেকের ৮/১০ বছর লেগে যায়। এমনও হয় ডাক্তারদের জুনিয়র অনেকে ইউএনও হয়ে এসে তাদের দণ্ডমুণ্ডের কর্তা বনে যান। একবার শুধু ভাবুন ইউএনও আর উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা; ডিসি আর সিভিল সার্জন, সচিব আর অধ্যাপক। আমি কোনও মন্তব্য করবো না, আপনারাই বলুন, এরপর কেন আপনি আপনার সন্তানকে ডাক্তার বানাতে চাইবেন? সুযোগ থাকলে আপনি ডিসি হবেন না সিভিল সার্জন? শুধু ডাক্তার নয়; আন্তঃক্যাডার এই বৈষম্য প্রবলভাবে বিরাজমান। চাকরি হওয়ার আগের কোটা বৈষম্যের চেয়ে পরের ক্যাডার বৈষম্যটাই বেশি বেদনার, কষ্টের, অপমানের, বঞ্চনার।

আমি প্রশাসন ক্যাডারের দোষ দিচ্ছি না বা তাদের অবজ্ঞাও করছি না। দেশ চালাতে দক্ষ, সৎ, যোগ্য, মেধাবী আমলা অবশ্যই দরকার। তবে শুধু আমলা দিয়ে তো আর দেশ চলবে না। যার যার কাজটা তাকে তাকে করতে হবে। সব খাতেই দক্ষ লোক দরকার। কিন্তু অবস্থাটা এমন জায়গায় চলে গেছে সুযোগ থাকলে বিশেষায়িত শিক্ষার সবাই সাধারণ বিসিএস-এ চলে আসবে। বিদ্যমান ব্যবস্থায় অবশ্য সরকারের কিছুই করার নেই। স্নাতক পাস যে কেউ বিসিএস-এ অংশ নিতে পারে। টিকে গেলে যোগ্যতা অনুযায়ী ক্যাডার পাবে, এখানে পিএসসির হাত নেই। তবে সরকারকে এই বৈষম্য দূর করার অবশ্যই একটা উপায় বের করতে হবে।

করোনাকালের একটা ছড়া দিয়ে লেখাটি শেষ করছি। করোনার সময় দেশ চালাচ্ছেন আমলারা। এটা দেখে প্রশাসন ক্যাডারের প্রতি মানুষের আগ্রহ আরও বাড়বে। আর  করোনার সময় অন্য অনেক ব্যবসা বন্ধ থাকলেও তরকারির ব্যবসা ছিল জমজমাট। সাধারণ ছুটির সময় সব দোকান বন্ধ থাকলেও খোলা ছিল ওষুধের দোকান মানে ডিসপনসারি। ফেসবুকের ছড়াটি হলো:

‘চাকরি করলে সরকারি
ব্যবসা করলে তরকারি
দোকান দিলে ডিসপেনসারি।’

লেখক: হেড অব নিউজ, এটিএন নিউজ

/এসএএস/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ