X
সোমবার, ০৫ ডিসেম্বর ২০২২
২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৯
গানের শিল্পী, গ্রামোফোন, ক্যাসেট ও অন্যান্য: পর্ব ১২

সাহানাকে রবীন্দ্রনাথ: আমি যদি সম্রাট হতুম, তোমাকে বন্দিনী করতুম

শহীদ মাহমুদ জঙ্গী
০৯ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১০:২১আপডেট : ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১১:৪৬

রবীন্দ্রনাথ ও দীনেন্দ্রনাথ কলকাতায় এসেছেন। জোড়াসাঁকোয় আছেন। দীনেন্দ্রনাথ সাহানাকে ফোন করলেন। জানালেন বেশ কিছু নতুন গান তৈরি আছে। বয়সে কিশোরী সাহানা গান শেখার কোনও সুযোগই ছাড়ে না। নতুন এই গানগুলো শেখার জন্য জোড়াসাঁকো যেতে হবে। সাহানা যাওয়ার জন্য তৈরি। কিন্তু গাড়ি পাচ্ছেন না। থাকেন রসা রোডে, মামা দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জনের বাড়িতে। এই বাড়ি থেকে জোড়াসাঁকোর দূরত্ব কম নয়। শেষ পর্যন্ত ওই দিন সাহানার যাওয়া হলো না। তাই বলে গান শেখা থেমে থাকেনি। দীনেন্দ্রনাথ টেলিফোনেই গান গাইলেন, সেই গান শুনে শুনে সাহানা শিখে নিলেন। একটা-দুটো নয় পাক্কা ১৪টি গান! 

রবীন্দ্রনাথ শুনে তো অবাক। বললেন, ‘এমন গান-পাগলা আমি আর কোনও মেয়েকে দেখলুম না।’ একবার তিনি সাহানাকে বলেছিলেন, ‘তোমাকেই দেখলুম যে সংসার থেকেও গান তোমার কাছে প্রিয়। মেয়েদের মধ্যে এটা কমই দেখা যায়। তারা সংসার করতে বড্ড ভালোবাসে।’

সাহানার সংগীত প্রতিভার প্রতি রবীন্দ্রনাথের অসীম আস্থা ছিল। তাই সাহানা অল্প বয়সেই রবীন্দ্রনাথের কাছ থেকে গান শেখার দারুণ সুযোগ পেয়েছিলেন।

রবীন্দ্রনাথ কলকাতা এলেই জোড়াসাঁকোয় গান শেখার জন্য সাহানার ডাক পড়তো। রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে যখন দীনেন্দ্রনাথ আসতেন, তিনিই গান শেখাতেন। রবীন্দ্রনাথ পাশে বসে শুনতেন। কখনও কখনও গলা মেলাতেন। আর দীনেন্দ্রনাথ না এলে রবীন্দ্রনাথ নিজেই গান শেখাতেন।

রবীন্দ্রনাথ গান নিয়ে মগ্ন থাকার সময়, দর্শনার্থীদের আগমন পছন্দ করতেন না। তারপরও লোকজন এলে দেখা করতেন। ধৈর্য ধরে কথা শুনতেন, নিজেও বলতেন। তার এই অপরিসীম ভদ্রতার কোনও তুলনা ছিল না।

বিষয়টি নিয়ে সাহানা দেবী স্মৃতিচারণ করেছেন এভাবে, “সবেমাত্র ‘গান আমার যায় ভেসে যায়’ গানটি শিখেছি আর অনেক লোক এলেন কবির সাথে দেখা করতে। বাধ্য হয়ে ওঁকে গান ফেলে উঠতে হলো। যাবার সময় বললেন ‘দেখছ তো, আমার কতো অনিচ্ছার সঙ্গে পদে পদে চলতে হয়।’ আমি বললাম, ‘আমি কেন কিছুতেই যা ইচ্ছা হয় না তা করতে পারি না?’ উনি বললেন, ‘পারো না নয়, করতে চাও না তাই। তার কারণ তুমি দেখতে চাও না তোমার অনিচ্ছাটা কেন আসে, কোথা থেকে আসে, বা তার কারণ কী?’ মনে আছে কথাগুলো তখন মনে খুব দাগ কেটেছিল।”

নিজের জন্ম সময় নিয়ে সাহানা দেবী লিখেছেন, ‘যে সালে বাংলাদেশে সেই সাংঘাতিক ভূমিকম্প হয়, আমার জন্ম সেই ১৮৯৭ সালের ভূমিকম্পর কিছু দিন আগে।’

সাহানার পিতা প্যারীমোহন ছিলেন ফরিদপুরের সিভিল সার্জন। পিতামহ কালীনারায়ণ গুপ্ত ছিলেন সমাজসেবক, জ্যাঠামশাই কে জি গুপ্ত ছিলেন আইসিএস। অতুলপ্রসাদ সাহানার পিসতুতো ভাই। সুকুমার রায় পিসতুতো ভগ্নিপতি। মায়ের দিকে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ ছিলেন মামা। বিশিষ্ট শিল্পী অমলা দাশ ছিলেন সাহানার মাসি।

সাহানার বয়স মাত্র দেড় বছর, পিতা মৃত্যুবরণ করেন। প্যারীমোহন মৃত্যুর আগে সাহানার মামা দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশকে ডেকে তার হাতে সাহানার মাকে দিয়ে বলেন, ‘চিত্ত এরা রইলো, দেখো।’ সেই থেকে মামা চিত্তরঞ্জনের বাড়িতেই বেড়ে ওঠা সাহানার।

মাসি অমলা দাশ সেই সময়ে যথাযথভাবেই সংগীত-শিক্ষা নিয়ে রবীন্দ্রসংগীত গাইতেন। তিনি রবীন্দ্রনাথকে রবিকাকা বলে ডাকতেন। রবীন্দ্রনাথ অমলাকে কন্যার মতো ভালোবাসতেন। অমলা একদিন সাহানাকে রবীন্দ্রনাথের কাছে নিয়ে গেলেন। বললেন, ‘রবিকাকা আমাদের এই মেয়েটার গান শুনবে?’

সাহানা গাইলেন, অমলা মাসির থেকে শেখা গান, ‘ঘুরে ফিরে এমনি করে ছড়িয়ে দেরে’। তারপর থেকে রবীন্দ্রনাথ আসলেই সাহানার খবর নিতেন। রবীন্দ্রনাথের সাথে দেশবন্ধুর ভালো ভাব ছিল। উভয় পরিবারের মধ্যে নিয়মিত আসা-যাওয়া ছিল। তাই সাহানার শিশুবেলা থেকেই তার অসাধারণ প্রতিভা সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথের ধারণা ছিল।

সাহানার দাদু চমৎকার গাইতেন। প্রতিদিন ভোরে তার কণ্ঠে ভোরের রাগরাগিণী শুনে সাহানার সকাল শুরু হতো। তিনি গানও রচনা করতেন। দাদুর কাছ থেকে অনেক গান শিখেছিলেন। সাত-আট বছর বয়সে গ্রামোফোন রেকর্ড থেকে লালচাঁদ বড়ালের সব গান গলায় তুলে হুবহু গাইতেন। সাহানার মামা বলতেন, ‘তুই গ্রামোফোনে গান দে।’

একদিন, অমলা দাশ নিজের ছোট বোন ও সাহানার বড়বোনদের গান শেখাচ্ছিলেন। গানটি ছিল টপ্পা ঢঙের হিন্দি গান। তানে ভরা গানটি হচ্ছে ‘আয়ে আজু মেরা আয়ে নন্দলালা’। একটু দূরে দাঁড়িয়ে শিশু সাহানা শুনছিলেন। শুনতে শুনতেই গান শিখে নিলেন। এবং সবার আগেই গানটি সবাইকে গেয়ে শোনালেন। মাসি অমলা ভীষণ খুশি। শিশু বয়সে, এই গান সাহানাকে বহুবার গাইতে হয়েছে। বয়স হওয়ার পরও শ্রোতার অনুরোধের তালিকায় এই গান থাকতো।

সাহানাকে গান শেখাবার জন্য ওস্তাদ সুরেন্দ্রনাথকে পাঠিয়েছিলেন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ। সুরেন ওস্তাদের কাছে গান শিখতে আরম্ভ করার আগে সাহানার গানের পুঁজি ছিল বেশিরভাগ গ্রামোফোনের রেকর্ড শুনে তোলা গান। এসব গানের কণ্ঠশিল্পী ছিলেন লালচাঁদ বড়াল, বিনোদিনী দাসী, গহরজান, মালকাজান, জানকী বাঈ, পান্নাময়ী প্রমুখ। আর রেকর্ডের গানের বাইরে মাসীর কাছে শেখা গান।

১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ আন্দোলন। সাহানার বয়স তখন আট। একদিন পুরুলিয়ায় এক বিরাট জনসভায় সাহানাকে কোলে করে নিয়ে একটি টেবিলের ওপর দাঁড় করিয়ে দেওয়া হলো। সাহানা গাইলেন রজনীকান্তের গান-
‘আমরা নেহাত গরিব আমরা নেহাত ছোট
তবু আছি সাত কোটি ভাই জেগে ওঠো।’

ফ্রক পরা ছোট্ট একটি মেয়ের কণ্ঠে সেদিন উপস্থিত সবাই অবাক হলেন। সভার পর অনেকেই তার পরিচয় জানার জন্য এগিয়ে এলেন। এভাবেই সাহানা শিশুকাল থেকেই নির্ভয়ে ও সাবলীলভাবে গান গাওয়ার অভ্যাস রপ্ত করে ফেলেন।

রবীন্দ্রনাথের জোড়াসাঁকোর পুরানো বাড়িতে মাঘোৎসবের সভায় ১৫ বছরের সাহানা প্রথমবারের মতো গান করেন।

গান নিয়ে সাহানার পরামর্শকে কবিগুরু গুরুত্ব দিতেন। একদিন কবিগুরু বললেন, ‘আজ একটা নৃত্যসংগীত রচনা করা গেলো, এই সবে শেষ করলুম।’ এরপর তিনি ‘নৃত্যের তালে তালে হে নটরাজ’ গানটি গেয়ে উপস্থিত সবাইকে শোনালেন। সবাই গানটি শুনে খুব খুশি। সাহানা গানের চারটি স্তবক চার রকম তালে করার প্রস্তাব করলে কবি পছন্দ করলেন। এবং চারটি স্তবকের চার রকম সুর করে দিলেন। ওই সময় ‘নমো নমো নমো, তোমার নৃত্য অমিত বিত্ত ভরুক চিত্ত মম’ এই অংশটুকু ছিল না। পরে কবি এটুকু জুড়ে দিয়েছিলেন।

অতুলপ্রসাদকে ভাইদা বলে সম্বোধন করতেন। তার থেকেও গান শিখেছেন। দার্জিলিংয়ে সাহানার বড় মেশোমশাই ডা. পি কে রায়ের ‘রুবি হল’ নামক বাসায় বসে অতুলপ্রসাদ থেকে প্রথম গানটি শিখেন। গানটি ছিল, ‘তব পারে যাবো কেমনে হরি।’ সেদিনই, আরও দুটি গান শেখেন- ‘বধূ ধর ধর মালা পরো গলে’ ও ‘এ মধুর রাতে বল কে বীণা বাজায়?’

রবীন্দ্রনাথ ওই সময় দার্জিলিংয়ে আসেন। খবর পেয়ে অতুলপ্রসাদ ও সাহানা দেখা করতে যান। কবি তখন তার বিদেশ সফরের গল্প বলছিলেন। এসব বলতে বলতে একবার ইশারায় সাহানাকে দেখিয়ে অতুলপ্রসাদকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘গানে অনুরাগ কি বলে? গাইছে আজকাল?’

অতুলপ্রসাদ হেসে বললেন, ‘গানে অনুরাগ তো খুবই দেখছি, উৎসাহের শেষ নাই। এরই মধ্যে আমার কাছে এসে কটা গান শিখে নিয়েছে।’ এরপর কবি মজা করে বললেন, ‘ওহে রোস রোস, এখনও তো বিয়ে হয়নি!’

প্রখ্যাত সংগীতজ্ঞ দিলীপকুমার রায় সাহানা দেবীকে নিজের তৈরি একটি গান শিখিয়েছিলেন। গান শেখার পর সাহানা যখন গাইলেন। মুগ্ধ দিলীপকুমার বললেন এই গান তিনি আর গাইবেন না। কারণ, তার মতে সাহানা তারচেয়ে অনেক ভালো গেয়েছেন। আশপাশের পরিচিত লোকজন জানেন দিলীপকুমার যা সত্য মনে করতেন তাই বলতেন।

একসময় তাদের মধ্যে স্বার্থহীন বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে।

সাহানা দেবীকে দিলীপকুমার অনেক গান শিখিয়েছিলেন, যেগুলো বড় বড় আসরে বা বিখ্যাত সব গায়ক-গায়িকাদের সামনে সম্মানের সাথে গাওয়া যায়।

নিখিল ভারত সংগীত সম্মেলন হচ্ছে লখনৌতে। সেই সময় সেখানে সাহানা ছিলেন। সম্মেলন শেষে লখনৌর এক বড় হলে গানের আসর হয়। সে আসরে মথুরার বিখ্যাত ওস্তাদ চন্দন চৌবে, ভাতখণ্ডের প্রিয় শিষ্য শ্রীকৃষ্ণ রতনজনকরের মতো বড় বড় গায়কেরা গাইবার জন্য এসেছেন। সাহানাও একই অনুষ্ঠানে গাইবেন। গাওয়ার জন্য একটি হিন্দি গান ঠিক করলেন। গানটি তিনি দিলীপকুমার থেকে শিখেছিলেন। দিলীপকুমার আরও একটি গান, মীরার ভজন সাহানাকে তালিম দিয়ে রাখলেন। প্রয়োজন হলে যেন গাইতে পারেন। এই গান দুটি তো গাইলেনই, শ্রোতাদের বারবার অনুরোধে আরও দুটি গান গেয়ে তবে ছাড়া পেলেন।

গান দুটির মধ্যে একটি কাফি সিন্ধু রাগে হোলির গান ছিল। যেটি সাহানা শেখেন দিলীপকুমারের কাছ থেকে। আর দিলীপকুমার শিখেছিলেন ওস্তাদ চন্দন চৌবের কাছ থেকে।

১৯২৫ সালে প্রথমবারের মতো সাহানার গাওয়া দুটি রবীন্দ্রসংগীতের রেকর্ড প্রকাশিত হয়। গান দুটি- ‘আমার যাবার বেলায়’ এবং ‘যদি তারে নাই চিনিগো’।

এরপর রেকর্ড-ক্যাসেটে তার যেসব গান প্রকাশিত হয়েছে, তারমধ্য থেকে কয়েকটি—রবীন্দ্রনাথের গান ‘তোমায় নতুন করে পাবো বলে’, ‘তরী আমার হঠাৎ ডুবে যায়’, ‘কেন যামিনী না যেতে’ ইত্যাদি।

অতুলপ্রসাদের গানের মধ্যে রয়েছে ‘মিছে তুই ভাবিস রে মন’, ‘হৃদে জাগে শুধু বিষাদরাগিনী’, ‘আমারে ভেঙে ভেঙে করো’, ‘কি আর চাহিব বলো’ ইত্যাদি।

বেশ কিছু হিন্দি গান রেকর্ড করেছিলেন। যার মধ্যে ছিল—পণ্ডিত ইন্দ্র’র কথায়, জ্ঞান দত্তের সুরে ‘বালাম রে ইয়াদ করো’, পণ্ডিত ভূষণের কথায়, প্রতাপ মুখোপাধ্যায়ের সুরে ‘হামারি ছোটিসি দুনিয়া’, কে বি লালের কথায়, অশোক ঘোষের সুরে ‘দরশন দো গিরিধারী’ ইত্যাদি।

দিলীপকুমারের সঙ্গে একত্রে তিনি ‘কাকলী’ নাম দিয়ে অতুলপ্রসাদের গানের স্বরলিপি প্রকাশ করেন। সাহানা এককভাবে কিছু রবীন্দ্রসংগীতের স্বরলিপিও প্রকাশ করেন।

১৯২৬ সালে সাহানা শারীরিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েন। ১৯২৭ সালের জানুয়ারি মাসের মাঝামাঝি তিনি যান শান্তিনিকেতনে। প্রায় আড়াই মাস ছিলেন। পরে স্যানিটোরিয়ামে যান। তার এই যাত্রায় ট্রেনে কাশী পর্যন্ত তার সাথে ছিলেন রবীন্দ্রনাথ।

দিলীপকুমার ইতোমধ্যে শ্রী-অরবিন্দের ভক্তে পরিণত হয়েছেন। সাহানা আগে থেকেই শ্রী-অরবিন্দ সম্পর্কে জানতেন। দিলীপকুমারের সংস্পর্শে এসে শ্রী-অরবিন্দ সম্পর্কে তার জানা ও শ্রদ্ধার পরিধি দিন দিন আরও বাড়তে থাকে। দিলীপকুমারের চিন্তা-ভাবনায় তিনি প্রভাবিত হন। এবং শ্রী অরবিন্দের আশ্রমে বসবাসের সিদ্ধান্ত নেন।

সাহানা দেবীর আশ্রমে যাওয়া নিয়ে লেখক কবি শিল্পী শ্রী চিন্ময় লিখেছেন, ‘When Dilip-da joined the Sri Aurobindo Ashram, He inspired Sahana-di to do the same. By that time, She too had developed tremendous love devotion for Sri Aurobindo. Dilip-da And Shana-di both arrived at the Ashram on November 22nd, 1928.’

দিলীপকুমার সবসময় নিজস্ব নিয়মেই চলতেন। আশ্রমেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। গানের সাধনা উনি ওনার মতো করে চালিয়ে গেছেন। এক্ষেত্রে ওনার সার্বক্ষণিক সাথী ছিলেন সাহানা দেবী। কাজেই আশ্রমে থাকলেও সাহানা দেবীর সংগীত চর্চা অব্যাহত ছিল।

সাহানা দেবী ১৯৯০ সালের ৬ এপ্রিল ইহলোক ত্যাগ করেন। উনার বয়স তখন ৯০। তিনি রবীন্দ্রসংগীত ছাড়াও অনেক ধরনের গান গেয়েছেন। নিজেও গান-কবিতা লিখতেন। সুর করতেন। মামা দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ ছিলেন প্রখ্যাত রাজনীতিবিদ। খ্যাতিমান উকিল। তবে সংস্কৃতির প্রতি, গান-বাজনার প্রতি তার ভালোলাগার কথা সবার জানা। মামার লেখা গান ‘কেন ডাকো অমন করে, ওগো আমার প্রাণের হরি’ সাহানা দেবী অল্প বয়সেই সুর দিয়েছিলেন। গেয়েছিলেন। এজন্য মামা থেকে কানের দুল ও কণ্ঠহার পুরস্কার পেয়েছিলেন। সুর করার এই ধারা অব্যাহত ছিল। সাহানার লেখা কিছু কিছু গান ও কবিতা বিভিন্ন সময়ে ফণীন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায় সম্পাদিত ‘ভারতবর্ষ’ পত্রিকা, বিজয়চন্দ্র মজুমদার ও দীনেশচন্দ্র সেন সম্পাদিত ‘বঙ্গবাণী’ পত্রিকা, উপেন্দ্রনাথ সম্পাদিত ‘বিচিত্রা’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। অনেক গান স্বরলিপিসহ প্রকাশ করা হয়েছে।

সাহানা দেবীর অসাধারণ গায়কী, সংগীতের ওপর সামগ্রিক জ্ঞান, গানের জন্য দরদ, সর্বোপরি রবীন্দ্রনাথের গানে তার সাবলীল বিচরণে কবি মুগ্ধ হতেন। সাহানা দেবীর ডাক নাম ঝুনু। তিনি তখন পন্ডিচেরিতে। রবীন্দ্রনাথের থেকে নিজের লেখা চিঠির উত্তর পেলেন ১৯৩৮ সালের ৪ আগস্ট। চিঠির শেষের দুই স্তবকে সেই মুগ্ধতাই আলো ছড়িয়েছে—
কল্যাণীয়াসু,
তোমার ছবি সমেত তোমার চিঠিখানি পেয়ে খুব খুশি হয়েছি। ছবির আদিম দেহরূপিনীকে পেলে আরও খুশি হতুম। বোধহয় ঘটে উঠবে না, কারণ মেয়াদ সংকীর্ণ হয়ে এসেছে, তার ওপরে দেখতে দেখতে ভাঙন ধরেছে দেহে। সম্প্রতি ভাগ্যদেবী আমার চোখের মাথা খাবার ভয় দেখাচ্ছে। চিঠিপত্র পড়ায় পরের দৃষ্টি ব্যবহার করতে হচ্ছে। দৃষ্টিক্ষীণতা সবচেয়ে বড়ো কারাদণ্ড। নালিশ করে লাভ নাই। আপিলের আদালত বন্ধ।

হাসির গান পূর্বেই শুনেছি। ওর গলা মৃদু কিন্তু মধুর। ভয় হয় পাছে ওর নিজের গলার স্বাভাবিক দরদ কোনও শিক্ষিত ভঙ্গির দ্বারা আচ্ছন্ন হয়। যাদের গলায় সুরের বিধিদত্ত বিশেষত্ব আছে তাদের পক্ষে এটা লোকসান।

‘হে ক্ষণিকের অতিথি’ মন্টু সেদিন গেয়েছিল- সুরের মধ্যে কোনও পরিবর্তন ঘটায়নি। তার মধ্যে ও যে ধাক্কা লাগিয়েছিল সেটাতে গানের ভাবের চেয়ে ভঙ্গি প্রবল হয়ে উঠেছিল। দেখলুম শ্রোতাদের ভালো লাগলো। গানের প্রকাশ সম্বন্ধে গায়কের ব্যক্তিগত স্বাধীনতা অগত্যা মানতেই হবে—অর্থাৎ গানের দ্বারা গায়ক নিজের অনুমোদিত একটা বিশেষ ভাবের ব্যাখ্যা করে- সে ব্যাখ্যা রচয়িতার অন্তরের সঙ্গে না মিলতেও পারে- গায়ক তো গ্রামোফোন নয়।

তুমি যখন আমার গান করো শুনলে মনে হয় আমার গান রচনা সার্থক হয়েছে, সে গানে যতখানি আমি আছি ততখানি ঝুনুও আছে- এই মিলনের দ্বারা যে পূর্ণতা ঘটে সেটার জন্য রচয়িতার সাগ্রহ প্রতীক্ষা আছে।

আমি যদি সেকালের সম্রাট হতুম, তাহলে তোমাকে বন্দিনী করে আনতুম লড়াই করে। কেননা, তোমার কণ্ঠের জন্য আমার গানের একান্ত প্রয়োজন আছে। মন্টুকে আমি স্নেহ করি, তার প্রাণশক্তি ও মননশক্তিকে তারিফ করি। তাকে পাশে পেয়ে খুশি হয়েছি। 

ইতি

স্নেহাসক্ত

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

চলবে...

লেখক: গবেষক, প্রাবন্ধিক ও গীতিকবি

তথ্য সহায়তা
স্মৃতির খেয়ায়: সাহানা দেবী
Shana Devi, Stories by Chinmoy
srichinmoy-reflections.com
দিলীপকুমার গানে, প্রাণে ও প্রেমে: গোবিন্দগোপাল মুখোপাধ্যায়
‘তুমি যখন গাও, মনে হয় আমার রচনা সার্থক’
অভীক চট্টোপাধ্যায়। আনন্দবাজার

আরও:

পর্ব ১: অ্যাঞ্জেলিনা ইয়ার্ড থেকে সুপার স্টার গওহর জান হয়ে ওঠার ইতিহাস

পর্ব ২: শিল্পীদের আয়ের বিজ্ঞানসম্মত পথ খুলে দেয় গ্রামোফোন

পর্ব ৩: গান-বাণিজ্যে গওহর জান নায়িকা হলে, লালচাঁদ বড়াল নায়ক

পর্ব ৪: ‘সেকালের কলকাতার লোকেরা ছিলেন সংগীত-ছুট’

পর্ব ৫: রেকর্ডিং কোম্পানিগুলোর কাছে যোগ্য সম্মানি পাননি কে. মল্লিক

পর্ব ৬: অমলা দাশের কারণেই অনেক প্রতিভাবান শিল্পী এসেছিলেন

পর্ব ৭: প্রথম রেকর্ড হাতে পেয়ে ইন্দুবালা নিজেই ভেঙে ফেলেন!

পর্ব ৮: টাইটানিক থেকে ঢাকা, রেডিওর গপ্পো

পর্ব ৯: দৃষ্টি হারিয়েও সেই যুগের শ্রেষ্ঠ গায়ক কৃষ্ণচন্দ্র দে

পর্ব ১০: আঙ্গুরবালা দেবীর গান গাইতে প্রতিমা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো শিল্পী ভয় পেতেন

পর্ব ১১: ভারতে গীতিকার হিসেবে প্রথম সম্মানী পেয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ 

/এমএম/এমওএফ/
সম্পর্কিত
পংকজের কণ্ঠ-সুর: কবিগুরু থেকে মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত বিস্তৃত
গানের শিল্পী, গ্রামোফোন, ক্যাসেট ও অন্যান্য: পর্ব ১৪ (গ)পংকজের কণ্ঠ-সুর: কবিগুরু থেকে মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত বিস্তৃত
পংকজ-রাইচাঁদ জুটি: বাংলা ও হিন্দি সিনেমায় প্লে-ব্যাক শুরুর ইতিহাস
গানের শিল্পী, গ্রামোফোন, ক্যাসেট ও অন্যান্য: পর্ব ১৪ (খ)পংকজ-রাইচাঁদ জুটি: বাংলা ও হিন্দি সিনেমায় প্লে-ব্যাক শুরুর ইতিহাস
পংকজ মল্লিক: বাড়ি বাড়ি টিউশনি থেকে বেতার-সিনেমা ও রেকর্ডিংয়ে অবদান
গানের শিল্পী, গ্রামোফোন, ক্যাসেট ও অন্যান্য: পর্ব ১৪ (ক)পংকজ মল্লিক: বাড়ি বাড়ি টিউশনি থেকে বেতার-সিনেমা ও রেকর্ডিংয়ে অবদান
রবীন্দ্রনাথের পরে দিলীপকুমারের ওপরেই দাবি ছিল সর্বাধিক
গানের শিল্পী, গ্রামোফোন, ক্যাসেট ও অন্যান্য: পর্ব ১৩রবীন্দ্রনাথের পরে দিলীপকুমারের ওপরেই দাবি ছিল সর্বাধিক
বিনোদন বিভাগের সর্বশেষ
‘১৮ বছর হলে মেয়েকে এমন একটা সিঙ্গেল ট্রিপে পাঠাবো’
৫০ পর্বে মামানামা- আউট অব দ্য বক্স‘১৮ বছর হলে মেয়েকে এমন একটা সিঙ্গেল ট্রিপে পাঠাবো’
নয়তো নেপথ্যে চলে যাবো: আফজাল হোসেন
মুখোমুখিনয়তো নেপথ্যে চলে যাবো: আফজাল হোসেন
পংকজের কণ্ঠ-সুর: কবিগুরু থেকে মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত বিস্তৃত
গানের শিল্পী, গ্রামোফোন, ক্যাসেট ও অন্যান্য: পর্ব ১৪ (গ)পংকজের কণ্ঠ-সুর: কবিগুরু থেকে মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত বিস্তৃত
আজ অব্দি শাকিব খানের কাছ থেকে আর্থিক সহায়তা নিইনি: বুবলী
আজ অব্দি শাকিব খানের কাছ থেকে আর্থিক সহায়তা নিইনি: বুবলী
শাকিব-অপুর সংসার নিয়ে মুখ খুললেন বুবলী (ভিডিও)
শাকিব-অপুর সংসার নিয়ে মুখ খুললেন বুবলী (ভিডিও)