পারস্য উপসাগরকে এরই মধ্যে কার্যত অবরুদ্ধ করে ফেলেছে ইরান। জ্বালানি সরবরাহের জন্য বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এই সামুদ্রিক পথটি এখন তেহরানের নিয়ন্ত্রণে। তবে ইরানের শত্রুপক্ষ এখনও লোহিত সাগর ব্যবহার করে বিকল্প পথে পারস্য উপসাগরীয় সংকট এড়ানোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু সেই স্বস্তিও ফুরিয়ে আসতে পারে, যদি ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীরা এই লড়াইয়ে সরাসরি জড়িয়ে পড়ে। মার্কিন সংবাদমাধ্যম ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল এ খবর জানিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও মধ্যপ্রাচ্যে তাদের মিত্ররা এখন তীক্ষ্ণ নজর রাখছে ইয়েমেনের এই সশস্ত্র গোষ্ঠীর ওপর। ইরানের অর্থ ও অস্ত্রে পুষ্ট হুথিরা গত দুই বছরের বড় একটা সময় লোহিত সাগরে জাহাজ চলাচল স্থবির করে দিয়েছিল। সম্প্রতি তারা আবারও যে ধরনের কড়া হুঁশিয়ারি দিচ্ছে, তা বিশ্বনেতাদের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে।
থিংক ট্যাংক প্রতিষ্ঠান নিউ আমেরিকা’র বিশেষজ্ঞ অ্যাডাম ব্যারন বলেন, ‘যদি হুথিরা এই যুদ্ধে যোগ দেয়, তবে পরিস্থিতির ভয়াবহতা অনেক বেড়ে যাবে। এর ফলে সুয়েজ খাল এবং মিসর যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হবে, তেমনি সৌদি আরবও এই সংকটে আরও গভীরভাবে জড়িয়ে পড়বে।’
‘আঙুল এখন ট্রিগারে’
ইরান দীর্ঘদিন ধরে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে লেবাননের হিজবুল্লাহ এবং ইরাকের সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে নিজেদের ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে আসছে। গাজা যুদ্ধকে কেন্দ্র করে হিজবুল্লাহ ও ইরাকি গোষ্ঠীগুলো এরই মধ্যে ইসরায়েল ও মার্কিন ঘাঁটিতে হামলা শুরু করেছে। হুথিরা এখন পর্যন্ত বড় কোনও পদক্ষেপ না নিলেও তারা যেকোনও মুহূর্তে ঝাঁপিয়ে পড়ার সংকেত দিচ্ছে।
হুথি নেতা মোহাম্মদ আল-বুখাইতি গত সপ্তাহে বলেছিলেন, ‘আমাদের আঙুল এখন ট্রিগারে। যুদ্ধে ইয়েমেনের যোগ দেওয়া এখন শুধু সময়ের ব্যাপার মাত্র।’
এক সময় কেবল ‘স্যান্ডেল পরা পাহাড়ি যোদ্ধা’ বলে অবজ্ঞার শিকার হওয়া হুথিরা এখন এক দুর্ধর্ষ বাহিনী। এক দশকের গৃহযুদ্ধে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের নেতৃত্বাধীন জোটকে মোকাবিলা করে তারা ইয়েমেনের রাজধানীসহ জনবহুল এলাকাগুলো নিজেদের দখলে রেখেছে। গাজা যুদ্ধের সময় লোহিত সাগরে তাদের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় সুয়েজ খাল দিয়ে জাহাজ চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। বাধ্য হয়ে জাহাজগুলোকে আফ্রিকার উত্তমাশা অন্তরীপ ঘুরে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হয়েছিল।
লোহিত সাগরের কৌশলগত গুরুত্ব
ইরান বর্তমানে হরমুজ প্রণালি নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে পারস্য উপসাগর থেকে তেলের সরবরাহ আটকে দিচ্ছে। এর বিকল্প হিসেবে সৌদি আরব তাদের পাইপলাইনের মাধ্যমে মরুভূমি পাড়ি দিয়ে লোহিত সাগরের ইয়ানবু বন্দরে অপরিশোধিত তেল পাঠাচ্ছে। কিন্তু এই পথটিও নিরাপদ নয়। কারণ, জাহাজগুলোকে শত শত মাইল হুথি-নিয়ন্ত্রিত উপকূল রেখা ঘেঁষে চলতে হয় এবং বাব আল-মান্দেব নামক সংকীর্ণ জলপথ পাড়ি দিতে হয়।
অ্যাডাম ব্যারনের মতে, ‘ইরান যদি লোহিত সাগরের জাহাজ চলাচল বন্ধ করে দিয়ে চাপ সৃষ্টি করতে চায়, তবে হুথিরাই তাদের জন্য সবচেয়ে সহজ মাধ্যম।’
সৌদি ও মার্কিন সতর্কতা
সৌদি আরবের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ২০২২ সালে হুথিদের সঙ্গে তাদের একটি অলিখিত চুক্তি হয়েছে যে তারা একে অপরের ভূখণ্ড বা জাহাজে হামলা চালাবে না। বর্তমানে সৌদি আরব কূটনীতির মাধ্যমে হুথিদের এই যুদ্ধ থেকে দূরে রাখার চেষ্টা করছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলও চাইছে না এমন কোনও উসকানি দিতে, যাতে হুথিরা সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে পরিস্থিতি আরও জটিল করে তোলে।
তবে বাইডেন প্রশাসনের সাবেক কর্মকর্তা বারবারা লিফ মনে করেন, হুথিরা ইরাকের সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর মতো পুরোপুরি তেহরানের নির্দেশে চলে না। তাদের নিজস্ব অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও জনসমর্থনের বিষয় রয়েছে। ইয়েমেনের সাধারণ মানুষ হুথিদের গাজার পক্ষে লড়াই করাকে সমর্থন দিলেও, ইরানের স্বার্থে আরব দেশগুলোর ওপর হামলা চালানোকে তারা ভালোভাবে নাও নিতে পারে।
‘জিরো আওয়ার’-এর অপেক্ষা?
গত বছর মার্কিন হামলায় হুথিদের সামরিক অবকাঠামো ও বেশ কয়েকজন নেতা নিহত হয়েছিলেন। কিন্তু তেহরান যদি অস্তিত্বের সংকটে পড়ে, তবে তারা হুথিদের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে। গত মার্চে হুথি নেতা আবদুল মালিক আল-হুথি বলেছিলেন, তার যোদ্ধারা ইরানের পাশে আছে এবং প্রয়োজনে যুদ্ধের মাত্রা বাড়াতে প্রস্তুত।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক নিরাপত্তা বিশ্লেষক মোহাম্মদ আল-বাশা বলেন, ‘অনেকের ধারণা, হুথিরা ইচ্ছা করেই দেরি করছে। তারা হয়তো একদম শেষ মুহূর্তের বা জিরো আওয়ার-এর জন্য অপেক্ষা করছে, যাতে একে আলোচনার টেবিলে ট্রাম্প কার্ড হিসেবে ব্যবহার করা যায়।’







