যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ‘গৌরবময় বিজয়’ উদযাপন করছে ইরানের গণমাধ্যমগুলো। একই সময়ে এই সপ্তাহে স্বাক্ষরিত অন্তর্বর্তী শান্তি চুক্তির সুযোগ কাজে লাগিয়ে দ্রুত তেল রফতানি বাড়ানোর চেষ্টা করছে তেহরান। পাশাপাশি লেবাননে ইসরায়েলি হামলা বন্ধেরও উদ্যোগ নিচ্ছে দেশটি।
তবে যুদ্ধের ধাক্কায় ইসলামি প্রজাতন্ত্রটি নিজেও বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছে। যুদ্ধের পর দেশটির অর্থনীতি বিপর্যস্ত অবস্থায় রয়েছে। জানুয়ারিতে দেশজুড়ে বিক্ষোভে কেঁপে ওঠে ইরান। এছাড়া দেশটির সর্বোচ্চ নেতা এখনও জনসমক্ষে আসেননি। এর মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নতুন করে পারমাণবিক আলোচনায় প্রবেশ করছে তেহরান।
অন্তর্বর্তী চুক্তির মাধ্যমে ইরান নিষেধাজ্ঞা শিথিল হওয়ার সুযোগ পাচ্ছে। তবে এর বড় অংশই নির্ভর করছে দেশটির পারমাণবিক কর্মসূচি সীমিত করার ওপর, যার মধ্যে উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত কমানোর বিষয়ও রয়েছে। এই ছাড় নিয়ে ইরানের কট্টরপন্থিদের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র পুরোপুরি ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বন্ধের দাবি জানিয়ে আসছে, যা তেহরান দীর্ঘদিন ধরে প্রত্যাখ্যান করে আসছে।
জেনেভা গ্র্যাজুয়েট ইনস্টিটিউটের ইরান বিশেষজ্ঞ ফরজান সাবেত বলেন, ইরান বিজয়ী হয়ে বেরিয়েছে বলা অতিরঞ্জন হবে, তবে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারতো। ইরানের প্রকৃত বিজয় হলো টিকে থাকা।
চুক্তির আর্থিক সুবিধার আশা
অন্তর্বর্তী চুক্তির আওতায় যুক্তরাষ্ট্র ইরানি অপরিশোধিত তেল রফতানির অনুমতি দিতে সম্মত হয়েছে। লয়েডস লিস্ট ইন্টেলিজেন্সের তথ্য অনুযায়ী, মার্কিন অবরোধ শিথিল হওয়ার পর অন্তত তিনটি রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ইরানি তেলবাহী জাহাজ ইতোমধ্যে যাত্রা শুরু করেছে।
ট্যাংকারট্র্যাকার্স ডটকম জানিয়েছে, গত পাঁচ দিনে ইরান প্রায় ১ কোটি ৮০ লাখ ব্যারেল তেল রফতানি করেছে, যার মূল্য প্রায় ১৪৪ কোটি ডলার।
পারস্য উপসাগরে অবস্থিত ইরানের প্রধান রফতানি টার্মিনাল খার্গ দ্বীপ থেকে আরও কয়েক ডজন তেলবাহী জাহাজ শিগগিরই যাত্রা করতে পারে। এতে বিশ্ববাজারে তেলের দাম আরও কমার সম্ভাবনা রয়েছে।
চুক্তির পর থেকে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ১১০ ডলারের বেশি থেকে নেমে প্রায় ৮০ ডলারে এসেছে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রে পেট্রোলের গড় মূল্যও প্রতি গ্যালন ৪ ডলারের নিচে নেমে গেছে।
দীর্ঘদিনের নিষেধাজ্ঞার কারণে ইরানকে ছায়া নৌবহরের মাধ্যমে বাজারদরের চেয়ে কম দামে, প্রধানত চীনের কাছে তেল বিক্রি করতে হয়েছে। এখন দেশটি নতুন ক্রেতা খুঁজে আরও ভালো দাম পাওয়ার সুযোগ পাচ্ছে।
অর্থনৈতিক সংকটের চাপ
দীর্ঘ সময়ের ইন্টারনেট বন্ধ তুলে নেওয়ার পর অনেক ইরানি সামাজিক মাধ্যমে খালি ফ্রিজের ছবি প্রকাশ করেছেন। মাংসসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম অনেক পরিবারের নাগালের বাইরে চলে গেছে। ২০১৫ সালের পারমাণবিক চুক্তির সময় যেখানে এক ডলারের বিপরীতে ৩২ হাজার রিয়াল পাওয়া যেত, বর্তমানে সেই হার ১৫ লাখ রিয়ালেরও বেশি।
ওয়াশিংটন ইনস্টিটিউট ফর নিয়ার ইস্ট পলিসির জ্যেষ্ঠ ফেলো হলি ড্যাগ্রেস বলেন, সংঘাতের কারণে অন্তত ১০ লাখ মানুষের চাকরি হারানোর আশঙ্কা রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ২০ শতাংশ ক্ষতি ইন্টারনেট বন্ধের সঙ্গে সম্পর্কিত।
রিয়ালের অবমূল্যায়ন জানুয়ারির দেশব্যাপী বিক্ষোভের অন্যতম কারণ হয়ে ওঠে। সেই বিক্ষোভ দমনে নিরাপত্তা বাহিনীর কঠোর পদক্ষেপে হাজারো মানুষ নিহত হয়।
লেবানন ও পারমাণবিক ইস্যুতে অনিশ্চয়তা
লেবাননের পরিস্থিতি ইতোমধ্যেই চুক্তির জন্য ঝুঁকি তৈরি করেছে। ইসরায়েল ও ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহর মধ্যে সংঘর্ষ বাড়ায় শুক্রবার সুইজারল্যান্ডে নির্ধারিত আলোচনা স্থগিত করা হয়েছে।
ইসরায়েল জানিয়েছে, হিজবুল্লাহ হুমকি হিসেবে থাকলে তারা দক্ষিণ লেবাননের বিস্তীর্ণ এলাকায় অবস্থান অব্যাহত রাখবে। অন্যদিকে হিজবুল্লাহ বলেছে, ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহার ছাড়া তারা হামলা বন্ধ করবে না, যদিও শুক্রবার উভয় পক্ষ শত্রুতা বন্ধে সম্মত হয়েছে।
ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের অন্তর্বর্তী চুক্তিতে উভয় পক্ষকে সামরিক অভিযান বন্ধ এবং লেবাননের আঞ্চলিক অখণ্ডতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার আহ্বান জানানো হয়েছে। তবে চুক্তিতে ইসরায়েল বা হিজবুল্লাহ স্বাক্ষর করেনি।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি বলেছেন, লেবাননের যুদ্ধের অবসান সামগ্রিক যুদ্ধের সমাপ্তির অবিচ্ছেদ্য অংশ। আর যুদ্ধের অবসান মানে দখলদারিত্বেরও অবসান।
এদিকে পারমাণবিক আলোচনায় ইরান তার ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি এবং হিজবুল্লাহসহ বিভিন্ন গোষ্ঠীর প্রতি সমর্থনের বিষয়টি আলোচনার বাইরে রাখতে সক্ষম হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। তবে উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম কমানোর বিষয়ে সম্মতি দেওয়ায় কট্টরপন্থি মহল ক্ষুব্ধ। কট্টরপন্থি ঘনিষ্ঠ সংবাদমাধ্যম রাজা নিউজের দাবি, এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে ইরান তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চাপ প্রয়োগের হাতিয়ার ছেড়ে দিয়েছে।
ফরজান সাবেতের মতে, পারমাণবিক ইস্যুতে পরবর্তী দফার আলোচনার সাফল্য নিয়ে আশাবাদী হওয়ার সুযোগ কম। তার ভাষায়, এ মুহূর্তে আমার কাছে স্পষ্ট নয় যে এসব আলোচনা অন্তত এ বছর উল্লেখযোগ্য কোনও অগ্রগতি অর্জন করতে পারবে।
সূত্র: এপি

ইরান একেবারে শেষ, ট্রাম্পের দাবি
যুদ্ধবিরতির পরদিনই লেবাননে ইসরায়েলি হামলায় নিহত ১৬







