X
শুক্রবার, ২৩ এপ্রিল ২০২১, ১০ বৈশাখ ১৪২৮

সেকশনস

চারদিকে রাজাকার!

আপডেট : ২৬ ডিসেম্বর ২০১৯, ১৪:১১

শান্তনু চৌধুরী দেশের প্রতি যাদের অকৃত্রিম ভালোবাসা রয়েছে বা যারা উপলব্ধি করতে পারেন কতটা ত্যাগের বিনিময়ে এই দেশ, এই পতাকা এসেছে; তারা স্বভাবতই ডিসেম্বর মাস এলে একটু গর্ব অনুভব করেন। নিজেকে বিজয়ী ভাবতেই ভালোবাসেন। আর তা ভাববেন নাই বা কেন? এই মাসেই অর্জিত হয়েছে আমাদের চূড়ান্ত বিজয়। কিন্তু স্বাধীনতার ৪৮ বছর পর এসেও আজ আমাদের অর্জন কিছুটা ম্লান। যারা জীবন বাজি রেখে যুদ্ধ করেছেন, দেশের জন্য যারা স্বজন হারিয়েছেন, তারা আজ ব্যথাভারাতুর। সম্ভবত স্বাধীনতার পর প্রতিটি বছরই আমরা স্বাধীনতার মানেটা খুঁজতে চেয়েছি, দেশ কতটা এগিয়েছে, সেটি দেখতে চেয়েছি। সেই চাওয়ার মাঝে আরও একটি বিষয় বারবার এসেছে। সেটি হলো, একজন মহান মুক্তিযোদ্ধা বা তার পরিবারকে আমরা কতটা সম্মান দেখাতে পেরেছি। এক কথায় বলতে গেলে সেটি আমরা পারিনি এবং আদৌ পারবো বলে মনে হয় না।
এই যে আমাদের ব্যর্থতা সেটি অভিমান করে বুঝিয়ে দেন অনেক মুক্তিযোদ্ধা। যারা মারা যাওয়ার পর চান না রাষ্ট্রীয় সম্মাননা। দিনাজপুরের অভিমানী মুক্তিযোদ্ধা ইসমাইল  হোসেন তাই নেননি সম্মাননা। পঞ্চগড়ের আটোয়ারী উপজেলার কাটালী মীরপাড়া গ্রামের মুক্তিযোদ্ধা সলিমউদ্দিন জেলা প্রশাসককে জানিয়ে দেন, মৃত্যুর পর রাষ্ট্রীয় সম্মাননা চান না তিনি। এই যে তার অভিমান, সেটি কি আমরা কখনো বুঝতে চেষ্টা করেছি? আমরা বলছি, দেশ এগিয়েছে, কিন্তু সেটা শুধু সূচকে। সার্বিকভাবে সম্মান নিয়ে যতটা এগুনোর কথা, তা এগিয়েছে বলে মনে হয় না। কারণ ঘুষ দুর্নীতি কমেনি, মানুষ স্বভাবজাতভাবে ভালো হয়ে ওঠেনি। আর ফাঁসি দিয়ে যতই মানবতাবিরোধী অপরাধী, রাজাকারদের বিচার হোক না কেন, কমেনি নব্য রাজাকারের সংখ্যা। চারদিকে বাড়ছে তাদের সংখ্যা। যারা মুখোশ পরে আছে, সুযোগ পেলেই ছোবল মারবে তারা। 

কয়েকটি সাম্প্রতিক ঘটনার উল্লেখ করি। ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা পরিষদ আয়োজিত বিজয় দিবস উপলক্ষে আলোচনা সভা ও মুক্তিযোদ্ধাদের সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের মুখোশ পরে হামলা চালায় এই নব্য রাজাকাররা। এ সময় তারা বঙ্গবন্ধু ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছবি ছিঁড়ে ফেলে। ভাঙচুর করা হয় সভার চেয়ার, টেবিল ও স্টেজ। এটি এমন দিনে নব্য রাজাকাররা ঘটিয়েছে, যেদিন ছিল বিজয় দিবস। আরও একটি ঘটনা ঘটেছে রংপুরে। সেখানে বিজয় দিবসে দেওয়া ফুল ছিঁড়ে তছনছ করে ফেলা হয়। এই ঘটনাগুলো যতটা ছোট বা বিক্ষিপ্ত মনে হচ্ছে, বাস্তবে ততটা ছোট নয়। সেটা যে নয়, তার প্রমাণ যেমন মিলেছে, মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা প্রকাশের ক্ষেত্রে। এমনিতে মুক্তিযোদ্ধারা পথে ঘাটে নানা কারণে লাঞ্ছনা বা অপমানের শিকার হন। তবে, এবারের তালিকা প্রকাশের পর তারা যেভাবে রাষ্ট্রের হাতে অপমানিত হয়েছেন, সেটা বোধহয় মৃত্যু পর্যন্ত মনে থাকবে। যদিও সরকার প্রধান তাদের অন্তরের সেই আকুতিটা বুঝতে পেরেছিলেন বলে মুক্তিযোদ্ধাদের অপমানকারীদের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে তালিকাটি বাদ দিয়েছেন।

এমন অনেক ঘটনা, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বক্তব্য বা মূল ধারার গণমাধ্যম হোক বা কোনও একটি বিশেষ গোষ্ঠীর হোক মুখপত্র ‘সংগ্রাম’ একজন চিহ্নিত রাজাকারকে ‘শহীদ’ বলার মধ্য দিয়ে হোক, এই দেশ যে এখনও রাজাকারমুক্ত হয়নি বা প্রতিনিয়ত নতুন করে রাজাকার জন্ম নিচ্ছে, সেটাই বুঝিয়ে দিচ্ছে বা বুঝতে হচ্ছে। গেলো বছরের কোটাবিরোধী আন্দোলনের কথাই যদি ধরি, একজন ছাত্র বুকের মধ্যে ‘আমি রাজাকার’ কথাটি ধারণ করে সগর্বে দাঁড়িয়ে ছিলেন। জাতির জন্য কতটা লজ্জার ছিল সেটি! কতটা অপমানের ছিল মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য, যারা এখনও বেঁচে আছেন। স্বাধীন দেশে রাজাকারদের আস্ফালন। এই প্রসঙ্গে বলে নেই, মুক্তিযুদ্ধের সময় থেকে এখন পর্যন্ত এদেশের মুক্তিকামী মানুষের কাছে ‘রাজাকার’ ঘৃণিত শব্দ হিসেবে পরিচিত। যদিও ফার্সি এই শব্দের আভিধানিক অর্থ স্বেচ্ছাসেবী। ১৯৭১ সালে এই শব্দটির সঙ্গে বাংলাদেশের মানুষের পরিচয় হয়। ওই সময় পাকিস্তানি সেনাবাহিনীকে সহায়তার জন্য খুলনার খান জাহান আলী রোডের একটি আনসার ক্যাম্পে ৯৬ জন পাকিস্তানপন্থী ব্যক্তিকে নিয়ে রাজাকার বাহিনী গঠন করা হয়। এরপর দেশের বিভিন্ন জায়গায় এ বাহিনীর সদস্য সংগ্রহ করা হয়। রাজাকার বাহিনী গঠনের পেছনে সবচেয়ে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছিলেন জামায়াতের তৎকালীন নেতা এ কে এম ইউসুফ। মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় তাকে গ্রেফতার করা হয়েছিল। পরে কারাগারেই তার মৃত্যু হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের প্রথম দিকে রাজাকার বাহিনী ছিল শান্তি কমিটির আওতাধীন। ১৯৭১ সালে রাজাকার বাহিনীতে প্রয় ৫০ হাজার সদস্য ছিল, যারা মাসিক ভাতা পেতো। রাজাকার বাহিনীর সদস্যরা পাকিস্তানি সৈন্যদের সঙ্গে যুদ্ধে অংশ নিতো, মুক্তিযোদ্ধাদের ধরতো, হত্যা করতো বা পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর হাতে তুলে দিতো। বিশেষ করে এলাকায় এলাকায় তারা নারীদের ধরে ধরে অত্যাচার করতো এবং পাকিস্তানি সেনাদের দিয়ে পাশবিক নির্যাতন চালাতো। সেই রাজাকারের প্রেতাত্মা কিন্তু এখনও রয়ে গেছে। দেশের বিভিন্ন জায়গায় আটকেপড়া পাকিস্তানিরা রয়েছে। বিহারীরা রয়েছে। সংবাদ মাধ্যমে দেখলাম, সৈয়দপুরের বিস্তীর্ণ এলাকায় এখনও উর্দু ভাষা চলে। ঢাকার মিরপুরেও একই চিত্র। সবচেয়ে শঙ্কার বিষয় যেটি তা হলো, প্রশাসনে, ক্ষমতাসীনদের মধ্যে তাদের শক্ত অবস্থান রয়েছে। সেটি দিনে দিনে বাড়ছে। বিষয়টি উপলব্ধি করতে পেরেই হয়তো প্রাজ্ঞ সাংবাদিক, ভাষাসৈনিক আবদুল গাফফার চৌধুরী বলেছেন, ‘আওয়ামী লীগের ভেতরে জামায়াতের লোকও আছে। আওয়ামী লীগের ভেতর রাজাকার আছে। বিপদের সময় এরা ভয়ানকভাবে আসে। রাজাকারদের লিস্ট করার আগে এই রাজাকারদের তালিকা প্রকাশ করা উচিত।’

আমরা কথায় বলি, আজকের তারুণ্যই আগামীর সম্ভাবনা। কিন্তু এই যে তরুণ বলি বা ক্ষমতাসীনদের ছত্রছায়ায় থাকা অনেকের মধ্যে এখন দেশপ্রেমহীনতা গড়ে উঠছে। এর জন্য কিন্তু রাষ্ট্র ক্ষমতায় যারা ছিলেন বা আছেন, তারাও কম দায়ী নয়। এই যে, মুঠোফোনে বুঁদ হয়ে থাকা একটি প্রজন্ম গড়ে উঠছে, যারা জেনে বা না জেনে বুক চিতিয়ে বলে দিচ্ছে ‘আমি রাজাকার’, ‘বহুব্রীহি’ নাটকের টিয়া পাখির মুখের সেই ঘৃণিত সংলাপ ‘তুই রাজাকার’ কথাটিকে যারা ভাবছে নিছক সংলাপ, তাদের সেই মানসিকতার দায়ও কিন্তু রাষ্ট্রের। স্বাধীনতার ৪৮ বছর পরও রাষ্ট্র তাকে সেই সভ্য নাগরিক হিসেবে গড়ে ওঠার সুযোগ করে দিতে পারেনি। পারেনি তাকে এমন কোনও সুবিধা দিতে যাতে তার দেশপ্রেম জেগে ওঠে সেই ছেলেবেলা থেকে। তাহলে শহীদ বেদিতে জুতা পায়ে শ্রদ্ধা জানাতে আসা তরুণ বলতেন না, তার ‘সোনার বাংলা’ মুখে আনতে লজ্জা লাগে। সেই লজ্জা পুরো বাংলাদেশের। আবার এইসব ঘৃণিত রাজাকারদের মুখে আমরা ঘৃণা করলেও দেখা যায়, ক্ষমতায় যেতে তাদেরই খুঁজছি। ক্ষমতাসীনদের সেই খোঁজাখুঁজির কারণে আজও আমাদের খুঁজে ফিরতে হয় স্বাধীনতার মানে। আজও ৭১-এ স্বজন হারানো স্বজনদের চোখ ভিজে যায় অপমান যন্ত্রণায়। আজও নব্য রাজাকার প্ল্যাকার্ড হাতে গর্জে ওঠে। তাই দেশপ্রেমের মন্ত্রে দীক্ষিত করার দায়িত্বটা নিতে হবে পরিবার থেকে শুরু করে রাষ্ট্রকেও। শুধু নির্দিষ্ট দিবসে বাতি জ্বেলে ফেসবুকে পোস্ট নয়, পূর্ব প্রজন্মের মর্যাদা তুলে ধরতে হবে উত্তর প্রজন্মের কাছে। বোঝাতে হবে দাম দিয়ে কেনা এই বাংলা। কারও দয়ায় পাওয়া নয়। আবার কারও আস্ফালনে সেটি যেন শশ্মান না হয়ে যায় তা খেয়াল রাখতে হবে রাষ্ট্রকেই।

লেখক: সাংবাদিক ও সাহিত্যিক  

  

/এসএএস/এমএনএইচ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

সম্পর্কিত

কিশোরদের সামনে আদর্শ কারা?

কিশোরদের সামনে আদর্শ কারা?

‘এক ওসি কারাগারে, শত ওসি থানার পরে’

‘এক ওসি কারাগারে, শত ওসি থানার পরে’

আহারে ঈদ!

আহারে ঈদ!

যে-ই পারছে, সাংবাদিক মারছে!

যে-ই পারছে, সাংবাদিক মারছে!

শহর ছাড়ি, গ্রামে ফিরি!

শহর ছাড়ি, গ্রামে ফিরি!

সর্বশেষ

বাংলাদেশের নাগরিকত্ব পেয়েও ভাগ্য ঝুলে আছে কিংসলের!

বাংলাদেশের নাগরিকত্ব পেয়েও ভাগ্য ঝুলে আছে কিংসলের!

ভোটের হারে উচ্ছ্বসিত বিজেপি, দুইশ’ পারের আশা নেতাদের

ভোটের হারে উচ্ছ্বসিত বিজেপি, দুইশ’ পারের আশা নেতাদের

টাইমস হায়ার এডুকেশন র‍্যাংকিংয়ে সপ্তম স্থানে ডিআইইউ

টাইমস হায়ার এডুকেশন র‍্যাংকিংয়ে সপ্তম স্থানে ডিআইইউ

মুসা ম্যানশন সিলগালা, সকল রাসায়নিক দ্রব্য অপসারণ

মুসা ম্যানশন সিলগালা, সকল রাসায়নিক দ্রব্য অপসারণ

বাঁশখালীতে শ্রমিক হত্যার বিচার দাবিতে শাহবাগে সমাবেশ

বাঁশখালীতে শ্রমিক হত্যার বিচার দাবিতে শাহবাগে সমাবেশ

শিথিল হচ্ছে লকডাউন চলবে গণপরিবহন

শিথিল হচ্ছে লকডাউন চলবে গণপরিবহন

আগে ম্যাচ বাঁচানো, পরে জয়ের চিন্তা মুমিনুলদের

আগে ম্যাচ বাঁচানো, পরে জয়ের চিন্তা মুমিনুলদের

এ বছর চালের উৎপাদন বাড়াতে আমরা আপ্রাণ চেষ্টা করেছি: কৃষিমন্ত্রী

এ বছর চালের উৎপাদন বাড়াতে আমরা আপ্রাণ চেষ্টা করেছি: কৃষিমন্ত্রী

করোনায় মারা গেলেন ডুয়েটের ডেপুটি রেজিস্ট্রার

করোনায় মারা গেলেন ডুয়েটের ডেপুটি রেজিস্ট্রার

ফাইজারের সঙ্গে বিশ্বের বৃহত্তম ভ্যাকসিন চুক্তি করবে ইইউ

ফাইজারের সঙ্গে বিশ্বের বৃহত্তম ভ্যাকসিন চুক্তি করবে ইইউ

শ্রীলঙ্কা-বাংলাদেশ টেস্টের মাঝেই করোনায় আক্রান্ত একজন

শ্রীলঙ্কা-বাংলাদেশ টেস্টের মাঝেই করোনায় আক্রান্ত একজন

স্ত্রী-শ্যালিকাকে হত্যার পর নিজেই করলেন আত্মহত্যা!

স্ত্রী-শ্যালিকাকে হত্যার পর নিজেই করলেন আত্মহত্যা!

সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ

Bangla Tribune is one of the most revered online newspapers in Bangladesh, due to its reputation of neutral coverage and incisive analysis.
© 2021 Bangla Tribune