সেকশনস

‘ও আমার বাংলা মা তোর...’

আপডেট : ২৫ অক্টোবর ২০২০, ১৫:১৭

প্রভাষ আমিন জাতীয় প্রেসক্লাবের কোনও এসএমএস এলেই চমকে যাই–কোনও শোক সংবাদ নয় তো! আজ রাতে এসএমএস এলো প্রবীণ সাংবাদিক এইউএম ফখরুদ্দীন (৭৫) করোনা আক্রান্ত হয়ে ইন্তেকাল করেছেন। আমার সীমাবদ্ধতা এই নামের কোনও সাংবাদিককে চিনতাম না। তাই খারাপ লাগলেও শোকাচ্ছন্ন হইনি। ফেসবুকে অল্প কয়েকজন স্ট্যাটাস দিয়েছেন, সঙ্গে একটাই ছবি। খুঁটিয়ে দেখেও চিনতে পারলাম না। কেউ কেউ পরিচয় দিতে গিয়ে লিখেছেন, উইমেন জার্নালিস্টস ফোরামের সভাপতি মমতাজ বিলকিস আপার স্বামী ফখরুদ্দীন ভাই আর নেই। কোনও নৈকট্য খুঁজে বের করতে না পারায় প্রায় ভুলেই গেলাম। নানা কাজ শেষে বাসায় ফিরে ফেসবুকে পিআইবির মহাপরিচালক ও চলমান আর্কাইভ জাফর ওয়াজেদ ভাইয়ের স্ট্যাটাস দেখে প্রথম ধাক্কা খেলাম, ‘‘ও আমার বাংলা মাগো…’ গানের স্রষ্টা সাংবাদিক আবুল ওমরাহ মুহম্মদ ফখরুদ্দিন আর নেই। চলে গেলেন শনিবার রাতে পরপারে।” এবার তার মৃত্যুসংবাদে গভীর শোক এবং গ্লানিতে আচ্ছন্ন হলাম। আমার মতো না জানার গ্লানি দেখলাম কবিবন্ধু রাজু আলাউদ্দিনের স্ট্যাটাসেও।

 ‘ও আমার বাংলা মা তোর/আকুল করা রূপের সুধায়/হৃদয় আমার যায় জুড়িয়ে...’ এমন অসাধারণ দেশের গান যিনি লিখেছেন; তিনি কোন ক্লাবের সদস্য বা কার স্বামী; তাতে কিছু যায় আসে না। তার মৃত‌্যুই একটা গভীর শোকের সংবাদ। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলো, ফেসবুকে হাতেগোনা কয়েকটি স্ট্যাটাস ছাড়া আর কোথাও কোনও শোক নেই। কোনও গণমাধ্যমে কোনও খবর নেই। এই সম্মিলিত নির্লিপ্ততা আমার গ্লানি আরও বাড়িয়েছে কেবল। 

‘আবুল ওমরাহ মুহম্মদ ফখরুদ্দীন’ লিখে গুগল সার্চ দিয়ে আলাদা কিছু পেলাম না। সুরকার আলাউদ্দিন আলীকে নিয়ে কয়েকটি লেখায় তার নামের উল্লেখ পেলাম। যতটুকু জানলাম, তিনি একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছেন। মুক্তিযুদ্ধের সময়ই তিনি এই কবিতাটি লেখেন, যাতে বাংলার ষড়ঋতুর রূপবৈচিত্র‌্য ফুটিয়ে তুলেছেন অসাধারণ শৈল্পিক দক্ষতায়। বুকে কী গভীর দেশপ্রেম থাকলে এমন অসাধারণ পঙ্‌ক্তি লেখা যায় তাই ভাবছি। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে কবিতাটি তিনি তুলে দেন বন্ধু আলাউদ্দিন আলীর হাতে। আলাউদ্দিন আলী তখন সুরকার আনোয়ার পারভেজের সহকারী। আলাউদ্দিন আলী জীবনে প্রথম সুর দিলেন বন্ধু ফখরুদ্দীনের কবিতায় গাইলেন সাবিনা ইয়াসমীন। সৃষ্টি হলো অমর গান—ও আমার বাংলা মা তোর...।

সাবিনা ইয়াসমীনকে সবাই চেনেন, আলাউদ্দিন আলীও আমাদের সংগীত জগতের এক মহারাজা ছিলেন। কিন্তু আবুল ওমরাহ মুহম্মদ ফখরুদ্দীনকে কেউ চেনেন না। কী গভীর বেদনার কথা। আমি নিজে ছেলেবেলা থেকে কয়েকশ বার শুনেছি এই গানটি, আপ্লুত হয়েছি, মুগ্ধ হয়েছে, কখনও কখনও চোখে পানিও এসেছে। দেশের জন্য কী দরদ প্রতিটি পঙ্‌ক্তিতে। কিন্তু কী দুর্ভাগ্য, আমার দেশপ্রেমে শৈল্পিক পরশ দেওয়া এই মহান গীতিকবির নামটিই আমি কখনও শুনিইনি। কেউ কখনও তার নামটি উচ্চারণও করেননি। ‘ও আমার বাংলা মা...’ গানের গীতিকারের সময়ে আমি বেঁচে ছিলাম, এটা আমার জন্য গর্বের। কিন্তু তিন দশক সাংবাদিকতা করে এবং একই শহরে থেকেও আমি তার নামই শুনিনি, এটা অবশ্যই আমার জন্য ব্যর্থতার, গভীর বেদনার এবং  গ্লানির। এটা অবশ্যই আমার সীমাবদ্ধতা। কিন্তু শুধু আমি কেন, তার নাম তো বাংলাদেশের যারা এই গানটি শুনেছেন, তাদের সবার জানা উচিত ছিল। সমস্যাটা এখানেই। গীতিকবিরা যেন সংগীত জগতের সৎ ছেলে, আর সাহিত্যে তো তাদের কোনও ঠাঁইই নেই। অথচ সাহিত্যে কবিদের আসন অতি উঁচুতে, গীতিকবিরা কখনও সেখানে পৌঁছতে পারেন না। শুধু আবুল ওমরাহ ফখরুদ্দীন নন, অনেক প্রিয় গান কে লিখেছেন, আমরা জানি না, জানতে চাইও না। একজন মান্না দে সৃষ্টির পেছনে পুলক বন্দ্যোপাধ্যায় বা গৌরিপ্রসন্ন মজুমদারের অবদানের কথা খুব বেশি আলোচনা হয় না। দেখুন দু’জন গীতিকবির নাম লিখে আমি বেশ ভাব নিলাম আমি তাদের নাম জানি। এরপর আগাতে বলেন, কলম আটকে যাবে। ব্যক্তিগত পরিচয় বাদ দিলে বাংলাদেশ-ভারত মিলে জনাবিশেক গীতিকবির নাম কয়জন বলতে পারবেন? বনলতা সেনের কবির নাম সবাই জানেন। কিন্তু কফি হাউসের গীতিকারের নাম ক’জন জানেন? আমাদের কাছে কফি হাউস মানেই মান্না দে। অথচ মান্না দে বারবার বলেছেন, এই গানের মূল কৃতিত্ব গীতিকার গৌরিপ্রসন্ন মজুমদার আর সুরকার সুপর্ণকান্তি ঘোষের। মান্না দে’র ভাষায় ‘এটি হেমন্ত গাইলেও হিট হতো, শ্যামল মিত্র গাইলেও হিট হতো।’ গানের মূল আবেগটা কিন্তু গীতিকারেরই। গানটি গাওয়ার আগে মান্না দে কখনও কফি হাউসেই যাননি, পরে গেছেন, তবে অনেক পরে। 

এই যে জাতীয় প্রেসক্লাবের সিনিয়র সদস্য এইউএম ফখরুদ্দীনকে এত কথা বলছি, প্রেসক্লাবে এমন আরও অনেক সিনিয়র সদস্য আছেন। প্রেসক্লাবে আমার খুব একটা যাওয়া হয় না। গেলে ছোটখাটো একজন মানুষের দিকে শ্রদ্ধায় তাকাই। সাংবাদিকদের মধ্যে যারা নিয়মিত প্রেসক্লাবে যান, তারা তো তাকে নিয়মিতই দেখেন। প্রেসক্লাবের নবীন সদস্যদের কারও সঙ্গে হয়তো চলতে ফিরতে ধাক্কাও লেগেছে। কিন্তু আপনি যখন জানবেন, এই ছোটখাটো মানুষটির কলম থেকে বেরিয়েছিল, ‘তোমারে লেগেছে এত যে ভালো, চাঁদ বুঝি তা জানে...’; তখন অবশ্যই তাকে বাড়তি সম্মান দেবেন। অথচ ‘তোমারে লেগেছে’ বললেই আমরা তালাত মাহমুদের গান বলি, কে জি মোস্তফার নামও নেই না। কে জি মোস্তফার বয়স ৮৩। দোয়া করি তিনি শতায়ু হোন, কিন্তু তার নামে প্রেসক্লাবের কোনও এসএমএস এলে আবার আমরা আহাজারি করবো। মৃত্যুর পর শোক জানানোর চেয়ে জীবিত মানুষকে সম্মান বেশি জরুরি।

ছেলেবেলা থেকেই গান আমার প্রিয়, মানে শ্রোতা হিসেবে। জীবনে আমি কয়েক হাজার গান কয়েক লাখবার শুনেছি। এই যে কয়েক লাখবার গান শুনেছি, কোনও গীতিকবি কিন্তু আমার পকেট থেকে একটি টাকাও পাননি। তাহলে গীতিকবিদের চলে কীভাবে? তাদের কি পেট নেই, সংসার নেই, খিদে নেই? আপনি তাদের নাম দেবেন না, সম্মান দেবেন না, স্বীকৃতি দেবেন না, অর্থও দেবেন না; তাহলে তারা গানটা কেন লিখবে? সম্প্রতি গীতিকবিরা এক হয়েছেন, নিজেদের অধিকার আদায়ে সংগঠন করেছেন। বৈষম্য-বঞ্চনা তো আছেই, আছে কপিরাইটের সমস্যাও। অনেক গীতিকবি কিছু তো পানই না, নামটাও চুরি হয়ে যায়। অনেক শিল্পী ‘কথা: সংগৃহীত’ লিখে গান গেয়ে ফেলেন, গান হিটও হয়, কিন্তু সেই গীতিকবি বা চারণকবি হয়তো কোনও অজপাড়া গায়ে ধুঁকে ধুঁকে মরছেন, অনেক সময় জানতেও পারেন না।

বলছিলাম আবুল ওমরাহ মুহম্মদ ফখরুদ্দীনের কথা। রাতে যার মৃত্যু আমার কাছে ‘একজন নাম না জানা সিনিয়র সাংবাদিক’-এর মৃত্যু; মধ্যরাতে সেই মৃত্যুই আমাকে ঘুমাতে দিচ্ছে না। গভীর শোক আর গ্লানিতে আচ্ছন্ন হয়ে আছে মন। যার জন্য গুগল তার তথ্যের মহাসসুদ্রে একটি লাইনও বরাদ্দ রাখেনি, কোনও গণমাধ্যম যার জন্য শোক প্রকাশ করেনি; একজন নগণ‌্য সংবাদকর্মী ও সংগীতপ্রেমী হিসেবে তার জন্য আমার গভীর ভালোবাসা। তিনি তার কাজ করেছেন, দেশের জন্য অস্ত্র ধরেছেন, কলম ধরেছেন। তিনি তো আর প্রতিদিন বলবেন না, এই আমাকে দেখো, আমি ‘ও আমার বাংলা মা তোর...’ লিখেছি। আমরা যে তাকে চিনিনি, জানিনি, সম্মানিত করিনি; এটা আমাদের দীনতা। এই দীনতা ক্ষমা করো প্রিয় গীতিকবি।

লেখক: হেড অব নিউজ, এটিএন নিউজ

/এসএএস/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

সম্পর্কিত

অপচয়ের গর্তে যেন উন্নয়ন গতি না হারায়

অপচয়ের গর্তে যেন উন্নয়ন গতি না হারায়

আওয়ামী লীগের ‘গলার কাঁটা’

আওয়ামী লীগের ‘গলার কাঁটা’

মত প্রকাশের সাহস কি আছে?

মত প্রকাশের সাহস কি আছে?

বিরোধী দলবিহীন গণতন্ত্র!

বিরোধী দলবিহীন গণতন্ত্র!

‘বন্ধুরে তোর মন পাইলাম না…’

‘বন্ধুরে তোর মন পাইলাম না…’

‘বিতর্কের ঢেউ যেন নৌকা ডুবিয়ে না দেয়’

‘বিতর্কের ঢেউ যেন নৌকা ডুবিয়ে না দেয়’

অভিমানী মাশরাফি বিদায় বলার সুযোগ দিলেন না

অভিমানী মাশরাফি বিদায় বলার সুযোগ দিলেন না

‘দায়িত্ব নিতে না পারলে সন্তান জন্ম দিয়েছেন কেন?’

‘দায়িত্ব নিতে না পারলে সন্তান জন্ম দিয়েছেন কেন?’

অনুভূতিহীন আওয়ামী লীগ!

অনুভূতিহীন আওয়ামী লীগ!

বিশে বিষ ক্ষয়ে আসুক সম্ভাবনার একুশ

বিশে বিষ ক্ষয়ে আসুক সম্ভাবনার একুশ

বিএনপির শোকজ বিতর্ক এবং মান্নার বিপ্লব বিলাস

বিএনপির শোকজ বিতর্ক এবং মান্নার বিপ্লব বিলাস

স্বপ্ন, সাহস আর আত্মমর্যাদার সেতুবন্ধন

স্বপ্ন, সাহস আর আত্মমর্যাদার সেতুবন্ধন

সর্বশেষ

ভাষা শহীদদের নিয়ে শহীদুল হক খানের চলচ্চিত্র

ভাষা শহীদদের নিয়ে শহীদুল হক খানের চলচ্চিত্র

কারাগার থেকে হত্যা মামলার আসামি উধাও

কারাগার থেকে হত্যা মামলার আসামি উধাও

অ্যানিমেশন চলচ্চিত্র 'মুজিব আমার পিতা' নিয়ে আলোচনা অনুষ্ঠিত

অ্যানিমেশন চলচ্চিত্র 'মুজিব আমার পিতা' নিয়ে আলোচনা অনুষ্ঠিত

কক্সবাজারের কলাতলীতে ট্রাকচাপায় নারীসহ নিহত ২

কক্সবাজারের কলাতলীতে ট্রাকচাপায় নারীসহ নিহত ২

শেষ হলো অক্ষয় কুমার মৈত্রেয় নাট্যোৎসব

শেষ হলো অক্ষয় কুমার মৈত্রেয় নাট্যোৎসব

৭ মার্চ উপলক্ষে নোয়াখালীতে আ.লীগের পাল্টাপাল্টি কর্সসূচি

৭ মার্চ উপলক্ষে নোয়াখালীতে আ.লীগের পাল্টাপাল্টি কর্সসূচি

কথাসাহিত্যের শামীম রেজা

কথাসাহিত্যের শামীম রেজা

ঐতিহাসিক ৭ মার্চ আজ

ঐতিহাসিক ৭ মার্চ আজ

ডেস্কটপে ভিডিও কল চালু করলো হোয়াটসঅ্যাপ

ডেস্কটপে ভিডিও কল চালু করলো হোয়াটসঅ্যাপ

ঠিকাদার কোম্পানির অবহেলায় ক্ষতিগ্রস্ত একাধিক ভবন, ধসের শঙ্কা

ঠিকাদার কোম্পানির অবহেলায় ক্ষতিগ্রস্ত একাধিক ভবন, ধসের শঙ্কা

ইরাকে পোপ ফ্রান্সিস ও শিয়া নেতা আল-সিসতানির বৈঠক

ইরাকে পোপ ফ্রান্সিস ও শিয়া নেতা আল-সিসতানির বৈঠক

শিক্ষার্থীকে ধর্ষণের অভিযোগ, মাদ্রাসার শিক্ষক গ্রেফতার

শিক্ষার্থীকে ধর্ষণের অভিযোগ, মাদ্রাসার শিক্ষক গ্রেফতার

সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ


[email protected]
© 2021 Bangla Tribune
Bangla Tribune is one of the most revered online newspapers in Bangladesh, due to its reputation of neutral coverage and incisive analysis.