X
শুক্রবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২১, ৮ আশ্বিন ১৪২৮

সেকশনস

ভ্যাট আদায়ে ন্যায্যতার ঘাটতি, নজর দেবে কে?

আপডেট : ০৬ জুলাই ২০২১, ১৭:৩৬
মোহাম্মদ সিরাজ উদ্দিন আমাদের দেশে ভ্যাট আইন চালু হয়েছিল ১৯৯১ সালে। তখন ব্যবসা-বাণিজ্যে গতি মাত্র শুরু হয়েছিল, তবে বর্তমান সময়ের মতো ডিজিটাল গতি ছিল না। তখন ভ্যাট আইনটি চালু করার মূল উদ্দেশ্য ছিল অর্থনীতির প্রবাহে গতি আনার জন্য একটি কৌশলগত পরিকল্পনার অংশ। অর্থনীতিতে গতি ঠিকই এলো। তখনকার অর্থমন্ত্রী মরহুম এম সাইফুর রহমান সাহেব এ জন্য বাহবা কুড়িয়েছেন অনেক। তবে ভ্যাটে অভ্যস্ত করার চ্যালেঞ্জও ছিল ব্যাপক। কালের পরিক্রমায় এখন ভ্যাট সম্পর্কে ধারণা বেড়েছে!

আমাদের দেশে ভ্যাট সম্পর্কিত আইনটির নামই হচ্ছে-“মূল্য সংযোজন আইন-১৯৯১”, যা বর্তমানে “মূল্য সংযোজন ও সম্পূরক শুল্ক আইন-২০১২” নামে অভিহিত। আইন দু’টোতে সরাসরি “মূল্য সংযোজন কর” বা “ভ্যাট” এর সংজ্ঞা  খোঁজ করলাম- পেলাম না। তবে “কর” বা “মূল্য সংযোজন” সম্পর্কে ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে। যার সারমর্ম হলো এই মূসক হলো স্বনির্ধারণী পরোক্ষ কর। সরবরাহকৃত পণ্য বা সেবার ওপর প্রদেয় করের বিপরীতে উপকরণ কর সমন্বয় করে পণ্য বা সেবার মূল্যস্তরের প্রকৃত সেবা স্তরের মূল্য সংযোজনের ওপর আরোপিত করই হচ্ছে মূল্য সংযোজন কর বা মূসক [এখানে সংযোজনের কথা পাঠকগণ মনে রাখবেন] ।

আমি মূলত ট্যাক্স নিয়ে কাজ করছি এবং নিয়মিত লেখালেখিও ট্যাক্স নিয়েই। ভ্যাট সম্পর্কে গভীর জ্ঞান নেই। তবে ট্যাক্সের সঙ্গে ভ্যাটের একটা মৌলিক মিল থাকায় ট্যাক্সের কাজে বিভিন্ন জনকে পরামর্শ দিতে গেলে প্রসঙ্গক্রমে ভ্যাটের বিষয়টি সামনে চলে আসে। কখনও গুরুত্ব দেই, আবার কখনও তেমন গায়ে লাগাই না। সম্প্রতি একজন বন্ধু খুব অনুরোধ করলেন তার একটি ফার্মের ভ্যাটের কাজে সহযোগিতা করার জন্য। তার ভ্যাট পরিশোধের ইতিবাচক মানসিকতা দেখে আমি সত্যিই অবাক হলাম! কারণ লোকে বলে ব্যবসায়ীরা ভ্যাট পরিশোধ করতে চায় না। কিন্তু তিনি যেভাবে আগ্রহী, তাতে আমি নিজের শোনা তথ্যকে ভুল মনে হলো। একটু গভীরে গেলাম, বন্ধুটির মতো এরকম বহু ব্যবসায়ী ঠিকমতো ভ্যাট পরিশোধ করতে চায়। তাহলে সমস্যা কোথায়?

আরও একটু গভীরে যাই। ভ্যাটের চলমান আইন-কানুন ও পদ্ধতি দেখে আমি নিজেও রীতিমতো আতঙ্কিত হওয়ার অবস্থা।

ভ্যাট নির্ধারণ বিষয়ে এনবিআরের দেওয়া ব্যাখ্যাটি এরূপ: ধরা যাক কোনও একটি পণ্য ১,০০০ টাকা ক্রয় করে ১,৫০০ টাকায় বিক্রি করলে ওই পণ্যটির ক্রয়ে ১,০০০ টাকায় ১৩০.৪৩ টাকা ভ্যাট অন্তর্ভুক্ত ছিল (১,০০০ * ১১৫*১০০)। আবার ১৫০০ টাকায় বিক্রি করায় মূসক দাঁড়ায় ১৯৫.৬৫ টাকা-(১৫০০*১৫/১১৫)। পণ্যটি ১৫০০ টাকা বিক্রি করায় এখানে মূল্য সংযোজন করা হয়েছে ৫০০ টাকা। পণ্যটি ক্রয়কালে ভ্যাট/মূসক পরিশোধ করা হয়েছিল। তাই প্রকৃত সংযোজন হবে ৫০০ টাকা এবং বিক্রেতা ক্রয় স্তরের মূসক ফেরত নিয়ে বিক্রয় স্তরের প্রকৃত সংযোজনের ওপর অর্থাৎ ৫০০ টাকার ওপর মূসক পরিশোধ করবেন।

অর্থাৎ ১৫০০ টাকার ওপর পরিশোধযোগ্য মূসক ১৯৫.৯৬ টাকা থেকে ১০০০ টাকার ওপর পরিশোধিত ১৩০.৪৩ টাকা বাদ দিয়ে পরিশোধযোগ্য মূসক হবে ৬৫.৬২ টাকা (৫০০ * ১৫*১১৫)(সূত্র: https://nbr.gov.bd/faq/vat-faq/ban)

উপরের উদাহরণটি ব্যাখ্যা করলে দেখা যাবে (১০০০-১৩০.৪৩)=৮৬৯.৫৭ টাকা পণ্যে সর্বশেষ ক্রেতা/ভোক্তাকে ভ্যাট দিতে হলো (১৩০.৪৩+১৯৫.৯৬) টাকা=৩২৬.০৮৭ টাকা। বিক্রেতা লাভ করলেন =(১৫০০-৮৬৯.৫৭-৬৫.৬২)=৫৬৫.২১২ টাকা, যা বিক্রেতা বা ব্যবসায়ীর ক্রয়কৃত পণ্যের মূল্যের ৬৫% লাভ করলেন। এটা একটা উদাহরণ। প্রকৃত পক্ষে অধিকাংশ ব্যবসায়ী তাদের ক্রয়কৃত পণ্যের প্রকৃত ক্রয়মূল্য প্রকাশ না করেই ইচ্ছাকৃত লাভ ধরে বাজারে পণ্য বিক্রি করে থাকেন। ফলে  ভোক্তাকে অতিরিক্ত ভ্যাটের বোঝা বহন করতে হচ্ছে। বিপণনযোগ্য খাদ্যশস্য, জীবন রক্ষাকারী বিভিন্ন মেডিক্যাল সামগ্রী, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের ব্যবহৃত বিভিন্ন সহায়ক যন্ত্র ইত্যাদি ভ্যাটের অন্যায্যতা থেকে রক্ষা পাচ্ছে না।

এনবিআর কর্তৃক দেওয়া এ ব্যাখ্যাকে আরও গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, একজন ব্যবসায়ী শুধু ভ্যাট আদায়কারী। সব স্তরে যুক্ত হওয়া ভ্যাট পরিশোধ করতে হবে সর্বশেষ ভোক্তাকে। পণ্যটি যতবার  হাত বদল হবে ততবারই ভ্যাট যোগ হবে এবং ব্যবসায়ীরা তাদের পূর্বে পরিশোধিত ভ্যাট সমন্বয় করার সুযোগ পাবেন। কিন্তু শেষ ভোক্তাকে সব স্তরে যোগ হওয়া ভ্যাট পরিশোধ করতে হবে। আমাদের অধিকাংশ ব্যবসায়ী তাঁর ক্রয়মূল্য প্রকাশ করতে আগ্রহী নয়। আবার কত টাকা লাভ করবেন তা মনিটরিং করা যাচ্ছে না। ফলে ক্রেতাকেই ভ্যাটের ওপর ভ্যাট দিতে হচ্ছে। শুধু তা নয়, ভ্যাটের ওপর ভ্যাট যোগ হতে থাকে। অনেকটা সুদের চক্রবৃদ্ধির মতো। এটা বড় অন্যায্যতা! এদিকটা গভীরভাবে মনোযোগ দেওয়া প্রয়োজন।

কিন্তু যদি ব্যবসাকে নির্দিষ্টভাবে জবাবদিহির মধ্যে রাখা যেত তাহলে লাভবান হতেন উভয়পক্ষ। অযাচিতভাবে ভ্যাটের পরিমাণ বৃদ্ধি হতো না, যার ফলে সব স্তরের ভোক্তা পণ্যের ব্যবহারের ক্ষেত্রে সমান সুযোগ পেতেন। অন্যদিকে ব্যবসায়ীদের আয়ের স্বচ্ছতা নিশ্চিত হলে তারা সরকার পরিচালনায় ট্যাক্স পরিশোধ করে কী পরিমাণ অবদান রাখছেন তা স্পষ্টভাবে দেখা যেত, যা তারা দাবি করতে পারতেন। উল্টো এখন ব্যবসায়ীরা অভিযোগের শিকার হন, তারা জনগণ থেকে ভ্যাট আদায় করেন, কিন্তু সরকারকে দিচ্ছেন না।

অন্যদিকে ব্যবসায়ী যেহেতু পণ্যের প্রকৃত ক্রয়মূল্য গোপন রাখেন সেহেতু পুরো বিক্রয়মূল্যের ওপর ভ্যাট পরিশোধ করতে হয়, যার ভার পড়ে শেষ পর্যন্ত সর্বশেষ ক্রেতার ওপর বা ভোক্তার ওপর। দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির এটাও একটা বড় কারণ। ভ্যাট আইনেও এমনটা সমর্থন করেন। যা সরাসরি অন্যায্য।  ভ্যাট আদায়ে বা পরিশোধে এ যে অন্যায্যতা বিরাজমান এটা অনেকে জানেন, কিন্তু মুখ খুলছেন না কেউ-ই।

ভ্যাটের গরমিল আদায় খোদ একটা কেক উৎপাদনকারী সুমিস নামনীয় একটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে। প্রতিষ্ঠানটি ২০১৯ সালের জুলাই থেকে ২১ সালের এপ্রিল পর্যন্ত ভ্যাট ফাঁকি দিয়েছে ৭ কোটি ১৩ লাখ ১৪৩ টাকা, যার ওপর সুদ আসে ৩ কোটি ৩৯ লাখ টাকা। ওই প্রতিষ্ঠানের মালিক বলছেন এনবিআর-এর লোকজন কারাখানা পরিদর্শন করে ৫% ভ্যাট নির্ধারণ করেছেন। এখন ভ্যাট গোয়েন্দা এসে বলে ১৫% ভ্যাট দেওয়া প্রয়োজন। (সূত্র: দৈনিক প্রথম আলো অনলাইন-২৬ জুন ২০২১)

প্রশ্ন হলো ক্রিমযুক্ত কেক যা শিশুদের প্রিয় খাদ্য, সেখানেও ১৫% ভ্যাট বা ৫% ভ্যাট আছে। কিন্তু  ক্রেতাদের কোন অবস্থায় পরিষ্কার করা হচ্ছে না, কেকের দামের মধ্যে কত % ভ্যাট প্রকৃতপক্ষে দোকানি আদায় করছেন। এটাও ভ্যাট আদায়ে অন্যায্যাতা, যার অবসান হওয়া দরকার।    

ভ্যাটের এ অন্যায্যতা শুধু ম্যানুয়াল ব্যবসায় ক্ষেত্রেই বিরাজমান তা নয়। একইভাবে আমরা দেখি অনলাইন ব্যবসার ক্ষেত্রেও। যেমন, বর্তমান প্রেক্ষাপটে প্রচলিত ম্যানুয়াল ব্যবসা ও অনলাইন শপ/ ই-কমার্সের ক্ষেত্রে ভ্যাটের অন্যায্যতার একটি তুলনামূলক চিত্র:

অনলাইনে/ই-কমার্সের ক্ষেত্রে ভ্যাট নিবন্ধনের বাধ্যবাধকতা: বার্ষিক টার্নওভার যাই হোক না কেন ধারা ৬ অনুযায়ী নিবন্ধনের বাধ্যবাধকতা আছে। (সূত্র: সাধারণ আদেশ নং ১৭/মূসক/২০১৯)।

ম্যানুয়্যাল ব্যবসার ক্ষেত্রে: বার্ষিক টার্নওভার ৩ কোটি টাকা পর্যন্ত নিবন্ধনের প্রয়োজন নাই। বার্ষিক টার্নওভার ৫০ লক্ষ টাকা পর্যন্ত তালিকাভুক্তিরও প্রয়োজন নাই। বার্ষিক টার্নওভার ৫০ লক্ষ টাকা থেকে ৩ কোটি পর্যন্ত হলে টার্নওভার করদাতা হিসেবে তালিকাভুক্তির বাধ্যবাধকতা আছে।

অনলাইনে/ই-কমার্সের ক্ষেত্রে সেলস কমিশনের ওপর ৫% ভ্যাট পরিশোধযোগ্য (সূত্র: ব্যাখ্যা পত্র ০২/মূসক/২০১৯ এবং মূসক আইন ও সম্পূরক শুল্ক আইন ২০১২-এর তৃতীয় তফসিল)।

ম্যানুয়াল ব্যবসার ক্ষেত্রে বার্ষিক টার্নওভার ৫০ লক্ষ টাকা পর্যন্ত ভ্যাট ০%। বার্ষিক টার্নওভার ৫০ লক্ষ টাকা থেকে ৩ কোটি পর্যন্ত হলে ভ্যাট হার হবে ৪%। কিন্তু এখানে বিক্রেতা কত টাকা লাভ করলেন তার কোনও তথ্য মনিটরিং ব্যবস্থা নাই। যার ফলে ভোক্তা থেকে বিভিন্ন হারে ভ্যাট আদায় করলেও সরকার পাচ্ছে মাত্র ৪%।

অনলাইনে/ই-কমার্সের ক্ষেত্রে বিক্রয়কৃত পণ্যের ক্রয় মূল্যের ওপর ভ্যাট: পণ্য ক্রয় পর্যায়ে ক্রয় মূল্যের ওপর ভ্যাট পরিশোধ থাকার বাধ্যবাধকতা আছে (সূত্র: ১৮৬- আইন/২০১৯/৪৩-মূসক, ব্যাখ্যা পত্র ০২/মূসক/২০১৯ এবং এস আর ও নং ২৩৪-আইন/২০১৯/৭০ মূসক সেবা কোড S০৯৯.৬০)।  

ম্যানুয়াল ব্যবসার ক্ষেত্রে এই আইন প্রযোজ্য নয়।

অনলাইনে/ই-কমার্সের ক্ষেত্রে  উৎসে আয়কর কর্তন: পণ্য ক্রয়ের ক্ষেত্রে মার্চেন্ট/ভেন্ডরকে তার পাওনা পরিশোধের ক্ষেত্রে উৎসে আয়কর কর্তনের বাধ্যবাধকতা থাকায় মার্চেন্টরা  ৩% - ৭% অতিরিক্ত দাম দাবি করে। ফলে পণ্যের দাম বেড়ে যায় (সূত্র: আয়কর অধ্যাদেশ ১৯৮৪ এর ধারা ৫২ এর উপধারা (২)-এর  আইটেম ১৫ এবং বিধি ১৬)।

ম্যানুয়াল ব্যবসার ক্ষেত্রে পণ্য ক্রয়ের ক্ষেত্রে মার্চেন্ট/ভেন্ডরকে পাওনা পরিশোধের ক্ষেত্রে উৎসে আয়কর কর্তনের বাধ্যবাধকতা না থাকায় মার্চেন্ট/ ভেন্ডরগণ ৩% - ৭% কম দামে পণ্য সরবরাহ করে। ফলে পণ্যের দাম কম থাকে।

অনলাইনে/ই-কমার্সের ক্ষেত্রে শিপিং চার্জ/পার্সেল ডেলিভারি চার্জ (আয়): ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানগুলো পণ্যের দামের পাশাপাশি পণ্য কাস্টমারের কাছে পৌঁছানো খরচও (কুরিয়ার সার্ভিস চার্জ) ইনভয়েসে যোগ করে থাকে। পার্সেল পৌঁছানো এই সেবাটি  এসআরও নং-১৮৬- আইন/২০১৯/৪৩-মূসক অনুযায়ী সেবার কোড S০২৮.০০ কুরিয়ার ও এক্সপ্রেস মেইল সার্ভিসের অন্তর্ভুক্ত। এই সেবা মূল্যের ওপর ১৫% ভ্যাট প্রযোজ্য। যার কারণে অনলাইন পণ্য ক্রয় করে অতিরিক্ত ভ্যাট দিতে হচ্ছে  ভোক্তাকে।
ম্যানুয়াল ব্যবসার ক্ষেত্রে কাস্টমার দোকানে এসে পণ্য নিজেই নিয়ে যায় বিধায় প্রযোজ্য নয়।

অনলাইনে/ই-কমার্সের ক্ষেত্রে ব্যবসা সংশ্লিষ্ট খরচের ভ্যাট/উৎসে আয়কর কর্তন:  

ক্লাউড সার্ভিসের ওপর প্রযোজ্য মূসক ৫% (সূত্র: এস আর ও নং- ১৪৯-আইন/২০২০/১১০-মূসক, সার্ভিস  কোড S ০৯৯.১০)। আয়কর  ২০% বিদেশি কোম্পানি থেকে পণ্য বা সেবা গ্রহণের ক্ষেত্রে (সূত্র: আয়কর অধ্যাদেশ ১৯৮৪ এর ধারা ৫৬)।

ম্যানুয়াল ব্যবসার ক্ষেত্রে উৎসে কর্তনকারী সত্তা না হলে তা হওয়ায় প্রযোজ্য নয়।

অনলাইনে/ই-কমার্সের ক্ষেত্রে  ডিজিটাল মার্কেটিংয়ের ওপর ভ্যাট ১৫%। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের নথি নং- ০৮.০১.০০০০.০৬৮.০৯.০০৩.১২/৩২, দেশি/বিদেশি এবং পণ্য /সেবা ভেদে উৎসে আয়কর হার ০.৬৫% থেকে ২০% পর্যন্ত (সূত্র: আয়কর অধ্যাদেশ ১৯৮৪ এর ধারা ৫২ এএ এবং ধারা ৫৬)।

ম্যানুয়্যাল ব্যবসার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়।

অনলাইনে/ই-কমার্সের ক্ষেত্রে  যেসব সেবা বা পণ্য ক্রয়ের ওপর ভ্যাট প্রযোজ্য সেসব পণ্য বা সেবা ক্রয়ের ওপর উৎসে মূসক কর্তনে বাধ্যবাধকতা আছে । এসআরও নং-১৪৯-আইন/২০২০/১১০-মূসক। একইরকমভাবে  উৎসে আয়কর কর্তনে ও পরিশোধের বাধ্যবাধকতা আছে।  রেফারেন্স: আয়কর অধ্যাদেশ ১৯৮৪-এর ধারা ৫২ থেকে ধারা ৫৬ এবং বিধি-১৬।

ম্যানুয়াল ব্যবসার ক্ষেত্রে বাধ্যবাধকতা নাই।

অনলাইনে/ই-কমার্সের ক্ষেত্রে  কালেকশনের জন্য এমএফএস/ পেমেন্ট গ্যাটওয়ের ওপর অনেক বেশি নির্ভরশীলতা থাকায় আর্থিক ব্যয় বাড়ে এবং এই খরচের ওপর ১৫% ভ্যাট পরিশোধযোগ্য। সাধারণ আদেশ নং-০৩/মূসক/২০২০।

ম্যানুয়াল ব্যবসার ক্ষেত্রে সরাসরি ক্যাশ টাকা গ্রহণ করায় এই খরচ নাই।

অনলাইনে/ই-কমার্সের ক্ষেত্রে ফুড ডেলিভারি সেবার ক্ষেত্রে ১৫ শতাংশ ভ্যাট আছে। বর্তমানে ফুড ডেলিভারি সেবার ক্ষেত্রে ১৫ শতাংশ ভ্যাট প্রযোজ্য। যা শুধু অনলাইন ও অ্যাপভিত্তিক সেবার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।

ম্যানুয়াল ব্যবসার ক্ষেত্রে সরাসরি হোটেল বা রেস্তোরাঁ থেকে অফলাইন ডেলিভারি হলে এই ভ্যাট প্রযোজ্য হয় না। বর্তমান করোনা মহামারিতে ব্যবসা বাণিজ্য চলমান রেখে আর্থিক প্রবাহ ধরে রাখার ক্ষেত্রে ই-কমার্স বা অনলাইন ব্যবসার গুরুত্ব অনেক। কিন্তু ভ্যাটের অন্যায্যতার ফলে যেন এ সেবা খাতটি ক্ষতিগ্রস্ত না হয় সেদিকে নজর রাখা জরুরি।

যেকোনও দেশের সরকারের সকল অঙ্গ প্রতিষ্ঠানের সমন্বিত পরিচালনার জন্য দেশের নাগরিকদের দেওয়া প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ করের ওপর নির্ভর করতে হয়। এটা স্বাভাবিক। কিন্তু ভুল নীতি বা আইনের ভুলের কারণে যেন জনগণ ক্ষতিগ্রস্ত না হয় বা অতিরিক্ত ট্যাক্সের ভার বহন করতে না হয় সেটা খেয়াল রাখতে হবে। নতুবা সমাজে অন্যায় বাড়বে, রাষ্ট্রের নাগরিকদের ক্ষোভ বৃদ্ধি পাবে। একশ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ীরা সরকারের ভ্যাটের দোহাই দিয়ে অর্থনৈতিক অসমতা তৈরি করবে। ফলে একটা বৈষম্যের অর্থনীতি তৈরি হবে। একশ্রেণির লোক ব্যাপক ধনী হবে। অধিকাংশ নাগরিক তাদের ক্রয় ক্ষমতা হারাবে। যেকোনও সরকারের পক্ষে তা সামাল দেওয়া কঠিন হবে। আমরা এখন মধ্যম উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদা লাভ করেছি। তাই ভ্যাট আদায়ে ন্যায্যতা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।

লেখক: আয়কর আইনজীবী
 
 
/এসএএস/এমওএফ/

সম্পর্কিত

সঠিক ও নির্ভুল আয়কর রিটার্ন করদাতার বড় সম্পদ

সঠিক ও নির্ভুল আয়কর রিটার্ন করদাতার বড় সম্পদ

আয়কর রিটার্ন ইমেইলে জমা নেওয়ার উদ্যোগ যে কারণে জরুরি  

আয়কর রিটার্ন ইমেইলে জমা নেওয়ার উদ্যোগ যে কারণে জরুরি  

‘ব্লকচেইন প্রযুক্তি’ হতে পারে রাজস্ব আদায়ের নতুন দিগন্ত

‘ব্লকচেইন প্রযুক্তি’ হতে পারে রাজস্ব আদায়ের নতুন দিগন্ত

প্রতিবন্ধীদের সহায়ক চলনযন্ত্রের ওপর ভ্যাট প্রত্যাহার জরুরি

প্রতিবন্ধীদের সহায়ক চলনযন্ত্রের ওপর ভ্যাট প্রত্যাহার জরুরি

তালেবানবিরোধীদের স্ববিরোধী অবস্থান

আপডেট : ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১৯:২১
মো. জাকির হোসেন ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্র ইতিহাসের ভয়াবহতম সন্ত্রাসী হামলার শিকার হয়। ওই হামলার সঙ্গে তালেবানের সংশ্লিষ্টতা ছিল না। তবু মার্কিন নেতৃত্বাধীন পশ্চিমা জোট ২০০১ সালের ৭ অক্টোবর আফগানিস্তান আক্রমণ করে। ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহের মধ্যেই আফগানিস্তানে তালেবানকে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়। তালেবানের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল, ৯/১১ আক্রমণের মূল হোতা ওসামা বিন লাদেনকে তালেবান সরকার আশ্রয়-প্রশ্রয় দিচ্ছে। দীর্ঘ দুই দশক পর তালেবান আফগানিস্তানের ক্ষমতায় পুনরায় ফিরে আসার পর বিশ্বের নানা প্রান্তে তালেবানের পক্ষে-বিপক্ষে নানা বক্তব্য-বিতর্ক চলছে। আমি তালেবানকে সমর্থন করি না। আমি কেন তালেবানকে সমর্থন করি না এ বিষয়ে বাংলা ট্রিবিউনে আমার মতামত তুলে ধরেছি। তালেবান মুখে শরিয়াহ আইনের কথা বললেও তাদের অনেক কর্মকাণ্ড কেবল ইসলামের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণই নয়, কিছু ক্ষেত্রে তা কোরআন-হাদিসের বিধানের সঙ্গেও সাংঘর্ষিক। আবার তালেবানের বিরুদ্ধে যারা সোচ্চার আমি তাদের পক্ষেও নই। তালেবানের বিরুদ্ধে যারা সোচ্চার তাদের অবস্থানকে আমি যেসব কারণে সমর্থন করি না তা হলো –

এক. তালেবানের বিরুদ্ধে যারা সোচ্চার তারা একচোখা, পক্ষপাতমূলক আচরণ করছে। এরা কেবল ইসলামে ধর্মের অনুসারী জঙ্গিদের বিষয়ে সোচ্চার। মিয়ানমারের বৌদ্ধ উগ্রবাদীরা রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব কেড়ে নিলো। বৌদ্ধ সন্ত্রাসীরা চার দশক ধরে গণহত্যা, গণধর্ষণ করে, জমি-সম্পদ-ব্যবসা কেড়ে নিয়ে লাখ লাখ রোহিঙ্গাকে দেশ থেকে বিতাড়ন করলো। ‘ওয়ার অন টেরর’ ব্যবসায়ীরা মাঝে-মধ্যে ওষ্ঠ সেবা (লিপ সার্ভিস) ছাড়া এই ভয়ংকর সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে পুরোপুরি নীরব। ব্রিটিশদের বিশ্বাসঘাতকতায় ফিলিস্তিনিদের রাষ্ট্র জোর করে কেড়ে নিলো ইহুদি সন্ত্রাসীরা। রাষ্ট্র গঠনের জন্য পর্যাপ্ত ইহুদি ফিলিস্তিনে না থাকায় ব্রিটিশরা সারা বিশ্বে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ইহুদিদের ফিলিস্তিনে নিয়ে আসে এবং ফিলিস্তিনিদের বিতাড়ন করতে থাকে। ব্রিটিশ বাহিনীর সহযোগিতায় ইহুদিরা গড়ে তোলে প্রশিক্ষিত গোপন সন্ত্রাসী সংগঠন। এরমধ্যে তিনটি প্রধান সংগঠন ছিল, হাগানাহ, ইরগুন ও স্ট্যার্ন গ্যাং, যারা হত্যা, সন্ত্রাস, ধর্ষণ আর ধ্বংসযজ্ঞ সৃষ্টির মাধ্যমে নিরীহ ফিলিস্তিনদের বাধ্য করে নিজ মাতৃভূমি ছেড়ে চলে যেতে।

ফিলিস্তিনিদের জমিজমা ইহুদিরা দখল করে নেয়। ১৯২২ সালে ইসরাইলে ইহুদি ছিল মাত্র ১২ শতাংশ, ১৯৩১ সালে তা হয় ২৩ শতাংশ, আর ১৯৪৭-এ তা বেড়ে দাঁড়ায় ৩২ শতাংশে।

জাতিসংঘ এখতিয়ার-বহির্ভূতভাবে ৪৫ শতাংশ এলাকা নিয়ে ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের যে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছিল সন্ত্রাসী রাষ্ট্র ইসরায়েল, তাও লঙ্ঘন করে ক্রমাগত ফিলিস্তিনিদের ঘরবাড়ি, জায়গা-জমি কেড়ে নিচ্ছে। মুসলমানদের প্রথম কিবলা আল-আকসা মসজিদে নামাজরত মুসল্লিদের গুলি-বোমায় প্রতিনিয়ত আহত-নিহত করছে ইহুদিরা। ফিলিস্তিনিদের ঘরবাড়ি থেকে উচ্ছেদ ও তাদের জায়গা-জমি জোর করে বেদখল করাকে নিরাপত্তা পরিষদের একাধিক সিদ্ধান্তে ও আন্তর্জাতিক আদালতের অভিমতে অবৈধ ঘোষণা করা হয়েছে।

কিন্তু ইসরায়েল আন্তর্জাতিক আইনকে ক্রমাগত বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস অব্যাহত রেখেছে। এই সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে কোনও পদক্ষেপ নেওয়া দূরে থাক, উপরন্তু অতি সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র ঘোষণা দিয়েছে ইসরায়েলের সঙ্গে বন্ধুত্ব করতে বিভিন্ন দেশকে চাপ দেবে যুক্তরাষ্ট্র। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্থনি ব্লিঙ্কেন ঘোষণা করেছেন, ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার ক্ষেত্রে সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন এবং মরক্কোকে অনুসরণ করার জন্য আমরা আরও দেশকে উৎসাহিত করবো। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, সংযুক্ত আরব আমিরাত গত বছরের সেপ্টেম্বরে ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে সম্মত হয়। এরপর বাহরাইন, সুদান ও মরক্কো আরব আমিরাতের পথ ধরে ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করে। যুক্তরাষ্ট্র নানা রকম ‘তোফা’র বিনিময়ে এই তিনটি রাষ্ট্রকে ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে বাধ্য করে। পশ্চিম সাহারার ওপর মরক্কোর কর্তৃত্বের স্বীকৃতি দেওয়া, সুদানকে সন্ত্রাসী রাষ্ট্রের তালিকা থেকে বাদ দেওয়া এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান সংক্রান্ত একটি চুক্তি সই করার মাধ্যমে রাষ্ট্র তিনটিকে রাজি করিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।

তালেবানের বিরুদ্ধে সোচ্চাররা ইসরায়েলের সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে মুখে কুলুপ আঁটা। বছরে পর বছর ধরে চীনের উইঘুরে মুসলিম হত্যা, ধর্ষণ, নির্যাতন, ধর্মপালনে বাধাদান সন্ত্রাস হলেও তালেবানের বিরুদ্ধে বিপ্লবীরা এ ব্যাপারে উচ্চকিত নন। শ্বেতাঙ্গ উগ্রবাদীদের হাতে মসজিদে হামলা, নামাজরত মুসল্লিদের হত্যা, মুসলমানদের ওপর আক্রমণকে জঙ্গিবাদ বলতেই রাজি নন তালেবানের বিরুদ্ধে সোচ্চাররা। ভারতের বাড়ন্ত উগ্র হিন্দুত্ববাদ মুসলমানদের হত্যা-নির্যাতন করছে, মুসলিম নারীদের অবমাননা করছে। তালেবানকে জঙ্গি তকমা দিতে রগ ফুলিয়ে তর্ক করলেও উগ্র হিন্দুত্ববাদকে জঙ্গিবাদ বলতে বড়ই কুণ্ঠিত এরা।

দুই. জঙ্গিবাদের ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, মুসলমানদের গায়ে জঙ্গি, উগ্র, সন্ত্রাসী তকমা লাগার অনেক আগেই পৃথিবীতে উগ্রবাদ ও সন্ত্রাসের উত্থান হয়। আর বর্তমানে মুসলমান নামধারী জঙ্গিদের পাশাপাশি অন্য ধর্ম ও মতাদর্শের উগ্রবাদীরও হামেশাই দৃষ্টিগোচর হয়। কিন্তু মুসলমান জঙ্গিরা ছাড়া অন্য ধর্মের উগ্রবাদীরা মিডিয়ায় খুব একটা প্রচার-প্রচারণা পায় না। ২০১৮ সালে ইউনিভার্সিটি অব আলাবামা পরিচালিত একটি জরিপে দেখা গেছে, ২০০৬ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রে অমুসলিম নাগরিকদের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড নিয়ে সেখানে যে পরিমাণ খবর প্রচার করা হয়েছে, কোনও সন্ত্রাসী ঘটনায় মুসলমানরা জড়িত থাকলে সে তুলনায় ৩৫৭ গুণ বেশি খবর প্রচার করা হয়েছে।

এফবিআইয়ের পরিসংখ্যান অনুযায়ী ১৯৮০ থেকে ২০০৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রে যত সন্ত্রাসী হামলা হয়েছে তার সর্বোচ্চ ৪২ শতাংশের সঙ্গে যুক্ত ল্যাটিনো গ্রুপ। ২৪ শতাংশ চরম বামদল, ইহুদি চরমপন্থী গ্রুপ ৭ শতাংশ, ইসলামি জঙ্গি গ্রুপ ৬ শতাংশ, কমিউনিস্ট গ্রুপ ৫ শতাংশ ও অন্যান্য গ্রুপ ১৬ শতাংশ সন্ত্রাসী আক্রমণের সঙ্গে জড়িত।

National Consortium for the Study of Terrorism and Responses to Terrorism (START) এর পরিসংখ্যান বলছে ১৯৭০ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রে যে সন্ত্রাসী হামলা হয়েছে তার ২.৫ শতাংশ হামলার সঙ্গে জড়িত মুসলমানরা। মুসলমানদের সন্ত্রাসী হিসেবে ধারাবাহিকভাবে চিত্রায়িত করা এবং ইসলামভীতি ছড়ানোর জন্য ইসলামকে ভয়ংকর একটি মতাদর্শ হিসেবে তুলে ধরার একটি সুস্পষ্ট প্রবণতা দৃশ্যমান।

তিন. আলকায়েদা নেতা ওসামা বিন লাদেনকে আশ্রয়-প্রশ্রয় দেওয়ার জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও তার পশ্চিমা মিত্ররা সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে তালেবানের বিরুদ্ধে দুই দশক ধরে যুদ্ধ করলো। এই আল-কায়েদাকে সামরিক, আর্থিক ও প্রশিক্ষণ দিয়ে তৈরি করেছে যুক্তরাষ্ট্র ও পাকিস্তান।

আফগানিস্তানে দখলদার রাশিয়ার বিরুদ্ধে প্রক্সি যুদ্ধে আল-কায়েদার কাজের পূর্ণ সহযোগী ছিল যুক্তরাষ্ট্র ও পাকিস্তান। কট্টর ধর্মীয় গুরু আবদুল্লাহ আজমের সঙ্গে মিলে লাদেন মকতব আল-খিদামাত (এমএকে) নামে একটি বৈশ্বিক নিয়োগ নেটওয়ার্ক গড়ে তোলে। সংগঠনটি নিউ ইয়র্কের ব্রুকলিন এবং অ্যারিজোনার টুকসনে তাদের কার্যালয় স্থাপন করেছিল। সেখান থেকে তারা ‘আফগান আরব’ নামে খ্যাত অভিবাসীদের সামরিক প্রশিক্ষণ দিয়েছে। আল-কায়েদা তখন যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ছিল ‘পেয়ারের মুজাহিদিন’। সোভিয়েত বাহিনী পরাজিত হয়ে আফগানিস্তান ছেড়ে চলে যাওয়ার পর একই আল-কায়েদা যুক্তরাষ্ট্রের কাছে হয়ে গেলো জঙ্গি।

সোভিয়েত বাহিনী চলে যাওয়ার পর মুজাহিদিনদের মধ্যে অন্তর্দ্বন্দ্ব শুরু হয়। এ রকম অবস্থায় দৃশ্যপটে আসে তালেবান। তালেবান হঠাৎ করে আকাশ থেকে টুপ করে পড়েনি, কিংবা মাটি ফুঁড়ে বের হয়নি। সৌদি আর্থিক সহায়তায় দীর্ঘদিন ধরে তালেবান গড়ার কারিগর হচ্ছে পাকিস্তান। যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা কি এ খবর জানতো না?

চার. জঙ্গিবাদ দমনে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে পশ্চিমা মিত্রদের ‘ওয়ার অন টেরর’ সৎ ও পক্ষপাতহীন ছিল না। মুখে জঙ্গিবাদ দমনের কথা বললেও তারা বিশেষ ধর্ম-মতাদর্শ ও গ্রুপকে আশ্রয়-প্রশ্রয় দিয়েছে, অর্থ-অস্ত্র-প্রশিক্ষণ দিয়ে সাহায্য-সহযোগিতা করেছে। তথাকথিত ‘ওয়ার অন টেরর’ ঘোষণার পেছনে মুসলিম বিশ্বকে পদানত রাখার পরিকল্পনা ছিল। এছাড়া যুদ্ধ অর্থনীতিকে চাঙা রাখতে অস্ত্র ব্যবসার কূটকৌশলও ছিল। ফলে জঙ্গিবাদ দমনের নামে ভয়ংকর এই রাজনীতির খেলা ব্যর্থ হয়েছে। উপরন্তু, জঙ্গিবাদের বিশ্বায়ন হয়েছে। নতুন নতুন জঙ্গি গ্রুপের উত্থান হয়েছে।

পাঁচ. ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র এবং তালেবানের মধ্যে তথাকথিত শান্তি চুক্তির মাধ্যমে তালেবান ক্ষমতাসীন হয়েছে। মার্কিন ও তার মিত্র সামরিক বাহিনী প্রত্যাহার করে নেওয়ার অল্প সময়ের মধ্যেই আফগান সরকারের পতন ঘটতে পারে এটা কি অজানা ছিল? আফগানিস্তানে মার্কিন নেতৃত্বাধীন মিশনের অধিনায়ক জেনারেল অস্টিন মিলার গত জুন মাসেই হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন যে ‘দেশটি এক চরম নৈরাজ্যকর গৃহযুদ্ধের দিকে চলে যেতে পারে। এটি গোটা বিশ্বের জন্যই এক গভীর উদ্বেগের বিষয়।’

ওই মাসেই মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থার এক পর্যালোচনায় আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছিল, মার্কিন সামরিক বাহিনী প্রত্যাহার করে নেওয়ার অল্প সময়ের মধ্যেই আফগান সরকারের পতন ঘটতে পারে। শান্তি চুক্তির পর তালেবান বড় বড় শহর এবং সামরিক ঘাঁটির ওপর হামলার পরিবর্তে তারা টার্গেট করে করে হত্যা করছিল। তালেবানের হামলার টার্গেট ছিল সাংবাদিক, বিচারক, শান্তির জন্য আন্দোলনকারী এবং কিছু ক্ষেত্রে নারীরা। এ থেকে ধারণা পাওয়া যাচ্ছিল যে তালেবান তাদের চরমপন্থী মতাদর্শ পরিবর্তন করেনি, কৌশল বদলেছে মাত্র। তালেবানের সঙ্গে পাতানো ম্যাচ খেলে এখন উদ্বেগ প্রকাশ, মায়াকান্না পশ্চিমাদের দ্বিচারিতার নগ্ন প্রকাশ বৈ আর কিছু নয়।

ছয়. তালেবানবিরোধীরা মনে করে তালেবানকে ক্ষমতাচ্যুত এবং ইসলামের নামে পরিচালিত অন্য জঙ্গিদের দমন করতে পারলেই পৃথিবী থেকে জঙ্গিবাদ-সন্ত্রাস নির্মূল হবে। এটি ভ্রান্ত ধারণা। বৌদ্ধ, হিন্দু, ইহুদি ও খ্রিষ্ট ধর্মের অনুসারী ও শ্বেতাঙ্গ উগ্রবাদীদের দ্বারা মুসলমান হত্যা, ধর্ষণ, নিপীড়ন, নির্যাতন, মসজিদে হামলা বন্ধ না করা গেলে ইসলামের নামে জঙ্গিবাদ নির্মূল হবে বলে প্রতীয়মান হয় না। ‘ওয়ার অন টেরর’-এর নামে  আফগানিস্তান, ইরাক, লিবিয়া, সিরিয়া, মিসরকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করা হলো। লাখ লাখ নিরীহ মানুষকে হত্যা করা হলো। কোটি মানুষকে বাস্তুচ্যুত ও জীবনধারণের অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হলো। জঙ্গিবাদ কি দমন হলো? বরং, পক্ষপাতমূলক আচরণের প্রতিক্রিয়ায় জন্ম নিয়েছে আইএস, আইএসআইকেপি, বোকো হারাম, আল শাবাব।  

তালেবানের পক্ষে-বিপক্ষে বিতর্ক যা-ই থাকুক, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তালেবান ইস্যু এখন বড়ই গুরুত্বপূর্ণ। তালেবান, আল কায়েদা, হাক্কানি নেটওয়ার্ক সবারই নেপথ্যের কারিগর পাকিস্তানের আইএসআই। পাকিস্তান যেকোনও মূল্যে তালেবানের ওপর প্রভাব ধরে রাখতে চাইবে। অন্যদিকে, মধ্য এশিয়ায় অবস্থান ধরে রাখতে আফগানিস্তান রাশিয়ার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। চীন ও ভারতের ভূ-রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, বাণিজ্যিক ও নিরাপত্তা ইস্যু জড়িত রয়েছে আফগানিস্তানের সঙ্গে। তালেবানকে কাছে টানতে চেষ্টা করছে দুই দেশই। ইরান ও আমিরাত সরকার গঠন, অনানুষ্ঠানিক স্বীকৃতি ও উদার সাহায্যের হাত বাড়িয়েছে তালেবানের দিকে। এদিকে তালেবান যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে শান্তিচুক্তি করে ক্ষমতায় এসেছে। ফলে কোন দেশ তালেবানের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারবে, তার জন্য অপেক্ষা করতে হবে। আর এর জের ধরে রুশ-মার্কিন-চীন সম্পর্ক তথা বৈশ্বিক রাজনীতি কোনদিকে মোড় নেবে, তা সময়ই বলে দেবে। আইএসআইর সবচেয়ে বড় শত্রু হলো বাংলাদেশ ও ভারত। বাংলাদেশ ও ভারতের বিষয়ে তালেবানের ভূমিকা কী হবে সেটা দেখতেও তালেবানপ্রেমী ও বিরোধীদের অপেক্ষা করতে হবে আরও কিছু দিন।

লেখক: অধ্যাপক, আইন বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

ই-মেইল: [email protected]
/এসএএস/এমওএফ/

সম্পর্কিত

আমি কেন তালেবানকে সমর্থন করি না?

আমি কেন তালেবানকে সমর্থন করি না?

পরীমণি, ‘সরি মণি’

পরীমণি, ‘সরি মণি’

রাজনীতি ও ইতিহাসের ভুল পাঠ ও বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে শত্রুতা

রাজনীতি ও ইতিহাসের ভুল পাঠ ও বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে শত্রুতা

বিপদ ডেকে আনছে ভারত, ঝুঁকি বাংলাদেশেরও

বিপদ ডেকে আনছে ভারত, ঝুঁকি বাংলাদেশেরও

২১ হাজার কোটি টাকা ‘জানের সদকা’!

আপডেট : ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১৬:৩৮
প্রভাষ আমিন একসময় বাংলাদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় ব্যক্তি ছিলেন মাশরাফি বিন মোর্তজা। জাতীয় ক্রিকেট দলের সাবেক এই অধিনায়কের একদা জনপ্রিয়তাকে নিছক সবচেয়ে বেশি বললেও কম বলা হয়। আসলে তার জনপ্রিয়তা ছিল সর্বগ্রাসী। ভালো খেললেও সাকিব-তামিমদের সমালোচনাও কম ছিল না। বাংলাদেশের প্রথম সুপারস্টার মোহাম্মদ আশরাফুল তো ম্যাচ পাতানো কেলেঙ্কারিতে জড়িয়ে জাতীয় শত্রু হয়ে গেছেন। কিন্তু একটা সময় ছিল, যখন মাশরাফির কোনও শত্রু বা সমালোচক ছিল না। জাতি-ধর্ম-বর্ণ-রাজনীতি নির্বিশেষে সবাই ছিলেন মাশরাফির ভক্ত। নেতৃত্বে, পারফরম্যান্সে, মানবিকতায়, দেশপ্রেমে মাশরাফি ছিলেন সত্যিকারের আইডল। তার গুণগুলো নিশ্চয়ই আগের মতোই আছে। কিন্তু জনপ্রিয়তা আর আগের জায়গায় নেই। একটি দলে যোগ দিয়ে এমপি হতে গিয়ে তিনি জনপ্রিয়তায় ধস নামিয়েছেন।

মাশরাফি যত ভালোই হোন, আওয়ামী লীগ বিরোধীরা কিছুতেই আর তাকে পছন্দ করবে না। তাছাড়া গত বিশ্বকাপের পারফরম্যান্স, অবসর নিয়ে নানা নাটকীয়তায়ও মাশরাফির জনপ্রিয়তায় ধস নেমেছে। তবে যা শুনি, নড়াইলের এমপি হিসেবে তিনি সুখে-দুঃখে জনগণের পাশে থাকেন। প্রচলিত রাজনীতিবিদদের মতো নন তিনি। জনপ্রিয়তায় ধস নামলেও সেভাবে কোনও বিতর্কে কখনও জড়ায়নি মাশরাফির নাম। কিন্তু তার সারা জীবনের নিষ্কলঙ্ক ভাবমূর্তিতে কলঙ্ক লেপন করে দিয়েছে ই-অরেঞ্জ। এই ‘হায় হায়’ ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানের ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর ছিলেন মাশরাফি। কিন্তু সাধারণ জনগণের ১১০০ কোটি টাকা মেরে দিয়ে হাওয়া হয়ে গেছে ই-অরেঞ্জ। দুই মালিক কারাগারে, নেপথ্য মালিক ভারতের কারাগারে। কিন্তু মালিকদের আটকালেই তো সমস্যার সমাধান হচ্ছে না। জনগণের ১১০০ কোটি টাকা কে ফেরত দেবে?

আর কাউকে না পেয়ে ই-অরেঞ্জের প্রতারিত গ্রাহকরা মাশরাফির মিরপুরের বাসায় গিয়ে ভিড় করছেন। অন্য কেউ হলে হয়তো দায়িত্ব এড়ানোর চেষ্টা করতেন। কিন্তু মানবিক মাশরাফি তা করেননি। যদিও ই-অরেঞ্জের সঙ্গে তার চুক্তির মেয়াদ ফুরিয়েছে আগেই, তবু তিনি ই-অরেঞ্জের ক্ষুব্ধ গ্রাহকদের সঙ্গে কথা বলছেন, পাশে থাকার আশ্বাস দিচ্ছেন, তাদের হয়ে নানা জায়গায় কথা বলছেন। কিন্তু মাশরাফি যত আন্তরিকই হোন, ১১০০ কোটি টাকা আদায় করে দেবেন কোত্থেকে? মাশরাফিও বুঝেছেন গ্রাহকরা এই টাকা আর ফেরত পাবে না। একপর্যায়ে নাকি তিনি গ্রাহকদের টাকাটা ‘জানের সদকা’ হিসেবে দিয়ে দিতে বলেছেন।

‘জানের সদকা’ প্রসঙ্গে পরে আসছি। কিন্তু ই-অরেঞ্জের মেরে দেওয়া ১১০০ কোটি টাকার দায়িত্ব কে নেবে? অসহায় মাশরাফির হয়তো জানের সদকা দিতে বলা ছাড়া আর কিছু করার ছিল না। কিন্তু পুরো দায়িত্ব এড়ানোর সুযোগ কি তার আছে। তিনি তো ই-অরেঞ্জের ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর ছিলেন। কোনও গ্রাহক যদি দাবি করেন, মাশরাফিকে দেখেই তিনি ই-অরেঞ্জে টাকা দিয়েছেন, তাহলে মাশরাফি কীভাবে দায় এড়াবেন। মাশরাফি একা নন, এই হায় হায় কোম্পানিগুলো তাদের প্রতি জনগণের আস্থা তৈরি করতে বিভিন্ন ক্ষেত্রের তারকাদের ফেসভ্যালু ব্যবহার করে। সন্দেহভাজন আরেক কোম্পানি আলিশা মার্টের ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর সাকিব আল হাসান। ই-অরেঞ্জের গ্রাহকরা তবু দুঃখের কথা বলার জন্য মাশরাফির বাসা পর্যন্ত যেতে পেরেছেন। আলিশা মার্টের কিছু হলে কেউ কি সাকিবের দেখা পাবেন? ডুবন্ত কোম্পানি ইভ্যালির ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর ছিলেন তাহসান। জনপ্রিয় নায়িকা শবনম ফারিয়া, ফেসবুক সেলিব্রেটি আরিফ আর হোসেন মোটা বেতনে ইভ্যালির উচ্চপদে চাকরি করেছেন। কেউ না কেউ নিশ্চয়ই তাহসান, শবনম বা আরিফকে দেখেও ইভ্যালিতে লগ্নি করে থাকতে পারেন। জনগণের মেরে দেওয়া অর্থে এই হায় হায় কোম্পানিগুলো ক্রিকেট টিমের স্পন্সর করে, সিনেমা বানায়, গণমাধ্যমে বিজ্ঞাপন দেয়।

এভাবে তারা বাবল তৈরি করে এবং আরও বেশি মানুষের কাছ থেকে টাকা নেয়। মাশরাফি বলছেন, ই-অরেঞ্জকে ব্যবসা করার অনুমতি সরকার দিয়েছে। কোম্পানি ভালো না মন্দ সেটা দেখা সরকারের দায়িত্ব। মাশরাফি ভুল বলেননি। কিন্তু মাশরাফি বা সাকিব বা তাহসান তো এসব কোম্পানির স্রেফ মডেল নয়, ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর। সাধারণ মডেলরা হয়তো কোম্পানির ভালোমন্দের দায় এড়াতে পারেন, কিন্তু ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডররা নয়। এসব তারকা তাদের সারা জীবনের অর্জিত গুডউইল বিক্রি করেই ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর হতে পেরেছেন। বিনিময়ে তারা নিশ্চয়ই মোটা অঙ্কের অর্থ পেয়েছেন। কারণ, এখানে তাদের নিজের নামেই উপস্থাপন করা হয়েছে, মডেল হিসেবে নয়। সিগারেট কোম্পানিগুলোও বাংলাদেশে বৈধভাবে ব্যবসা করছে। মাশরাফি বা সাকিব কি কোনও কোম্পানির ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর হবেন? ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর হতে হলে অবশ্যই তারকাদের যাচাই-বাছাই করে নিতে হবে। কোম্পানি ডুবে গেলে গা ঝাড়া দিয়ে নিজেকে দায়মুক্ত করার সুযোগ নেই।

এবার আসছি, ‘জানের সদকা’ প্রসঙ্গে। মানুষ বিপদে পড়লে জানের সদকা হিসেবে সামর্থ্য অনুযায়ী টাকা-পয়সা দান করেন। কিন্তু একজন মানুষ ‘জানের সদকা’ হিসেবে কত টাকা ছেড়ে দিতে পারেন? জানই যদি না থাকে, সদকা দেবেন কোত্থেকে?

পত্রিকায় দেখলাম, সালাউদ্দিন নামে একজন তার জীবনের সর্বস্ব এক করে বিভিন্ন ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানে ২ কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছিলেন। কিন্তু এখন তিনি পথের ফকির। জানের সদকা দিলে কি তার জান থাকবে? এর আগে যুবক, ডেসটিনিতে সর্বস্ব হারিয়ে অনেকের আত্মহননের খবর পত্রিকায় এসেছে। দুদিন আগে প্রথম আলো লিখেছে, গত ১৫ বছরে যুবক, ডেসটিনি, ইউনিপেটু, এহসান গ্রুপ, ই-অরেঞ্জ, ইভ্যালি এবং বিভিন্ন সমবায় সমিতি মিলে জনগণের ২১ হাজার কোটি টাকা লোপাট করেছে। এবং এই ২১ হাজার কোটি টাকার এক টাকাও কেউ ফেরত পাননি। এই ২১ হাজার কোটি টাকা তো সরাসরি জনগণের পকেট থেকে গেছে। এর সঙ্গে বিভিন্ন ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান বা শেয়ারবাজারের লুটপাট হিসাব করলে লোপাট হওয়া টাকার পরিমাণ লাখো কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে। এই টাকাও শেষ পর্যন্ত জনগণেরই। লোপাট হওয়ার পর আমরা সবাই মিলে শোরগোল তুলি। কিন্তু ইভ্যালি বলুন আর ডেসটিনি, সবাই কিন্তু সবার চোখের সামনেই লুটপাটটা করেছে। সবাইকেই এর দায় নিতে হবে। যেমন নিতে হবে ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডরদের, ক্রিকেট টিমকে, বিজ্ঞাপন নেওয়া গণমাধ্যমকে।

তবে শেষ পর্যন্ত দায় বলুন আর ব্যর্থতা বলুন, পুরোটাই সরকারের। এখন গ্রেফতার করে, বিচার করে দায় এড়ানো যাবে না। ডেসটিনির রফিকুল আমিন বছরের পর বছর কারাগারে আছেন। সেখানে তিনি অসুস্থতার অজুহাতে হাসপাতালে থাকেন, হাসপাতালে বসে জুমে ব্যবসায়িক মিটিং করেন। কিন্তু তাতে সাধারণ মানুষ তো টাকা ফেরত পায়নি। ইভ্যালির রাসেল বা তার স্ত্রীকে সারা জীবন কারাগারে রাখলেও তো প্রতারিত সাধারণ মানুষ টাকা ফেরত পাবেন না।

জনগণের জানমালের নিরাপত্তা দেওয়ার দায়িত্ব সরকারের। কিন্তু যুবক, ডেসটিনি, ইউনিপেটু, ইভ্যালি, ই-অরেঞ্জের ক্ষেত্রে বারবার তারা জনগণের মালের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়েছে। কোনও কিছুর প্রথমবারে হয়তো সরকার বলতে পারে, তারা বুঝতে পারেননি। কিন্তু বারবার নানা ফর্মে একই স্টাইলে প্রতারণা করে মানুষের টাকা মেরে দেবে, আর সরকার বসে বসে বক্তৃতা দেবে; এটা হতে পারে না। ইভ্যালি নিয়ে তো এক বছর ধরেই ফিসফাস চলছিল। বাংলাদেশ ব্যাংক তো একবার তাদের অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ করে এক মাস পর আবার ছেড়েও দিয়েছিল। ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ছেড়ে দেওয়া মানে তো তাদের গ্রিন সিগন্যাল দেওয়া।

এই দায় তো বাংলাদেশ ব্যাংককে নিতেই হবে। দায়িত্ব নিলে জনগণের জানমালের নিরাপত্তা দিতেই হবে। নইলে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় বা বাংলাদেশ ব্যাংকের দায়িত্বশীলরা দায়িত্ব ছেড়ে দিন। একটি দেশে সুশাসন থাকলে, আইনের শাসন থাকলে দিনেদুপুরে এমন লুটপাট চলতে পারে না। প্রতারকদের বিচার চলুক, শাস্তি হোক; পাশাপাশি যুবক, ডেসটিনি, ইউনিপেটু, ইভ্যালি, ই-অরেঞ্জের মতো হায় হায় কোম্পানির সব স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ বিক্রি করে আনুপাতিক হারে হলেও জনগণের টাকা ফিরিয়ে দেওয়া হোক।

২১ হাজার কোটি টাকা ‘জানের সদকা’ দেওয়ার সামর্থ্য আমাদের নেই।
 
লেখক: হেড অব নিউজ, এটিএন নিউজ
/এসএএস/এমওএফ/

সম্পর্কিত

চাপ নয়, শিক্ষা হোক আনন্দের

চাপ নয়, শিক্ষা হোক আনন্দের

‘চোরে না শোনে ধর্মের কাহিনি’

‘চোরে না শোনে ধর্মের কাহিনি’

‘সভ্য সমাজে এগুলো হতে পারে না’

‘সভ্য সমাজে এগুলো হতে পারে না’

১৫ আগস্টের দায় কেন বিএনপির?

১৫ আগস্টের দায় কেন বিএনপির?

দরিদ্র মৃত্যুপথযাত্রী ছাত্র যদি ‘মেধাবী’ না হয়?

আপডেট : ২২ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১৭:৫৯
ডা. জাহেদ উর রহমান মাসখানেক আগে, ১৩ আগস্ট ছিল গুণী নির্মাতা তারেক মাসুদের মৃত্যুবার্ষিকী। তার সঙ্গে মারা যাওয়া আরেকজন মানুষের নামও আমাদের মনে আছে– মিশুক মুনীর। এ বছর সেই ঘটনার এক দশক পূর্ণ হয়েছে বলে মিডিয়ায় সেটি উল্লেখ করে সবাই গুরুত্ব দিয়ে সংবাদটি প্রকাশ করেছে। সেই বছরই এই দুর্ঘটনার ঠিক এক মাস আগে ঘটা আরেকটি ভয়ংকর দুর্ঘটনার কথা কি মনে আছে আমাদের? সেই দুর্ঘটনাটির এক দশক পূর্তি হয়েছে। প্রিয় পাঠক, মনে করার চেষ্টা করুন। একটু পরে আসছি সেই দুর্ঘটনার কথায়।

খুব স্পষ্টভাবে আমি তারেক মাসুদের দুর্ঘটনা এবং তার পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহের কথা মনে করতে পারি। মনে আছে, সে সময়ে কী অবিশ্বাস্য তোলপাড় ঘটে গিয়েছিল সারাদেশে। ভীষণ গুণী এই দুই জন মানুষের মৃত্যু আমাদের কাঁপিয়ে দিয়ে যায় ভীষণভাবে। প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ সবাই শোকে মুহ্যমান হন। অবহেলাজনিত সড়ক দুর্ঘটনাকে ‘হত্যা’ দাবি করে মানুষ ফুঁসে ওঠে, প্রতিবাদ করে ওই ‘হত্যাকাণ্ডের’। এ ঘটনার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ব্যাপার ছিল – আমাদের বুদ্ধিজীবী, শিল্পসাহিত্য আর সংস্কৃতির মানুষদের ‘অসাধারণ প্রতিবাদী’ হয়ে ওঠা। মিডিয়ায় অনেক খবর, অনেক আলোচনা, অনেক প্রতিবাদ, অনেক ধিক্কার। সারাদেশে মানববন্ধন হলো, এমনকি ঈদের দিন শহীদ মিনারে অবস্থান কর্মসূচি হলো। টিভি ক্যামেরার সামনে সবার শোকের মধ্যেও ছাপিয়ে উঠলো যোগাযোগমন্ত্রীর পদত্যাগের দাবি।

ওই দুর্ঘটনাকে কেন্দ্র করে আমাদের সামষ্টিক উন্মাদনা এমন পরিস্থিতিতে পৌঁছেছিল যে সেটা একজন মানুষের জীবনের ওপর এক বড় সংকট তৈরি করেছিল। এই দুর্ঘটনায় জড়িত বাসটির চালক জামিরকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়। গত বছর কাশিমপুর কারাগারে থাকা অবস্থায় তার হার্ট অ্যাটাক হয় এবং তিনি মারা যান।

জমিরের মৃত্যুর পেছনে আমাদের এক সংকটও উন্মোচিত হয়েছে। সেই দুর্ঘটনার ব্যাপারে দেশের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একজন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. শামসুল হক (সাবেক পরিচালক, দুর্ঘটনা রিসার্চ ইনস্টিটিউট, বুয়েট) দীর্ঘ নিবন্ধ লিখেছেন একটি বিদেশি সংবাদ সংস্থার বাংলা ভার্সনে। সেখানে তিনি দেখিয়েছেন এই দুর্ঘটনার জন্য জমিরের বাসটি দায়ী ছিল না। তিনি আদালতে দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে সাক্ষ্যের সঙ্গে টেকনিক্যাল মতামতের প্রতিও গুরুত্ব আরোপ করেন। এই দুর্ঘটনার দায়ভার নিয়ে তিনি তার বিশ্লেষণ শেয়ার করেছেন তারেক মাসুদের মামলার আইনজীবী, অ্যাটর্নি জেনারেল এবং আইনমন্ত্রীর সঙ্গে। কিন্তু এরপরও প্রক্রিয়াগত কারণে পারেননি সেই বাসচালকের শাস্তি ঠেকাতে।

সড়ক দুর্ঘটনা কি এই দেশে খুব কম হয়? দেশে সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলো যে সংখ্যা আমাদের জানায়, সেটা পত্রিকায় প্রকাশিত সংখ্যা। বাস্তব সংখ্যা আরও অনেক বেশি। সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ে বাংলাদেশ সরকার পরিচালিত হেলথ ইঞ্জুরি সার্ভে-২০১৬-তে জানা যায়, এই দেশে প্রতিদিন গড়ে ৬৪ জন মানুষ প্রাণ হারায়। অর্থাৎ বছরে এই সংখ্যা ২৩ হাজারের বেশি। ‘মজার’ ব্যাপার হলো, এই সংখ্যাগুলো আমাদের বিবেককে নাড়া দেয় না, জাগিয়ে তোলে না। আমাদের কাছে ‘নিছকই কতগুলো সংখ্যা, পরিসংখ্যান’।

তারেক মাসুদ আর মিশুক মুনীরের প্রাণ কেড়ে নেওয়া দুর্ঘটনাটির মাসখানেক আগের যে দুর্ঘটনাটির কথা বলছিলাম মনে পড়েছে সেটার কথা? ২০১১ সালের ১১ জুলাই মিরসরাইয়ে ঘটেছিল সেই দুর্ঘটনাটি। মারা গিয়েছিল নিতান্ত ‘সাধারণ’ কিশোররা। দুর্ঘটনায় ‘সাধারণ’ মানুষের মৃত্যু অত্যন্ত তুচ্ছ খবর আমাদের দেশে। কিন্তু তখন এ খবরটি বেশ বড় হয়েছিল। শুধু একটি সড়ক দুর্ঘটনায় ৪৪ জন কিশোর মারা গিয়েছিল। স্কুলের ফুটবল দলের খেলা দেখে পিকআপে করে ফিরছিল তারা। পিকআপটি গিয়ে একটি পুকুরে পড়ে।

দুর্ঘটনাটির পরে কখনও কখনও সেই দিনটিকে স্মরণ করে আমাদের দেশের কোনও কোনও মিডিয়ায় খবর প্রকাশিত হয়েছে। এই বছর তারেক মাসুদের দুর্ঘটনাটির মতো সেই দুর্ঘটনার এক দশক পূর্তি হলো। খুঁজে দেখলাম হাতে গোনা একটি বা দুটি মিডিয়ায় খবরটি হয়েছে।

তবে আমি মিডিয়াকে দোষ দিচ্ছি না। মিডিয়ার সংবাদও প্রায় সব ক্ষেত্রেই মেনে চলে অর্থনীতির 'চাহিদা-জোগান তত্ত্ব'। আসলেই আমরা ‘শিক্ষিত’ মধ্যবিত্তরা মিরসরাইয়ের খবরটি ভুলে যেতে চেয়েছি। নিতান্ত গ্রামের নিম্ন-মধ্যবিত্ত থেকে দরিদ্র কিশোররা ছিল এই দুর্ঘটনার শিকার। ঘটনার সময় সংখ্যার ওজনটা আমাদের কিছুটা প্রভাবিত করলেও সময়ের সঙ্গে ফিকে হয়ে গেছে সব।

অথচ দুর্ঘটনার কথা যদি আমরা ভাবি তাহলে দেখবো একজন বিখ্যাত বা সামর্থ্যবান মানুষের দুর্ঘটনায় মৃত্যুর চেয়ে একটা অতি সাধারণ মানুষের মৃত্যু অনেক বেশি ভয়ংকর। তারেক মাসুদের মৃত্যুর পর তার পরিবার পথে বসে যায়নি কিংবা সেটা ঘটেনি মিশুক মুনীরের পরিবারের ক্ষেত্রেও। কিন্তু সেই দুর্ঘটনায় তাদের বহনকারী মাইক্রোবাসের চালকও মারা গিয়েছিল; তার পরিবারের কথা কি আমরা ভাবি?

বাসচালক জমিরের পরিবারের কী অবস্থা, সেই খোঁজ কি আমরা নিয়েছি? কীভাবে চলছে পরিবারগুলোর জীবিকা? বহু দুর্ঘটনায় পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম মানুষটি মারা যায় কিংবা বিকলাঙ্গ হয় এবং পরিবারটির জীবন তছনছ হয়ে যায়। কিন্তু এভাবে আমরা কখনও ভাবি না। তাই এসব মৃত্যু আমাদের ক্ষুব্ধ করে না। তাই আমরা সোচ্চারও হই না সড়ক দুর্ঘটনার বিরুদ্ধে।

এই মানসিকতা রয়েছে আমাদের চিন্তার অনেক ক্ষেত্রেই। মাঝে মাঝেই পত্রিকায় চিকিৎসার জন্য সাহায্য চেয়ে বিজ্ঞাপন দেখা যেত আগে; কমে গেলেও এখনও দেখা যায়। এখন তো আবার সামাজিকমাধ্যম আছে এর জন্য। জটিল, দুরারোগ্য কোনও রোগে আক্রান্ত মানুষটি যদি কোনও ছাত্র হয় তাহলে খুব টিপিক্যালি লেখা হতো এভাবে- একজন দরিদ্র, মেধাবী ছাত্রকে বাঁচাতে এগিয়ে আসুন। বাংলাদেশে নিশ্চয়ই জটিল-কঠিন রোগে আক্রান্ত সব ছাত্র মেধাবী নয়; অনেকেই আছে মাঝারি, খুব কম মেধার মানুষ।

এই চর্চাও নিশ্চয়ই অর্থহীন নয়। মানুষের আবেগের সঙ্গে কানেক্টেড হওয়ার জন্য কোনও সাধারণ 'কম মেধার/বোকা ছাত্রের’ মৃত্যুপথযাত্রী হাওয়া হয়তো ঠিকঠাক কাজ করে না। আমরা হয়তো দায়বদ্ধতা বোধ করি ‘মেধাবী’দের বাঁচানোর জন্য। তাই সবাইকে গায়ের জোরে ‘মেধাবী’ বানিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চলতেই থাকে।

কথাগুলো এভাবে বলা হয়তো অর্থহীনই। বিদ্যমান অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় বেশি মূল্য কিংবা কম মূল্যের ধারণা তো থাকারই কথা। কিন্তু একই রকম অর্থনৈতিক ব্যবস্থার পশ্চিমা দেশগুলোর পরিস্থিতি তো এতটা ভয়ংকর নয়। সাধারণ মানুষের জীবন সেখানে এতটা মূল্যহীন নয়। সেখানে এতটা মর্যাদাহীন নয় সাধারণ মানুষ।

বাজারে সব পণ্য যেমন একই মূল্যে বিকায় না, তেমনি প্রতি মানুষের ‘মূল্যও’ সমান নয়। কিন্তু তবু কথা থেকে যায়, মূল্য একটা পারসেপশন। পুরোপুরি না হোক সেই পারসেপশন কিছুটা হলেও পাল্টালে এই সমাজটা হয়তো আরেকটু ভালো হতে পারতো। কিন্তু না, আমরা হাঁটছি না সেই পথে, যাচ্ছি উল্টো দিকে।
 
লেখক: শিক্ষক ও অ্যাকটিভিস্ট
/এসএএস/এমওএফ/

সম্পর্কিত

পরীমণি’র মুক্তির আন্দোলন কি কেবলই ‘স্টান্টবাজি’?

পরীমণি’র মুক্তির আন্দোলন কি কেবলই ‘স্টান্টবাজি’?

‘টিকটক অপু’র ‘জাতে ওঠা’ নিয়ে গাত্রদাহ

‘টিকটক অপু’র ‘জাতে ওঠা’ নিয়ে গাত্রদাহ

সাংবাদিক নির্যাতনে ডিসিকে শাস্তির ‘আইওয়াশ’

সাংবাদিক নির্যাতনে ডিসিকে শাস্তির ‘আইওয়াশ’

পরীমণির মামলা আর বিচারাঙ্গনে ‘পপুলিজম’

পরীমণির মামলা আর বিচারাঙ্গনে ‘পপুলিজম’

কন্যা সন্তানের জন্ম উদযাপিত হোক

আপডেট : ২২ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১৬:২৮

সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা করোনা সংক্রমণে বদলেছে জীবন। ভয়ংকর ভাইরাস প্রভাব রেখে গেছে বা যাচ্ছে আর্থ-সামাজিক পরিস্থিতিতে। এই আবহে দারিদ্র্য বেড়েছে, বেড়েছে বাল্যবিবাহও। দীর্ঘ ১৮ মাসের করোনা অতিমারিকালে স্কুল বন্ধ থাকায় সারাদেশে বাল্যবিয়ের মহামারি লেগেছে। বাংলাদেশে বরাবরই বাল্যবিয়ের হার বেশি, করোনাকালে সেটা যেন আরও গতি পেয়েছে। ১৫ বছরের কম বয়সী মেয়েদের বিয়ের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সারা বিশ্বে সর্বোচ্চ স্থানে অবস্থান করছে। বাংলাদেশে শতকরা ২৯ ভাগ মেয়েরই বিয়ে হয় ১৫ বছরের কম বয়সে৷ এরমধ্যে শতকরা দুই ভাগ মেয়ের বিয়ে হয় ১১ বছরের কম বয়সে।  

অবস্থাটা কেমন তার কিছু চিত্র উঠে এসেছে গণমাধ্যমে। করোনার বন্ধে সাতক্ষীরা সদর উপজেলার আলীপুর আদর্শ মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ের ৫০ জন ছাত্রীর বাল্যবিয়ে হয়েছে। এরকম আরও অসংখ্য স্কুলের একই চিত্র। কোনও কোনও উপজেলায় শতাধিক মেয়ের এই পরিণতি হয়েছে। নিম্ন মধ্যবিত্ত ও দরিদ্র পরিবারগুলোয় এখন অর্থাভাব। ফলে, কিশোরী মেয়েকে বিয়ে দিয়ে দেওয়াকেই নিরাপদ ভাবছে এসব পরিবার। স্কুল বন্ধ থাকা, পরিবারের আয় কমে যাওয়া ও নিরাপত্তাহীনতায় মেয়ে শিশুদের বিয়ে দিয়ে দিচ্ছেন অভিভাবকরা। করোনার আগে বাল্যবিয়ে প্রতিরোধে যে রকম প্রশাসনিক এবং সামাজিক উদ্যোগ ছিল, সেই উদ্যোগে ভাটা পড়েছে, এমনটা অনেক জনপ্রতিনিধিই বলছেন। এর বাইরে আছে অর্থনৈতিক কারণ। বেশিরভাগ পরিবার তাদের কর্মসংস্থান হারিয়েছে, তারা অসম্ভব দারিদ্র্যের মধ্যে বসবাস করছে। ২০১৪ সালে সরকার ঘোষণা করেছিল, ২০৪১ সালের মধ্যে বাল্যবিয়ে সম্পূর্ণ বন্ধ করা হবে। তবে এর পর পর সরকার নিজেই মেয়েদের বিয়ের ন্যূনতম বয়স ১৮ থেকে ১৬-তে নামিয়ে আনে।

স্থানীয় স্তরে সরকারি দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের নিষ্ক্রিয়তা, জনপ্রতিনিধিদের সহযোগিতার ফলে অনিয়ন্ত্রিত বাল্যবিয়ে। কোনও কোনও জেলা-উপজেলায় প্রশাসনের লোকজন জানতে পারলে কিছু বিয়ে ঠেকাতে উদ্যোগী হন। তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে অভিভাবকরা এগুলো করেন সমাজপতিদের ম্যানেজ করে। করোনাকালে এই প্রবণতা বাড়লেও, কিছু অঞ্চলে বরাবরই বাল্যবিয়ের হার বেশি। প্রাকৃতিক দুর্যোগের ব্যাপক প্রবণতা যেসব উপকূলীয় অঞ্চলে বেশি, সেখানকার মেয়েরা এই ঝুঁকির মধ্যে বেশি নিপতিত।  এসব দুর্যোগ তাদের পরিবারকে দারিদ্র্যের দিকে ঠেলে দেয়, যা পরিবারগুলোকে মেয়ের বিয়ে দিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করে।

অর্থনৈতিক কারণ অবশ্যই আছে। করোনাকালে সেটা আরও বড় হয়েছে। কিন্তু বাল্যবিয়ের ক্ষেত্রে নানা কুযুক্তিও চালু আছে সমাজে। ছোটবেলা থেকে শেখানো হয় বিয়ে আসলে ভাগ্য-নির্ধারিত। সেখানে কারও হাত নেই। বেশিরভাগ পরিবার এবং তাদের শুভাকাঙ্ক্ষীরা বলে, ভালো ছেলে পাওয়া গেছে, দাবিদাওয়া নেই, তাই  এমন পাত্র হাতছাড়া করা যায় না। আরেকটা বড় কারণ গ্রামাঞ্চলে মেয়েদের নিরাপত্তা।  তারা একটু বড় হলেই বখাটে ও মাস্তানদের নজরে পড়ে, এ নিয়ে একেকটা পরিবার অনিরাপদ হয়ে পড়ে।  নিরাপত্তা তো পায়ই না, উল্টো এলাকা ছাড়ার অবস্থা হয় অনেক সময়।

বাল্যবিয়ে রোখার পথটা সুগম নয়। আইন প্রণীত হয়। কিন্তু অনেক ধীরগতিতে মানুষের মনে পরিবর্তন আসে।  পুরুষতান্ত্রিকতা ও বয়ঃপ্রাপ্ত মেয়েদের নিয়ে এক গভীর সামাজিক অনিশ্চয়তাই বাল্যবিয়ের মতো রোগকে প্রশ্রয় দিয়ে থাকে। এর সঙ্গে যোগ হয় মেয়েদের উপার্জনক্ষম মানবসম্পদ হিসেবে ভাবতে না পারার সামাজিক ব্যর্থতা।

বাল্যবিয়ে নামের যে সামাজিক ব্যাধি বাংলাদেশকে গ্রাস করছে, তা থেকে রেহাই পেতে হলে আইন প্রয়োগের পাশাপাশি সামাজিক জাগরণ প্রয়োজন।  প্রশাসনিক পদক্ষেপ অবশ্যই দরকার, কিন্তু তার সঙ্গে প্রয়োজন সামাজিক আন্দোলন। সামাজিক মাধ্যমে মৌলবাদী গোষ্ঠী নিরন্তর বাল্যবিয়ের পক্ষে প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছে। এর বিপরীতে দীর্ঘ ও নিরবচ্ছিন্ন প্রচার প্রয়োজন সরকার ও সমাজের সচেতন মহল থেকে।  প্রশাসনের সক্রিয় অবস্থান এবং শিক্ষক-শিক্ষিকাদের সহযোগিতায় এতে বড় পরিবর্তন আসতে পারে।  স্কুলে-স্কুলে, পাড়ায়-পাড়ায় বাল্যবিয়েবিরোধী ক্লাব করা প্রয়োজন।  উদ্যোগটা আগে শুরু হতে পারে সরকারি স্কুলগুলোতে। ধর্মীয় নেতা, ইমামসহ সমাজপতিদের এ বিষয়ে দায়বদ্ধ করে তুলতে হবে।

একসময়ের নিয়মিত প্রচারে বাল্যবিয়ের কুফল যেভাবে মানুষ জানতে পেরেছিল সেগুলো যেন এখন ভুলতে বসেছে। অনেক শিক্ষিত পরিবারও মেয়েদের দ্রুত পাত্রস্থ করার পক্ষে। বাল্যবিয়ে নারী শরীরের পরিপূর্ণ বৃদ্ধি ও পুষ্টিতে অন্তরায়। বাল্যবিয়ে সুস্থ সন্তান জন্মের সম্ভাবনা কমিয়ে দেয়। বাল্যবিয়ে শ্বশুরবাড়িতে নারীর সম্ভ্রম-সম্মান-গুরুত্ব কমে যাওয়ার অন্যতম কারণ, অর্থনৈতিক স্বাবলম্বনেরও অন্তরায়- এ কথাগুলো নতুন করে জোরেশোরে বলার সময় এসেছে আবার।  
তাই বলছি, বাল্যবিয়েবিরোধী প্রচারে যে পরিবর্তন সাধিত হয়েছিল সেটা আবার বদলে যাচ্ছে। পথ এখনও দুর্গম এবং গন্তব্য দূরবর্তী। নতুন নতুন প্রবণতা তৈরি হচ্ছে প্রশাসনকে ফাঁকি দেওয়ার। যেখানে বাল্যবিয়ে ঠেকানো হচ্ছে সেখানে কোনও স্থানীয় প্রভাবশালীর নেতৃত্বে পাত্রপাত্রীকে অন্যত্র নিয়ে গিয়ে বিয়ে দেওয়া হচ্ছে। সমাজের সর্বস্তরের মানুষকে এই বিষয়ে সংবেদনশীল করে তুলতে না পারলে প্রবণতা ঠেকানো কঠিন।

বাংলাদেশে তো নানা প্রকল্প হয়। এবার নতুন একটি প্রকল্প হোক। প্রতিটি ঘরে প্রতিটি কন্যার জন্মকে উদযাপন করে তাকে আদরের সঙ্গে বরণ করে নেওয়ার প্রকল্প বাস্তবায়িত হোক।

লেখক: সাংবাদিক

/এসএএস/এমওএফ/

সম্পর্কিত

কাজের কথা

কাজের কথা

স্কুল যখন খুলছে

স্কুল যখন খুলছে

৪৩ বছরে বিএনপি

৪৩ বছরে বিএনপি

জনপ্রতিনিধি ও জনপ্রশাসক

জনপ্রতিনিধি ও জনপ্রশাসক

খুলেছে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, রয়েছে শঙ্কাও

আপডেট : ২১ সেপ্টেম্বর ২০২১, ২০:১২

ড. প্রণব কুমার পান্ডে ১৭ মার্চ ২০২০ সাল থেকে বাংলাদেশের সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান করোনা অতিমারির বিপর্যয়ের কারণে বন্ধ থাকায় শিক্ষা ব্যবস্থা প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছিল। শিক্ষার্থীরা তাদের প্রিয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে না যেতে পেরে অলস সময় অতিবাহিত করেছে প্রায় দেড় বছর। এ সময় অনেকের মধ্যে উৎকণ্ঠা বাড়তে থাকে তাদের শিক্ষা জীবনের ভবিষ্যৎ নিয়ে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকাকালীন  শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে অনলাইন ক্লাস এবং অ্যাসাইনমেন্ট কার্যক্রম চলমান থাকলেও অনেকেই এই কার্যক্রমের আওতায় বাইরে ছিল বলে বিভিন্ন পত্রপত্রিকার মাধ্যমে জানা যায়। একথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে বাংলাদেশে ডিজিটাল পদ্ধতিতে সেবা প্রদানের ক্ষেত্রে ব্যাপক উন্নতি হলেও এখন পর্যন্ত দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ইন্টারনেটের গতি ও নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের ক্ষেত্রে সমস্যা রয়েছে। এছাড়াও রয়েছে গ্রামীণ অঞ্চলে শিক্ষার্থীদের অনলাইন ক্লাসে অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে ডিভাইসের অপ্রতুলতা।

এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে সরকারি বিভিন্ন ধরনের প্রচেষ্টা সত্ত্বেও প্রাতিষ্ঠানিকভাবে অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রম সফল করার জন্য শিক্ষকমণ্ডলীরও দায় রয়েছে। কারণ, শিক্ষা ব্যবস্থার বিভিন্ন পর্যায়ে অনেক শিক্ষক রয়েছেন যারা এখনও নিজেদের অনলাইন কার্যক্রমের সঙ্গে পরিচিত করে উঠতে পারেননি। বিভিন্ন ধরনের সীমাবদ্ধতা থাকলেও সরকার বারবার চেষ্টা করেছে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো খুলে দেওয়ার জন্য। কিন্তু কিছু সময় বিরতির পর কোভিড-১৯ পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করায় বারবার সরকারি সিদ্ধান্ত পরিবর্তিত হয়েছে। যাহোক, করোনার তৃতীয় ঢেউ যখন নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রয়েছে ঠিক সেই সময় শিক্ষা মন্ত্রণালয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো খুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।  সিদ্ধান্তটি সত্যিই প্রশংসার দাবি রাখে। শিক্ষা মন্ত্রণালয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরিচালনার কিছু গাইডলাইন বা নির্দেশনা প্রস্তুত করে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে বিতরণ করেছে। পঞ্চম শ্রেণি এবং মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক স্তরের ছাত্রছাত্রীদের প্রত্যেক দিন ক্লাসের ব্যবস্থা রেখে অন্যান্য শ্রেণির শিক্ষার্থীদের জন্য একদিন স্কুলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত সঠিক বলে মনে হয়। কারণ, শিক্ষার্থীরা একদিন স্কুলে গেলেও তাদের মানসিক বিপর্যস্ততা কাটিয়ে ওঠে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারবে বলে আমার বিশ্বাস।
 
শিক্ষার্থীরা হলো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রাণ। শিক্ষার্থীশূন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান মরুভূমির মতো। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খোলার সিদ্ধান্তে নিশ্চিতভাবেই প্রাণের সঞ্চার হয়েছে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে। তবে আমাদের মধ্যেও এক ধরনের শঙ্কাও সব সময় কাজ করছে। আমরা নিকট অতীতে আমেরিকার অভিজ্ঞতার দিকে যদি দৃষ্টি দেই তাহলে দেখবো, সেখানে বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খোলার পর শিক্ষার্থীদের করোনা আক্রান্তের হার আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে গেছে। এমনকি আক্রান্ত শিশুদের একটি বড় অংশকে আইসিইউতেও ভর্তি করতে হয়েছে। এ ধরনের ঘটনা সত্যিই আমাদের শঙ্কার মধ্যে ফেলেছে। আর এ কারণেই মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী এবং স্বাস্থ্যমন্ত্রী  যে বার্তাটি দেওয়ার চেষ্টা করেছেন তা হলো, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খোলায় কিংবা করোনা পরিস্থিতি আবার যদি খারাপ হয় তাহলে এসব প্রতিষ্ঠান বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নিতে হবে। শঙ্কা থাকলেও গত কয়েক দিন ধরে যেভাবে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কার্যক্রম চলছে তাতে সত্যিই আনন্দিত আমরা।

তবে শিক্ষার্থীদের পাঠদান এবং পরীক্ষা চলমান রাখার ক্ষেত্রে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জের বিষয় আমাদের সব সময় মনে রাখতে হবে। আমাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে সুযোগ-সুবিধা উন্নত দেশের মতো নয়। তবে অত্যন্ত আশার খবর হচ্ছে, খোলার পর থেকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে সরকারের গাইডলাইন মেনে চলার প্রবণতা লক্ষ করা গেছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ঢুকতে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা গেলেও ক্লাসরুমগুলোতে স্বাস্থ্যবিধি মানার মতো সক্ষমতা বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠানের নেই। কারণ, ছোট ছোট শ্রেণিকক্ষে অনেক বেশি শিক্ষার্থীর ক্লাস নেওয়া হয় বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠানে।

স্বীকার করতে হবে, এসব বিষয় মাথায় রেখেই একই শ্রেণির শিক্ষার্থীদের কয়েকটি ভাগ করে পাঠদান করার নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে, যা সুচিন্তিত সিদ্ধান্ত। তবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো, দেড় বছর বাসায় অবস্থান করায় কোমলমতি শিক্ষার্থীরা অবসাদগ্রস্ত হয়ে পড়েছে। এখন তারা কতটা স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে পারবে সেটাই বিচার্য। অনেক ক্ষেত্রেই লক্ষ করেছি, শিক্ষার্থীরা পরস্পরকে আলিঙ্গন করছে, মাস্ক খুলে গল্প করছে এবং এমনকি নিজেদের টিফিন ভাগাভাগি করছে।  এসব অবশ্য তারা আবেগে করছে। এখন স্বাস্থ্যবিধি লঙ্ঘন করে শিক্ষার্থীরা যদি দূরত্ব বজায় না রাখে, তবে  নিজেরা আক্রান্ত হতে পারে, তেমনি পরিবার এবং দেশে আক্রান্তের হার বৃদ্ধি পেতে পারে। শিক্ষার্থীদের সুরক্ষাবিধি মানার বিষয়টি নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষকে আরও সতর্ক থাকতে হবে।

সুরক্ষাবিধি মেনে চলার জন্য শিক্ষকদের পাশাপাশি অভিভাবকদেরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে হবে।  অভিভাবকরা সন্তানদের যদি বোঝাতে সক্ষম হন স্কুলে সহপাঠী এবং শিক্ষক-শিক্ষিকার কাছ থেকে নির্দিষ্ট দূরত্ব বজায় রেখে ক্লাস করতে হবে, মাস্ক পরতে হবে এবং বারবার হাত ধুয়ে পরিষ্কার রাখতে হবে, তবেই আক্রান্তের হার নিয়ন্ত্রণে থাকবে। এসব না মানলে করোনা পরিস্থিতি ব্যাপক আকার ধারণ করতে পারে।

শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে স্বাস্থ্য সুরক্ষাবিধি নিশ্চিত করা যেমন একটি চ্যালেঞ্জ, তেমনি অভিভাবকদের সুরক্ষাবিধি মেনে স্কুলের বাইরে অবস্থান করার বিষয়টি নিশ্চিত করা আরেকটি চ্যালেঞ্জ। মিডিয়ায় এসেছে, স্কুল গেটের বাইরে গাদাগাদি করে অবস্থান করছেন অভিভাবকরা, যা অত্যন্ত ভয়ের একটি বিষয়।  অস্বীকার করার উপায় নেই অভিভাবকরা অনেক দূর থেকে সন্তানদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নিয়ে আসেন এবং বসে থেকে স্কুল শেষে বাসায় নিয়ে যান। একবার স্কুলে আসার পরে বাসায় ফিরে পুনরায় স্কুলে আসা তাদের জন্য কঠিন। এ জন্যই তারা স্কুলের বাইরেই অপেক্ষা করেন।

মনে রাখতে হবে, অভিভাবকরা যদি নিজেদের সুরক্ষিত রাখতে না পারি, তাহলে সন্তানদের সুরক্ষা দেওয়া সম্ভব হবে না। অনেক অভিভাবক মিডিয়ায় বলেছেন, স্কুল কর্তৃপক্ষ তাদের বসার কোনও ব্যবস্থা করেনি। তবে, এখানে স্কুল কর্তৃপক্ষকে দোষ দিয়ে লাভ নেই। বাংলাদেশে অনেক স্কুল রয়েছে, বিশেষ করে যেগুলো শহরে অবস্থিত, সেই স্কুলগুলো অল্প জায়গার ওপরে নির্মিত। তাদের পর্যাপ্ত জায়গা নেই, যেখানে বসার ব্যবস্থা করতে পারে। ঢাকার পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ। সেখানে বিভিন্ন ভবনে স্কুল প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ফলে অভিভাবকরা স্কুলের বাইরে গাদাগাদি করে অবস্থান করেন। অভিভাবকরা যদি এরইমধ্যে আক্রান্ত হয়ে থাকেন, তবে খুব দ্রুত অন্যরা আক্রান্ত হবেন এবং পরিস্থিতি জটিল আকার ধারণ করবে।

তবে এসব চ্যালেঞ্জ নিয়েই এগোতে হবে। কেউই এখন সঠিকভাবে বলতে পারবো না কবে আমরা করোনামুক্ত পৃথিবীতে বাস করতে পারবো। ফলে, করোনা পরবর্তী নিউ নরমাল জীবন পদ্ধতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে চলাটাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। যদি খাপ খাইয়ে চলতে না পারি তাহলে আমরা পিছিয়ে পড়বো। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ এ পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে ঠিকই এগিয়ে চলেছে। আমাদেরও উচিত তা করা। এটা করতে পারলেই করোনা সৃষ্ট বিপর্যয় থেকে শিক্ষা ব্যবস্থাকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারবো।

শিক্ষা ব্যবস্থায় উন্নত দেশের সুযোগ-সুবিধা প্রত্যাশা করা কখনোই সমীচীন হবে না। দীর্ঘদিন  শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রেখে শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবন ধ্বংস করাও ঠিক হবে না। এখন পরিস্থিতি যেহেতু কিছুটা নিয়ন্ত্রণে রয়েছে, তাই আমরা যদি নিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন করি, তাহলে একদিকে শিক্ষা ব্যবস্থা ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করা সম্ভব হবে, তেমনি শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবন রক্ষা করা যাবে।


লেখক: অধ্যাপক, লোকপ্রশাসন বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।

/এসএএস/এমওএফ/

সম্পর্কিত

শিক্ষা ব্যবস্থায় প্রয়োজন অনলাইন-অফলাইন সমন্বয়

শিক্ষা ব্যবস্থায় প্রয়োজন অনলাইন-অফলাইন সমন্বয়

‘বিপদে আমি না যেন করি ভয়’

‘বিপদে আমি না যেন করি ভয়’

গ্রামাঞ্চলে টিকা কার্যক্রম: কিছু সুপারিশ

গ্রামাঞ্চলে টিকা কার্যক্রম: কিছু সুপারিশ

মহামারির বিপর্যয় মোকাবিলায় স্থানীয় সরকারের সম্পৃক্ততা জরুরি

মহামারির বিপর্যয় মোকাবিলায় স্থানীয় সরকারের সম্পৃক্ততা জরুরি

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

সর্বশেষ

এস এম সোলায়মানের জন্ম ও মৃত্যুদিন ঘিরে স্মারকানুষ্ঠান

এস এম সোলায়মানের জন্ম ও মৃত্যুদিন ঘিরে স্মারকানুষ্ঠান

‘আফগানিস্তানে রক্তপাত ও অস্থিতিশীলতার জন্য যুক্তরাষ্ট্র দায়ী’

‘আফগানিস্তানে রক্তপাত ও অস্থিতিশীলতার জন্য যুক্তরাষ্ট্র দায়ী’

অর্থ হারানোর ঘটনাই ঘটেনি: ইউনিয়ন ব্যাংক

অর্থ হারানোর ঘটনাই ঘটেনি: ইউনিয়ন ব্যাংক

করোনায় মৃত্যু ‘স্বপ্নে নিরাময় পাওয়ার’ দাবি করা এলিয়ান্থা হোয়াইটের

করোনায় মৃত্যু ‘স্বপ্নে নিরাময় পাওয়ার’ দাবি করা এলিয়ান্থা হোয়াইটের

গণমাধ্যম নিয়ে যা বললেন নওফেল

গণমাধ্যম নিয়ে যা বললেন নওফেল

‘টিকায় বৈষম্য মানবতার জন্য কলঙ্ক’

‘টিকায় বৈষম্য মানবতার জন্য কলঙ্ক’

‘অক্টোবরে রংপুরে থানা-ওয়ার্ড কমিটি গঠনে আ.লীগের বর্ধিত সভা’

‘অক্টোবরে রংপুরে থানা-ওয়ার্ড কমিটি গঠনে আ.লীগের বর্ধিত সভা’

সঞ্চয়পত্রের মুনাফা কমায় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন যারা

সঞ্চয়পত্রের মুনাফা কমায় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন যারা

‘জিনের বাদশার’ কথায় ২৮ লাখ টাকা হারালেন প্রবাসী

‘জিনের বাদশার’ কথায় ২৮ লাখ টাকা হারালেন প্রবাসী

জানা গেলো তামিমের নেপাল যাওয়ার কারণ

জানা গেলো তামিমের নেপাল যাওয়ার কারণ

টাকা নিয়ে দ্বন্দ্ব, মারধরের ৮ দিন পর ছাত্রলীগকর্মীর মৃত্যু

টাকা নিয়ে দ্বন্দ্ব, মারধরের ৮ দিন পর ছাত্রলীগকর্মীর মৃত্যু

বাউবি’র স্থগিত বিএ ও বিএসএস পরীক্ষা  শুক্রবার শুরু

বাউবি’র স্থগিত বিএ ও বিএসএস পরীক্ষা  শুক্রবার শুরু

সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ

© 2021 Bangla Tribune