X
মঙ্গলবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১৩ আশ্বিন ১৪২৮

সেকশনস

করোনার করুণ কাহিনি: মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধের পটভূমি ও ‘বাংলাদেশ ভ্যারিয়েন্ট’

আপডেট : ১১ জুলাই ২০২১, ১৬:০৬

মাকসুদুল হক ‘জগৎ মুক্তিতে ভোলালেন সাঁই
ভক্তি দাউও যাতে তোমার
রাঙা চরণ দুটি পাই’—ফকির লালন শাহ

১. যুদ্ধের আপডেট ও ক্ষয়ক্ষতির সম্ভাব্য পূর্বাভাস ৮-১০ জুলাই ২০২১:

১ জুলাই ২০২১ লকডাউন কার্যকর হওয়ার পর যেসব তথ্য উপাত্ত আমাদের নজরে এসেছে, তাতে স্পষ্টত প্রতীয়মান এ সপ্তাহের সংক্রমণ ও মৃত্যুর হারের মূলসূত্র ভয়াল করোনাভাইরাস মানবদেহে ওঁৎ পেতে ছিল ৩ সপ্তাহ আগে। অর্থাৎ গেলো ১২ থেকে ১৮ জুন ২০২১ যাদের দেহে ভাইরাস ছিল তাদের দ্বারা এইবারের ‘ওয়েভ’ সৃষ্টি হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, ১০ জুলাই, ২০২১ যাদের দেহে ভাইরাস সংক্রমণ করছে তাতে দৈনিক মৃত্যুর হার ৯ জুলাই ২০২১– সর্বোচ্চ ২১২ থেকে বৃদ্ধি পেয়ে ২৫০ থেকে ৩০০ পৌঁছাতে খুব বেশি সময় লাগবে না। এরপরে যা আসবে তাকে ‘ওয়েভ’ বা ঢেউ বললে মারাত্মক ভুল হবে। আমাদের ভাগ্যে অপেক্ষা করছে এক ‘করোনা সুনামি’ ও তা কোরবানি ঈদ অতিক্রম করে আগস্ট মাসের মাঝামাঝি অবধি স্থায়ী থাকার জোর সম্ভাবনা। পরিস্থিতির এই ভয়ানক ‘অবনতি’ থেকে ‘রাষ্ট্রীয় দুর্যোগে’-এর দিকে অগ্রসর হচ্ছে বিধায় এই কলামে আমার ২৭ জুনের ২০২১ প্রেরিত প্রস্তাবনাগুলো আবার পুনর্ব্যক্ত করছি:

ক. দেশজুড়ে ‘জরুরি অবস্থা’ জারি করা।
খ. ভ্যাকসিনের জন্য বয়স ৪০-এর নিচের ক্যাটাগরির কথা বিবেচনা করা ও কর্মসূচি সম্পন্ন না হওয়া অবধি দেশের প্রতিটি নাগরিককে বিনামূল্যে টেস্ট করা।
গ. আসন্ন কোরবানি ঈদে পশুর হাট বন্ধ ঘোষণাসহ ভারতীয় গরুর চোরাচালান রুদ্ধ করা।
ঘ. পরিস্থিতি বেগতিক হলে কারফিউ জারিসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সরকারি নির্দেশ অমান্যকারী, বিশৃঙ্খলাকারীদের ‘দেখা মাত্র গুলি’ করার ক্ষমতা প্রদান।

২. চলমান করোনা যুদ্ধের ধারাভাষ্য ও বিবরণী:

আমি এই মহামারিকে আগাগোড়া সম্মুখ রণযুদ্ধের সঙ্গে তুলনা করেছি। যুদ্ধে প্রথম বোমা হামলা হয় যেকোনও দেশের রাজধানী ও বড় শহরগুলোতে। প্রথম টার্গেট এবার রাষ্ট্রের মাথাগুলো এবং প্রতিষ্ঠানকে ঘাবড়িয়ে দিয়ে সরকার ও জনগণের মাঝে দ্বিধাবিভক্তি সৃষ্টি করে নতুন আখ্যায়িকা স্থাপন করা। প্রতিক্রিয়া বা রি-অ্যাকশন পর্যবেক্ষণ করা– এরপর চোরাগোপ্তা হামলা চালানোর গ্যাপ (ফাঁক) খোঁজ করা। পেয়ে গেলে তা সম্পূর্ণ কাজে লাগিয়ে সমগ্র দেশজুড়ে যুদ্ধ ছড়িয়ে দেওয়া। ২০২১-এ শত্রুর কাঙ্ক্ষিত গ্যাপ সৃষ্টি হলো রমজান ঈদের ছুটিতে। ঢাকা শহরের মানুষ ডেল্টাকে ছড়িয়ে দিলো জেলা শহর, মফস্বল ও গ্রামগঞ্জে। বাকিটা ইতিহাস।

২০২০-এ যা কিছুই ঘটেছে, তা ছিল যুদ্ধের দামামা বা প্রাথমিক সূচনা সংকেত। বাংলাদেশ তা প্রচণ্ড দৃঢ়তার সঙ্গে মোকাবিলা করে খুব অল্প সময়ে পরিস্থিতি স্বাভাবিকের কাছাকাছি নিয়ে আসতে সক্ষম হয়। অন্যান্য দেশের তুলনায় আমাদের ক্ষয়ক্ষতি ছিল নগণ্য। দেশের ৮০ ভাগ প্রান্তিক জনগোষ্ঠী অর্থকষ্টে থাকলেও কখনোই অনাহারে ছিল না, বা দুর্ভিক্ষ এমনকি মঙ্গার মতো পরিস্থিতি পরিলক্ষিত হয়নি।

কিন্তু শত্রুকে এতটা অবমূল্যায়ন করা ছিল রাষ্ট্র ও জনগণের এক বিশাল আত্মঘাতী ভুল। যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হবে জেনেও জরুরি রসদ যেমন আইসিইউ, অক্সিজেন, ওষুধ, খাদ্য, পানি, অ্যাম্বুলেন্স, ডাক্তার, নার্স, বিছানা ইত্যাদি আগাম মজুত না রাখা ও সম্ভাব্য ক্যাজুয়ালটি কী হতে পারে– তা হ্যান্ডেল করার অবকাঠামোগত বা মানসিক প্রস্তুতি আমাদের একবারেই ছিল না, এখনও নেই।

প্রাথমিক বিজয়ের পর আমরা আত্মপ্রচার ও আত্মপ্রসাদের মচ্ছবে বিভোর হয়ে পড়ি। ‘আমরা করোনার চেয়ে অধিক শক্তিশালী’ মার্কা অভিনন্দন সূচক একে-অপরের পিঠ চাপড়ানোতেই ছিলাম বেশি ব্যস্ত। ওই একই ভুল করেছিলেন ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী, যার খেসারত আমাদের অঞ্চলসহ সমগ্র বিশ্বে ‘ডেল্টা ভ্যারিয়েন্ট’ দাপটে ঢুকে পড়ে আমাদের ভাগ্যলিখন সম্পূর্ণ পাল্টে ফেললো।

এখন শত্রু আমাদের চতুর্দিকে অবরুদ্ধ রাখেনি, সে ঘরের ভেতরে, বাইরে, জলে, স্থলে ডাঙায় নির্বিঘ্নে ঘুরে বেড়াচ্ছে শেষ ছোবলটি দেওয়ার জন্য। লাশের গন্ধ না ছড়ালেও– বাতাস ভারী হয়ে আসছে।

৩. অভ্যন্তরীণ শত্রু চিহ্নিতকরণ:

এই ভয়াল দুর্যোগের সময়ে অত্যন্ত ভারাক্রান্ত হৃদয়ে লক্ষ করছি, দেশের অভ্যন্তরীণ বাস্তব শত্রুদের নির্লজ্জ আস্ফালন। যেখানে রক্ত-মাংসের মানুষ মরছে– আর আমরা কিছুই করতে পারছি না, সেখানে একে অপরকে দোষারোপ করা, ‘বিতি-কিচ্ছিরি’ কথাবার্তার চালাচালির করার সময় যে এখন নয়– তা কি আমাদের চিন্তায় একবারও আসে? 

শুধু সমস্যা আর সমস্যার কথা দিনরাত ‘বকবক’ করছি এবং স্থূল ও উটকো রাজনৈতিক স্বার্থসিদ্ধি উদ্ধার করার উদ্দেশ্যে ‘আমরা কত ভালো, ওরা কত খারাপ’ ঠাওরাচ্ছি ও প্রেস বিজ্ঞপ্তি বিলি করছি। কিন্তু এত মেধাবী জাতি হওয়া সত্ত্বেও এই মহামারিকে রুখে দেওয়ার জন্য কোনও সম্ভাব্য সমাধান কী হতে পারে–তা নিয়ে কি কারও কোনও মাথা ব্যথা আছে? এই লজ্জাকর ব্যর্থতা কি শুধু সরকারের নাকি তার দায়ভার আমাদের সবার কাঁধেও বর্তায়?

৪. দেশের রুপক ‘স্বরূপ’ নাকি ‘ভাবমূর্তি’?

আর দেশের তথাকথিত ‘ভাবমূর্তি’? বাবারে বাবা–সেকি বিশাল এক ‘হেডঅ্যাক’!

আরে মশাই এই গালাগালি ও পিঠ ‘চুলকাচুলকি’ করতে করতে যে করোনা সুনামি হয়ে ‘নিউ বাংলাদেশ ভ্যারিয়েন্ট’ সমগ্র বিশ্বে আবির্ভাব ঘটাবে, তা কি আপনাদের আক্কেলে একটুও ঢুকছে?

দয়াল আমাদের ক্ষমা করুক– যদি তেমন দুর্ঘটনা ঘটে যায়, আপনাদের ভাবমূর্তির ‘মুখ’ যে ধ্বংস হয়ে, চুরমার হয়ে ইতিহাসের ডাস্টবিনে নিক্ষিপ্ত হবে– তা নিয়ে ‘ভাব মারার’ ফুরসত এ অবধি কি পেয়েছেন?

কোথায় যাবে আপনাদের রফতানি শিল্প– কোথায় যাবে গার্মেন্টস শিপমেন্ট? বাংলাদেশ থেকে একটা মানুষ বের না হতে পারলে আপনাদের তো কোনও সমস্যা নেই। আপনাদের টাকা আছে ও চিত্তবিনোদন, মনোরঞ্জনের জন্য প্রচুর দেশীয় স্থাপনা রয়েছে। তবে বিদেশে অবস্থানরত হতদরিদ্র অভিবাসী শ্রমিকদের ঘাড় ধরে ধরে যে বিতাড়িত করা হবে– তখন কি ছুঁক ছুঁক শব্দ করে ‘আহারে বেচারা’ বলে মায়াকান্না করবেন?

তাও মেনে নিতাম -কিন্তু সবুজ পাসপোর্ট দেখা মাত্রই বিদেশিরা যে আপনাদের সঙ্গে কুষ্ঠ রুগীর মতো ‘ছেঁচে’ আচরণ করবে– তখন আপনাদের এই ভাবের ‘মুখ’খানা  কোথাই লুকাবেন স্যার?

আমাদের দয়াল সৃষ্টিকর্তা সীমা লঙ্ঘন করা বরদাশত করেন না, তথাপি আপনাদের ঔদ্ধত্যকে বরদাশত করেছেন কেবল ৮০ ভাগ হতভাগা জনগোষ্ঠীর মুখের দিকে তাকিয়ে। গরিবকে ঠকিয়েও আপনারা পেয়েছেন দয়ালের আশীর্বাদ। আপনাদের হাজার কোটি কালো টাকার মাত্র ১০০ টাকার ‘বরকত’ হলো সেই আশীর্বাদ। একবার কি ভেবেছেন যে দয়াল আপনাদের প্রয়োজনের অতিরিক্ত আশীর্বাদ করেছেন?

৫. ‘খয়রাত’ নাকি ‘সাদকায়ে জারিয়া’?  ‘দ্য চয়েস ইজ ইউরস’:

তাই অনতিবিলম্বে সেই আশীর্বাদ ধরে রাখার জন্য শুকরিয়া আদায় করুন আর এই করুণ করোনার সময় ঝাঁপিয়ে পড়ুন দরিদ্র মানুষের জীবন রক্ষায়। নিদেনপক্ষে আসন্ন কোরবানি ঈদে মানুষ দেখানো লক্ষ টাকার নিরীহ পশু হত্যা না করে অন্তরের পশুটিকে হত্যা করুন। সঞ্চিত অর্থ দিয়ে দরিদ্র মানুষের জন্য খাদ্য সরবরাহ নিশ্চিত করুন। কারণ, রাষ্ট্রীয় খাদ্যভাণ্ডার আপনাদের ভাণ্ডারের ন্যায় ‘অফুরন্ত’ নয়।

আমাদের হিসাবে কেবল এই ঈদে সঞ্চিত অর্থের মূল্য অতি নিম্নে হলেও ৩৫০ কোটি টাকা। আপনাদের একজনকে দেখাদেখি সবাই যদি এই কাজটি করেন তা হবে ‘সাদকায়ে জারিয়া’– এবং নিশ্চিত থাকেন পাঁচ বছরের ভেতরে বাংলাদেশে একটিও গরিব থাকবে না। ‘নিম্ন আয়’ থেকে ‘মধ্যম আয়’-এর দেশ মোটেও না- আমরা পোলভল্ট করে ধনী রাষ্ট্রদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ ঘষাঘষি করবো ইনশাআল্লাহ!

তবে কৃপা আপনাদের ওই অতি ভঙ্গুর ধর্মীয় অনুভূতির ‘ভূত’টিকে শক্ত শিকল দিয়ে আটকে রাখুন ও তার থেকে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখুন প্লিজ। এই ভুতুড়ে সময়ে বাড়তি কিছু ভূতকে ‘খোশ আমদেদ’ জানানো দয়াল বরদাশত করবেন না।

আরেকটা কথা, দয়াল ভজনার জন্য যেকোনও দৃশ্য বা অদৃশ্য আঁকার যথা ‘মূর্তি’ বা ‘ভূত’ দুটোই ‘শিরক’। ইমান প্রমাণ করার জন্য তা গুরুত্বহীন ও অপ্রয়োজনীয়।

৬. অসমাপ্ত মুক্তিযুদ্ধ ও ১৬ লক্ষ নব্য রাজাকার:

দেশের এই সংকটপূর্ণ পরিস্থিতিতে ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা’র ফাঁকা বুলি অভ্যন্তরীণ প্রোপাগান্ডার কাজে লাগলেও লাগতে পারে– তবে তা দিয়ে শত্রুকে  ঘায়েল করা নেক্সট টু ইম্পসিবল। সরকার কেন জানি বুঝেও বুঝতে চায় না যে ‘হাইব্রিড’ আওয়ামী লীগারদের দাপট ও অত্যাচার থেকে জনগণ মুক্তি চায়– ও এরাই দেশ, জাতি ও জনগণের এক নম্বর চিহ্নিত শত্রু।

এই সুবিধাবাদী চাটুকার চক্রের সঙ্গে অশ্লীল জোট বেঁধেছে অতি নগণ্য তথাকথিত ব্যবসায়ী মাফিয়া সিন্ডিকেট। এদেরই কথায় নিহিতার্থে আজ আমরা দরিদ্র জনগণ কান ধরে উঠবস করছি। আমরা এমন কি পাপ করেছি ভাই? দরিদ্র হওয়াটাই কি আমাদের একমাত্র পাপ? কেন দিচ্ছেন এই লাগামহীন শাস্তি?

এই মুহূর্তে বাংলাদেশের অথনীতির যে বেগবান শক্তি তাতে অন্য কিছুর কমতি হোক, টাকার কমতি নেই। পিঠাপিঠি চাটুকার ও লোভী চক্রেরও অশ্লীল দাপট ও ক্ষমতাও কমতি নেই। ৮০ ভাগ খেটে খাওয়া হতদরিদ্র মানুষের সৃষ্ট সম্পদ লুণ্ঠন করে বিদেশে পাচার, আর দুর্নীতির দলিলসহ প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও তার বিচার তো দূরের কথা– তা নিয়ে প্রকাশ্যে আলাপেরও আছে এক ধরনের অলিখিত নিষেধাজ্ঞা।

২০২১-এর মুক্তিযুদ্ধে ১৬ কোটি নিরীহ মানুষের দেশে ১৬ লক্ষ ‘নব্য রাজাকারের’ উপস্থিতি এই প্রমাণ করে যে বঙ্গবন্ধুর সেনার বাংলার স্বপ্ন ও জনগণের প্রকৃত মুক্তি তথাকথিত কিছু ‘আমাদের লোক’রা সুপরিকল্পিতভাবে ধূলিসাৎ করার পাঁয়তারায় মগ্ন।

এই ইয়াজিদ তুল্য ঘাতকদের দল জাতির পিতা ও তার পরিবারকে হত্যা করার সময় তাদের বুক একটুও কাঁপেনি, আর জনগণ? তার গর্দনে করপাল চালাবে সে হাসিমুখে– তবে তাদের সেই অট্টহাসিকে মুহূর্তে কান্নায় পাল্টে ফেলার ক্ষমতাও রাখে সদা জাগ্রত লড়াকু জনগণ– তা যেন আমরা ভুলে না যাই। গরিবের পিঠ এখনও দেয়ালে ঠেকেনি– তার ধৈর্য দেখে আপনারা অহেতুক অধৈর্য হবেন না।

হুশিয়ার: মুখে মুখে নয় হৃদয়ের গহিনে গেঁথে রাখা ‘জয় বাংলা’র আমরা গেরিলা যোদ্ধা জাতি। একাত্তরের যুদ্ধ শেষে অস্ত্র জমা দিয়েছি ঠিকই, কিন্তু ট্রেনিং জমা দেইনি। আমরা শান্তিতে লড়তে চাই। আমাদের ক্ষেপাবেন না।

তবে সবকিছু ‘ফিনিশ’ হওয়ার সময় এখনও আসেনি। কারণ, অসমাপ্ত মুক্তিযুদ্ধের সমাপ্তি ঘোষণা সেদিনই হবে যেদিন আমরা প্রকৃত ‘মনের মুক্তি’ অর্জন করতে পারবো।

একাত্তরের ৯ মাসের শিক্ষা– আজকের প্রজন্মকে রন্ধ্রে রন্ধ্রে বোঝাতে ও নব্য রাজাকার নির্মূল করতে নিদেনপক্ষে ৯ বছর যুদ্ধ চালিয়ে যেতে হবে। করোনার এই ‘যুদ্ধ যুদ্ধ খেলা’ চলতেই থাকবে এবং বাঙালি নিঃসন্দেহে সেই খেলাতে অতিদ্রুত সিদ্ধহস্ত হয়ে উঠবে।

৭. যুদ্ধ ‘খেলতে’ হবে হাসিমুখে:

যেকোনও খেলা বাঙালি দুর্দান্ত খেলে। ক্রিকেটের মতো ‘যুদ্ধযুদ্ধ’ খেলায় বাংলাদেশের অভাবনীয় সাফল্য তার জ্বলন্ত প্রমাণ রাখে। চিন্তা করেছেন একেকটা ‘পোলা তো নয় সে আগুনের গোলা’?

তবে এই খেলার শিক্ষণীয় ‘অগ্রিম তালিম’ দিয়ে গেছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বয়ং। মস্তিষ্কের খেলা ‘ব্রিজ’ নিয়ে ইংরেজি মন্তব্য যা একদা করেছিলেন তার বঙ্গানুবাদ দাঁড়ায়:

‘যদি জারজেরদের সঙ্গে খেলতে হয়– তোমাকে আরও বড় জারজের মতো খেলতে হবে, তা না হলে তুমি হারবে’।

সুতরাং ইতিহাসের পাতা থেকে যেহেতু আমরা শিক্ষা নিতে ব্যর্থ– কেবল করুণ ও নিষ্ঠুর বাস্তব অভিজ্ঞতাই তা দিতে বাধ্য।

অভিজ্ঞতাই জীবনের সাম্যক গুরু!

৮. মস্তিষ্ক ধোলাই-এর ১৬ মাস ও ‘বুদ্ধিজীবীর’ ভূমিকা:

এই ১৬ মাসে আমাদের সবার অনুভূতিগুলো হয়ে গেছে পক্ষাঘাতগ্রস্ত, আমাদের অন্তরগুলো হয়ে গেছে লোহার চেয়েও শক্ত ও নির্বিকার, পারদ-এর চেয়েও শিথল ও নিষ্প্রাণ। আমরা সবাই পরিস্থিতির শিকার। চোখের জল নিতান্তই আমাদের আত্মার রক্তক্ষরণ– আর কতইবা রক্ত ঝরানো সম্ভব? আত্মা তো কোনও লেবু না যে চিপে চিপে তার ‘জুস’ বের করে পান করা যাবে? চোখের জল-ই বা কি করে আসবে যখন কাঁদতে কাঁদতে আমাদের সেই ফোয়ারা বহু আগেই ফুরিয়ে গেছে?

আমরা সবাই ‘আত্মার অ্যাকজিমা’ রোগে ভুগছি– সেই জীবন্ত আত্মার পচনের গন্ধের প্রাথমিক ধাক্কা এতটাই প্রগাঢ় যে নাকও তা সহ্য না করতে পেরে ভয়ে আপনাআপনি বন্ধ হয়ে যায়। তখন ভাবনাগুলো লুকোচুরি খেলা করে বলে– ‘করোনা ধরলো নাকি, হায়রে জীবন ফুরালো নাকি?’

যুদ্ধের সময় মস্তিষ্ক ধোলাই সবচেয়ে খতরনাক হাতিয়ে যা নিপীড়ক শত্রু এই মিডিয়া যুগের ‘কল্যাণে’ অনায়াসে ও নির্দ্বিধায় আমাদের করছে। স্ট্র্যাটেজি হলো জনগণের সব চিন্তাচেতনা যেন বিলকুল শত্রুর সঙ্গে প্রান্তিককৃত থাকে ও তাহা নিশ্চিত করতে দণ্ডায়মান আছে অতি ক্ষীণদৃষ্টি সম্পন্ন এক ‘ছ্যাঁচোরের’ দল: আমাদের স্বঘোষিত ‘বুদ্ধিজীবী’ বাহাদুরগণ।

সরকার ‘বাহাদুর’ এদের সমীহ করলেও একটু নিরাপদ দূরত্বে রাখে, কারণ কোনও ভ্যালু না থাকলেও এদের ‘নুইসেন্স ভ্যালু’ প্রচুর। তবে এসব বিজ্ঞ পণ্ডিত বুদ্ধিজীবীর মাথা, যে অনেক আগেই ক্রয় করে শত্রু তাদের পকেটবন্দি করেছে– তা জনগণের কাছে এখন ‘ওপেন সিক্রেট’ থাক।

৯. মানসিক স্বাস্থ্য ও আমাদের সমাজ:

মহামারিকালে মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে কালেভাদ্রে ‘না করলেই নয়’ স্টাইলে কথাবার্তা চলছে। এই আলাপের সামাজিক অনেক ঝুঁকি আছে ও আছে অযাচিত স্টিগমা (পাংশু)। এই আলাপ শুরু করলেই প্রকারান্তরে সবাই ধরে নেয়  ‘উনি কি পাগল?’ আর পাগল নিয়ে হাসিঠাট্টা? সে তো আমাদের নিষ্ঠুর সংস্কৃতিতে আদিকাল হতেই ‘উৎকৃষ্ট’ বিনোদন।

যদিও পাগল শব্দটা ব্যবহার করা সামাজিক অপরাধ, তার আরেক ভয়ানক বাস্তবতা যা আমরা অনেকেই জানি না: পাগল কখনই স্বেচ্ছায় স্বীকার করে না সে পাগল। এই ‘নিউ নরমাল’ বা নতুন স্বাভাবিক ফটকাবাজির যুগে জাতিগতভাবে আমাদের ইদানীংকার আচরণ সেদিকেই কি ইঙ্গিত দিচ্ছে?

আমরা তো কোনোদিনও ভুলেও স্বীকার করবো না আমরা পাগল, তাই আমরা ‘অ-পাগল’ জনগণ না হয় বিষয়টা একটু ‘ঘেঁটে দেখি’ কেমন?

১০. মিডিয়া ও নেগেটিভ নিউজে পসিটিভ সিম্পটম:

‘ভয় নয় সচেতনতায় জয়’– এসব চালু কথাবার্তা এখন হাই ফ্যাশন। টেলিভিশনের স্মার্টলি ড্রেসড সংবাদ পাঠক/পাঠিকারা বিরতির সময় বা খবর শেষে স্যানিটিজার হাতে মেখে, স্পন্সর কোম্পানির সূক্ষ্ম ‘ব্র্যান্ডিং’ করে (প্রাইম টাইম খবরের ভেতরে বিজ্ঞাপন, সকল ধান্দার ঊর্ধ্বে মহাধান্দা) মুখে মাস্ক পরে জনগণকে তথাকথিত ‘স্বাস্থ্যবিধি’ মানার সচেতনতার ‘উদ্বুদ্ধ’ করে বিদায় নেন। এসব ফালতুমি আন্তর্জাতিক কোন চ্যানেলগুলোতে কেউ কি দেখেছেন? তবে প্রশ্ন হচ্ছে এ কীসের স্বাস্থ্য? আপনাদের মানসিক কোষ্ঠকাঠিন্য নাকি মৌখিক আমাশয়ের ট্রিটমেন্টের প্রয়োজন?

ভালো বোঝা গেলো আপনাদের নিজেদেরই সৃষ্ট মৃত্যু আতঙ্ক থেকে বাঁচার উপায় আপনারা ১০০ ভাগ পোক্ত ইমান দ্বারা নিজেরাই বাতলিয়ে দিচ্ছেন– কিন্তু অপর দিকে জনগণের মস্তিষ্কগুলোকে ধোলাই করে নির্বিচারে ধ্বংস করছেন– সেই ‘সচেতনতা মলম’ কোথায় পাওয়া যাবে ভাই?

এসব মানুষ মারার ধান্দায় জনগণের মতো রাষ্ট্র নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করছে– আর রাষ্ট্রকে দোষারোপ করেই বা লাভ কী? তার আমলাতন্ত্রের সকালে এক, বিকালে আরেক, ঘণ্টায় ঘণ্টায়, মিনিটে মিনিটে কথা পাল্টানো ‘পাগলের প্রলাপ’ না বলে আমি নিজেও অতি মোলায়েম সুরে ‘সিদ্ধান্তহীনতা’ বা ‘হিতাহিতজ্ঞান শূন্যতা’ বলি– কিন্তু তাতে কি বিন্দুমাত্র জনগণের উপকার হচ্ছে?

পত্রিকা বলেন আর টিআরপি পাগল টিভি চ্যানেল বলেন– আপাদমস্তক নেগেটিভ ‘হায় হায় কী হবে’ বা ‘ছিঃ ছিঃ সরকার এসব কী করছে’, খুন, ধর্ষণ, রাহাজানিসহ করোনা মৃত্যু নিয়ে কান গরম করা গালাগালি। আর যে দলই ক্ষমতায় আসুক তাকে চোর, জুলুমশাহী, ফ্যাসিস্ট, পরিবারতন্ত্র, দুর্নীতিবাজ, ঘুষখোর, ধান্দাবাজ না বললে তো বাঙালির পেটের ভাত হজম হয় না। এসব ভীতিকর খবর ছাড়া যেন পৃথিবীতে আর কোনও খবরই নাই।

এই যে ২৪ ঘণ্টা লাগাতার ‘নেগেটিভ’ নিউজ দিতে দিতে জনগণকে মানসিক ব্রেকডাউনের দ্বারপ্রান্তে ঠেলে দিচ্ছেন তা কি বোঝেন? বারবার টেস্ট, দুই ডোজ ভ্যাকসিন নেওয়ার শেষে দেহে কোভিড-১৯ ডেল্টা ভ্যারিয়েন্ট নেগেটিভ রিপোর্ট আসার পরেও আমরা ‘অসুস্থ’। কীসের এই অসুস্থতা? কেন আমাদের এই অপচিকীর্ষু অসুস্থতা?

তার একটিমাত্র কারণ জনগণের আত্মার ভেতরে আপনারা করোনা সংক্রমণ করিয়ে আমাদের ‘মানসিক কোভিড পজিটিভ’– কেবল করেননি, ভাইরাস দিব্বি পরিপাটি সংসার বেঁধে কিলবিলিয়ে চলছে। তার ফলশ্রুতিতে শিক্ষিতমূর্খ নির্বোধ কিছু জনগণ কোভিড-১৯ কে মানব ‘মস্তিষ্কের উঁকুন’ মনে করা শুরু করেছেন। এবং অতি আশ্চর্যজনক বিষয় হচ্ছে অত্যন্ত টক্সিক ‘ঘোড়ার উঁকুন’ মারার ওষুধ গিলে তারা ভাইরাস খতম করার চেষ্টা চালাচ্ছেন ও অন্যকে মরার জন্য ‘উদ্বুদ্ধ’ করছেন– হাসবো নাকি কাঁদবো?

১১. ক্রান্তিকাল নাকি মহাপ্রলয়?

২০১৬ নাগাদ বিশ্ববরেণ্য ভারতীয় সাধগুরু বাসুদেব জাগ্গি ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন:

‘আজ পৃথিবী যে ভয়াবহ নিয়মে চলছে তার যদি কোনও পরিবর্তন না ঘটে এবং একইভাবে চলতে থাকে– নিশ্চিত থাকেন আগামী ৫০ বছরের ভেতরে পৃথিবীর অর্ধেক জনসংখ্যা আত্মহত্যা করবে– আর বাকি অর্ধেক উন্মাদ-এর মতো বেঁচে থাকবে’।

আমার সমগ্র শরীর শিউরে উঠছে এই ভেবে যে ৫০ বছরও কি আমাদের অপেক্ষা করতে হবে না? মানবজাতির ক্রান্তিকাল কি শুরু হয়েছে– নাকি এ মহাপ্রলয়ের প্রাথমিক আলামত?

‘সেই দিন’ কি এই জীবনেই দেখতে হবে আমাদের? আমরা কি কোনও বিভ্রমে আটকে গেছি নাকি আমরা জীবিত মৃত? আমরা কি মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত সব নিরীহ মানুষ: শুধু রায় কার্যকর হওয়ার অজানা দিনক্ষণের অপেক্ষায়?

লেখক: সংগীতশিল্পী

/এসএএস/এমওএফ/

সম্পর্কিত

করোনার করুণ কাহিনি: ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি’ (২)

করোনার করুণ কাহিনি: ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি’ (২)

করোনার করুণ কাহিনি: ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি’ (১)

করোনার করুণ কাহিনি: ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি’ (১)

করোনার করুণ কাহিনি: গালি, তালি, পরীমণি ও প্রজন্মের বিদ্রোহ

করোনার করুণ কাহিনি: গালি, তালি, পরীমণি ও প্রজন্মের বিদ্রোহ

করোনার করুণ কাহিনি: করোনা কি বাংলাদেশ ছেড়ে পালিয়েছে?

করোনার করুণ কাহিনি: করোনা কি বাংলাদেশ ছেড়ে পালিয়েছে?

আজ মহাবরণের মহাদিন

আপডেট : ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১৮:২১

হায়দার মোহাম্মদ জিতু ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ বাঙালির ওপর করা পাকিস্তানিদের গণহত্যার চুম্বক অংশ নিয়ে লেখা ঔপন্যাসিক আনোয়ার পাশার দর্শন-কথা, কোনও খেলা না শিখেই খেলায় জয়লাভ করতে চাইলে চরিত্র হারাতে হয়। চরিত্রহীনের সম্বল তোষামোদ আর দালালি। উপমহাদেশীয় রাজনীতির ইতিহাসে এ ধরনের চরিত্রহীনের সংখ্যা কম হলেও তা কখনই শূন্য ছিল না। মীরজাফর থেকে মোশতাক যার ধারাবাহিক ও প্রাসঙ্গিক উদাহরণ।

আনন্দের বিষয় হলো, রাজনীতির মতো বৃহৎ খেলায় অসম্পূর্ণ প্রশিক্ষণে কেউ কেউ কিছুটা কায়দা কিংবা জাতে উঠলেও শেষমেশ ইতিহাসের আস্তাকুঁড়েই নিক্ষেপিত হয়েছেন। কারণ, রাজনীতির মতো পবিত্র স্থানে সততা এবং সত্যই প্রকৃত সম্বল-সম্পদ।

সময়ের ধারাবাহিকতায় বর্তমানে এসব খেলোয়াড়ের কথিত দর্শন এবং ষড়যন্ত্র মোকাবিলায় বাঙালির অবলম্বন শান্ত সাহস শেখ হাসিনা। যিনি গৌতম বুদ্ধের জন্মেছো যখন পদচিহ্ন রেখে যাও দর্শনের অনুরণনে তোষামোদি এবং ষড়যন্ত্রকে হটিয়ে সৃষ্টি সুখের উল্লাসে নিরলসভাবে কাজ করে চলেছেন। উন্নয়ন অগ্রযাত্রার দাপটে দেশকে বিশ্বসংসারে অনুপ্রেরণার উদাহরণ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। দক্ষিণ এশিয়া কেন্দ্রিক পাশ্চাত্য ও অন্যান্যের নতজানু দৃষ্টিভঙ্গি বা পররাষ্ট্রনীতি পরিকল্পনাকে উন্নয়ন সম্ভাবনা দিয়ে মোকাবিলা করে দেশকে সহযোগিতা এবং সম্মানের আসনে নিয়ে গেছেন।

টানা ১২ বছরের নেতৃত্বে দেশকে দারিদ্র্যের ক্লাব থেকে উন্নীত করেছেন উন্নয়নশীল দেশের কাতারে। শুধু তা-ই নয়, তাঁর কল্যাণেই দেশের দারিদ্র্য ৪০ শতাংশ থেকে ১৯ শতাংশে নেমেছে। দেশের রিজার্ভ ৪৮ বিলিয়ন এবং মাথাপিছু আয় ২২২৭ ডলারে পৌঁছেছে। মাতৃ ও শিশু মৃত্যুর হার কমেছে। এসব হিসাবে বৈশ্বিক পরিসংখ্যান মতে, আগামী দশ বছরে বাংলাদেশ তার প্রতিবন্ধকতা ও দারিদ্র্যকে জাদুঘরে শব্দবন্দি করবে।

তবে এসবের মাঝে সবচেয়ে বিস্ময়কর ও অনুকরণীয় বিষয় হলো, বৈশ্বিক করোনা পরিস্থিতিতেও এর অর্থনীতির চাকা সচল থেকেছে। বাণিজ্য চলেছে সবিস্তারে। করোনার মাঝেও বৈশ্বিক অর্থনীতিতে বিশ্বের যে পাঁচটি দেশ এগিয়েছে তার মাঝে বাংলাদেশ একটি। বর্তমান অবস্থান হিসেবে যা দাঁড়ায় বিশ্বের ৪১তম বৃহৎ অর্থনীতির দেশ। আরও প্রেরণার বিষয়, করোনা পরিস্থিতিতে সরকারি নম্বরে ফোন করলে ঘরে ঘরে খাবার চলে গেছে। শিশুদের জন্যে পৌঁছানো হয়েছে শিশুখাদ্য।

এর বাইরে বিশ্বের ৫৭তম স্যাটেলাইটসম্পন্ন দেশের তালিকায় জায়গা করে নিয়েছে বাংলাদেশ। বিষয়টি মিশ্র অনুভূতির! কারণ, যে দেশ একদা তলাবিহীন ঝুড়ি হিসেবে ব্যঙ্গ করেছিল আজ সেই দেশের মাটি ছুঁয়ে বিশ্ব আকাশে উড়লো বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১। যদিও এ ক্ষেত্রে কিছু বেদনার বিষয়ও আছে। আর তা হলো, এমন গৌরব এবং ভবিষ্যৎ সম্ভাবনার বিষয় নিয়েও অগাধ মিথ্যাচার, কটূক্তি হয়েছে, হচ্ছে। এর জন্য অবশ্য জনপ্রতিনিধিদের দায় আছে। কারণ, এই স্যাটেলাইট কী, কী এর উপযোগিতা এবং কেন তা দেশের জন্য প্রয়োজন তার সঠিক ব্যাখ্যা তৃণমূল পর্যন্ত পোঁছাতে পারেননি। আরও বিস্তৃত অর্থে বললে, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সরকারের উন্নয়ন অগ্রযাত্রাকে সমূলে প্রচার করতে পারেননি। যা আগামী নির্বাচন কেন্দ্রিক ভীষণভাবে অনুভবের। তাছাড়া এসব যদি জনগণকে বোঝানোই না যায়, তবে সবটাই যে বিরোধীরা বিকৃত অর্থে ব্যবহার করবে সেটাও অনুমেয়। কাজেই সবটা নিয়ে নিরীক্ষণ জরুরি। পাশাপাশি নির্বাচন কেন্দ্রিক বিএনপি-জামায়াতের যে আগুন-সন্ত্রাসের উদ্ভাবন এবং ব্যবহার তার থেকে জনগণকে রক্ষার ক্ষেত্রেও মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তির প্রস্তুতি প্রয়োজন।

বৈশ্বিক দরবারে প্রতিনিধিত্ব করতে অর্থনৈতিক দিকের সঙ্গে শিক্ষা, সংস্কৃতি ও প্রযুক্তিগত জ্ঞান প্রয়োজন। এক্ষেত্রে এখানকার অর্থনীতি, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, শিক্ষার বিস্তর উন্নয়ন হলেও বাঙালি সংস্কৃতি চর্চায় শূন্যতা তৈরি হয়েছে। যেমন, বিগত দশ বছরে এখানে বিশটি ভালো ছবির তালিকা পাওয়া যায়নি। মঞ্চ ক্রমাগত দর্শকশূন্যের দিকে গেছে। দেশীয় বাদক, বাদ্যযন্ত্র বিলুপ্তির পথে গেছে। অথচ টেকসই উন্নয়ন এবং ভবিষ্যৎ বিশ্বনেতৃত্বে দেশীয় জীবনাচরণ বা সংস্কৃতি চর্চার বিকল্প কিছু নেই।

বাঙালি সংস্কৃতি সম্মিলিতভাবে সবাইকে নিয়ে এগোনোর। অন্যদিকে বৈশ্বিক উগ্রবাদীদের পলিসি হলো, বিভাজন তৈরির মাধ্যমে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের ভরণ-পোষণ করা। কাজেই সচেতন থাকতে হবে কেউ যেন এই অর্থনৈতিক অর্জন-অগ্রগতিকে বাঁধাগ্রস্ত করতে উগ্রবাদী, মৌলবাদী ভাবধারাকে উসকানি দিতে না পারে। আর এজন্যই সরকারপ্রধান হিসেবে শেখ হাসিনার প্রয়োজন। কারণ, ক্ষত-বিক্ষত হৃদয়ে ঘুরে দাঁড়াবার সাহস তিনিই রাখেন। তাই প্রার্থনা এখন তাঁর শতায়ু হওয়ার, সুস্থতার সঙ্গে এগিয়ে চলার।

লেখক: প্রশিক্ষণ বিষয়ক সম্পাদক, বাংলাদেশ ছাত্রলীগ, কেন্দ্রীয় নির্বাহী সংসদ।
[email protected]

/এসএএস/এমওএফ/

সম্পর্কিত

শুধু জীবনমান নয়, গুরুত্বে জনগণের আবেগও

শুধু জীবনমান নয়, গুরুত্বে জনগণের আবেগও

মিথ্যাচারে আক্রান্ত শেখ কামাল

মিথ্যাচারে আক্রান্ত শেখ কামাল

মানুষগুলোর শূন্যতাই বিশৃঙ্খলার কারণ

মানুষগুলোর শূন্যতাই বিশৃঙ্খলার কারণ

উদ্যোক্তা-নির্ভর দেশ বিনির্মাণের পরিকল্পনা

উদ্যোক্তা-নির্ভর দেশ বিনির্মাণের পরিকল্পনা

শুভ জন্মদিন সবার প্রেরণা শ্রদ্ধেয় প্রধানমন্ত্রী

আপডেট : ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১৫:৩৬

ড. জেবউননেছা ১৯৫২ সাল।  ভাষা আন্দোলনে উত্তাল দেশ।  ছয় বছরের একটি শিশুর বাবা জেলখানায় অসুস্থ। দাদু ভাইয়ের সিদ্ধান্তে তিন মাল্লার নৌকা দিয়ে, দাদা-দাদী এবং মায়ের সাথে গোপলগঞ্জের টুঙ্গিপাড়া থেকে ঢাকায় পৌঁছান। ঢাকা পৌঁছাতে লেগে যায় চার-চারটে দিন। কৈশোরে তাঁর  ঘরের নাম ছিল ‘আলসে খানা’। যে ঘরটি গুছিয়ে রাখতেন মা।

বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস করতে কোন পোশাক পরে যাবেন ঠিক করে রাখতেন মা। তাঁর একমাত্র কাজই ছিল লেখাপড়া এবং গান শোনা। সন্ধ্যাবেলা এসেই ঘুমিয়ে পড়তেন। গ্রামের বাড়ি গেলে সব বোনদের  নিয়ে ক্যামেরা দিয়ে ছবি তোলা ছিল তাঁর শখ। শখের খেলনাগুলো ১৯৫৮ সালের মাশার্ল ল’-তে ভেঙে চুরমার হয়েছিল, সাথে ভেঙেছিল তাঁর শিশুমন। তিন দিনের নোটিশে বাড়ি ছেড়ে দিয়ে মায়ের সাথে  রাস্তার মধ্যে মালপত্র নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা শিশুটি যখন ছেলে মেয়ের মা, তখনও তাঁর বাবা ভাত মেখে দিলে ভাত খেতেন। বাবা একটি ফ্রিজ এনেছিলেন সেই ফ্রিজটি টাকার অভাবে মা  বিক্রি করে দেন। মা চাল ডাল দিয়ে খিচুড়ি রান্না করতেন। মা সেই খাবারের নাম দিয়েছিলেন ‘গরিব খিচুড়ি’।

নানা ভাঙা-গড়ায় ১৯৬১ সালের ১ অক্টোবরে ধানমণ্ডির ৩২ নম্বর সড়কে ৬৭৬ নম্বরের তিন কামরার বাড়িতে ওঠেন। শ্রমিকের  টাকা বাঁচানোর জন্য মা তাদের নিয়ে দেয়ালে পানি দিতেন, ইট বিছাতেন। বাবা জেলে থাকতেন বলে ঈদের সময় কাপড়-চোপড় নতুন তেমন কিছু আসতো না। তাই মা সেলাই করতেন। একসময় তিনি কাপড় সেলাই শুরু করলেন। তাদের বাসায় ছিল সেলাই মেশিন। নিজের বাড়ির সদস্যদের কাপড় এবং পড়শিদের কাপড়ও বানিয়ে দিতেন। প্রতি রবিবার ফুফাতো ভাইবোনদের আগমনে বাড়িটি ছিল আনন্দবাড়ি। 

বাড়িটিতে রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গের আসা-যাওয়া ছিল ভীষণ। বাড়ির দোতলার সিঁড়িতে বসে বই পড়তে ভালোবাসতেন তিনি। বাড়ির দোতলার সিড়িতে ফুফাতো বোনের সঙ্গে বসে চা পান করতেন  আর  গল্প করতেন।

বাসায় প্রচুর ভীড় হতো বলে তিনি এবং তার খালাতো বোন ছাদের ওপর বসে পড়তেন। অনেক সময় পানির টাংকির ওপর পা ঝুলিয়ে গলা ছেড়ে জোরে জোরে পড়তেন। তিনি ঘুম তাড়ানোর জন্যেও জোরে পড়তেন। ১৯৬৬ সালের ছয়দফা  আন্দোলনের সময় তিনি উচ্চ মাধ্যমিকের শিক্ষার্থী। বাসা ভর্তি মানুষ। পড়তে বসলেও মন পড়ে থাকতো মিটিংয়ে।

জানালার পাশে বসে সভা শুনতেন। সবাইকে চা বানিয়ে দিতেন। পাঁচ ভাই বোনের সবচেয়ে বড় সন্তান ছিলেন তিনি।

১৯৪৭ সালে ২৮ সেপ্টেম্বর  গোপালগঞ্জ জেলার বাইগার নদীর তীর ঘেঁষে টুঙ্গিপাড়া গ্রামে এই মানুষটি জন্মগ্রহণ করেন। রাজনৈতিক কাজে ব্যস্ত থাকায় জন্মের সময় বাবা ছিলেন না পাশে। এই মানুষটির নাম শেখ হাসিনা। 

১৯৫৪ সালে রাজধানী ঢাকার রজনীবোস লেনের বাড়িতে বসবাস শুরু করেন।  ১৯৫৬ সালে টিকাটুলি নারী শিক্ষা মন্দির বালিকা বিদ্যালয়ে তাঁর হাতে খড়ি। ১৯৬৫ সালে আজিমপুর বালিকা বিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক এবং ১৯৬৭ সালে  গভর্নমেন্ট ইন্টারমিডিয়েট গার্লস কলেজ ( বর্তমানে বদরুন্নেসা কলেজ)  থেকে উচ্চ মাধ্যমিক উত্তীর্ণ হন। তাঁর পিতা সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ নেতা, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। মা সর্বংসহা নারী এবং বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুননেছা মুজিব। রাজনীতি সচেতন পরিবারে নিজের শৈশব-কৈশোর এবং বাবার বারংবার জেলখানায় বন্দীদশা শিশুমনে বিস্তার লাভ করায় বিদ্যালয়ে পড়াকালীন সময়ে ১৯৬২ সালে আইয়ুববিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণ করে আজিমপুর গার্লস স্কুল থেকে তাঁর নেতৃত্বে মিছিল গিয়েছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে। তারই ধারাবাহিকতায় ১৯৬৬-১৯৬৭ শিক্ষাবর্ষে গভর্নমেন্ট ইন্টারমিডিয়েট গার্লস কলেজে ভোটের মাধ্যমে সহ সভাপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন।

১৯৬৯ এ গণ আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেছিলেন তিনি। এর মাঝখানে ঘটে যায় তাঁর জীবনের নতুন অধ্যায়- বাবা তখন জেলে অন্তরীণ। বিয়ের প্রস্তাব আসে  ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের  শিক্ষার্থী এবং ফজলুল হক হলের সহ সভাপতি মেধাবী ছাত্র পরমাণু বিজ্ঞানী ড. এম এ ওয়াজেদ মিয়ার সাথে। বাবা মায়ের সম্মতিতে ১৭ নভেম্বর পবিত্র শবই বরাতের রাতে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। বাবা তার মেয়ের জামাইকে জেল গেটে একটি রোলেক্স ঘড়ি উপহার দেন। যা আজীবন সযতনে ছিল পরমাণু বিজ্ঞানীর কাছে। 

শেখ হাসিনা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সদস্য ও রোকেয়া হল শাখার সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭৩ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন।  তিনি ১৯৭১ সালে ২৭ জুলাই ঢাকা মেডিক্যাল কলেজে ড. ওয়াদুদের তত্ত্বাবধানে পুত্র সন্তানের মা হন। সন্তান জন্মের সময় মা গৃহবন্দী আর বাবা জেলখানায় অন্তরীণ। পাশে ছিলেন  ছোট ফুফু খাদিজা হোসেন।  দ্বিতীয় সন্তান সায়েমা ওয়াজেদ পুতুলের মা হন ১৯৭২ সালের ৯ ডিসেম্বর। ১৯৭৫ সালের ২৯ জুলাই বোন শেখ রেহানাকে সাথে নিয়ে স্বামীর সাথে পশ্চিম জার্মানি যান। যেদিন চলে যাচ্ছিলেন, সেদিন তাঁর মা ভীষণ কেঁদেছিলেন। বড় সন্তানকে চোখের আড়াল করতে হবে এই বেদনায়। বিদেশে যাওয়ার পূর্বে দুই ভাইয়ের বিয়েকে কেন্দ্র করে তাদের বাড়িটি ছিল একটি উৎসবের বাড়ি।

জার্মানিতে একটি অনুষ্ঠানে ছিলেন ১৪ আগস্ট, ১৯৭৫ইং। হাসি-আনন্দে ছিল সেই অনুষ্ঠান। কে জানত সেই রাতই শেষ আনন্দের রাত। যে রাতে সব হাসি-কান্নার নোনাজল হয়ে পদ্মা, গঙ্গা এবং মধুমতীর মোহনায় এসে জড়ো হবে। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট তিনি হয়ে যান এতিম এবং ভাই হারা বোন। মাত্র ২৮ বছর তখন তাঁর। যে বয়সে নিজের জীবনের সকল আনন্দকে একটি মানচিত্রে করে শান্তির পায়রার মতো উড়ার কথা। সেই জীবনটা হয়ে গেলো দুঃসহ এক জীবন। এমন একটি পরিস্থিতি হয়ে গেলো যে, কাছের মানুষগুলোও দূরে চলে যান। জার্মানি থেকে তিনি যুক্তরাজ্য এবং দিল্লিতে ছয় বছর নিবার্সিত জীবন কাটান। দিল্লিতে দুই বোন ছদ্মনামে থাকতেন। এক সময় শেখ রেহানা যুক্তরাজ্যে যান এবং সেখানে তাঁর বিবাহ সম্পন্ন হয়।

দুই সন্তানকে নিয়ে শেখ হাসিনা হয়ে যান একা। এই নির্বাসিত জীবনে ১৯৭৮ সালে  দিল্লিতে ছুটে গিয়েছিলেন খান সাহেব ওসমান আলী এম এল এ’র ছেলে  এবং তৎকালীন জাতীয় সংসদ সদস্য মুক্তিযোদ্ধা এ. কে এম শামসুজ্জোহা এবং তার পরিবার। সেদিন তিনি ছিলেন বিমর্ষ এবং তাদের পেয়ে শুধুই কেদেঁছিলেন। ১৯৮১ সালে ৯ এপ্রিল দিল্লির নিজামউদ্দিন আউলিয়ার মাজার জিয়ারত করতে যান শেখ হাসিনা। সেখানে মাজারের খাদেম বঙ্গবন্ধুর স্বাক্ষর সম্বলিত একটি কাগজ তাকে দেখান যেখানে তারিখ উল্লেখ করা  ৯ এপ্রিল, ১৯৪৬।

বাবার হাতের স্বাক্ষর দেখে শেখ হাসিনা প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়ে পড়েন তিনি দেশে ফিরবেন।  ১৯৮১ সালের ১৭ মে দেশে আসেন। মাত্র ৩৪ বছর বয়সে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভাপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন। অন্যদিকে বাবার বাড়িতে প্রবেশের অনুমতি মিলেনি। স্মৃতি  ছুঁয়ে দেখার সুযোগ পাননি। রাস্তার পাশে বসেই মিলাদ পড়ান। পরবর্তীকালে ১২ জুন ১৯৮১ সালে  বাড়িতে প্রবেশের সুযোগ দেওয়া হয়। শত শত স্মৃতিমাখা, ধুলোবালি, ময়লা নিজ হাতে পরিষ্কার করেন আর চোখের জলে বুক ভাসান। একদিকে দুই সন্তান অন্যদিকে দেশ। এদিকে বোন শেখ রেহানা দেশে এসে দেখেন বড় বোন দেশ গড়ার কাজে ব্যস্ত। বাচ্চা দুটোকে সময় দেবার মতো সময়ই তিনি করতে পারেন না। তখন তিনি শেখ হাসিনার দুই ছেলে মেয়েকে নিয়ে যুক্তরাজ্যে চলে যান। সেদিন মা শেখ হাসিনা গৃহবন্দী। দূর থেকে একটি গাছের কাছে দাঁড়িয়ে অঝোরে কান্নার স্মৃতি ভুলতে পারেন না ছোট বোন শেখ রেহানা।

দিনে দিনে তিনি হয়ে যান নিজ বৈশিষ্ট্যে একজন আপসহীন নেত্রী এবং একজন শক্তিমান লেখক। অকপটে  নিজের কথা, দেশের কথা লিখতে থাকেন। সেই সাথে ছুটে বেড়ান গণ মানুষের কাছে।

প্রিয় বই ‘পথের পাঁচালী’ ছাড়াও রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলের কবিতা  মুখস্থ করা মানুষটি হয়ে যান পুরোদস্তুর একজন লেখক। তবে তাঁর লেখনী শক্তিশালী হবার একটি কারণ ছিল। কারণ তাদের বাড়িতে বই পড়ার একটি পরিবেশ ছিল।  তাঁর বাবা বঙ্গবন্ধু  অবসরে বই পড়তেন এবং মা  বঙ্গমাতা বই পড়তেন। মায়ের সাথে বই কিনতে নিউমার্কেট যেতেন।  তাঁর শাড়ি গহনার শখ ছিল না। শখ ছিল বইপড়া। তাঁর বেশকিছু  বই সেই ভয়াল রাতে ছিন্নভিন্ন হয়ে যাওয়ায় এখনও তিনি কষ্ট পান। প্রায় ৪০ এর কাছাকাছি গ্রন্থ তিনি প্রকাশ করেছেন। প্রকাশ করেছেন বাবার লেখা গ্রন্থ। এছাড়াও সিক্রেট ডকুমেন্টস প্রকাশ করে জাতির কাছে তুলে ধরেছেন সত্যিকারের ইতিহাস।

বিভিন্ন ক্ষেত্রে অবদানের জন্য পেয়েছেন ৩৫ এর কাছাকাছি আন্তর্জাতিক পুরস্কার। সন্তানের নামের  পাশে পিতার পাশাপাশি মায়ের নাম জুড়িয়ে দেবার উদ্যোগ তারই। বছরের প্রথম দিন সকল শিশুদের হাতে নতুন বই তুলে দেওয়ার উদ্যোগ তারই। সারাদেশে ৫৬০ টি মডেল মসজিদ ও ইসলামিক সাংস্কৃতিক কেন্দ্র নির্মাণের উদ্যোগ তারই। নানা প্রতিকূলতা সত্ত্বেও ৩০ হাজার ১৯৩ কোটি টাকার মেগা প্রকল্প ৬.১৫ কিলোমিটারের পদ্মা সেতুকে দেশবাসীর কাছে উপহার দেওয়ার উদ্যোগ তারই। তাছাড়াও সমুদ্র জয়, বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট কেন্দ্র স্থাপন, প্রতি ঘরে বিদ্যুৎ পৌঁছানো তারই উদ্যোগ। এমন আরও শত শত নব উদ্যোগের উদাহরণ দেওয়া যাবে। যা এই স্বল্প পরিসরে উল্লেখ করা দুঃসাধ্য। তাঁর এসকল উদ্ভাবনী  কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ নিউজ উইকের মতে, তিনি বিশ্বের ১০ জন ক্ষমতাধর ব্যক্তির অন্যতম এবং পিপলস অ্যান্ড পলিটিকসের নামের একটি আন্তর্জাতিক সংস্থার জরিপে বিশ্বের সৎ সরকার প্রধানের তালিকায় তিনি তৃতীয় স্থান অধিকার করেন।

দক্ষিণ এশিয়ার নারীবাদী বিশেষজ্ঞ কমলা ভাসিন তাঁর এক লেখায় বলেছেন, ‘যেহেতু সামাজিক লিঙ্গ আমাদের সকলের তৈরি। আমরা ছেলে ও মেয়ের, নারী ও পুরুষের একটি নতুন সংজ্ঞা দিতে পারি। আমরা যদি চাই তবে তা পরিবর্তন করতে পারি। আমরা এমন এক সমাজ তৈরি করতে পারি যেখানে মেয়ে মানেই অসহায় দুর্বল নয়, আর ছেলে মানেই কঠোর, উদ্ধত আদেশকারী ও নির্যাতন কারী নয়।’

হ্যাঁ, শেখ হাসিনা প্রমাণ করে দিয়েছেন, মেয়ে মানেই অসহায় দুর্বল নয়। টুঙ্গিপাড়ায় বেড়ে ওঠা হিজল গাছ থেকে খালে ঝাপিয়ে পড়া মেয়েটি একদিন উন্নয়নের রোল মডেল হবে কে জানত। তাঁর প্রজ্ঞা, সততা, অধ্যবসায় তাকে ক্ষমতায়িত করেছে। তাকে কেউ ক্ষমতায়িত করেনি। একজন নারী  সারাটা জীবন ব্যথা বেদনার মধ্যে দিয়ে যায়। সেই ব্যথা বেদনাকে জয় করে লৌহ মানবী হয়েছেন তিনি। তিনি গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করছেন। কিন্তু সর্বোপরি তিনি একজন নারী। তিনিও এই ব্যস্ততার মাঝে সন্তানের জন্মদিনে পোলাও রান্না করেন। নাতি-নাতনিদের নিয়ে  গ্রামের মেঠোপথে ভ্যানে চড়েন, অবসরে নাতি-নাতনিদের নিয়ে ব্যাডমিন্টন খেলেন। সকাল শুরু করেন তাহাজ্জুদ নামাজ আদায় করেন। পবিত্র কোরআন শরিফ তেলাওয়াত করেন।

আট দশজন নারীর মতো তারও ইচ্ছে হয় রিকশায় চড়ার, সমুদ্রের জলে পা ভিজানোর, বোনের সাথে বরফ নিয়ে খুনসুটি করতে এবং বোনের সাথে ছবি তুলতে। যে মানুষটি তার সব হারিয়ে দিনভর হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রম করে দেশকে বিশ্বের দরবারে তুলে ধরেছেন। তাঁর হৃদয়ের কান্না আমরা কয়জনে জানি। তিনি ছায়ানটে বেহালা শিখেছিলেন, ভালো ছবি আঁকতে পারতেন। জীবন যুদ্ধের কঠিন সময়ে সব ভুলে গিয়ে স্মৃতির অ্যালবামে হাতড়ে বেড়ান জাতির জনক বঙ্গবন্ধু রহমান স্মৃতি জাদুঘরে।

তাদের আনন্দ বাড়িটি ১৯৯৪ সালের ১৪ আগস্ট জাদুঘরে রূপান্তরিত হয়। তিনি ভীষণ বন্ধুবৎসল। এক যুগ পরেও বন্ধুদের সাথে দেখা হলে তিনি দিব্যি তাদের নাম ধরে ডাকেন। রবীন্দ্রসঙ্গীতের ক্যাসেট উপহার পেলে যারপরনাই খুশি হন। গণমাধ্যমে  রবীন্দ্রসঙ্গীত শুনতে পেয়ে সরাসরি শিল্পীকে ফোন করে শুভেচ্ছা জানান। খেলোয়াড়দের উৎসাহ দেবার জন্য মাঠে খেলা উপভোগ করতে চলে যান।  তিনি আপাদমস্তক একজন মানবিক এবং অন্যের প্রতি শ্রদ্ধাশীল একজন ব্যক্তিত্ব। তাইতো শিক্ষককে লাল গালিচা ছেড়ে দেন এবং শিক্ষকের গায়ের চাদর ঠিক করে দেন। মঞ্চ  থেকে শিক্ষককে সালাম দেন। বাংলাদেশে মাদার তেরেসা এলে ছুটে যান তাঁর কাছে। কাউকে কোনও কিছু না বলে ১৯৯৮ সালের ২৪ মার্চ ছুটে যান কবি সুফিয়া কামালের বাড়িতে। 

২০১০ সালে ৩ জুলাই ঢাকার নিমতলী অগ্নিকাণ্ডে গণভবনে মা বাবা হারানো তিন নারীকে বিয়ে দিয়ে তাদের মায়ের ভূমিকা পালন করেন।  মিয়ানমার থেকে বিতাড়িত রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেন। বন্ধুদের ভাষায়, তিনি একজন অমায়িক, প্রাণোচ্ছল এবং নিরহংকার একজন মানুষ।

আমার দৃষ্টিতে শেখ হাসিনা একজন নারী নয়, তিনি সর্বগুণে গুণান্বিত একজন মানুষ। বলা হয়, পুত্র বংশের বাতি। তাহলে শেখ হাসিনা একজন নারী হয়ে পুরো দেশে যে উন্নয়নের বাতি জ্বালিয়েছেন তাহলে তিনি এক কথায় বাংলাদেশের বাতি। নারী জাগরণের অগ্রদূত বেগম রোকেয়া বলেন, ‘বাস্তবিক অলংকার দাসত্বের নিদর্শন না ভাবিয়া সৌন্দর্য বর্ধনের উপায় মনে করা যায়, তাহাই কি কম নিন্দনীয়! সৌন্দর্য বর্ধনের চেষ্টা ও কি কম দুর্বলতা নয়’?

এই বাংলাদেশে একজন বঙ্গবন্ধু জন্মেছিলেন বলে  একজন শেখ হাসিনার জন্ম হয়েছে। ২৩ বার মৃত্যুকূপ থেকে ফিরে আসা এই মানুষটির ৭৫ তম জন্মদিনে শুভেচ্ছা কিছু প্রশ্ন রেখে। কী করে বেঁচে আছেন? বাইগার  নদী আপনাদের দু বোনের চোখের জলে  লোনা হয়েছে। দিন আসে দিন যায়, এভাবে বছরের পর বছর, একসময় যুগ অতিক্রম করে, তবুও বদলায় না আপনার পরিশ্রমের মানচিত্র।

আপনার দু’বোনের চোখের জল নদীতে গিয়ে সাগরে মিশে ঢেউ আছঁড়ে পড়ে বালুকাবেলায়। রক্তগঙ্গায় ভেসে গেছে জীবনের চরাচর। দু’চোখ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে যায় পদ্মা পেরিয়ে মেঘনায়। আপনাদের শাড়ির আঁচলে ঢেকে গিয়েছে ভাইবোনের রক্তাক্ত মুখ আর বুলেট বিদ্ধ দেহ।

আচ্ছা আপনাদের কি রাগ নেই! ঘৃণা নেই! ক্ষোভ নেই! যে আকাশ বাতাস কেড়ে নিলো এক নিমিষে আপনাদের সুখের রাজ্য;  তাও সে আকাশের জমিনে উড়িয়ে যাচ্ছেন শান্তির সাদা পায়রা। আচ্ছা, আপনি তো পাথর নন! রক্তমাংসে গড়া মানুষ, তাহলে কি করে সইছেন এত শোক?  বুকে চাপা দিয়ে রেখেছেন কত সহস্র ধূলি মাখা ধূসর স্মৃতি। আপনার স্বজনেরা নিথর হয়ে পড়ে আছে মাটির সাথে মিশে, যেখানে গজিয়ে উঠেছে সবুজ দুর্বা ঘাস। যেন মনে হয় জামাল, কামাল, রাসেলেরা তারুণ্যে ছুটে বেড়ায়। ওদিকে পিতা সবাইকে ছেড়ে একা শুয়ে আছেন নিজ ভূমে। আপনাদের দু’জনের কাছে আমার আবার ও প্রশ্ন, কী করে বেঁচে আছেন? কী করে সইতে পারেন? আমাদের প্রার্থনায়  বেঁচে থাকবেন আপনার স্বজনেরা।

পিতা, যে আপনি সকলের দুঃখ ঘুচে দেবার জন্য পরিশ্রম করতেন, ভিক্ষুককে ডেকে এনে পাশে বসিয়ে মালা পরিয়ে দিতেন। সে আপনি কোথায় আছেন, কতদূরে? জানেন কি পিতা, আপনার দুই কন্যা আপনাকে হারিয়ে শোকার্ত হয়ে শক্তি অর্জন করেছেন! বাস্তবায়ন করে চলেছেন আপনার সোনার বাংলার স্বপ্ন। পিতা যেখানে আছেন, শুনতে পাচ্ছেন তো বাংলাদেশের এগিয়ে যাবার গল্প ?

লেখক: অধ্যাপক, লোক প্রশাসন বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

/এসএএস/

সম্পর্কিত

৭৫’র শহীদ রিন্টুর গল্পটা কি আমরা জানি?

৭৫’র শহীদ রিন্টুর গল্পটা কি আমরা জানি?

বঙ্গবন্ধুর বিশ্বস্তজন শহীদ কর্নেল জামিলের কথা

বঙ্গবন্ধুর বিশ্বস্তজন শহীদ কর্নেল জামিলের কথা

তারুণ্যের প্রতীক সব্যসাচী শেখ কামাল

তারুণ্যের প্রতীক সব্যসাচী শেখ কামাল

ডেঙ্গুজ্বর নিয়ে ভাবনা ও কিছু কথা

ডেঙ্গুজ্বর নিয়ে ভাবনা ও কিছু কথা

রোহিঙ্গা ইস্যুতে কূটনৈতিক তৎপরতা হতাশার

আপডেট : ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১৭:০০

আনিস আলমগীর বাংলাদেশের জন্মের পর থেকে যেসব সমস্যার সম্মুখীন তার মধ্যে বর্তমান রোহিঙ্গা সমস্যা একটা কঠিনতম সমস্যা। রোহিঙ্গা নিয়ে আশির দশক থেকে বাংলাদেশ সমস্যায় পড়লেও ২০১৭ সালে এসে বড় ধরনের ধাক্কা খেয়েছে এবং এখন তার ৫ম বর্ষ চলছে। সমস্যা উত্তরণে বাংলাদেশ কূটনৈতিক তৎপরতা চালাচ্ছে সত্য, কিন্তু সেটা যে কাজে আসছে না তা এখন আরও স্পষ্ট।

জাতিসংঘের ৭৬তম অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রোহিঙ্গা শরণার্থীদের নিয়ে যা বলেছেন,২০১৭ সাল থেকে তা-ই বলে আসছেন। তার কণ্ঠে উঠে এবার এসেছে হতাশার সুরও। জাতিসংঘের এ সংক্রান্ত উচ্চ পর্যায়ের এক ভারচুয়াল বৈঠকে যোগ দিয়ে তিনি বলেছেন, ‘গত চার বছর ধরে আমরা এই উচ্চাশাই পোষণ করে আসছিলাম যে এসব স্থানচ্যুত লোকজন নিজেদের দেশ, তাদের মাতৃভূমি মিয়ানমারে নিরাপদে, সুরক্ষিতভাবে সসম্মানে ফেরত যেতে পারবে। আমরা তাদের নিজ দেশে প্রত্যাবর্তনের জন্য আন্তর্জাতিক সমাবেশে এবং আন্তর্জাতিক সমাজের প্রতি আস্থা রেখেছিলাম। আমাদের কথা শোনা হয়নি, আমাদের আশা অপূর্ণই থেকে গেছে।’

এখন প্রশ্ন আসতে পারে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের ফেরত পাঠানোর ক্ষেত্রে আমরা এতদিনেও সাফল্যের বিন্দুমাত্র কিছু চোখে দেখছি না কেন? কেন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে আমরা কাজে লাগাতে পারিনি বা তারা কেন এগিয়ে আসেনি? আমাদের কূটনৈতিক ব্যর্থতা নেই তো?

আমার চোখে বাংলাদেশের কূটনৈতিক তৎপরতা শুরুতেই ভুল ছিল। রোহিঙ্গা সংকট শুরুর তিন মাসের মধ্যে মিয়ানমারের সঙ্গে প্রত্যাবাসন সমঝোতা করেছিল বাংলাদেশ। এ সমঝোতা এত দ্রুততার সঙ্গে হয়েছে যে সমঝোতার মাধ্যমে মিয়ানমার আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে দেখিয়েছে যে সংকট সমাধানের জন্য তারা কাজ করছে, যদিও সমঝোতা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে তেমন কোনও অগ্রগতি হয়নি। প্রত্যাবাসনের বিষয়ে চার বছরে কোনও অগ্রগতি হয়নি। বরং এ সমঝোতার মাধ্যমে রোহিঙ্গা সংকটকে বাংলাদেশ এবং মিয়ানমারের দ্বিপক্ষীয় বিষয় হিসেবে আবদ্ধ করা হয়েছে। একমাত্র সান্ত্বনার বিষয় হচ্ছে, মিয়ানমারের সঙ্গে বাংলাদেশের কূটনীতিক পর্যায়ে আলোচনা অব্যাহত আছে।

টেবিলের উল্টোদিকে বসলে সবকিছু বুঝা সম্ভব হয় না। মিয়ানমার যখন রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশের দিকে ঠেলে দিচ্ছে তখন বাংলাদেশ সরকার খাদ্যমন্ত্রীকে মিয়ানমার পাঠিয়ে চালের ব্যবসা করে কী কূটনৈতিক প্রয়াস চালাতে চেয়েছিল তাও আমাদের কাছে বোধগম্য হয়নি। ভারত, চীন, জাপান, রাশিয়ার সহমত ও সমর্থনের কারণে মিয়ানমার একটা সুরক্ষিত অবস্থানে বসে রোহিঙ্গা হত্যা ও বিতাড়নের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে সত্য, অন্যরা তো মিয়ানমারের বিরুদ্ধে এবং রোহিঙ্গাদের পক্ষে ছিল। আমরা তাদেরও আমাদের কাজে লাগাতে পারিনি।

মুসলিম বিশ্বও এগিয়ে এসেছিল বাংলাদেশের পাশে। বিশেষ করে তুরস্ক, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া রোহিঙ্গা বিতাড়নের ব্যাপারে বিশ্বজনমত সৃষ্টি করার উদ্যোগ নিয়েছিল। মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী দ্বিপক্ষীয় সফরে আমেরিকা গিয়ে ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠকে দ্বিপক্ষীয় বিষয় ছাড়াও রোহিঙ্গা বিষয়ে ট্রাম্পকে বিস্তারিত বলেছেন। তুরস্কের রাষ্ট্রপতি এরদোয়ান তার স্ত্রীকে রোহিঙ্গাদের অবস্থা সরজমিন দেখার জন্য বাংলাদেশে পাঠিয়েছিলেন। তিনি রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবির পরিদর্শনের সময় শরণার্থীদের দুঃখ-দুর্দশা দেখে কেঁদেছেন। ইন্দোনেশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী মিয়ানমারও সফর করেছেন। আবার ঢাকাও সফর করেছেন। মালয়েশিয়া আদালত বসিয়ে মিয়ানমারের যুদ্ধ অপরাধীদের বিচারও করেছে। বাংলাদেশের উচিত ছিল অব্যাহত কূটনৈতিক যোগাযোগ সতেজ রেখে মুসলিম দেশগুলোকে সক্রিয় রাখা।

ব্রিটেন, ফ্রান্স, জার্মানিও রোহিঙ্গাদের বিষয়ে খুবই সহানুভূতিশীল, তাদের সহানুভূতিকে আমরা কাজে লাগাতে পারিনি। ঘটনার প্রায় এক বছর পর জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস কক্সবাজারে রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শন করে গেছেন। ওআইসির পক্ষে গাম্বিয়া ২০১৯ সালের ১১ নভেম্বর আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচার আদালতে যে মামলা করেছে, তারও কোনও সুফল দেখা যাচ্ছে না।

২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট প্রায় আট লাখ মিয়ানমারের রাষ্ট্রহারা নাগরিকরা বাংলাদেশে প্রবেশ করে। এর আগে আসা রোহিঙ্গা শরাণার্থী মিলিয়ে এখন তার সংখ্যা ১১ লাখের বেশি। কোভিড-১৯-এর চ্যালেঞ্জের মুখেও বাংলাদেশ রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তা ও সুরক্ষার দিকে দৃষ্টি রেখেছে। নিজস্ব বাজেট থেকে ৩৫০ মিলিয়ন ডলার খরচ করে ভাসানচরের উন্নতি সাধন এবং সেখানে অবকাঠামো নির্মাণ করেছে।

শরণার্থী ঢলের এক মাস পরেই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনের রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে ৫ দফা সুপারিশ পেশ করেছিলেন। সে প্রস্তাবে তিনি জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে সকল সাধারণ নাগরিকের নিরাপত্তা বিধান করা এবং এ লক্ষ্যে মিয়ানমারের অভ্যন্তরে জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে সুরক্ষা বলয় গড়ে তোলার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। প্রধানমন্ত্রীর প্রস্তাবিত জাতিসংঘের উদ্যোগে মিয়ানমারে সুরক্ষা বলয় গড়ে তুলতে চাইলে নিরাপত্তা পরিষদের অনুমোদন প্রয়োজন। কিন্তু সেখানে মিয়ানমারের সমর্থক চীনের ভেটো দেওয়ার ক্ষমতা থাকায় তা বারবার পেশ করা হলে অনুমোদন পাওয়া যায়নি। চীনের সঙ্গে রাশিয়াও যোগ দিয়েছে কয়েকবার। এই ইস্যুতে বাংলাদেশ কাছে পায়নি ভারত ও জাপানের মতো বন্ধু রাষ্ট্রকেও।

মিয়ানমারে এখন সামরিক সরকারবিরোধী আন্দোলন গৃহযুদ্ধের দিকে ঠেকছে। রোহিঙ্গাদের আদৌ পাঠানো যাবে কিনা সে সংশয় রয়ে যাচ্ছে। জাতিসংঘ ও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার চাপের মুখে রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে মিয়ানমার রাজি হলে বাংলাদেশ ২০১৮ সালের নভেম্বর এবং ২০১৯ সালের আগস্টে দু’দফায় রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন শুরুর উদ্যোগ নিয়েছিল। কিন্তু দুর্ভাগ্য, একজন রোহিঙ্গাও যেতে রাজি হয়নি। মিয়ানমারে আর কোনও নির্যাতন চালানো হবে না, এই মর্মে তারা মিয়ানমার থেকে কোনও আশ্বাস পায়নি। এখন পরিস্থিতির উন্নতি কবে হবে তার কোনও হদিস নেই।

এরমধ্যে বিশ্বের ঘাড়ে এসেছে নতুন সমস্যা আফগানিস্তান। যুক্তরাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) যদি তাদের কাছে থাকা আফগানিস্তানের সংরক্ষিত তহবিল উন্মুক্ত না করে তবে আফগান অর্থনীতি ধসে পড়বে। তালেবান শাসনে সেখানে মানবিক বিপর্যয়ের সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। সুতরাং রোহিঙ্গা ইস্যুর ওপর ফোকাস কমে যেতে থাকবে।

রোহিঙ্গা নিয়ে এর আগে যতবার সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে সমাধান হয়েছে মিয়ানমারের সামরিক শাসন থাকা অবস্থাতেই। বাংলাদেশ মিয়ানমারের বর্তমান শাসন ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন না তুলে ভালোই করেছে কিন্তু সামরিক সরকারকে চাপে রাখার কোনও উদ্যোগ দৃশ্যত নেই। সারা বিশ্বে, বিশেষ করে উন্নত দেশে রোহিঙ্গা ডায়াসপোরা ছড়িয়ে আছে। মিয়ানমারকে চাপ দিতে বাংলাদেশ তাদের কাজে লাগাচ্ছে না। শুধু তা-ই না, বাংলাদেশে অবস্থানরত রোহিঙ্গাদের কোনও নেতৃত্বকেও স্বীকৃতি দিচ্ছে না, যাদের সারা বিশ্বে জনমত সৃষ্টিতে পাঠানো যেতে পারে।

বিশ্ব রাজনীতিতে চীন-যুক্তরাষ্ট্র এখন মুখোমুখি। উত্তর কোরিয়াকে সামাল দেওয়ার জন্য আমেরিকা বারবার চীনকে অনুরোধ করেছিল, কিন্তু চীন আমেরিকার সেই অনুরোধ আমলে নেয়নি। এখন দেখা যাচ্ছে চীন তার ভূ-রাজনীতির স্বার্থে মিয়ানমারে আরেক কিম ইল সাংয়ের জন্ম দিচ্ছে। সুতরাং আমেরিকা ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের বোধোদয় হওয়া স্বাভাবিক।

জাতিসংঘের এবারের অধিবেশনে মিয়ানমারের জান্তার কোনও প্রতিনিধি আমন্ত্রণ পায়নি। এই জান্তা সরকারের ওপরও বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক চাপ সৃষ্টিতে ভূমিকা রাখতে হবে। শুধু চীন ও ভারতের ওপর নির্ভরশীল থাকলে রোহিঙ্গাদের এই  মাটি থেকে কখনও সরানো যাবে না।

লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট। ইরাক ও আফগান যুদ্ধ-সংবাদ সংগ্রহের জন্য খ্যাত। [email protected]

/এসএএস/এমওএফ/

সম্পর্কিত

রাজনৈতিক দলের বিদেশি ‘দোকান’ বন্ধ হোক

রাজনৈতিক দলের বিদেশি ‘দোকান’ বন্ধ হোক

দায় এড়াতে পারবে না নতুন তালেবান

দায় এড়াতে পারবে না নতুন তালেবান

ই-কমার্স প্রতারণা থামানোর উপায়

ই-কমার্স প্রতারণা থামানোর উপায়

জিয়ার কবর নিয়ে রাজনীতি

জিয়ার কবর নিয়ে রাজনীতি

শেখ হাসিনা: বাংলার ফিনিক্স পাখি

আপডেট : ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২১, ০০:১০

আবু আব্বাস ভূঁইয়া তখনও রাতের আঁধার কাটেনি ব্রাসেলসে। ব্রহ্মাণ্ডের কর্কশতম শব্দে যেন বেজে উঠলো টেলিফোন। কুয়াশায় মোড়া সেই শীতভোরের টেলিফোনে এসেছিলো মর্মান্তিক দুঃসংবাদটি। ২৮ বছর বয়সী বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা তখনও জানতেন না, সব হারিয়ে নিঃস্ব তিনি।

ফোনটা করেছিলেন জার্মানির বন থেকে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন রশিদ চৌধুরী। শেখ হাসিনাকে সরাসরি জানাতে চাইলেন না খবরটি। কথা বললেন তার স্বামী ড. ওয়াজেদ মিয়ার সঙ্গে। ভীষণ উৎকণ্ঠা নিয়ে পাশেই দাঁড়িয়েছিলেন শেখ হাসিনা। মন বলছিলো, খুব খারাপ কিছু একটা ঘটেছে। ওয়াজেদ মিয়া ফোন রেখে যখন জানালেন, বাংলাদেশে ক্যু হয়েছে; তখনই ইলেকট্রিক শকের মতো বেদনার শিহরণ ছড়িয়ে পড়ে রক্তশিরায়।

ঠিক ধরেছিলেন তিনি। আর কেউ-ই বেঁচে নেই। মা-বাবা-তিন ভাইসহ পরিবারের কোনও আপনজনই আর নেই তার। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট। বাঙালির ইতিহাসে কলংকময় কালো দিন। স্বাধীনতার স্থপতি বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে দেশীয়-আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রে সপরিবারে হত্যা করে বিপথগামী সেনাদের একটি দল। 

এই দিন থেকে পাল্টে যায় শেখ হাসিনার জীবনের গতিপথ। পিতা-মাতা সহ পরিবারের সবাইকে হারানোর পথ ধরেই শুরু হয় অচেনা যাত্রা। অমানিশার অন্ধকারময় পথে... 

ব্রাসেলসে ছিলেন বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত সানাউল হকের বাড়িতে। অভ্যুত্থানে বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর পর, ওইদিন রাতে আনুষ্ঠানিক দাওয়াত স্থগিত করেন। একইসঙ্গে দুই কন্যা ও জামাতাকে কোনও ধরনের সাহায্য করতেও অস্বীকার করলেন হক। শেখ হাসিনার বক্তব্যে ‘আমরা যেন উনার জন্য বোঝা হয়ে গিয়েছিলাম’। দ্রুত তাঁদের চলে যেতে বলেন হক পরিবার। যাওয়ার কথা ছিলো, ফ্রান্সের প্যারিস। ফোন বাজার সাড়ে ৪ ঘণ্টা পর বোন শেখ রেহানা আর দুই ছেলে-মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে রওনা হন জার্মানির বনের উদ্দেশ্যে। বিকেল সাড়ে চারটার দিকে রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন রশিদ চৌধুরীর বাসায় পৌঁছান তাঁরা। দু’বোনই তখন অঝোরে কাঁদছিলেন। চোখ বেয়ে নামছিলো অপার শূন্যতার অশ্রু। 

মাত্র ১০ দিন জার্মানিতে থাকতে পেরেছিলেন শেখ হাসিনা-শেখ রেহানা। মাত্র ২৫ ডলার হাতে নিয়ে এসেছিলেন দুই বোন। রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন রশীদের কাছ থেকে হাজার খানেক জার্মান মুদ্রা নিয়ে চলে তাদের ওইদিনগুলো। নিরাপত্তার কথা ভেবে শুরু থেকেই তাঁদেরকে ভারতে পাঠিয়ে দেওয়ার পক্ষে ছিলেন হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী। এরই ধারাবাহিকতায় কয়েক দফায় জার্মানিতে ভারতীয় দূতাবাসে যোগযোগ করেন ওয়াজেদ মিয়া।

২৪ আগস্ট দুই সন্তান ও বোন রেহানাকে নিয়ে ফ্রাঙ্কফুর্ট বিমানবন্দরে আসেন শেখ হাসিনা ও তার স্বামী ওয়াজেদ মিয়া। গন্তব্য গোপন রেখে শুরু হয় যাত্রা। পরদিন সকাল সাড়ে ৮টার দিকে দিল্লির পালাম বিমানবন্দরে পৌঁছান তারা। সপরিবারে পিতাকে হারানোর মাত্র ১০ দিনের মাথায় যে জীবন শুরু করেছিলেন, কেমন ছিল তার সেই জীবন?

বিমানবন্দরে নামার পর, সেখানেই প্রায় চার ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয় তাদের। দুপুরের দিকে নয়াদিল্লির ডিফেন্স কলোনিতে ছোট্ট একটা বাসায় জায়গা হয় তাদের। বাইরে যাওয়া নিষিদ্ধ, কারও কাছে পরিচয়ও দেওয়া যাবে না, এমনকি দিল্লিতে কারো সঙ্গে যোগাযোগ করা যাবে না– শেখ হাসিনার ছোট্ট পরিবারকে এমন তিন কড়া পরামর্শ দিয়েছিলো ভারত সরকার। এই সময়টায় জাতির পিতার কন্যা শেখ হাসিনা ও তার স্বামী ড. ওয়াজেদ মিয়াকে নামও বদলে ফেলতে হয়েছিলো।

ভারতে তখন জরুরি অবস্থা চলছিলো। বাংলাদেশ সম্পর্কে তেমন কোনও খবর ছাপা হতো না দেশটির পত্রপত্রিকায়। তাই ভয়ানক দুশ্চিন্তা নিয়ে দিন পার করছিলেন তারা। দু’সপ্তাহ পর গোপনে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সাক্ষাৎ পান শেখ হাসিনা। ১৫ আগস্টের ঘটনা সম্পর্কে সর্বশেষ তথ্য জানান গান্ধী। কষ্টের তীব্রতায় নিজেকে ধরে রাখতে পারছিলেন না শেখ হাসিনা।

১৯৭৬ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকাকালে ইন্দিরা গান্ধীর সাথে ওই একবারই সাক্ষাৎ হয়েছিলো শেখ হাসিনার। একপর্যায়ে ডিফেন্স কলোনি থেকে ইন্ডিয়া গেটের কাছে পান্ডারা পার্কে নতুন আবাস হয় শেখ হাসিনা ও তাঁর পরিবারের। নিরাপত্তার জন্য নিয়োজিত ছিল দু’জন।

নামে মাত্র সরকারি খরচে চলতো তাদের দিন। সে বছর দ্বাদশ শ্রেণিতে পরীক্ষা দেওয়ার কথা ছিল বঙ্গবন্ধুর কনিষ্ঠ কন্যা শেখ রেহানার। কিন্তু বাংলাদেশের ঘটনাবলীর জন্য বন্ধ হয়ে যায় তাঁর পড়াশোনা। শান্তি নিকেতনে ভর্তির কথা চললেও নিরাপত্তাজনিত কারণে তাও বাতিল হয়। ৭৬-এ শেখ রেহানার বিয়ে হয় লন্ডন প্রবাসী শফিক সিদ্দিকের সঙ্গে।

৭৭-এ ইন্দিরা গান্ধী নির্বাচনে হেরে গেলে শেখ হাসিনা ও ওয়াজেদ মিয়ার ওপর চাপ বাড়তে থাকে। প্রথমে ফ্ল্যাটের বিদ্যুৎ বিল বন্ধ করে দেওয়া হয়, এরপর তুলে নেওয়া হয় গাড়ির ব্যবস্থাও। বলতে গেলে, তাদেরকে এক প্রকার ভারত ছেড়ে চলে যাওয়ার জন্য বাধ্যই করে নতুন সরকার। ফেরারী জীবন যেন শেষই হচ্ছিলো না আজকের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার। স্বামী, ছেলে-মেয়েকে নিয়ে লন্ডনে যান তারা। বঙ্গবন্ধু হত্যার পর এভাবেই ৬ বছর নির্বাসিত-যাযাবরের জীবন কাটান শেখ হাসিনা।

তবে এরই মাঝে শোকের পাথর বুকে বেঁধে নিজেকে তৈরি করতে শুরু করেছিলেন। ১৯৮১ সালের ১৭ মে। স্বজনহারার যন্ত্রণা নিয়ে সবহারা শেখ হাসিনা পা রাখেন পিতার গড়া স্বাধীন বাংলাদেশে। ঢাকা বিমানবন্দরে সেদিন ১৫ লাখেরও বেশি মানুষ তাঁকে স্বাগত জানাতে হাজির হন। নিষ্পেষিত মানুষের হাহাকার কণ্ঠে ধারণ করে, আকাশের দিকে দুই হাত তুলে মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ও বাংলার মানুষের কাছে বিচার চান বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা। পনেরো আগস্টের ন্যাক্কারজনক নৃশংসতায় আতংকিত ক্ষুব্ধ বাংলার মানুষ হয়ে ওঠে তাঁর আপনজন। আর এই ভালোবাসাকেই পুঁজি  করে রাজনৈতিক অঙ্গনে  ও সাধারণ মানুষের অন্তরে স্থান করে নেন জননেত্রী।

১৯৪৭ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর জন্ম শেখ হাসিনার। প্রায় চার দশকেরও বেশি সময় ধরে বিস্তৃত তার রাজনৈতিক কর্মজীবন। ছাত্রজীবনে ছিলেন তুখোড় নেতা। যার প্রমাণ দিয়েছেন ইডেন কলেজ ছাত্র সংসদ নির্বাচনে, সেসময়কার অগ্নিকন্যাখ্যাত মতিয়া চৌধুরীকে হারিয়ে ভিপি নির্বাচিত হয়ে।

১৯৮১ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি ঢাকার ইডেন হোটেলে আওয়ামী লীগের ঐতিহাসিক কাউন্সিলের মধ্য দিয়ে বঙ্গবন্ধু কন্যা ঐক্যের প্রতীক হিসেবে সর্বসম্মতিক্রমে দলের সভাপতি নির্বাচিত হন। তখনও দেশে আসেননি। পরে ১৭ মে বাংলাদেশে এসেই রাজনৈতিক মঞ্চে নিজেকে ও তার দলকে প্রতিষ্ঠিত করার কাজে লেগে যান শেখ হাসিনা। তবে খুব সহজ ছিল না স্বৈরাচারী জিয়া সরকারের যাঁতাকলে পিষ্ট দেশে, স্বাধীনতার স্থপতি বঙ্গবন্ধুর জেষ্ঠ্যকন্যা শেখ হাসিনার শুরুর পথচলা। ছুটে গিয়েছিলেন ধানমণ্ডি ৩২ নম্বরের রক্তস্নাত বাড়িতে। কিন্তু জিয়াউর রহমানের সরকারের পেটোয়া বাহিনী বঙ্গবন্ধু ভবনে ঢুকতেই দেয়নি। ১৯৮২’র ফেব্রুয়ারিতে ড. ওয়াজেদ মিয়া বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনে যোগ দেওয়ায় মহাখালীতে দুই কামরার একটা বাসা বরাদ্দ পান। শেখ হাসিনা সেই ফ্ল্যাটেই স্বামীর সঙ্গে থেকেছেন।

নতুন জীবনে দলকে পুনর্গঠন আর গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়লেন শেখ হাসিনা। সারাদেশে দলকে পুনর্জীবিত করার সংগ্রামে মনোনিবেশ করেন।

জিয়াউর রহমান ও মুশতাক সরকারের কুখ্যাত ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ বাতিল করে বঙ্গবন্ধুর আত্মস্বীকৃত খুনি এবং জেলহত্যাকারীদের বিচার করার প্রত্যয় ঘোষণা করেন। দালাল আইন বাতিল করে যুদ্ধাপরাধীদের কারাগার ও অভিযোগ থেকে মুক্তি, চিহ্নিত স্বাধীনতা বিরোধীদের মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্তকরণ এবং স্বাধীনতাবিরোধী ও সাম্প্রদায়িক শক্তিকে রাজনীতি করার সুযোগদানের বিরুদ্ধে শুরু করেন সংগ্রাম। রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুটপাট, ঘুষ-দুর্নীতি এবং অবৈধ ক্ষমতা দখল করে রাজনৈতিক দল গড়ে তোলার প্রক্রিয়ার বিরুদ্ধেও দেশবাসীকে সোচ্চার হওয়ার আহ্বান জানান।

১৯৮২ সালে জেনারেল এরশাদের ক্ষমতায় আরোহনকে অবৈধ ঘোষণা করে এরশাদ বিরোধী দুর্বার আন্দোলন গড়ে তোলেন শেখ হাসিনা। ১৯৮৩ সালে তিনি পনেরো দলের একটি জোট গঠন করেন। তার নেতৃত্বে দেশজুড়ে এরশাদ বিরোধী আন্দোলন গড়ে ওঠায় ১৯৮৩ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি তৎকালীন সামরিক শাসকের নির্দেশে শেখ হাসিনাসহ ৩১ জন নেতা-কর্মীকে শীর্ষ নেতৃবৃন্দকে সামরিক গোয়েন্দারা চোখ বেঁধে ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে নিয়ে যায় এবং বিনা কারণে একটানা ১৫ দিন আটকে রাখে।

১৯৮৪-এর ফেব্রুয়ারি ও নভেম্বরে তাকে পুনরায় গৃহবন্দি করা হয়। ১৯৮৫-এর মার্চে তাকে ৩ মাস মাস বিনাবিচারে আটক রাখে। জাতীয় সংসদে বিরোধীদলীয় নেত্রী থাকা সত্ত্বেও ১৯৮৬-এর ১০ নভেম্বর তিনি যখন সচিবালয় অবরোধ কর্মসূচির নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন তখন পুলিশ তাঁর প্রতি গুলিবর্ষণ করে এবং জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে গাড়িতে থাকা অবস্থায় ক্রেন দিয়ে সেই গাড়ি তুলে নেওয়ার চেষ্টা চলে। পরদিন ১১ নভেম্বর তার বিরুদ্ধে ১ মাসের আটকাদেশ দেওয়া হয়। ১৯৮৮-এর ২৪ জানুয়ারি চট্টগ্রামে হত্যার উদ্দেশে তাঁর গাড়ি বহরে পুলিশ গুলিবর্ষণ করলে অল্পের জন্য প্রাণে বেঁচে যান। সেদিন বঙ্গবন্ধুকন্যাকে রক্ষায় প্রায় অর্ধশত নেতাকর্মী প্রাণ বিসর্জন দেন। ১৯৮৯-এর ১১ আগস্ট রাত ১২টার দিকে ফ্রিডম পার্টির একদল সশস্ত্র সন্ত্রাসী ধানমণ্ডি ৩২ নম্বরের বঙ্গবন্ধু ভবনে হামলা চালায়। বঙ্গবন্ধু কন্যা ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা তখন সেখানে ছিলেন। হামলাকারীরা ৭/৮ মিনিট ধরে বঙ্গবন্ধু ভবন লক্ষ্য করে গুলি চালায় ও গ্রেনেড নিক্ষেপ করে। তবে সেটি বিস্ফোরিত হয় নাই। ১৯৯০-এর ২৭ নভেম্বর স্বৈরাচারী সরকারের জরুরি অবস্থা ঘোষণার পর শেখ হাসিনাকে বঙ্গবন্ধু ভবনে অন্তরীণ করা হয়। অবশ্য প্রবল গণরোষের ভয়ে সামরিক সরকার ওইদিনই তাকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয়।

এরপর আসে- জিয়াউর রহমানের পরম্পরার রাজনীতি নিয়ে খালেদা জিয়ার সরকার। শুরু হয় এবার জননেত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যার একের পর এক চেষ্টা। ১৯৯১ এর ১১ সেপ্টেম্বর রাজধানীর গ্রিনরোডে উপনির্বাচনে ভোটের পরিস্থিতি দেখতে গেলে বিএনপি’র কর্মীরা গুলিবর্ষণ ও বোমা বিস্ফোরণ করে। ২৩ সেপ্টেম্বর ১৯৯৪ তারিখে ঈশ্বরদী ও নাটোর রেল স্টেশনে প্রবেশের মুখে তাঁকে বহনকারী রেল গাড়ি লক্ষ্য করে গুলি ছোঁড়া হয়; স্টেশনে সমাবেশ পন্ড করার জন্য আগে থেকে অসংখ্য বোমা ফাটানো হয়। শেখ হাসিনাকে হত্যার উদ্দেশ্যে তাঁকে লক্ষ্য করে গুলিবর্ষণ করা হয়। ১৯৯৫ এর ৭ ডিসেম্বর শেখ রাসেল স্কয়ারে সমাবেশে ভাষণ দানরত অবস্থায় আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ও সাবেক বিরোধী দলীয় নেত্রী শেখ হাসিনার ওপর গুলিবর্ষণ করা হয়। ১৯৯৬ এর ৭ মার্চ বৃহস্পতিবার বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউতে আওয়ামী লীগের সমাবেশে সভানেত্রী শেখ হাসিনার বক্তৃতার পর অকস্মাৎ একটি মাইক্রোবাস হইতে সভামঞ্চ লক্ষ্য করে গুলিবর্ষণ ও বোমা নিক্ষেপ করা হইলে অন্তত ২০ জন আহত হয়। 

জেল-জুলুম, গৃহবন্দিত্ব এমনকি চোখের সামনে মৃত্যুর স্বরূপ বার বার দেখতে হয়েছে তাঁকে। তবে এসব যেন তাঁকে আরো সাহসী ও আরো দৃঢ় করে তোলো। পিতা যেমন ধ্বংসস্তুপ থেকে মাত্র সাড়ে ৩ বছরে স্বনির্ভর বাংলাদেশ গড়েছিলেন, বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা তেমনই স্বৈরশাসকের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে প্রতিষ্ঠা করেন ভোট ও ভাতের অধিকার। ৯৬ সালে দীর্ঘ ২১ বছর পর জনতার রায় নিয়ে সরকার গঠন করে আওয়ামী লীগ।

১৯৯৬-২০০১ পাঁচ বছর ছিল স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে সফল সময়। এ’সময়কালের মধ্যে ১৯৯৬ সালের ১২ ডিসেম্বর ভারতের সাথে গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তি, ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তি চুক্তি, ১৯৯৮ সালে যমুনা সেতুর নির্মাণ কাজ সম্পন্ন করা, ১৯৯৯ সালে ২১ ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত করাসহ অনেকগুলো খাতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জিত হয়। এসময় দ্রব্যমূল্য ছিল ক্রয় ক্ষমতার মধ্যে। কৃষকের জন্য ন্যায্যমূল্যে সার, বীজ সরবরাহ এবং সেচ সুবিধা সম্প্রদারণের ফলে দেশ প্রথমবারের মতো খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করে। প্রায় ২ হাজার ৬ শ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন বৃদ্ধি পায়। প্রথম মোবাইল প্রযুক্তির বাজার উন্মুক্ত করে দেওয়া হয় এবং উল্লেখযোগ্য হারে কর সুবিধা প্রদান করা হয়। বেসরকারি খাতে টেলিভিশন চ্যানেল অপারেটর করার অনুমতি প্রদান করে আকাশ সংস্কৃতিকে তৃণমূল পর্যায়ে জনগণের দোরগোড়ায় নিয়ে যাওয়া হয়। পিতার সাথে মাতার নাম লেখা বাধ্যতামূলক করা হয়। কম্পিউটার আমদানির ক্ষেত্রে শুল্ক হ্রাসকরণের দ্বারা সাধারণের হাতে হাতে বিশ্বায়নের মাধ্যম পৌঁছে দেওয়া হয়। তবে এ দফায় মাত্র পাঁচ বছর ক্ষমতা থাকতে পারেন শেখ হাসিনা। দীর্ঘ দুই দশকের ষড়যন্ত্র আর ক্ষমতা আঁকড়ে ধরার প্রবণতা থেকে বিএনপি-জামায়াত জোটকে হটানো কঠিন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়।

সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতা, বৈশ্বিক ষড়যন্ত্র আর জন-মতামত উপেক্ষা করা নির্বাচনে হারিয়ে দেওয়া হয় আওয়ামী লীগকে। এরপর শুরু হয় বঙ্গবন্ধুকন্যাকে রাজনীতি থেকে মাইনাস করার ফর্মুলা বাস্তবায়ন; থেমে থাকে না খালেদা-তারেকের ষড়যন্ত্র ও নীলনকশা। চলে শেখ হাসিনাকে অন্তত ২১ বার হত্যার ষড়যন্ত্র। 

২০০২-এর ৪ মার্চ নওগাঁয়, ২০০২ সালে ২৯ সেপ্টেম্বর সাতক্ষীরার কলারোয়ায় সংসদে তৎকালীন বিরোধী দলীয় নেতা ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ওপর হামলা চালানো হয়। ২০০৪ সালের ২ এপ্রিল বরিশালের গৌরনদীতে শেখ হাসিনার গাড়ি বহরে গুলিবর্ষণ করে জামায়াত-বিএনপির ঘাতক চক্র। এরপর ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা।

বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউতে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে শান্তি সমাবেশে গ্রেনেড হামলা চালানো হয়। খালেদা-পুত্র তারেক রহমানের প্রত্যক্ষ মদদে এদিন শেখ হাসিনা-সহ আওয়ামী লীগকে নেতৃত্বশূন্য করার চেষ্টা চালানো হয়। কয়েকজন নেতা অল্পের জন্য ভয়াবহ এই হামলা থেকে বেঁচে গেলেও সাবেক রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমানের সহধর্মিণী ও আওয়ামী লীগের মহিলা বিষয়ক সম্পাদক আইভি রহমান এবং আরও ২৩ জন নেতাকর্মী নিহত হন। এছাড়াও ওই হামলায় আরও ৪শ’ জন আহত হন। যাদের অনেকেই চিরতরে পঙ্গু হয়ে গেছেন। তাদের কেউ কেউ আর স্বাভাবিক জীবন ফিরে পাননি।

২০০৬ সালের ২৯ অক্টোবর ইয়াজউদ্দিনকে দিয়ে ‘ক্যু’ ঘটিয়েছিল আওয়ামী লীগবিরোধী এবং বিএনপি-জামায়াতের পক্ষের শক্তি। এরপর আসে সেনা সমর্থিত ‘অবৈধ সরকার’। ২০০৭ সালের ১৬ জুলাই তারিখে অন্যায়ভাবে বিনা ওয়ারেন্টে গ্রেফতার করা হয় জননেত্রী শেখ হাসিনাকে। পরে সাব জেলে খাবারে স্লো পয়জনিং-এর মাধ্যমে হত্যার চেষ্টা চালানো হয়। অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন শেখ হাসিনা।

২০০৮ সালের ১১ জুন এগারো মাস কারাভোগের পর শেখ হাসিনাকে প্যারোলে মুক্তি দিতে বাধ্য হয় ফখরুদ্দিন-মঈনুদ্দিনের সরকার।

আর শত্রুর মুখে ছাই দিয়ে ২০০৮ সাল থেকে টানা ৩ মেয়াদে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তাঁর নেতৃত্বে সরকার পরিচালনা করছে আওয়ামী লীগ। শেখ হাসিনা যেন অবিকল পিতা বঙ্গবন্ধুরই প্রতিচ্ছবি। বঙ্গবন্ধু যেমন ধ্বংসস্তুপ থেকে মাত্র সাড়ে ৩ বছরে স্বনির্ভর বাংলাদেশ গড়েছিলেন, কন্যা অনুসরণ করছেন পিতারই পদাঙ্ক। রাষ্ট্রদর্শনে প্রাধান্য দেন জনগণ ও দেশের উন্নয়নকে। বিশ্ব পরিমন্ডলে জননেত্রী শেখ হাসিনা আজ গণতন্ত্র, উন্নয়ন, ন্যায়বিচার ও শান্তির প্রতীক হয়ে উঠেছেন। পিতার স্বপ্ন বাস্তবায়নে বৈষম্যহীন এবং সকলের অংশগ্রহণমূলক ক্ষুধা, দারিদ্রমুক্ত সোনার বাংলা গঠনের কাজ করে যাচ্ছেন নিরলস।

বঙ্গবন্ধু কন্যা ঘুচিয়ে দিয়েছেন পশ্চিমাবিশ্বের তলাবিহীন ঝুঁড়ির গ্লানির অপবাদ। বঙ্গবন্ধুর অর্থনৈতিক কাঠামোর ধারাবাহিকতায় টেকসই অর্থনীতির ভিত গড়েছেন। ‘মানুষ নিয়েই কল্যাণ রাষ্ট্র’- বঙ্গবন্ধুর এই দর্শনই রাষ্ট্রনায়ক শেখ হাসিনার মূলমন্ত্র।

স্থায়ী অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, স্বনির্ভর খাদ্য ব্যবস্থা, নারীর ক্ষমতায়ন, গ্রামীণ জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন, অবকাঠামো,  তথ্য-যোগাযোগ ও প্রযুক্তি, বিদ্যুৎ ও জ্বালানিসহ উন্নয়নের  প্রতিটি ক্ষেত্রেই শেখ হাসিনা সরকারের সাফল্যে বাংলাদেশ এখন বিশ্বে উন্নয়নের রোল মডেল।

স্বাধীনতার পরে ১৯৭২-৭৩ অর্থবছরের ৭৮৬ কোটি টাকার বাজেট এখন ৭২৩ গুণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৬৮ হাজার কোটি টাকার ওপরে। সাড়ে ৭ হাজার কোটি টাকার জিডিপির আকার হয়েছে প্রায় ২৮ লাখ কোটি টাকা। রফতানির আকার ৩ দশমিক ৩৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। বৈদেশিক মুদ্রার বাজার ১ দশমিক ২৬ বিলিয়ন ডলার থেকে ছাড়িয়েছে ১৮০ বিলিয়ে ডলারে।

বাংলাদেশ এখন বিশ্বের দ্রুত বর্ধনশীল পাঁচটি অর্থনীতির মধ্যে অন্যতম। জিডিপি-তে আমরা বিশ্বের ৪১তম। গত এক দশকে দারিদ্র্যের হার ৩১ দশমিক ৫ থেকে ২০ দশমিক ৫ শতাংশে নেমে এসেছে। এসময়ে আমাদের মাথাপিছু আয় তিনগুণ বৃদ্ধি পেয়ে ২,২২৭ মার্কিন ডলারে উন্নীত হয়েছে। বৈদেশিক মুদ্রার মজুদ সর্বকালের সর্বোচ্চ ৪৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার অতিক্রম করেছে।

মাথাপিছু আয়, মানবসম্পদ,  অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা- তিন সূচকের মানদণ্ড পূরণের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে পৌঁছেছে।

পদ্মাসেতুর মতো মেগা প্রজেক্ট এখন আর স্বপ্ন নয় বাস্তব। অদম্য সাহসী শেখ হাসিনা বৈশ্বিক ঋণ ও দাতা সংস্থাগুলোকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে  নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মাসেতুর মতো বৃহৎ প্রকল্প দৃশ্যমান করেছেন। আর এক বছর পরই সেতুর ওপর দিয়ে একইসাথে চলবে বাস-ট্রেন।

রাজধানীতে দৃশ্যমান মেট্রোরেলের পথও। যানজট এড়ানো এবং নগরবাসীর ভোগান্তি কমাতে  একাধিক উড়াল সেতু, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে ও ক্রাইভার নির্মাণ দ্রুতগতিতে অগ্রসরমান।

ঢাকার বাইরে দেশব্যাপী চলমান নানান বড় বড় সব প্রকল্প। চট্টগ্রামে কর্ণফুলী নদীর বহুলেনের কর্ণফুলী টানেল, পাবনায় রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, পায়রা সমুদ্র বন্দর, দোহাজারি-রামু-কক্সবাজার ঘুমধুম রেলপথ, মাতারবাড়ি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং চট্টগ্রামে এলএনজি টার্মিনাল। দেশজুড়ে গড়ে উঠছে ১০০টি অর্থনৈতিক অঞ্চল। সময়মত এসব প্রকল্প বাস্তবায়নের লক্ষ্যেই সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছেন জাতির পিতার সুযোগ্য কন্যা।  উন্নয়নের গতি ধরে রাখতে ১০০ বছরের ডেল্টা প্ল্যানও রয়েছে সরকারের।

দুর্যোগে-মহামারিতেও বিচক্ষণ নেতৃত্বে সংকট কাটিয়ে উচ্চ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ঠিক রেখেছেন শেখ হাসিনা সরকার। করোনা মহামারি মোকাবিলায় বিশ্বের অনেক বড় বড় অর্থনীতির দেশ যেখানে খেই হারিয়ে ফেলেছিল, বাংলাদেশ সেখানে জীবন জীবিকা রক্ষায় মুন্সিয়ানার পরিচয় দিয়ে চলেছে। একদিকে অর্থনীতি সচল রাখতে প্রণোদনা দেওয়া হয়েছে বিভিন্ন খাতে। আবার ভ্যাকসিন নিয়ে বিশ্বব্যাপী বিপুল চাহিদার মধ্যেও দ্রুততম সময়ে দেশের মানুষের জন্য তা নিশ্চিত করা হচ্ছে।

প্রায় দেড় বছরের করোনার ধাক্কার পরও বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের ধারণা উড়িয়ে, এশিয়ার সব দেশের মধ্যে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি সবচেয়ে বেশি। এসব কিছুই সম্ভব হয়েছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত ও সঠিক নির্দেশনায়।

২০০৮ ক্ষমতায় আসার পর শুরু করা ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার মিশন বাস্তবায়নের ফলাফল মহামারিকালীন সময়ে শিক্ষা, চাকরিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে এনে দেয়  নতুন সফলতা। মহাকাশে বঙ্গবন্ধু স্যাটালাইট স্থাপনও উন্মুক্ত করে প্রযুক্তির আরেক দ্বার।

শুধু অর্থনীতি আর উন্নয়ন নয়, নিজেরাই নানা প্রতিবন্ধকতার মধ্যে থেকেও ছোট্ট এই দেশটির প্রধানমন্ত্রী, ২০১৭ সালে মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা সাড়ে সাত লাখেরও বেশি রোহিঙ্গার জন্য  খুলে দেন মানবতার দ্বার।

এমন মানবিক, দৃঢ়চেতা ও বলিষ্ঠ নেতৃত্বের অধিকারী শেখ হাসিনা বিশ্বব্যাপী ব্যাপক প্রংশসা কুড়িয়েছেন। শেখ হাসিনা পরিণত হয়েছেন বিশ্বের অন্যতম সর্বোচ্চ ক্ষমতাশালী ব্যক্তিদের একজন। বিশ্বের ক্ষমতাধর ১০০ নারীর তালিকায় বার বার এসেছে তাঁর নাম। বিশ্ব পরিমণ্ডলে তিনি আজ গণতন্ত্র, উন্নয়ন, ন্যায়বিচার ও শান্তির প্রতীক।

জননেত্রীর স্বপ্ন বাংলাদেশকে ২০৪১ সালের মধ্যে একটি জ্ঞানভিত্তিক উন্নত দেশ ও ২১০০ সালের মধ্যে সমৃদ্ধ ও টেকসই বদ্বীপে রূপান্তর করা। তার নেতৃত্বেই কল্যাণ রাষ্ট্রের সব উপাদান নিয়ে বাংলাদেশে এখন টেকসই অর্থনীতির দেশ।

আজ বঙ্গবন্ধু কন্যার ৭৫ তম জন্মদিনে মহান রাব্বুল আলামিন আমাদের প্রিয় আপাকে দীর্ঘায়ু করুন, যেন বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলার রুপায়িত করে যেতে পারেন। জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু, জয়তু দেশরত্ন শেখ হাসিনা।

লেখক: সাবেক ছাত্রলীগ নেতা

 

/এসএএস/

সম্পর্কিত

আজ মহাবরণের মহাদিন

আজ মহাবরণের মহাদিন

শুভ জন্মদিন সবার প্রেরণা শ্রদ্ধেয় প্রধানমন্ত্রী

শুভ জন্মদিন সবার প্রেরণা শ্রদ্ধেয় প্রধানমন্ত্রী

রোহিঙ্গা ইস্যুতে কূটনৈতিক তৎপরতা হতাশার

রোহিঙ্গা ইস্যুতে কূটনৈতিক তৎপরতা হতাশার

শেখ হাসিনা ও আমাদের আইনি ঐতিহ্য

শেখ হাসিনা ও আমাদের আইনি ঐতিহ্য

শেখ হাসিনা ও আমাদের আইনি ঐতিহ্য

আপডেট : ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১৮:১৮

এস এম মাসুম বিল্লাহ  যারা বঙ্গবন্ধুকে টেলিভিশনের পর্দায় দেখে তাঁর জলদ-ভাব-গম্ভীরভরাট কণ্ঠ শুনে আচমকা থমকে যান এবং নিবিষ্টমনে বলে ওঠেন, ‘ইশ, বঙ্গবন্ধু যদি বেঁচে থাকতেন’– তাঁদের জন্য এই লেখা। যাঁরা জাতির দুঃসময়ে শেখ হাসিনার নেতৃত্ব দেখে আনন্দিত বোধ করার ক্ষমতা রাখেন এবং জাতির উদ্দেশ্য প্রদত্ত কোনও ভাষণে সুকান্ত-রবীন্দ্রনাথ-নজরুল থেকে তাঁর আবৃত্তি করাকে নেহায়েত দুর্ঘটনা মনে করেন না, তাদের জন্যে এই লেখা। 

এই লেখায় আমি বাংলাদেশের আইনি সৌন্দর্যময় মন খুঁজবো। সেখানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং তাঁর মহোত্তম পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অবদানের স্বীকৃতি ও স্বরূপ সম্মুখে আনতে চাইবো। এভাবে শেখ হাসিনার সম্মানে এই নিবন্ধটা উপস্থাপন করে তাঁর জন্মদিনে শুভেচ্ছা জানাবার প্রয়াস পাবো। বলা জরুরি যে, এখানে আইনি ঐতিহ্যের শিল্পীত ডালায় সংবিধান, মানবাধিকার এবং আন্তর্জাতিক আইনের মিতালি– এই তিনটি বিষয় আমি বিশেষ করে বিবেচনায় নেব।

আমি জানি যে, যে কথা বলতে চাচ্ছি তার কিছু গ্রহণযোগ্য, দৃষ্টিগ্রাহ্য সমালোচনামূলক দিক থাকবে, কিন্তু বঙ্গবন্ধু-শেখ হাসিনা পরম্পরা বলতে গিয়ে খেয়ালিজন একটা ধারা ধরতে পারবেন। এবং হঠাৎ করেই ডাক্তারের নাড়ির স্পন্দন পরীক্ষা করার মতো মাঝে-মাঝে আমাদের আইনি-সংস্কৃতির প্রাণধারা হারিয়ে ফেলবেন। 

আইনি সৌন্দর্যধারার শুরুর বহমান স্রোতকে এই দেশের ৫০ বছরের জীবনকালে কিছু নির্দিষ্ট সময়ে (সামরিক বা সামরিক মানসিকতাসম্পন্ন আমলে) থমকে যেতে দেখা যাবে। ভবিষ্যৎ দু’একটা ব্যতিক্রম যে নেই তা নয়, কিন্তু সেটা আমি ধরছি না। দীঘির জলের দিকে হেলে থাকা বরই গাছের বড় ডাল কেটে ফেললে সে ডাল পুরো মানুষটাকে নিয়েই জলে পড়ে, ডালে দুই একটা পাকা বরই যে থাকে না, তাতো নয়!

ব্যাপারটা একটু খোলসা করি। বাংলাদেশ নামের এই মায়াময় দেশের জন্মের একটা আইনি দিক রয়েছে। পৃথিবীর যে রাষ্ট্রগুলো যুদ্ধ করে স্বাধীন হয়েছে তাদের মধ্যে বোধ করি বাংলাদেশ একমাত্র দেশ, যে দেশের মানুষ একদিকে যেমন দিগ্বিদিক দামামা বাজিয়ে যুদ্ধক্ষেত্রে রক্ত দিয়েছে, অন্যদিকে এই রাষ্ট্রের মহত্তম কারিগরেরা এর জন্মের আইনি বৈধতার ব্যাপারটি অতি সুনিপূণভাবে নিশ্চিত করেছেন। স্বাধীনতার অমোঘ ঘোষণাপত্রের মাধ্যমে আমাদের পূর্বপুরুষেরা আন্তর্জাতিক আইনের নব-নব দিগন্তের ধারা অবমুক্ত করেছেন। বাঙালির জন্যে পৃথক একটি রাষ্ট্র বানানোর প্রক্রিয়া ছিল পৃথিবীর বুকে বাংলাদেশ কর্তৃক আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার প্রয়োগের প্রথম উদহারণ। তেমনি করে এই স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের বরাতেই আমরা এককভাবে স্বাধীনতা ঘোষণার বৈধতা, আন্তর্জাতিক রাষ্ট্র-স্বীকৃতির নীতি এবং ন্যায্য সরকার পাওয়ার অধিকার প্রতিষ্ঠা করেছিলাম। মাত্র তিন মাসের মধ্যে ভারতীয় মিত্র-সৈন্যদের স্বদেশে ফেরত পাঠানোর মধ্য দিয়ে আমরা আন্তর্জাতিক আইনের ঈর্ষাকাতর বোধিনীও হয়েছি।

স্বাধীন দেশে হেমন্তের এক মিষ্টি বিকেলে মাত্র নয় মাসে আমরা গেঁথেছিলাম আমাদের রক্ত, ঘাম ও অশ্রুভেজা সংবিধান। আমরা যাতে করে ‘স্বাধীনসত্তায় সমৃদ্ধি লাভ’ করতে পারি, সেই জন্যে ‘মানবজাতির প্রগতিশীল আশা আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে সঙ্গতি’ রেখে বৈশ্বিক সংবিধানিকতাবাদ-এর প্রতিচ্ছবি হয়ে আমরা তৎকালীন জমানার অন্যতম প্রাগ্রসর ওই ১৯৭২ সালের সংবিধান নিজেদেরকে দিয়েছিলাম। সেটা ছিল উদার অর্থে আমাদের রাষ্ট্রের জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের এই জাতিকে দিয়ে যাওয়া শ্রেষ্ঠতম উপহার, যার ৭ নম্বর অনুচ্ছেদে লেখা হয়: ‘প্রজাতন্ত্রের সকল ক্ষমতার মালিক জনগণ… জনগণের অভিপ্রায়ের অভিব্যক্তিরূপে এই সংবিধান প্রজাতন্ত্রের সর্বোচ্চ আইন’। 

ইচ্ছে করলে তিনি সেদিন কোনও সংবিধান না দিয়েই, কোনও নির্বাচন না দিয়েই, পাকিস্তানের ভুট্টো-ইয়াহিয়া মডেলে এই রাষ্ট্রকে এককভাবে শাসন করতে পারতেন। আমাদের সংবিধানের ডালায় ও নকশায় রয়েছে শিল্পাচার্যের তুলির আঁচড়, নমস্য বাংলা অধ্যাপকের সৃষ্টিশীল মনন, সাহিত্যিক ও বাংলা ভাষার পণ্ডিতদের প্রজ্ঞার প্রয়োগ, রবীন্দ্রনাথের গানের কলি, মহত্তম জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর হাতের পরশ ও স্বাক্ষর। শব্দের পিঠে শব্দ বিন্যাসিত হয়ে এক ভাষার শোভাযাত্রা তৈরি করেছে সংবিধানের বাংলা পাঠ। সন্নিবেশিত রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতিসমূহ এবং মৌলিক অধিকারগুলো পড়লে এটা টের পাওয়া যায়। এতে যারা বাঙালিয়ানা খুঁজে পান না তাদেরকে করুণা করা ছাড়া আমরা আর কী করতে পারি? 

১৯৭৩ সালে দেশীয় পর্যায়ে আন্তর্জাতিক অপরাধের বিচার করার জন্যে যে আইন জাতির জনক বানিয়েছিলেন, তা ছিল নুরেমবার্গ অথবা টোকিও ট্রায়াল নীতিমালাকে (১৯৪৬-৪৮) ছাপিয়ে বিশ্বের ইতিহাসে প্রথম একটা স্বয়ংসম্পূর্ণ দেশজ আইন। জাতির পিতা হিসেবে সুনির্দিষ্ট অপরাধী ছাড়া যে রাজাকারদের তিনি ক্ষমা করেছিলেন, তা বর্তমান যুগের লোকেরা ট্রানজিশনাল জাস্টিস অথবা রেস্টরেটিভ জাস্টিস নাম দিয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ আইনের বাজারে বিলিয়ে বেড়ায়। 

১৯৭৪ সালে বাংলাদেশের তরফে আমরা আন্তর্জাতিক গুরুত্বসম্পন্ন দুটি আইন দেখতে পাই, শিশু আইন এবং সমুদ্র আইন। শিশু আইনের দর্শন আমরা পরবর্তীতে ১৯৮৯-এর জাতিসংঘ শিশু সনদে দেখি এবং সমুদ্র আইনের একক অর্থনৈতিক অঞ্চলের ধারণা (ইইজেড) ১৯৮২-এর জাতিসংঘ সমুদ্র কনভেনশনে পাই। ওই একই বছরে (১৯৭৪) আন্তর্জাতিক আইনের নীতিমালা প্রতিফলিত করে বাংলাদেশ প্রণয়ন করে বহিঃসমর্পন আইন।

এই হলো আমাদের আইনি ঐতিহ্যের এক চিলতে– লিগ্যাল হেরিটেজ। এর পরের গল্প এক বাক্যেও লেখা যায়, আবার লম্বা করেও বলা যায়। বিচারপতি শাহাবুদ্দিন আহমেদ ৮ম সংশোধনী মামলায় (১৯৮৯) এর পরের ইতিহাসকে বলেছেন সাংবিধানিকতাবাদের বালিয়াড়ি (Sand Dune), আর আরেকজন বিদগ্ধ বিচারপতি মুহম্মদ হাবিবুর রহমান ওই একই মামলার রায়ে একে আখ্যা দিয়েছেন সংবিধানের ‘সিকস্তি-পয়স্তি’ হিসাবে। 

এরপর এই দেশে স্বদেশী বর্গীরা হানা দিলো। আমাদের স্বপ্ন লুট হয়ে গেলো। আমাদের কণ্ঠ বাজেয়াপ্ত হয়ে গেলো। হালাকু খানরা বাগদাদ যেভাবে দখল করে নিয়েছিলো, স্বঘোষিত জেনারেলরা আমাদের দেশ সেভাবে জয় করে নিলো। পশ্চিম পাকিস্তান হাইকোর্ট-এর প্রধান বিচারপতি জাস্টিস রুস্তাম কায়ানি একবার চট্টগ্রাম সফরে এসে এক বক্তব্যে আইয়ুব খানকে পরিহাস করে বলেছিলেন (১৯৬২): ‘সম্ভবত পাকিস্তান সেনাবাহিনী পৃথিবীর একমাত্র সেনাবাহিনী যারা নিজেদের দেশ নিজেরাই দখল করে নিয়েছে।’ একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হলো বাংলাদেশে আইয়ুব খান স্টাইলে দেশ চালানো মোশতাক-সায়েম-জিয়া-এরশাদ সময়ে (১৯৭৫-১৯৯০)। 

সংবিধানকে মানুষের হাতে পৌঁছতে দেয়নি সামরিক সরকারগুলো। বিশেষ করে বাংলা সংবিধানের সলতে জীবন পুণ্য করে মানুষের হাতে জ্বলেনি তেমন। তখন আদালতের উঠান, বিচারক-আইনজীবী, ক্ষমতাসীনরা সংবিধানকে নিজেদের একচ্ছত্র সম্পত্তি হিসেবে ভেবেছেন। সংবিধানের ওপর সামরিক ফরমানকে প্রাধান্য দিয়ে তারা নার্সিসাস সিন্ড্রোমে ভুগেছেন। দেবী সার্সির মতো মাথায় টোকা দিয়ে মানুষকে বুঝিয়েছেন যে সামরিক আইনও আইন! 

এমন রাজ্যে মানুষ সংবিধান নিয়ে কথা বলে ঠিকই কিন্তু সংবিধানে কী রাখা হয়েছে, কী জুড়ানো হয়েছে, কেন জুড়ানো হয়েছে তা কেউ তেমন জানার প্রয়োজন মনে করে না। ১৮২৫ এর রাশিয়ার সেন্ট পিটার্সবার্গ-এর ‘ডিসেম্বর জাগরণ’ এক চুটকি মনে পড়লো। জার আলেক্সন্ডার-এর বিদায়ের পরে তার সন্তান কনস্টান্টাইন এবং নিকোলাস এর মধ্যে ক্ষমতায় আসা  নিয়ে ‘সিপাহী-জনতার বিপ্লব’ হয়। কনস্টান্টাইন-এর সমর্থকরা একটা সাংবিধানিক প্রবর্তনা চাচ্ছিলেন। তাই উচ্চ পর্যায় থেকে সিপাহী-জনতাকে ‘কনস্টান্টাইন’ ও ‘কনস্টিটিউশন’ (রাশিয়ান ভাষায় কনস্টিটুটস্যুয়ে)- এর নাম করে স্লোগান দিতে বলা হয়েছিল। তাদের যখন জিজ্ঞেস করা হলো তারা কিসের স্লোগান দিচ্ছেন, জবাবে সিপাহী-জনতা জানালো তারা কনস্টান্টাইন ও তার স্ত্রী ‘কনস্টিটুটস্যুয়ে’ -এর মঙ্গল কামনা করে স্লোগান দিচ্ছেন!

আমাদের মানুষজনকে অনেকটা ওই ধরনের সাংবিধানিক ‘ঘুমপাড়ানি মাসিপিসি’র মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে।  সামরিক শাসককে ‘বহুদলীয় গণতন্ত্রের প্রবক্তা’ হিসাবে ভাবতে শেখানো হয়েছে!   

১৯৭৫-১৯৯০ আমাদের জাতীয় আইনি মানসে এক অন্ধকারাচ্ছন্ন অধ্যায়। আইনের ছাত্ররা চোখের পলকে, মনের নিমিষে এই সময়ের মধ্যে মানবাধিকার, গণতন্ত্র, কিংবা আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি আমাদের দেশের প্রতিশ্রুতির ইঙ্গিতবাহী তেমন বড় কোনও আইন বা বিখ্যাত কোনও মামলার সিদ্ধান্ত পাবেন না। এমনকি দুই একটা ব্যতিক্রম ছাড়া ১৯৯১-১৯৯৬ এবং ২০০১-২০০৮ সময়কালকেও আপনি এই অন্ধকারের মধ্যে আনতে পারেন। বিশ্বাস না করলে বই না দেখে চোখ বুঁজে ভাবনার সাহসটা করুন, তেমন বলার মতো মানবাধিকার সমভাবাপন্ন ওই সময়ের কোনও আইন আপনি পাবেন না, যেটা আমাদের আইনি সংস্কৃতির পূর্বধারায় মূল্যবান সংযোজন হিসেবে কাজ করেছে বা করতে পারতো, বরং উল্টোটা পাবেন।

আসুন, আমরা ওই আইনি ক্রমধারাটির নাম দেই বিচারহীনতার সংস্কৃতি বা দায়মুক্তির ধারা (Culture of Impunity)।

জাতির স্থপতিকে সপরিবারে হত্যা করে তাঁর দিয়ে যাওয়া পবিত্র সংবিধানে খুনি জিয়া-মুশতাক ‘ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ’ জারি করে তাঁর বিচারের পথ রুদ্ধ করে দিয়েছিলো। শেখ হাসিনাকে পুরো জাতির সমান্তরালে দাঁড় করিয়ে এই হুজ্জতি-প্রলয় ২১ বছর ধরে সংবিধানে ছিল। কারও কিছু মনে হয়নি! ১৯৯১ সালে দেশ যে সংসদীয় ধারায় ফিরেছিল, সেই প্রস্তাবও এনেছিলেন শেখ হাসিনার পক্ষে তৎকালীন বিরোধী দলীয় সংসদ উপনেতা আব্দুস সামাদ আজাদ। বিএনপি অবস্থার প্রেক্ষিতে সংসদীয় ধারার সরকার প্রবর্তন করেছিলো, কিন্তু ইনডেমনিটি আইন বাতিলের প্রয়োজন মনে করেনি। 

বরং দায়মুক্তির সংস্কৃতির ধারাবাহিকতায় আমরা পাই ১৯৯১ সালে  আব্দুর রহমান বিশ্বাসকে রাষ্ট্রপতি করার জন্য প্রকাশ্য ব্যালট সিস্টেম চালু করে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আইন সংশোধন, ১৯৯৪ সালে গোলাম আযমের নাগরিকত্ব প্রদান, ২০০৩ সালের অপারেশন ক্লিন হার্টের মাধ্যমে বিনা বিচারে মানুষ হত্যা করে বিচার না করার আইন, ২০০৪ সালে চতুর্দশ সংশোধনীর মাধ্যমে বিচারপতিদের অবসরের বয়স ৬৭ বছর করে নিজেদের রাজনৈতিক ভাবধারার বিচারপতি কেএম হাসানকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান করে সুষ্ঠু নির্বাচনের কফিনে শেষ পেরেক ঠুকে দেওয়ার ব্যবস্থা। নিয়তির কী পরিহাস, বিএনপি কাঙ্ক্ষিত ও আহুত দুটো দায়মুক্তি আইনই (ইনডেমনিটি ১৯৭৫ ও ক্লিনহার্ট ২০০৪) পরবর্তীতে উচ্চ আদালতে বাতিল হয়ে গেছে [শাহরিয়ার রশিদ খান ১৯৯৬, জেড.আই. খান পান্না  ২০১৭]।

১৯৯৬-এর ১২ জুনের ঐতিহাসিক নির্বাচনে শেখ হাসিনাকে ক্ষমতায় এসে পিতৃ হত্যার বিচার করার জন্যে আগে ইনডেমনিটি আইন বাতিল করতে হয়, বিএনপি-জামায়াত সেদিন সংসদে অনুপস্থিত থাকে এবং হরতাল ডাকে। খুনি শাহরিয়ার রশিদ ইনডেমনিটি আইন বাতিলকে সুপ্রিম কোর্টে চ্যালেঞ্জ করে হেরে যায়। এবং শেখ হাসিনাকে এগুলো চেয়ে চেয়ে দেখতে হয়। ইচ্ছে করলে তো তিনি বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন করে জেনারেল জিয়ার কায়দায় খুনিদেরকে অবলীলায় ফাঁসি দিতে পারতেন। আমরা জানি, জেনারেল জিয়াউর রহমান তাঁর আমলে এগারোশোর বেশি মুক্তিযোদ্ধা অফিসারকে সামরিক ট্রাইব্যুনালে বিচারের নামে হত্যা করে। 

অথচ প্রচলিত সাধারণ ফৌজদারি আদালতে জাতির পিতা হত্যার বিচার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে যে দৃষ্টান্ত শেখ হাসিনা রেখেছেন, শুধু এই কারণেই বাংলাদেশের মানুষের কাছে শেখ হাসিনা নিরন্তর নমস্য হয়ে থাকবেন। ২০০১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় এসে আইনমন্ত্রী মওদুদ আহমেদকে দিয়ে উচ্চ আদালতে বিচারপতি নিয়োগ না করার মধ্য দিয়ে দীর্ঘ ১০ বছরের জন্যে বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার রায় কার্যকর স্থগিত করে দেয়। এবং নয় বছর পর ২০০৯ সালে আবার ক্ষমতায় এসে শেখ হাসিনাকে বঙ্গবন্ধুর খুনিদের কয়েকজনের ফাঁসি নিশ্চিত করতে হয়। তখন আমরা তাঁকে ‘প্রতিশোধপরায়ণ’ হিসেবে আখ্যা দেই! এবং আমরা তাঁকে আইনের শাসনের সবক দিতে থাকি! হায় সেলুকাস! কী বিচিত্র এই দেশ!

১৯৯৬ এর গঙ্গার জলবণ্টন চুক্তিতে ভারত থেকে পানি আসা শুরু হয়। ১৯৯৭-এর ঐতিহাসিক শান্তি চুক্তির মাধ্যমে জেনারেল জিয়ার সামরিকায়ন নীতির ফলে টালমাটাল হয়ে ওঠা পাহাড়ি-বাঙালি দ্বন্দ্বের হাত ধরে পাহাড়ি অঞ্চলে ৩০ হাজার মানুষের রক্তপাতের ধারা বন্ধ হয়ে যায়। বিএনপি এই শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রতিবাদে হরতাল করে, লংমার্চ করে, কিন্তু আর কিছু করে না। এরা অনেকটা মাথা গুঁজে স্ত্রীর ‘আয় খাওয়া’ অপারগ গৃহকর্তার মতো, যারা ‘স্ত্রী বাইরে কেন গেছে’ এই অভিযোগে রাগে গজ গজ করে। কিন্তু আর কিছু করে না। এরা তথ্য-প্রযুক্তি বিপ্লবকে ধারণ করে না, কিন্তু শেখ হাসিনার নিন্দায় একে ব্যবহার করে। কী এক আত্মপ্রবঞ্চনা! 

১৯৯৬-এর শেখ হাসিনা সরকার আইন কমিশন আইন করে আইন সংস্কারে এর অঙ্গীকার আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে নিয়ে আসে। ১৯৯৭ এর স্থানীয় সরকার আইন, খাস জমি বন্দোবস্ত নীতিমালা, ২০০০ সালের আইনগত সহায়তা আইন, একই বছরের নারী নির্যাতন দমন আইন, ২০০১ এর অর্পিত সম্পত্তি প্রত্যার্পণ আইন ওই সময়কার শেখ হাসিনা সরকারের ঝুলিতে নতুন অর্জন হিসেবে যুক্ত হয়। এই সময়ে ১৯৬৬-এর দুই যমজ মানবাধিকার দলিল– আইসিসিপিআর এবং আইসিইএসসিআর-এ অনুস্বাক্ষর করে আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি আমাদের সংবিধানের যে প্রতিশ্রুতি তা শেখ হাসিনা সুউচ্চে তুলে ধরেন। এই সময়ে বাংলাদেশ সমুদ্র বিষয়ক জাতিসংঘের তৃতীয় কনভেনশন (১৯৮২) অনুসমর্থন (Ratification) করে রাখে, যেটা ২০০৯ এসে বাংলাদেশকে ভারত ও মিয়ানমারের বিরুদ্ধে সমুদ্র-বিরোধ নিষ্পত্তিতে আইনি-বাধার দরজা উন্মুক্ত করে দিতে সাহায্য করে।

বাংলাদেশের ৫০ বছরের আইনি ইতিহাসকে যদি দুটো পর্বে ভাগ করি তাহলে বোধ হয় আমরা এভাবে বলতে পারবো– একটা ২০০৯ পূর্ব সময় আর একটা ২০০৯ পরবর্তী সময়। কেননা, এই ২০০৯ সালেই মানবাধিকার ও আন্তর্জাতিক আইন উদ্দীপক কিছু আইন বাংলাদেশ প্রণয়ন করেছে। দেখা যায়, গত দশকে প্রণীত আইনগুলোর প্রস্তাবনায় সংবিধান, মানবাধিকার ও আন্তর্জাতিক আইনের দোহাই দেওয়া হয়, যেটা আগে থাকতো না। এই ধারা নতুন স্বদেশী আইনবিজ্ঞান সৃষ্টির সুযোগ তৈরি করেছে বলে মনে হয়। এর জন্য অবশ্য আইনি ‘বাতি জালানি’ (Legal Enlightenment) ঘটা দরকার। 

২০০৯-এর ত্রয়ী আইন - জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন, তথ্য অধিকার আইন, ভোক্তা অধিকার আইন এই সারিতে অগ্রগামী। সামরিক আদেশের রাহুমুক্ত করে সংবিধানে ২০১১ সালে ১৫তম সংশোধনীর মাধ্যমে ফিরে আসে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বাংলাদেশ এবং এর চারটি স্থায়ী বুনিয়াদ– বাঙালি জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, ধর্ম নিরপেক্ষতা ও সমাজতন্ত্র। সেক্যুলারিজম-এর বাংলা হিসেবে ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’ যথেষ্ট উত্তাপ ছড়িয়েছে আমাদের জাতীয় জীবনে। বিচারপতি গোলাম রাব্বানী সেক্যুলারিজম এর বাংলা ‘লোকায়ত’ লেখেন (বাংলাদেশ সংবিধানের সহজ পাঠ, সমুন্নয়, ২০০৮)। কিছু দৃষ্টিভঙ্গিতে দাবি করা হয় (যেমন, আবুল মনসুর আহমদ, প্রথমা, ২০১৭) যে, সমাজতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ, ধর্মনিরপেক্ষতা ইত্যাদির মতো তাত্ত্বিক বা দার্শনিক ধারণা সংবিধানে থাকা উচিত নয়। এতে বিতর্ক কমে।

এই দৃষ্টিভঙ্গি দুটো কারণে গ্রহণযোগ্য নয়– এক. উল্লিখিত ধারণাগুলো ধারণামাত্র নয়, সেগুলো যেমন লক্ষ্য তেমনি অর্জনের উপায়ও;

দুই. সেগুলোর মুগ্ধকর সংজ্ঞা ১৯৭২ সালের সংবিধানে দেওয়া ছিল, যা জেনারেল জিয়া সামরিক কাঁচির খোঁচায় পরবর্তীতে বাদ দিয়ে জাতিকে বিভ্রান্ত করেন। 

১৫তম সংশোধনীর হাত দিয়ে বেশ কিছু ব্যাপারের সঙ্গে দুটি গুরুত্বপূর্ণ অথচ কম প্রশংসিত বিষয় সংবিধানে ঠাঁই পায়। এর একটি হলো ‘ক্ষুদ্র-নৃতাত্ত্বিক’ জনগোষ্ঠীর অধিকারের সন্নিবেশের মাধ্যমে আদিবাসী সংস্কৃতির লালন (অনুচ্ছেদ ২৩-এ) এবং প্রজন্মান্তরের অধিকার সন্নিবেশের মাধ্যমে জীব-বৈচিত্র্যের সংরক্ষণের বিধান (অনুচ্ছেদ ১৮-এ)। 

পুলিশ হেফাজতে মৃত্যু ও নির্যাতন নিবারণ আইন (২০১২), অভিবাসন আইন (২০১২), ২০১৩ সালের শিশু আইন ও ভৌগোলিক নির্দেশক পণ্য আইন, উদ্ভিদের জাত সংরক্ষণ আইন ২০১৯ ইত্যাদি আইন প্রণয়ন দেশীয় অবস্থানে থেকে মানবাধিকার ও আন্তর্জাতিক আইনের কাছাকাছি যাবার প্রয়াস বলে ভাবা যেতে পারে।

স্বীকার্য যে, ২০১৮ এর সড়ক পরবিহন আইন ও ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের বেশ কিছু ধারার যৌক্তিক সমালোচনা রয়েছে, রয়েছে ১৬তম সংশোধনীর অস্বস্তি, যা আওয়ামী লীগের আইনি প্রণয়ন ঐতিহ্যের সাথে অসাযুজ্যপূর্ণ।

১৯৭৪ সালের বিশেষ ক্ষমতা আইনের আলোচনা আমি এই লেখায় ইচ্ছে করেই তুলিনি, কেন না প্রতিটি ক্ষমতাসীন সরকার এর সুবিধা নিয়েছে, এবং এর ধারাবাহিক অপপ্রয়োগ আমাদের আইনি ঐতিহ্যে স্থায়ী অভিঘাত সৃষ্টি করেছে। 

এবার আমি লেখাটা গুটিয়ে আনার সাহসটা করি। ১৯৭৩-এ জাতির জনক যুদ্ধাপরাধের বিচারের আইন করে যান, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় বড় পরিসরে সেটা করেছে ১৯৯৮ সালে, রোম সংবিধিতায়। শেখ হাসিনা রোম সংবিধি স্বাক্ষর করেন ১৯৯৯ সালে, আর অনুসমর্থন করেন ২০১০ সালে।

এই কাজগুলো না করলে বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধকালীন সংঘটিত অপরাধের বিচার আর করা হয়ে উঠতো না। এমনকি রামপাল প্রকল্পে যাদের আপত্তি, তারা যে পরিবেশ বিপর্যয়ের দায়ে শেখ হাসিনাকে জেনেভা নিতে চেয়েছিলেন, সেই আদিখ্যেতাও তারা দেখাতে পারতেন না। আন্তর্জাতিক অপরাধ আইনবিজ্ঞানে আজ বাংলাদেশ অন্যতম একটা অধীত নাম।

বঙ্গবন্ধু শিশু আইন করেন ১৯৭৪ সালে, শেখ হাসিনাকে ২০১৩ সালে এসে সেটাকে যুগোপযোগী করতে হয়। বঙ্গবন্ধু সমুদ্র আইন করেন ১৯৭৪ সালে, শেখ হাসিনাকে এখন সেটা যুগোপযোগী করতে হচ্ছে ব্লু ইকোনমির হাতছানি দেওয়া অবারিত সম্ভাবনাকে কাজে লাগনোর জন্যে।

জাতিসংঘ সমুদ্র কনভেনশন (১৯৮২) অনুসমর্থনের পরে দেশের দীর্ঘদিন ঝুলে থাকা সমুদ্রভাগ্য নির্ধারণে বাজি ধরতে হয়। বাংলাদেশের আর কোনও রাজনৈতিক নেতা এই সিদ্ধান্ত নিতেন বলে আমার বিশ্বাস হয় না। জনগণের স্বার্থ জড়িত, অথচ শেখ হাসিনা চুপ থাকবেন এমনটি হওয়ার নয়। শেখ হাসিনা এমন এক রাজনীতিক, হতাশা যাকে মানায় না। ভারত-মিয়ানমারকে আন্তর্জাতিক সালিশী এবং সমুদ্র ট্রাইব্যুনালে নিয়ে (২০১২, ২০১৪) সমুদ্র বিরোধ নিষ্পন্ন করে শেখ হাসিনা যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন, তা এখন অন্য দেশের নেতারা অবাক বিস্ময়ে অনুসরণ করছেন, আর পৃথিবীর সমুদ্র আইনের মুয়াল্লেম আর তালেবে-এলেমগণ বসে বসে গবেষণা করছেন।

এই সুন্দরতম বিষয়গুলো এমনই এমনই ঘটতে পারে না, ঘটে না। এর পেছনে কিছু মানুষের সুন্দর মন থাকতে হয়, মেধা-মনন, ভাবনা, আকাঙ্ক্ষা-খেয়াল থাকতে হয়। এই ‘খেয়াল’ থাকাটাই শেখ হাসিনার রাজনীতিকে অন্য রাজনীতিকের রাজনীতি থেকে স্বতন্ত্র ও মহিমা উদ্ভাসিত করেছে। অনেক সময় তিনি শ্রুতিপ্রিয় বক্তা নন, কিন্তু ঝানু বিতার্কিক, দক্ষ পার্লিয়ামেন্টারিয়ান। সেটা সংসদে তাঁর সবাক, সাবলীল, স্থিতিপ্রজ্ঞ, অর্থবহ ও সহাস্য-সক্রিয় উপস্থিতি খেয়াল করলে ধরতে পারা যায়।

সংগ্রামে দুর্জয় বাংলার মানুষ হাসিনাপ্রসূত রাজনীতির মূল উপজীব্য। এই মানুষগুলোর প্রতি তাঁর দায়বোধ ও জেদ তাঁর রাজনৈতিক, সাংবিধানিক ও আইনি দর্শনকে স্থায়ী করেছে। এই দায়ভারই তাঁর নিয়তি। এই দায়ভার তাঁর উত্তরাধিকার।

তাঁর জেদ তিনি বাংলাদেশকে হারিয়ে যেতে দেবেন না। তাঁর জেদ তিনি বাংলাদেশকে ভালো রাখবেন। এদিক দিয়ে তিনি তাঁর বাবার সমান। যতবার (কমপক্ষে ২১ বার) তাঁকে হত্যা করার চেষ্টা করা হয়েছে, ততবার তিনি মাথা উঁচু করে দু’হাতে মৃত্যুকে ঠেলে অনন্ত আকাশের দিকে মাথা তুলে দাঁড়িয়েছেন। আকাশ তাঁর শিরস্ত্রাণ, মানুষ তাঁর কর্ম।

আমরা আশ্রয় পাই। আমরা ডিজিটাল হয়ে উঠি। আমাদের অর্থনীতির রুপান্তর ঘটে। আমরা ২০৪১ সালকে দেখতে পাই টুকরো টুকরো। আমাদের আলোকায়ন ঘটে। বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার ৭৫তম জন্মদিনে তাই ‘অপমান তব করিব না আজ করিয়া নান্দী পাঠ।’ শুধু বলবো– ‘জয়তু, শেখ হাসিনা!’ আপনি বহু বহু গৌরাবান্বিত অর্জনের মধ্যে আমাদের সমৃদ্ধতর আইনি সংস্কৃতির ধারক ও বাহক। জয় বাংলা। 

লেখক: শিক্ষক, আইন বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

ইমেইল[email protected] 

/এসএএস/

সম্পর্কিত

আজ মহাবরণের মহাদিন

আজ মহাবরণের মহাদিন

শুভ জন্মদিন সবার প্রেরণা শ্রদ্ধেয় প্রধানমন্ত্রী

শুভ জন্মদিন সবার প্রেরণা শ্রদ্ধেয় প্রধানমন্ত্রী

রোহিঙ্গা ইস্যুতে কূটনৈতিক তৎপরতা হতাশার

রোহিঙ্গা ইস্যুতে কূটনৈতিক তৎপরতা হতাশার

শেখ হাসিনা: বাংলার ফিনিক্স পাখি

শেখ হাসিনা: বাংলার ফিনিক্স পাখি

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

সর্বশেষ

নির্বাচনে পরাজয়, দলেই সমর্থন হারাচ্ছেন লাশেট

নির্বাচনে পরাজয়, দলেই সমর্থন হারাচ্ছেন লাশেট

যেসব উসকানিমূলক বক্তব্য দিয়েছেন মুফতি ইব্রাহীম

যেসব উসকানিমূলক বক্তব্য দিয়েছেন মুফতি ইব্রাহীম

টি-টোয়েন্টিতে রেকর্ড গড়েই চলেছেন পোলার্ড

টি-টোয়েন্টিতে রেকর্ড গড়েই চলেছেন পোলার্ড

টাঙ্গাইলে কেটে গেছে রেল লাইনের সিগন্যাল ক্যাবল

টাঙ্গাইলে কেটে গেছে রেল লাইনের সিগন্যাল ক্যাবল

শেখ হাসিনা ভালো থাকলে দেশ ভালো থাকবে: শিল্পমন্ত্রী

শেখ হাসিনা ভালো থাকলে দেশ ভালো থাকবে: শিল্পমন্ত্রী

শেষ হলো যশোর রোডে সুবাতাসের পদযাত্রা

শেষ হলো যশোর রোডে সুবাতাসের পদযাত্রা

৪৫ মিনিটে দুই ডোজ টিকা নিলেন নারী

৪৫ মিনিটে দুই ডোজ টিকা নিলেন নারী

টিকা কেন্দ্রে পুলিশকে থাপ্পড় মারায় প্রধান শিক্ষক গ্রেফতার

টিকা কেন্দ্রে পুলিশকে থাপ্পড় মারায় প্রধান শিক্ষক গ্রেফতার

সাফের মিশনে বাংলাদেশ দল এখন মালদ্বীপে

সাফের মিশনে বাংলাদেশ দল এখন মালদ্বীপে

টিকা কেন্দ্রে স্বাস্থ্যকর্মীকে থাপ্পড়, সাংবাদিক গ্রেফতার

টিকা কেন্দ্রে স্বাস্থ্যকর্মীকে থাপ্পড়, সাংবাদিক গ্রেফতার

জাদুঘরের অর্থ পকেটস্থ করে সেটিকে শিল্পকর্ম বলছেন শিল্পী

জাদুঘরের অর্থ পকেটস্থ করে সেটিকে শিল্পকর্ম বলছেন শিল্পী

৭৫ পাউন্ডের কেক কেটে প্রধানমন্ত্রীর জন্মদিন উদযাপন

৭৫ পাউন্ডের কেক কেটে প্রধানমন্ত্রীর জন্মদিন উদযাপন

সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ

© 2021 Bangla Tribune