X
শুক্রবার, ০৩ ডিসেম্বর ২০২১, ১৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৮

সেকশনস

উন্নয়ন, গণতন্ত্র ও মিডিয়ার স্বাধীনতার সপক্ষে নোবেল

আপডেট : ১৫ অক্টোবর ২০২১, ১০:৫৯

স্বদেশ রায় রাশিয়ার দিমিত্রি মুরাতভ যেদিন ফিলিপাইনের সাংবাদিক মারিয়া রেসার সঙ্গে যৌথভাবে শান্তিতে নোবেল পান ওই দিনটি ছিল  দিমিত্রি মুরাতভ সম্পাদিত নোভায়া গেজেটের অন্যতম পরিচিত সাংবাদিক আন্না পলিতিভস্কয়ার নিহত হবার ১৫তম বার্ষিকী। ২০০৬ সালে তিনি পেশাগত কাজ করতে গিয়ে গুলিতে নিহত হন। ২০০০ সাল থেকে এ পর্যন্ত নোভায়া গেজেটের ছয় জন সাংবাদিক পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে নিহত হয়েছেন। আর এই সাংবাদিক টিমেরই নেতৃত্ব দেন দিমিত্রি মুরাতভ। অন্যদিকে মারিয়া রেসার বিরুদ্ধে এখনও দুটি মামলা চলছে।

পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে মৃত্যু, হামলা ও মামলা এটা সাংবাদিকের সঙ্গে শুরু থেকে চলে আসছে। আর এ কারণে সাংবাদিকতা ঝুঁকিপূর্ণ পেশা বলেই চিরকাল চিহ্নিত। প্রত্যেকটা পেশায় ঝুঁকি নেওয়ার একটা কারণ থাকে, একটা স্বার্থকে ঊর্ধ্বে তুলে ধরে এ ঝুঁকি নিতে হয়। সাংবাদিকতার মূল স্বার্থ রাষ্ট্র ও সমাজকে মানুষের কাছে স্বচ্ছ রাখা। অধিকাংশ মানুষই মূলত সাংবাদিকের চোখ দিয়ে রাষ্ট্র ও সমাজকে দেখতে পায়। তাই অধিকাংশ মানুষকে সঠিক বিষয়টি দেখানোর সততা নিয়ে নির্ভয়ে এ কাজটি করার দায়িত্ব সাংবাদিকের ঘাড়ে বর্তায়। আর পৃথিবীতে যেখানেই যেকোনও ধরনের ভয় বা ভয়ের সংস্কৃতির বিরুদ্ধে দাঁড়ালেই সেখানে মৃত্যুসহ নানান ঝুঁকি আসবেই।

তবে আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থায় সাংবাদিকতাকে এই ঝুঁকির ঊর্ধ্বে যতটা নেওয়া যায় সেই চেষ্টাই করা হয়েছে। আর এটা যতটা না সাংবাদিকের ও সাংবাদিকতার স্বার্থে, তার থেকে অনেক বেশি মানুষ ও রাষ্ট্রের স্বার্থে। এই স্বাধীন সাংবাদিকতা শুরু হওয়ার পর থেকে প্রতিটি দেশ অনেক বড় বড় বিপর্যয় থেকে নিজেকে রক্ষা করেছে।

যেমন, একটা বিষয় লক্ষ করলে দেখা যায়, ব্রিটিশ চলে যাবার পরে ভারতে আজ অবধি বড় কোনও দুর্ভিক্ষ হয়নি। অথচ ব্রিটিশ আমলের শুরুতে দ্বৈত শাসনামলে ১৭৬৯-৭০ বা ছিয়াত্তরের মন্বন্তর নামে খ্যাত দুর্ভিক্ষে সে সময়েই তৎকালীন বেঙ্গলে প্রায় ৩০ লাখ লোক মারা যায়। আবার ১৯৪৩-এর দুর্ভিক্ষে মারা যায় প্রায় এক কোটি। সেদিনের এই বড় দুটি দুর্ভিক্ষের অর্থাৎ  ছিয়াত্তরের মনন্বতর ও ৪৩-এর দুর্ভিক্ষকে ঠেকাতে না পারার কারণ হিসেবে অনেক বিষয় গবেষকরা সামনে এনেছেন। তার ভেতর ছিয়াত্তরের মন্বন্তর না ঠেকাতে পারার অন্যতম কারণ সে সময়ের মিডিয়াবিহীন রাষ্ট্র আর ১৯৪৩-এর দুর্ভিক্ষ ঠেকাতে না পারার কারণ সরকার নিয়ন্ত্রিত মিডিয়া। ১৯৪৩-এ ব্রিটিশ সরকার দুর্ভিক্ষ সম্পর্কে কোনও সঠিক সংবাদ প্রকাশ করতে দেয়নি। কিন্তু ভারতের স্বাধীনতার পরে সেদেশে মিডিয়ার স্বাধীনতা নিশ্চিত করায় দরিদ্র দেশ হলেও সেখানে প্রতিটি দুর্ভিক্ষের পূর্বাভাস পাওয়া গেছে মিডিয়ার মাধ্যমে। আর সরকার সেই পূর্বাভাস পাবার পরপরই দুর্ভিক্ষ ঠেকানোর ব্যবস্থাগুলো নিতে পেরেছে। যার ফলে সব দুর্ভিক্ষই তারা ঠেকাতে সমর্থ হয়েছে।

আজকের পৃথিবীতে আফ্রিকার কয়েকটি দেশ ছাড়া আর সব দেশই প্রায় মূল খাদ্য অভাবটি দূর করতে সমর্থ হয়েছে।  বর্তমান বিশ্বের রাষ্ট্রগুলোর এ মুহূর্তে মোটা দাগে মূল কাজ-  মানুষে মানুষে ধনবৈষম্য কমানো, টেকসই উন্নয়ন করা, রাষ্ট্রের ও সমাজের বিভিন্ন পর্যায় থেকে দুর্নীতি বন্ধ করা, যুদ্ধ উন্মাদনা কমানো, সমরাস্ত্র প্রতিযোগিতা থেকে পৃথিবীকে বের করে আনা, ধর্মীয় মৌলবাদ ও বর্ণবাদ মুক্ত করা। আর সর্বোপরি মানুষের স্বাধীন মতামত প্রকাশের সব ধরনের সুযোগ দিয়ে চিন্তা ও সংস্কৃতির সর্বোচ্চ বিকাশ ঘটানো। যাতে মনোজাগতিকভাবে মানুষ নিজেকে উন্নত করতে পারে।

এ মুহূর্তের পৃথিবীতে একটি বিষয় স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে, পৃথিবীতে প্রতিদিন প্রযুক্তির উন্নতি ঘটছে কিন্তু ওই প্রযুক্তির সঙ্গে তাল মিলিয়ে মানুষের চিন্তা ও সংস্কৃতির বিকাশ ঘটছে না। আঠারো শতক, উনিশ শতক এবং বিশ শতকে প্রযুক্তির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে মানুষের মনোজগতে যে বিকাশ ঘটেছিল, এ মুহূর্তের পৃথিবীতে মনোজগতের বিকাশের গতি সেখানে নেই। বরং সবখানেই কমে গেছে। মনোজগতের এই বিকাশ কমে গেলে মানুষের সাহস কমে যায়, চিন্তার উদারতা কমে যায়, মানুষ অনেকটা যান্ত্রিক হয়ে পড়ে। যার ফল দাঁড়ায় রাষ্ট্র ও সমাজে দুর্নীতি, বিভিন্ন ধরনের মৌলবাদ ও কুসংস্কার বাসা বাঁধতে থাকে। এবং ধীরে ধীরে এগুলোই রাষ্ট্র ও সমাজে চালকের ভূমিকায় বসে যায়। রাষ্ট্র ও সমাজ থেকে দুর্নীতি, মৌলবাদ, কুসংস্কার এগুলো দূরে রাখতে হলে এর বিরুদ্ধে সমাজে সব সময়ই একটা প্রতিবাদ থাকতে হয়। কারণ, মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি হলো লোভের কাছে আত্মসমর্পণ করা, কুসংস্কার বা মৌলবাদের কাছে আত্মসমর্পণ করা। এর বিপরীতে মানুষের চিন্তার জগৎকে জাগ্রত করতে পারলে, বোধকে জাগ্রত করতে পারলে তখন মানুষ এগুলোর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায়। তখন রাষ্ট্র ও সমাজ সুস্থ ও আধুনিকতার পথে যাবার সুযোগ পায় বা মানুষকে সে পথে নিয়ে যেতে পারে।

আধুনিক এই রাষ্ট্র ব্যবস্থায় মানুষের বোধ ও চিন্তার জগৎ জাগ্রত রাখার জন্যে অনেক ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলে আসছে সেই পনের শতক থেকে। পৃথিবীর এই পথ চলাতে এখন অবধি দেখা যাচ্ছে, অনেক ত্রুটি সত্ত্বেও গণতান্ত্রিক পদ্ধতিই মন্দের ভালো। কারণ, গণতন্ত্র কোনও রাষ্ট্রের একক কোনও শক্তির বিষয় নয়। এটা রাষ্ট্রের অনেক শক্তির ওপর নির্ভর করে। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে যেমন রাষ্ট্রীয় সব কাঠামোকে শক্তিশালী ও স্বাধীন রাখতে হয়, তেমনি সামাজিক শক্তিগুলোকেও শক্তিশালী ও স্বাধীন রাখতে হয়। রাজনৈতিক দল জনগণের রায়ে রাষ্ট্রক্ষমতার অধিকারী হয় ঠিকই, কিন্তু তারা যদি মনে করে রাষ্ট্রের সবকিছুর নিয়ন্ত্রক তারাই, তাহলে গণতন্ত্র থাকে না। রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকা রাজনৈতিক দল রাষ্ট্রের ও সমাজের সব ধরনের শক্তির সঙ্গে নিজেকে ভারসাম্যমূলক অবস্থানে নিয়ে যখন চলতে পারে তখনই কেবল ওই রাষ্ট্র ‘গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র’ হয়।

রাষ্ট্রক্ষমতার অধিকারী রাজনৈতিক দল রাষ্ট্রের সব শক্তিকে নিয়ে ভারসাম্যমূলকভাবে চলছে কিনা, রাষ্ট্রে মৌলবাদ, কুসংস্কার, বর্ণবাদ জাগছে কিনা, আবার রাষ্ট্র তার সব নাগরিকের জন্যে সমানভাবে অর্থনৈতিক উন্নয়ন করছে কিনা, রাষ্ট্র কাউকে বাড়তি সুবিধা দিচ্ছে কিনা- এ বিষয়গুলো সব সময়ই একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সর্বোচ্চ স্বচ্ছ রাখার চেষ্টা করতে হয়। আর এই চেষ্টার প্রথম সারিতে কাজ করে মিডিয়া। মিডিয়া এগুলোকে যতটা স্বচ্ছভাবে মানুষের সামনে নিয়ে আসবে ততই মানুষ এর ত্রুটিগুলো দূর করার জন্যে রাষ্ট্রের প্রতি চাপ দিতে পারে। এখানে মিডিয়ার ওপর কোনও ভয়ের সংস্কৃতি থাকলে চলে না।

এবারের দুই জন সাংবাদিককে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার দেওয়া তাই বাস্তবে দুই জন সাংবাদিককে নোবেল দেওয়া নয়, এটা মূলত পৃথিবীজুড়ে মিডিয়ায় যে ভয়ের সংস্কৃতি ঢুকে গেছে, তার বিরুদ্ধে একটি বার্তা। তাই এবারের শান্তিতে এ নোবেলটি শুধু সময়োপযোগী নয়, এটা সারা পৃথিবীর মিডিয়াকে ঘুরে দাঁড়ানোর একটি আহ্বান। কারণ, এ কাজটি এমন একসময়ে হয়েছে যে সময়ে সারা পৃথিবীতে রাষ্ট্র, পুঁজি, মৌলবাদ, উগ্রবাদ, ধর্মীয়বাদ ও বর্ণবাদ দ্বারা মিডিয়া অনেক বেশি নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে। আর এই কাজ পৃথিবীর দেশে দেশে রাষ্ট্রের এক ধরনের ভুল চিন্তা বা পুঁজি নিয়ন্ত্রিত চিন্তার কারণেই ঘটছে সব থেকে বেশি। এই চিন্তার এক বড় স্লোগান হলো, অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্যে মানুষের চিন্তার স্বাধীনতা ও মিডিয়ার স্বাধীনতাকে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। আর এই স্লোগানের সপক্ষে কর্তৃত্ববাদী সরকার পরিচালিত দেশগুলোর অর্থনৈতিক উন্নয়নের সূচককে সামনে আনা হচ্ছে। কর্তৃত্ববাদী দেশগুলোর এই অর্থনৈতিক সূচক বাস্তবে কতটা সত্য তা কেউই জানে না। কারণ, ওই দেশগুলোর বাস্তব অবস্থা কি তা সেখানে স্বাধীন মিডিয়া না থাকায় জানার কোনও সুযোগ নেই । যেমন, গত শতকের নব্বইয়ের দশকের আগে অবধি সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের অর্থনৈতিক উন্নয়নের সূচক, মানবিক উন্নয়নের সূচক নিয়ে পৃথিবীর নানান প্রান্তে অনেক মানুষ উচ্ছ্বসিত ছিল। কিন্তু সোভিয়েত ইউনিয়ন যখন কাচের ঘরের মতো ভেঙে পড়লো তখন দেখা গেলো, ওই অর্থনৈতিক উন্নয়নের সূচক, মানবিক উন্নয়নের সূচক আসলে ছিল কর্তৃত্ববাদী সরকারের প্রোপাগান্ডার ফানুস। তাই আজ পৃথিবীর দেশে দেশে যেসব কর্তৃত্ববাদী সরকার তাদের অর্থনৈতিক ও মানবিক উন্নয়নের সূচক তুলে ধরছে নিয়ন্ত্রিত ও সরকারি প্রচারযন্ত্রের মাধ্যমে, তাও যে অমনি ফানুস নয় তা কে জানে?

তবে এর কিছু কিছু লক্ষণ কিন্তু দেখা যাচ্ছে। যেমন, বেশ কয়েক দশক ধরে বলা হচ্ছে আগামী অর্থনীতির নিয়ন্ত্রক হবে এশিয়া। আর সেখানে সামনের সারিতে রাখা হয়েছিল দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় দেশগুলোকে । কিন্তু এখন অবধি এসব দেশ প্রোডাকশন হাউজই থেকে গেলো। তারা এখনও নিজের দেশের বাজারকে বড় করতে পারেনি বা মূল বাজারে পরিণত করতে পারেনি। তাদের দেশে শ্রমের প্রকৃত মূল্য নিশ্চিত করতে পারেনি। বাস্তবে শুধু শ্রম বিক্রি করেই যাচ্ছে। এর মূল অর্থ দাঁড়ায়, সেখানে প্রবৃদ্ধি কেবল কিছু সংখ্যক লোকের জন্যে ঘটেছে। কিছু লোকই ধনী হয়েছে। সমাজে অর্থনৈতিক বৈষম্য মোটেই কমেনি। আর কোনও সমাজে যখন রাতারাতি কিছু লোক ধনী হতে থাকে, তখন নিশ্চিত ধরে নিতে হয় ওই রাষ্ট্রের সরকার দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দিচ্ছে। এবং সরকারি আনুকূল্যে কিছু লোক ধনী হচ্ছে। সরকারি আনুকূল্যে যখন কিছু লোক ধনী হয় তখন তারা যতটা না সঠিক বাণিজ্যের মাধ্যমে ধনী হয়, তার থেকে বেশি হয় জনগণের অর্থ নয়-ছয় করে। যারা জনগণের এই অর্থ নয় ছয় করে তারা তখন ওই অর্থ দিয়েই রাজনীতি ও প্রশাসনকে কিনে ফেলে। আর তখন যে রাজনীতি রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রণ করে ওই রাজনীতি ও প্রশাসন জনগণের ওপর ভয়ের সংস্কৃতি চাপিয়ে দেয়। এই ভয়ের খড়গটি সব থেকে বড় হয়ে আঘাত করে মিডিয়ার ওপর। এমনকি অনেক সময় অনেক সৎ রাজনীতিকও সরকারি আনুকূল্যের বাণিজ্যের মাধ্যমে তথাকথিত উন্নয়নের প্রতারণায় পড়ে যান। তারা মনে করেন, সত্যি সত্যি দেশের উন্নয়ন ঘটছে। এবং তারাও মিডিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করার কাজকে ভালো মনে করেন।

যেমন, একটা ছোট্ট উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে। ভারতের রাজ্য পশ্চিমবঙ্গের সাবেক দুই মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসু ও বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য সৎ রাজনীতিক হিসেবে পরিচিত ছিলেন। এমনকি সৎ রাজনীতিক হিসেবে পরিচিত বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জিও। তবে তারপরেও আজ বাস্তবতা হচ্ছে, ভারতের অন্যতম দরিদ্র রাজ্য পশ্চিমবঙ্গ। যেখানে সত্যি অর্থে কোনও শিল্প নেই; বরং রয়েছে চরম বেকারত্ব ও দারিদ্র্য। অথচ ১৯৪৭-এ যখন ভারত স্বাধীন হয় সে সময়ে শিল্প ও অর্থনীতি মিলিয়ে ভারতের রাজ্যগুলোর মধ্যে চার নম্বরে ছিল বেঙ্গল। আর আজ তাদের এ অবস্থা। এখানে তারা বলতে পারে বেঙ্গল ভাগ হবার একটা ধাক্কা তাদের ওপর পড়েছে।

তবে তারপরেও সেখানে এখন সচেতন সবাই বলেন, পশ্চিমবঙ্গের যা প্রকৃত উন্নয়ন তা শুধু বিধান রায়ের আমলেই হয়েছিল। তারপরে আর হয়নি। এই বিধান রায়ের আমলে সেখানে মিডিয়ার স্বাধীনতা এমন ছিল যে বিধান রায় বিহার ও পশ্চিমবঙ্গ নিয়ে একটি প্রদেশ বা রাজ্য করতে চেয়েছিলেন। মিডিয়ার সমালোচনাই কিন্তু বিধান রায়কে এ কাজ থেকে বিরত হতে বাধ্য করে। অন্যদিকে জ্যোতিবসু’র কমিউনিস্ট শাসনে পশ্চিমবঙ্গে মিডিয়া ও মানুষের মনোজগৎ, দুটোই সরকার শাসিত ছিল। আর মমতা ব্যানার্জির  আমলে ‘আনন্দবাজার’ ও ‘বাংলা স্টেটসম্যানে’-এর  সম্পাদককে সরে যেতে হয়েছে শুধু সরকারের সমালোচনা করার অপরাধে। এভাবে প্রাইভেট মিডিয়াও সেখানে নিয়ন্ত্রিত। আর তার ফল ভোগ করছে পশ্চিমবঙ্গ দারিদ্র্য দিয়ে। সেখানে উন্নয়ন বলতে কয়েকটি ফ্লাইওভার। যে ফ্লাইওভারের নিচ দিয়ে হেঁটে চলে হাজার হাজার বেকার তরুণ-তরুণী। শুধু দারিদ্র্য নয়, তাদের মনোজগতেরও পরিবর্তন ঘটে গেছে। সেখানে কোনও আদর্শবাদী রাজনীতি এখন আর নেই।  সুবিধাবাদী ও ধর্মাশ্রয়ী রাজনীতিও স্থান করে নিয়েছে উপমহাদেশের আধুনিকতার রেনেসাঁ ঘটেছিল যে এলাকাটিতে, সেই মাটিতেই।

তাই এই স্বাধীন মিডিয়ার বাধা এখন শুধু আর কর্তৃত্ববাদী দেশগুলোতে নয়। সবখানেই কম বেশি বাধার মুখে মিডিয়া।  মাত্র কিছু দিন আগেও যে দেশের সংবিধানে মিডিয়ার স্বাধীনতাকে সর্বোচ্চ নিশ্চিত করা হয়েছে সেই আমেরিকার হোয়াইট হাউজ থেকে ট্রাম্পও মিডিয়াকে ‘শত্রু’ বলে চিহ্নিত করেছিলেন। তাঁর মতের লোকেরা এখনও আমেরিকাতেও কম নয়। তাই এবারের শান্তির নোবেল সারা পৃথিবীর সাংবাদিক ও সাংবাদিকতার জন্যে একটি ঘুরে দাঁড়ানোর বার্তা। এ মুহূর্তে তাই যেকোনও দেশের  সাংবাদিকতা ও মিডিয়া এই সত্য উপলব্ধির বাইরে থাকলে ভুল করবে।

কারণ, স্বাধীন মিডিয়া ছাড়া, সাহসী সাংবাদিকতা ছাড়া একটি মনোজাগতিক ও অর্থনৈতিকভাবে উন্নত সমাজ গড়া মূলত গ্রিক দেবতা ‘কাইমেরা’। অর্থাৎ আশা করা যেতে পারে কিন্তু বাস্তবে অসম্ভব।

লেখক: রাষ্ট্রীয় পদকপ্রাপ্ত সাংবাদিক

/এসএএস/এমওএফ/

সম্পর্কিত

গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান পুনরুদ্ধার জরুরি

গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান পুনরুদ্ধার জরুরি

ভালো মানুষ ও রাজনীতিমুক্ত স্থানীয় সরকার

ভালো মানুষ ও রাজনীতিমুক্ত স্থানীয় সরকার

প্রশাসন যখন রাজনৈতিক শক্তির ওপরে 

প্রশাসন যখন রাজনৈতিক শক্তির ওপরে 

সাম্প্রদায়িকতা ও মনোজগৎ

সাম্প্রদায়িকতা ও মনোজগৎ

অভিবাসী শ্রমিকদের দক্ষতা বৃদ্ধি জরুরি

আপডেট : ৩০ নভেম্বর ২০২১, ১৭:৩০

মো. আখতার হোসেন জীবন ও জীবিকার তাগিদে প্রতি বছর বিশ্বের অগণিত মানুষ নিজ দেশ ছেড়ে পাড়ি জমান বিভিন্ন দেশে। বিশ্ব অর্থনীতিতে অভিবাসন তাই একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বেশিরভাগ উন্নয়নশীল দেশের মতো বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটেও অভিবাসনের যথেষ্ট গুরুত্ব রয়েছে। আশির দশকের শুরু থেকেই দেশের কর্মসংস্থান সংকট মোকাবিলায় ও দারিদ্র্য বিমোচনে অভিবাসন উল্লেখযোগ্য অবদান রাখছে। বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রা উপার্জনের দ্বিতীয় বৃহত্তম খাত প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স। কোভিড-১৯ ও লকডাউনের প্রভাবে সারা বিশ্বের অর্থনীতি যখন চরম সংকটের মুখোমুখি, তখন অনিশ্চয়তা ও শঙ্কা ভর করেছে দেশের অভিবাসন খাতেও।  

জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো’র (বিএমইটি) তথ্যমতে, গত বছর প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্সের পরিমাণ দাঁড়ায় ২১,৭৫২.২৭ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। মার্চ-মে মাসে নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি হলেও জুন থেকে এর ধারাবাহিক ঊর্ধ্বগতি দেখা গেছে, যা করোনাভাইরাসের অভিঘাত থেকে অর্থনীতিকে পুনরুদ্ধারের ক্ষেত্রে ইতিবাচক ভূমিকা রেখেছে। প্রবাসী শ্রমিকরা মধ্যপ্রাচ্য, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও উত্তর আফ্রিকার দেশসহ প্রায় মোট ১৬৮টি দেশে বসবাস করছেন। তারা মূলত বিভিন্ন ব্যক্তিমালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের স্বল্পমেয়াদি চুক্তিভিত্তিক কর্মী হিসেবে কাজ করেন এবং চুক্তি শেষে দেশে ফিরে আসেন।

প্রবাস ফেরত শ্রমিকদের তথ্য সংরক্ষণের কোনও যথাযথ প্রক্রিয়া নেই বলে প্রতি বছর কতজন দেশে ফিরছেন এর সঠিক সংখ্যা বের করা বেশ কঠিন।

তবে, করোনা বৈশ্বিক মহামারি উদ্ভূত পরিস্থিতির কারণে অন্য যেকোনও বছরের তুলনায় গত বছর দেশে ফেরত আসা প্রবাসী শ্রমিকের সংখ্যা তুলনামূলক বেশি। আইওএম’র হিসাব অনুসারে, গত বছরের এপ্রিল থেকে ডিসেম্বর মাসে প্রায় চার লাখ প্রবাসী শ্রমিক কোভিড-১৯ এর কারণে দেশে ফেরত আসেন। কোভিড-১৯-এর বিস্তার ঠেকাতে বেশিরভাগ দেশে লকডাউন ঘোষণা করায় এবং জ্বালানি তেলের দাম ব্যাপকভাবে হ্রাস পাওয়ায় সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের বেশ কয়েকটি দেশ অভিবাসী শ্রমিকদের নিজ দেশে পাঠিয়ে দেওয়ার ঘোষণা দেয়।

এই প্রবাস ফেরত শ্রমিকদের একটি বড় অংশ ঋণদায়গ্রস্ত এবং দেশে তারা বেকার অবস্থায় জীবনযাপন করছেন। তাই, বিদেশে যেমন তারা কষ্টে দিনযাপন করছিলেন, দেশে এসেও তারা পড়েছেন এক দুর্দশাপূর্ণ পরিস্থিতিতে। আইওএম’র গবেষণায় দেখা গেছে, দেশে ফেরত আসা ৭৫ শতাংশ প্রবাস শ্রমিক করোনাভাইরাস পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে আবার বিদেশে ফেরত যেতে আগ্রহী।

সেক্ষেত্রে আমাদের দরকার প্রবাস ফেরত এই শ্রমিকদের দক্ষতা উন্নয়নের জন্য একটি কাঠামোভিত্তিক রি-স্কিলিং ও আপস্কিলিং প্রোগ্রামে অন্তর্ভুক্ত করা, যেটি পরবর্তীতে দক্ষতার বিচারের মাপকাঠিতে প্রবাসে চাকরি নিশ্চিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনে সক্ষম হবে।

দক্ষতার বিচারে বাংলাদেশ থেকে সাধারণত তিন রকমের অভিবাসন হয়– দক্ষ, স্বল্প দক্ষ এবং অদক্ষ। সাধারণত আমাদের দেশের প্রবাসী শ্রমিকরা অবকাঠামো নির্মাণ সংক্রান্ত কাজ, পরিবহন, হোটেল-রেস্টুরেন্টের কাজ, স্বাস্থ্য সেবা, ঘরের কাজসহ স্বল্প দক্ষ ও নিম্ন উৎপাদনশীল কাজে নিয়োজিত থাকায় যেকোনও ধরনের অর্থনৈতিক অভিঘাতে তারা সমস্যার সম্মুখীন হন। করোনায় বেশিরভাগ দেশে এসব কাজের চাহিদা কমে যাওয়ায় অনেক প্রবাসী শ্রমিকই চাকরি হারিয়েছেন।

বিদেশ গমন করা অধিকাংশ শ্রমিকই কোনও প্রশিক্ষণ ছাড়া বিদেশে যান। অথচ ছয় মাস কিংবা এক বছরের একটি প্রশিক্ষণ বিদেশে তাদের পারিশ্রমিক দুই থেকে তিনগুণ বাড়িয়ে দিতে সক্ষম। তাই দেশে ফেরত আসা শ্রমিকরা যাতে ফের বিদেশ গমনের পর অধিক উপার্জন করতে পারেন, সেজন্য বহির্বিশ্বের শ্রমবাজারের চাহিদা অনুযায়ী যেসব খাতে দক্ষ জনবল প্রয়োজন, সেসব খাতে তাদের দক্ষতা বৃদ্ধিতে মনোযোগ দিতে হবে। এক্ষেত্রে মনে রাখা প্রয়োজন, করোনা পরিস্থিতি শ্রমবাজারের রূপ অনেকটাই পাল্টে দিয়েছে। যার মধ্যে রয়েছে প্রযুক্তি নির্ভরতা ও উদ্ভাবন এবং নতুন দক্ষতার সুযোগ সৃষ্টি কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রেও পরিবর্তন নিয়ে এসেছে। কোভিড-১৯ যেমন কাজের ক্ষেত্রকে বিভিন্নভাবে পরিবর্তন করেছে, একইসাথে অনেক নতুন সুযোগও সৃষ্টি করেছে। দেশের অভিবাসী শ্রমিকদের বেশিরভাগেরই ভাষাগত দক্ষতা ও প্রযুক্তি জ্ঞান কম থাকায় তারা বিদেশে কাজ করতে গিয়ে বিভিন্ন রকম সমস্যার সম্মুখীন হন।

এসব ক্ষেত্রে বিদেশ ফেরত শ্রমিকদের দক্ষতা বৃদ্ধির মাধ্যমে শ্রম পরিস্থিতি আরও সুসংহত করা যেতে পারে। এছাড়া, অবকাঠামো নির্মাণ সংক্রান্ত কাজ, অটোমোবাইল ও ডিজিটাল খাতের কাজে বিদেশে অধিক চাহিদা থাকায়, তাদের এসব কাজ সংশ্লিষ্ট প্রশিক্ষণ প্রদান করার ব্যাপারে নজর দেওয়া যেতে পারে। আমাদের নারী প্রবাসী শ্রমিকদের একটি বড় অংশই বিদেশে ঘরের কাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত। তাদের যদি ভারতের কেরালা, ফিলিপাইন বা ভিয়েতনামের মতো নার্সিং কোর্স করানো হয়, অথবা দক্ষভাবে গৃহপরিচালনা সংক্রান্ত প্রশিক্ষণ দেওয়া যায়, তবে তা তাদের জন্য যেমন মঙ্গলজনক হবে, তেমনি আমাদের সমতা ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক কাঠামোও সুনিশ্চিত হবে।

অভিবাসীদের জন্য বৈশ্বিক মহামারি সৃষ্ট চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার জন্য সরকার কয়েক ধাপে নগদ সহায়তাসহ প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করলেও এর মাত্র পাঁচ শতাংশ প্রবাস ফেরত শ্রমিকরা কাজে লাগিয়েছেন। প্রবাসীদের সহায়তার প্রক্রিয়া ও ব্যবস্থাপনায় সুফল পেতে তাই নীতিনির্ধারকদের নতুন করে চিন্তাভাবনা করা জরুরি।  আর্থিক প্রণোদনা প্যাকেজ তৈরির ব্যাপারে ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, শ্রীলঙ্কাকে উদাহরণ বিবেচনা করা যেতে পারে। এসব দেশ, বিদেশ ফেরত শ্রমিকদের নগদ আর্থিক সহায়তা প্রদানসহ তাদের দক্ষ করে তুলতে বিভিন্ন প্রশিক্ষণ প্রদানের উদ্যোগ নিয়েছে। সরকারি বিভিন্ন উদ্যোগের পাশাপাশি বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান একসঙ্গে এগিয়ে আসতে পারে।

করোনাকালীন ও পরবর্তী দেশের অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারে প্রশিক্ষিত দক্ষ জনবলের বিকল্প নেই। তাই, দক্ষ জনশক্তি সৃষ্টি ও নতুন সম্ভাবনাময় বাজার অনুসন্ধান একসঙ্গে দুটোই চালিয়ে যেতে হবে। আর এটা করা সম্ভব হবে বহুমুখী অংশীদারিত্বের মাধ্যমেই।

লেখক: সিনিয়র সচিব, যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়, ‎গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার।

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

সর্বশেষ

৬ ঘণ্টা পর ঢাকার সঙ্গে উত্তরবঙ্গের ট্রেন যোগাযোগ স্বাভাবিক

৬ ঘণ্টা পর ঢাকার সঙ্গে উত্তরবঙ্গের ট্রেন যোগাযোগ স্বাভাবিক

সড়ক দুর্ঘটনায় আহত রাজশাহী আইনজীবী সমিতির সভাপতির মৃত্যু

সড়ক দুর্ঘটনায় আহত রাজশাহী আইনজীবী সমিতির সভাপতির মৃত্যু

মুন্সীগঞ্জে ফ্ল্যাটে বিস্ফোরণের ঘটনায় একই পরিবারের দুই শিশুর মৃত্যু

মুন্সীগঞ্জে ফ্ল্যাটে বিস্ফোরণের ঘটনায় একই পরিবারের দুই শিশুর মৃত্যু

ঐশীর অভিষেক: গত কয়েক রাত ঘুমাতে পারিনি

চার মহাদেশে ‘মিশন এক্সট্রিম’ঐশীর অভিষেক: গত কয়েক রাত ঘুমাতে পারিনি

ঢাকা আসছেন ভারতের পররাষ্ট্র সচিব

ঢাকা আসছেন ভারতের পররাষ্ট্র সচিব

ভিয়েতনামে বন্যা-ভূমিধসে নিখোঁজ ১৮

ভিয়েতনামে বন্যা-ভূমিধসে নিখোঁজ ১৮

পঞ্চম ধাপে রংপুর ও রাজশাহী বিভাগের ইউপিতে আ. লীগের প্রার্থী ঘোষণা

পঞ্চম ধাপে রংপুর ও রাজশাহী বিভাগের ইউপিতে আ. লীগের প্রার্থী ঘোষণা

বাংলাদেশকে জানতে হলে বঙ্গবন্ধুকে জানতে হবে: আতিকুল ইসলাম

বাংলাদেশকে জানতে হলে বঙ্গবন্ধুকে জানতে হবে: আতিকুল ইসলাম

দুই ডোজের আওতায় পৌনে ৪ কোটি মানুষ

দুই ডোজের আওতায় পৌনে ৪ কোটি মানুষ

কারখানা থেকে ৩০ কোটি টাকার সার গায়েব

কারখানা থেকে ৩০ কোটি টাকার সার গায়েব

কালি বাড়ির সিসিটিভির হার্ডডিস্ক চুরি, সন্দেহের চোখ যেদিকে

কালি বাড়ির সিসিটিভির হার্ডডিস্ক চুরি, সন্দেহের চোখ যেদিকে

বাল্যশিক্ষায় কী শিখছে শিশু?

বাল্যশিক্ষায় কী শিখছে শিশু?

সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ

© 2021 Bangla Tribune