আয়-ব্যয়ের ভাগশেষ শুধুই দীর্ঘশ্বাস

তুষার আবদুল্লাহ
০৬ নভেম্বর ২০২১, ১৮:৪৪ আপডেট : ০৬ নভেম্বর ২০২১, ২০:৩৮

তুষার আবদুল্লাহ

মহল্লার দোকান কিংবা বাজারে কেনাকাটা এখন আর প্রতিদিন হয়ে ওঠে না। সপ্তাহে একদিন ঢুঁ দেওয়ার চেষ্টা করি। কেনার চেয়ে আড্ডা হয় বেশি। দোকানি তো আছেনই, মহল্লার মানুষের সঙ্গেও সম্মিলনটা ভালো হয়। পাওয়া যায় একেবারে হাঁড়ির খবর। কার অসুখ ছিল শরীরে। মনের অসুখে ভুগছেন কারা। পুরনো কোন বাড়িটা চলে গেলো ডেভেলপারের দখলে। কে চলে গেলেন মহল্লা ছেড়ে, ছেড়ে গেলেন পৃথিবী। এসব খোঁজ-খবরের মধ্যেই জানা হয়ে যায় চাকরি হারিয়ে ঘরে বসে থাকা বন্ধু বা প্রিয়মুখের কথা। কেউ কেউ অভিমান ও ক্ষোভের সঙ্গে বলেন, আর পেরে উঠছেন না। ব্যবসায় মন্দা, চাকরির বেতন অনিয়মিত হয়ে পড়েছে। কিন্তু পাতের খাবার, সন্তানের স্কুলের বেতন, বাড়িভাড়া, বিদ্যুৎ-গ্যাস বিল, পরিবারের চিকিৎসা, যাতায়াত ব্যয় নিয়মিতই রয়ে গেছে। সেই নিয়মিত চাহিদার জোগান দেওয়া অসম্ভব হয়ে উঠেছে। মহল্লার দোকানির বাকির খাতায় নতুন নাম উঠছে। বাকি শোধ না করে হারিয়ে যাওয়া মানুষের সংখ্যাও কম নয়। তাদের জন্য দোকানিদের মৃদু ক্ষোভের সঙ্গে মায়াও তৈরি হয়ে আছে। কারণ, কাজ হারানো মানুষগুলো নিরুপায় হয়ে লজ্জায় শহর ছেড়েছেন। যারা আছেন, এখনও তারা লড়াই করছেন টিকে থাকতে। করোনাকালে দুই দফায় তিন-চার কোটি মানুষ নতুনভাবে দরিদ্রতার তালিকায় ঢুকে পড়েছেন। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম যে হারে বাড়ছে তাতে জীবনে ভেসে থাকাই মুশকিল।

মুদ্রাবাজারের সবচেয়ে বড় যে হাজারি নোট, সেই নোটের বিনিময়ে কেনা আনাজ তরকারিতে থলে ভরবে দূরের কথা, ঠোঙাও ভরছে না যে। পাতে ভাত বাড়ন্ত। পথেও দুর্ভোগ চূড়ান্ত। জ্বালানি তেলের দাম লিটারে বেড়েছে ১৫ টাকা। কিন্তু সুদে-আসলে জনগণকে দিতে হচ্ছে শতগুণ। শাক, মাছ, চাল কিনতে হবে বেশি দামে। পথে গণপরিবহনের ভাড়া হয়ে গেলো দ্বিগুণ। ডিজেলের বাড়তি দামের প্রভাব পড়বে বাসাবাড়িতে, রেস্তোরাঁয়ও। কারণ, সেখানে জেনারেটর ও অন্যান্য সেবা চালু রাখতে ডিজেলের ব্যবহার আছে। অতএব, সেখানেও বাড়বে সেবামূল্য।

সমস্যা হলো মূল্যস্ফীতি যে হারে বাড়ছে, সেই হারে পকেট ভরাট হচ্ছে না। বরং তলানিতে গিয়ে ঠেকছে মুদ্রা। আয়-ব্যয়ের ভাগশেষ শুধুই হা-পিত্যেশ, দীর্ঘশ্বাস। নিজের মহল্লা থেকে বেরিয়ে সড়ক-মহাসড়ক পেরিয়ে গ্রামগঞ্জে ঘুরে এলাম। সেখানেও দিন আনে দিন খাই চক্রের মানুষের জীবন যন্ত্রণা বাড়ছে। হাঁপিয়ে উঠেছে মধ্যবিত্তও।

বিগত ৫০ বছরে বাংলাদেশে বাজার ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা আনার কোনও জুতসই উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। ক্রেতা অধিকার আন্দোলনও ছত্রভঙ্গ হয়ে গেছে। সরকার ভোক্তা অধিদফতর প্রতিষ্ঠা করেছে। কিছু সুফলও পাওয়া যাচ্ছিল। প্রতারিত ও ক্ষুব্ধ ক্রেতারা প্রতিকার পেতে শুরু করেছিলেন। কিন্তু পুঁজির দাপটে আশা জাগিয়েও নিজেদের পারফরম্যান্স মেলে ধরতে পারছে না ভোক্তা অধিকার অধিদফতর।

মুক্তবাজার অর্থনীতিতে বাজার নিয়ন্ত্রণের আবদার হয়তো ক্রেতারা করতে পারবেন না। কিন্তু কৃষকের গোলা, মাঠ থেকে বাজার পর্যন্ত আসার ধাপগুলো কমিয়ে আনা যায়। কারখানা ও খুচরা বাজারের মাঝে থাকা মজুতদার, ফড়িয়াকে উৎপাটন করা যেতো। তৈরি করা যেতো দেশব্যাপী বিপণন অবকাঠামো। বাংলাদেশ ট্রেডিং কোম্পানি নিজে ব্যবসা না করে বাজারে বিপণন সহায়ক হিসেবে কাজ করতে পারতো। এখন ই-কমার্সেও কেনাবেচা বাড়ছে। এখানেও বিভিন্ন ছাড়ের আড়ালে আছে বেশি দাম ও প্রতারণা। সেখানেও ভোক্তা অধিদফতর ও সরকারের বাজার তদারকি বিভাগকে সক্রিয় হতে হবে।

দাম বাড়বে যেমন, তেমনি কমার সূত্রও আছে। আমাদের বাজারে কমার সূত্র অনুসরণ করা হয় না। সংকটে যা বাড়লো তা বাজারে সুলভ হলেও কমে না। বাজার সিন্ডিকেটের মুঠোবন্দি। সরকার নাকি জোর চেষ্টায়ও সেই মুঠো খুলতে পারে না। একই কথা পরিবহন খাত নিয়েও। কিন্তু ভোক্তা বা জনগণ বিশ্বাস করে, কল্যাণ রাষ্ট্রে সরকার সব সিন্ডিকেটের চেয়ে ক্ষমতাবান। সরকারের ইচ্ছার কাছে সিন্ডিকেট নস্যি। বিশ্বাস করতে চাই, আমরা কল্যাণ রাষ্ট্রে বসবাস করছি।

লেখক: গণমাধ্যমকর্মী
/এসএএস/জেএইচ/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
সৌদিতে ২ বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনায় সরকারের ব্যর্থতার অভিযোগ
সৌদিতে ২ বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনায় সরকারের ব্যর্থতার অভিযোগ
দলীয় বা ব্যক্তি স্বার্থে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে ব্যবহার করবে না সরকার: পানিসম্পদমন্ত্রী
দলীয় বা ব্যক্তি স্বার্থে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে ব্যবহার করবে না সরকার: পানিসম্পদমন্ত্রী
আবারও ইমরানুর ও শিরিন দ্রুততম মানব-মানবী
আবারও ইমরানুর ও শিরিন দ্রুততম মানব-মানবী
দিনের গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক খবর
দিনের গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক খবর
সর্বশেষ সর্বাধিক