বার্লিনে পুজো, ‘আমরা আনন্দে শামিল’

দাউদ হায়দার
০১ অক্টোবর ২০১৯, ১৫:১১আপডেট : ০১ অক্টোবর ২০১৯, ১৯:১৪

দাউদ হায়দার মহালয়া কবে শুরু (২৮ সেপ্টেম্বর), এই তথ্য নতুন প্রজন্মের অজানা, ‘জানবেই-বা কী করে, যদি বয়স্করা না জানান। জেনে কী হবে, আমরা তো এখানে মহালয়ার জাঁকজমক অনুষ্ঠান করি না। পুজোমণ্ডপ তৈরি হয় না। দুর্গা মা ঠাকুরও আসেন না। অপেক্ষা করতে হয় সপ্তমীর জন্যে। সপ্তমী থেকে মূলত পুজো, তাও ঘরবন্দি। দুর্গা মা-ও ঘরবন্দি। ঘর খোলা হয় দুপুরের পরে। দর্শকের সমাগম সন্ধ্যার পরে। সপ্তাহান্তে যদি অষ্টমী-নবমী, লোকের সংখ্যা বেশি। পুজো উপলক্ষে এ দেশে তো ছুটি নেই। সপ্তাহের পাঁচদিনই কাজ, সকাল থেকে বিকেল পাঁচটা অব্দি, মূলত যাঁরা অফিসে, কলকারখানায় কাজ করেন। কাজের পরে ঘরে ফেরা, বাজারসওদা করা, রান্না করা, সংসারের নানা উটকো ঝামেলা, সামাল দিয়ে সন্ধ্যার পরেও সময় পাওয়া দুষ্কর, পুজোয় যাওয়া হয় না। শনিবারেও যে সময় পাওয়া যায়, তাও নয়। গোটা সপ্তাহের বাজার, ঘরদোর পরিষ্কার, ছেলেমেয়ের দেখভাল, ছেলেমেয়ের সঙ্গে বাইরে যাওয়া, ওদের ইচ্ছে পূরণে শামিল না হলে হুলুস্থুল কাণ্ড।
এদেশে অধিকাংশ বাঙালি, হোক তা বাংলাদেশের বা পশ্চিমবঙ্গের, রেস্তোরাঁর কর্মী। রেস্তোরাঁর আসল কাজকর্ম বিকেলের পর থেকে, রাত বারোটা একটা পর্যন্ত। পুজোয় কখন যাবে।’

কলকাতার সাত্যকি সেন, বয়স বাইশ, জন্ম বার্লিনে, ছাত্র। ওঁর বাবা-মা কলকাতার, বাবা-মা’র আদিনিবাস বাংলাদেশের কুমিল্লায়।

সাত্যকি বলেছেন, ‘জেনে কী হবে।’ বলার কারণও ব্যাখ্যা করেন। ‘আমরা এই প্রজন্মের। পুজো আমাদের ধর্মীয় আচার, তাও পারিবারিক। কিন্তু আমরা ধর্মীয় আচারে আবদ্ধ নেই, আমাদের সব বন্ধু-বান্ধব এ দেশীয়, অধিকাংশই জার্মান, অনেকেই নানা দেশের, তাদের কাছে ধর্মের চেয়ে বন্ধুতাই মহামূল্য। আমরা ভুলে যাই ধর্মীয় বোধ। আমার বান্ধবী পাকিস্তানের, ওঁর রোজা-ঈদের খবর ভুলেও জানান না, জানতেও চাইনি। আমাদের পুজো আর্চা নিয়ে কথা হয় না। তবে, পুজোয় নিমন্ত্রণ করলে আসেন। মা দুর্গার পাশে দাঁড়িয়ে ছবি তোলেন, ফেসবুকে পোস্ট করেন, পুজোয় খেয়েদেয়ে মহাখুশি।’

—এরকম কথা একজন সাত্যকির নয়, আরো বহু সাত্যকির।

বার্লিনে পুজোর বয়স পঞ্চাশ বছরও হয়নি। শুরুতে নিতান্তই ছোটখাটো, বার্লিনে (পশ্চিম বার্লিনে) বসবাসরত কয়েকজন, তথা মুষ্টিমেয় পশ্চিমবঙ্গীয় উদ্যোগে। শুরুতে দু’দিন পুজো। একটি ঘরে।

দুই বার্লিন একত্রীকরণের পরে পুজোর জাঁকজমক বেড়েছে, কিন্তু একটি ঘরেই, ছাত্রাবাসের একটি ‘হলঘরে’। এই হলঘর থেকে এখনও বেরুতে পারেনি। না-পাওয়ার কারণ অর্থাভাব। পুজোর দিনে খাওয়া বিক্রি করে যেটুকু অর্থ পাওয়া যায়, কিংবা কেউ ‘ডনেশন’ দিলে। না দিলেও আয়োজকরা চাঁদাটাদা তুলে পুজোর আয়োজন সম্পন্ন করেন। নিশ্চয় মহৎ কাজ, উদ্যোগ।

বার্লিনেই নয় কেবল, জার্মানিসহ ইউরোপের অধিকাংশ শহরে, যেখানে পুজো, পুজোর মণ্ডপ, বছরের পর বছর মা দুর্গার একই মূর্তি। ফেলা হয় না। জলে ভাসান দেওয়া নিষেধ। দিলে জল দূষিত। আইনত দণ্ডনীয়। সমস্যা আরও। প্রকৃতি-পরিবেশ আইন লঙ্ঘনে কারাদণ্ড।

ইউরোপে দুর্গাপুজোর বিশাল সমারোহ লন্ডনে, ব্রিটেনের আরও চারটি শহরে। ফ্রান্সের প্যারিসেও, তবে লন্ডনের মতো নয়। গত দশ বছরে ইটালির রোমেও কম নয়। আমেরিকার নিউ ইয়র্ক থেকে শুরু করে আরও রাজ্যের শহরে। ‘বাঙালির কালচার। হিন্দু বাঙালির’। দেখেছি। ‘দুর্গা পুজো উপলক্ষে আমরা কলকাতার নামি গায়ক শিল্পীদের আমন্ত্রণ জানাই, ইদানীং সমস্যা শিল্পীরা অন্য শহর থেকে আমন্ত্রণ পান, ডিমান্ড করেন, কত হাজার ডলার দেবেন। যেখানে বেশি পান, চলে যান।’ বললেন বস্টনের বিদিশা চক্রবর্তী।

বার্লিনের পুজোয় কলকাতার নামি শিল্পীদের ডাকা হয় না, আয়োজকদের টাকাকড়ি নেই। এই প্রজন্ম কলকাতার শিল্পীদের নামও জানে না। বাংলা গানও শোনে না। ওরা জার্মান। বার্লিনে নয়, পুজোর সবচেয়ে বড় আয়োজন কোলনে। কারণও আছে। কোলনের পুজো পুরনো এবং কোলনের আশপাশের শহররাজ্যে বিস্তর বাঙালির বাস। দুই বাংলার বাঙালি। বার্লিনে বাঙালির সংখ্যা কম। দুই হাজারও হবে না। না হলেও বার্লিনের পুজোর গরিমা আলাদা। দুই বাংলা একাকার। বলেন, ‘পুজোর আনন্দে আমরা শামিল।’

লেখক: কবি ও সাংবাদিক

/এসএএস/এমএমজে/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
হেলিকপ্টার বিধ্বস্ত হয়ে ইকুয়েডরের গোয়েন্দাপ্রধানসহ নিহত ৭
হেলিকপ্টার বিধ্বস্ত হয়ে ইকুয়েডরের গোয়েন্দাপ্রধানসহ নিহত ৭
স্বামীর মরদেহের পাশে অশ্রুসিক্ত দীপু মনি
স্বামীর মরদেহের পাশে অশ্রুসিক্ত দীপু মনি
চুল ও শেভের বিল আড়াই হাজার টাকা, সেলুনে অভিযান চালিয়ে জরিমানা
চুল ও শেভের বিল আড়াই হাজার টাকা, সেলুনে অভিযান চালিয়ে জরিমানা
বাথরুম পরিষ্কার নিয়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীকে হত্যাচেষ্টার অভিযোগ
বাথরুম পরিষ্কার নিয়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীকে হত্যাচেষ্টার অভিযোগ
সর্বশেষসর্বাধিক