X
মঙ্গলবার, ০৫ জুলাই ২০২২
২১ আষাঢ় ১৪২৯

পরীমণি, ‘সরি মণি’

আপডেট : ২৫ আগস্ট ২০২১, ২০:৩৬
মো. জাকির হোসেন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেখলাম বিবাহিত পুরুষের জন্য পরীমণির বিষয়ে লেখালেখি ঘরে-বাইরে দুই জায়গাতেই বিপজ্জনক। বাস্তবে দেখলাম যারা শামসুন নাহার স্মৃতিকে ‘পরীমণি’ বানালো, পরীমণির সঙ্গে যাদের নিয়মিত যোগাযোগ ছিল, পরীমণি যাদের চোখেরমণি ছিল– তাদের কোনও ঝুঁকি দূরের কথা, মানুষ তো তাদের নামও জানতে পারলো না।

ঝুঁকি জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাই ঝুঁকি থাকলেও অবশেষে পরীমণিকে নিয়ে লিখলাম। পরীমণিকে ঘিরে নানা গল্প-কাহিনির ভিড়ে পরীমণির মূল অপরাধ কোনটি, বোঝা মুশকিল? যৌনতা, পরকীয়া, বিলাসবহুল গাড়ি ব্যবহার, প্রভাবশালীদের ব্ল্যাকমেইলিং নাকি বেআইনিভাবে মাদক সেবন ও বাসায় মাদক মজুত রাখা?

মহানগর আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর পরীমণির জামিনের বিরোধিতা করতে গিয়ে বলেছেন, ‘আসামির বাসা থেকে প্রচুর দেশি-বিদেশি মাদক উদ্ধার করা হয়েছে, তিনি নায়িকার সাইনবোর্ড ব্যবহার করে দেশের অনেক শিল্পপতি, কোটিপতি ও সম্ভ্রান্ত ঘরের লোকদের ও তরুণ সমাজকে ডিজে পার্টির মাধ্যমে অনৈতিক কর্মকাণ্ডে আসক্তির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তাই মামলার তদন্ত না হওয়া পর্যন্ত তাকে কারাগারে আটক রাখার আবেদন করছি।’

বেশ কয়েকটি গণমাধ্যমে দেখেছি পরীমণি আগে বিয়ে করেছিলেন। এ বিষয় নিয়ে বাংলা ট্রিবিউনে ‘‘স্মৃতি এখন আমার স্মৃতিতে নেই’: পরীমণি প্রসঙ্গে সৌরভ’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদনও প্রকাশ হয়। যেখানে পরীমণিকে স্ত্রী হিসেবে যশোরের কেশবপুরের যুবক ফেরদৌস কবীর সৌরভ দাবি করেন। ওই প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, তাদের মধ্যে এখনও ডিভোর্স হয়নি। যদিও তারা এখন সম্পর্ক ও যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন।  

এই সংবাদের সূত্র ধরে বলা যায়, বাংলাদেশ দণ্ডবিধি আইনের ৪৯৭ ধারায় বলা হয়েছে, যদি কোনও ব্যক্তি অন্য ব্যক্তির স্ত্রী অথবা যাকে সে অপর কোনও লোকের স্ত্রী বলে জানে বা তার অনুরূপ বিশ্বাস করার কারণ রয়েছে এমন কোনও নারীর সঙ্গে উক্ত নারীর স্বামীর সম্মতি বা সমর্থন ব্যতিরেকে এরূপ যৌন সম্পর্ক করে, যা নারী ধর্ষণের শামিল নহে, সে ব্যক্তি ব্যভিচারের অপরাধে দোষী এবং যেকোনও বিবরণের কারাদণ্ডে যার মেয়াদ পাঁচ বছর পর্যন্ত হতে পারে অথবা অর্থ দণ্ড অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবে। তবে ব্যভিচারে অংশগ্রহণকারী নারী দুষ্কর্মের সহায়তাকারিণী হিসেবে দণ্ডিত হবে না।

ব্যভিচারবিরোধী বাংলাদেশের আইনে স্ত্রী ব্যভিচারী স্বামীর বিরুদ্ধে মামলা করতে পারেন না, তেমনি স্বামীও স্ত্রীর বিরুদ্ধে অভিযোগ করতে পারেন না। কেননা, আইন কেবল ব্যভিচারী নারীর স্বামীকে ব্যভিচারের পুরুষ সঙ্গীর বিরুদ্ধে মামলা করার অধিকার দিয়েছে। এ আইনের বিধান পর্যালোচনায় স্পষ্টতই প্রতীয়মান হয়, অবিবাহিত নারীর সঙ্গে, বিধবার সঙ্গে, অথবা স্বামীর সম্মতিপ্রাপ্ত স্ত্রীর সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ক ব্যভিচারের আওতায় পড়বে না।

তারপরও জামিনের বিরোধিতায় ‘অনেক শিল্পপতি, কোটিপতি ও সম্ভ্রান্ত ঘরের লোকদের ও তরুণ সমাজকে ডিজে পার্টির মাধ্যমে অনৈতিক কর্মকাণ্ডে আসক্তির সঙ্গে পরীমণি যুক্ত ছিলেন’– এই যুক্তি উপস্থাপন কেন?

পরীমণির বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলায় বলা হয়েছে, গোপন তথ্যের ভিত্তিতে পরীমণির বাসায় অভিযান চালানো হয়। মাদকদ্রব্য জব্দ ও আসামিদের গ্রেফতারে অভিযানটি পরিচালিত হয়। অভিযানে পরীমণির বাসা থেকে ৮ বোতল প্লাটিনাম লেভেল, ৩টি ব্ল্যাক লেভেল, ২টি চিভাস রিগাল, ২টি ফক্স গ্রোভ, ১টি ব্লু লেভেল, ২টি গ্ল্যানলিভেট, ১ বোতল গ্ল্যানফিডিচসহ ৪ গ্রাম আইস ও ১টি স্লট এলএসডি জব্দ করা হয়। এ ছাড়া জব্দ তালিকায় আছে একটি বং পাইপ।

এই জগতে বিচরণ না থাকায় জানি না কোনটা তরল, আর কোনটা কঠিন পদার্থ? আর এলএসডি নামটা আমার কাছে এতটাই অপরিচিত যে আমি বারবার পড়ছিলাম ‘এলএমজি’ আর ভাবছিলাম অস্ত্রের নামে মাদক। যাই হোক,এজাহারে দাবি করা হয়েছে, অভিযানে উদ্ধার মাদকদ্রব্যের বিষয়ে পরীমণি কোনও বৈধ কাগজ ও সন্তোষজনক জবাব দিতে পারেননি। এতে আরও বলা হয়, পরীমণি তার সহযোগীদের সাহায্যে বিভিন্ন ব্র্যান্ডের বিদেশি মদসহ জব্দ হওয়া মাদকদ্রব্য কিনে তার বাসায় রাখতেন। পরীমণির  বিরুদ্ধে তাই ২০১৮ সালের মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনের ৩৬ ধারায় মামলা করা হয়েছে। পরীমণির বাসা থেকে জব্দকৃত মাদকদ্রব্যের প্রকার ও পরিমাণ বিবেচনায় পরীমণির সর্বোচ্চ পাঁচ বছর কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড হতে পারে। তবে পরীমণির বিরুদ্ধে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে যে মামলা হয়েছে, সেটি একটি আমলযোগ্য ও অজামিনযোগ্য অপরাধ। জামিন অযোগ্য অপরাধ মানে এই নয় যে মামলার রায় না হওয়া পর্যন্ত আসামিকে কোনোভাবেই জামিন দেওয়া যাবে না। জামিন অযোগ্য অপরাধের ক্ষেত্রে জামিন প্রদান করা আদালতের এখতিয়ার। জামিন অযোগ্য মামলায় আমাদের আদালতসমূহ অপরাধীকে জামিন দেওয়ার ক্ষেত্রে বেশ কিছু বিষয় বিবেচনা করে জামিনের আদেশ দিয়ে থাকেন। উদাহরণস্বরূপ, কয়েকটি বিবেচনা উল্লেখ করছি। আসামি এজাহারভুক্ত নাকি সন্দেহভাজন আসামি। আসামির বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগের গুরুত্ব কতটুকু কিংবা আনীত অভিযোগ যুক্তিসঙ্গত কিনা। আসামির স্থায়ী ঠিকানা ও সমাজে পরিচিতি আছে কিনা। দুর্ধর্ষ বা অভ্যাসগত দাগী অপরাধী কিনা। আসামিকে জামিন দিলে মামলার তদন্তে কোনও বিঘ্ন সৃষ্টি করবে কিনা বা মামলার আলামত, সাক্ষ্য-প্রমাণ নষ্ট বা মামলা পরিচালনায় কোনও সমস্যা সৃষ্টি করবে কিনা। আসামি জামিন পেলে পালিয়ে যাবে কিনা। শারীরিকভাবে অক্ষম কিনা। নারী, শিশু ও অপ্রাপ্ত বয়স্ক কিনা। আসামি কোনও দায়িত্বশীল পদে বা পেশায় আছে কিনা। আসামির কাছ থেকে কোনও অবৈধ মালামাল উদ্ধার করা হয়েছে কিনা।

ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় নিজেকে জড়িয়ে দোষ স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে কিনা। পূর্ব শত্রুতার জেরে মামলার আসামি করা হয়েছে কিনা। প্রথমবার অপরাধ করেছে কিনা। পুলিশি তদন্তে আসামির বিরুদ্ধে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬১ ধারা মতে কেউ সাক্ষ্য দিয়েছে কিনা। ডাক্তারি সনদ মতে আসামি রোগাক্রান্ত কিনা ইত্যাদি।

জামিন অযোগ্য মামলায় জামিন দেওয়ার ক্ষেত্রে আদালতসমূহ যেসব বিষয় বিবেচনা করে থাকেন আমি তন্মধ্যে যে কয়েকটি বিবেচনা উল্লেখ করলাম তার অধিকাংশই পরীমণির জামিন পাওয়ার পক্ষে। উল্লিখিত বিষয়গুলো থাকলেই যে জামিন পাওয়া যাবে বা আদালত জামিন দিতে বাধ্য তা কিন্তু নয়।

জামিন-অযোগ্য মামলায় আসামির জামিন আদালতের সন্তুষ্টির ওপর নির্ভর করে। জামিন শুনানিতে পক্ষদ্বয়ের বিজ্ঞ কৌঁসুলির উত্থাপিত যুক্তিতর্কও জামিনের ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পরীমণির আইনজীবী জামিনের পক্ষে যুক্তি উপস্থাপন করে বলেছেন, পরীমণি হত্যা মামলা কিংবা রাষ্ট্রদ্রোহ মামলার আসামি নন। পুলিশ রিপোর্টের উল্লেখ করে আইনজীবী বলেন, পরীমণির বিরুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়ার কথা বলেছে পুলিশ। তার বিরুদ্ধে যদি কোনও অভিযোগ প্রমাণিত হয়, তাহলে পুলিশ অভিযোগপত্র দেবেন। পরীমণি যদি এই মামলায় অপরাধী হয়, তাহলে তাকে মামলার বিচারের মধ্য দিয়ে শাস্তি দেওয়া যাবে। কিন্তু আপাতত যেকোনও শর্তে তার জামিন চাই বিজ্ঞ আদালত। যেকোনও শর্তে তাকে জামিন দেওয়া হোক। আদালত প্রয়োজনে তার পাসপোর্ট জমা রেখে জামিনের আদেশ দিতে পারেন।

পরীমণির আইনজীবী জামিনের যুক্তিতে আরও উল্লেখ করেন,  আসামিকে গ্রেফতার করে র‌্যাব উত্তরায় তাদের অফিসে নিয়ে গেছে। তাকে থানায় হস্তান্তর না করে নিজেদের কাছে কয়েক ঘণ্টা রাখার পর থানায় হস্তান্তর করা হয়েছে। পরীমণি কোনও খুনের আসামি নন, তাকে কেন এত ঘণ্টা আটক রাখা হলো বিজ্ঞ আদালত আপনি নিশ্চয়ই তা বিবেচনা করবেন। অবজারভেশন দেবেন ও তার জামিন দেবেন। তবু বিচারক জামিন নামঞ্জুর করে কারাগারে প্রেরণকেই যুক্তিসঙ্গত মনে করেছেন। জামিনের বিরোধিতায় রাষ্ট্রপক্ষ থেকে বলা হয়েছে, পরীমণির কাছে ভয়ংকর মাদক এলএসডি পাওয়া গেছে। বাসায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা পৌঁছানোর আধঘণ্টা পর পরীমণি দরজা খুলেছেন। পাবলিক প্রসিকিউটর বলেছেন, চিত্রনায়িকা তো আরও আছেন, তাদের বাসায় তো মদ পাওয়া যায়নি। তাদের তো পুলিশ ধরেনি। তাকে কেন গ্রেফতার করা হয়েছে? তার বাসায় মদ ছিল, সেজন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাকে গ্রেফতার করেছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাকে যখন গ্রেফতার করতে যায় তখন তিনি আধঘণ্টা পর্যন্ত দরজা খোলেননি। এ সময় তার বাসায় থাকা মদের বোতল থেকে মদ ফেলে দিয়ে বোতল খালি করেন। বাসায় যে খালি বোতল আছে সেগুলোতে মদ ছিল। আমার মনে প্রশ্ন, পরীমণির বাসায় এত মাদক মজুত ছিল, তিনি কি মাদকে ভয়ংকর আসক্ত ছিলেন? নিয়মিত মাদকাসক্তদের গল্প শুনেছি, সময় মতো মাদক না পেলে শরীরে ভীষণ প্রতিক্রিয়া হয়। এ সময় তারা সহিংস হয়ে ওঠে। মাদক কেনার টাকা না পেয়ে মা-বাবাকে হত্যা করার কথাও জেনেছি সংবাদমাধ্যমে। পরীমণি বেশ কিছু দিন ধরে আটক আছেন। জানতে ইচ্ছা করে, এ সময় তিনি কি মাদকের জন্য সহিংস আচরণ করেছেন? যদি না করে থাকেন, তাহলে মাদকের এত মজুত কেন? যাদের জন্য করেছিলেন তারা গ্রেফতার হলেন না কেন?

জামিন অযোগ্য মামলায় আসামিকে জামিন প্রদানের ক্ষেত্রে আদালত স্বাধীন হলেও জামিন আবেদন প্রত্যাখ্যানের ক্ষেত্রে জুডিশিয়াল মাইন্ড তথা সুবিচার ও সুবিবেচনার ওপর নির্ভর করতে হয়।

পরীমণিকে আটকের পর তিন দফা রিমান্ড শেষে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। পরীমণি খুন কিংবা রাষ্ট্রদ্রোহিতার মতো অপরাধ করেননি। তদুপরি তিনি দুর্ধর্ষ বা অভ্যাসগত দাগী অপরাধীও নন। দফার দফায় তাকে পুলিশ রিমান্ডে দেওয়া কী জরুরি ছিল? পুলিশ রিমান্ডে আসামির দেওয়া তথ্য ও স্বীকারোক্তির সাক্ষ্যগত মূল্য কতখানি? তিন দফা রিমান্ডে নেওয়ার প্রসঙ্গে সিআইডির প্রধান সাংবাদিকদের বলেন, মামলার তদন্তের স্বার্থেই পরীমণিকে রিমান্ডে নেওয়ার আবেদন করা হয়। পরীমণির দেওয়া তথ্যে বেশ কিছু অসঙ্গতি পাওয়া গিয়েছিল। এসব তথ্য যাচাই-বাছাইয়ের জন্য পুনরায় পরীমণিকে রিমান্ডে নিতে আবেদন করা হয়। স্বভাবতই প্রশ্ন জাগে, রিমান্ডে নিয়েই যদি তথ্য যাচাই-বাছাই করতে হয় তাহলে পুলিশি তদন্তের দরকার কী?

তৃতীয় দফা পুলিশ রিমান্ড প্রদানের মাধ্যমে ফৌজদারি কার্যবিধি আইনের ১৬৭(২) ধারা ও উচ্চ আদালতের নির্দেশনা লঙ্ঘন হয়েছে বলে প্রতীয়মান হয়। ১৬৭ ধারা অনুসারে, কোনও আমলযোগ্য মামলায় গ্রেফতারকৃত ব্যক্তি বা ব্যক্তিগণকে তদন্ত কর্মকর্তা মামলার প্রয়োজনে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য যদি রিমান্ড আবেদন করেন, তাহলে এরূপ রিমান্ডের আবেদন অবশ্যই গ্রেফতার হওয়ার তারিখ থেকে ১৫ দিনের মধ্যে করতে হবে। অন্যথায়, সেই আবেদন করার কোনও আইনগত ভিত্তি থাকবে না। ১৫ দিন অতিবাহিত হওয়ার পর রিমান্ডের আবেদন সংশ্লিষ্ট আদালত কর্তৃক নামঞ্জুর হওয়াটাই আইনগতভাবে বাঞ্ছনীয়। কেননা, ১৬৭ ধারার অধীনে ১৫ দিনের মধ্যে রিমান্ড আবেদন করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। গ্রেফতার ও আদালতে উপস্থাপনের তারিখ থেকে ১৫ দিন পরে রিমান্ড আবেদন করা বৈধ নয় এবং মঞ্জুর করাও বৈধ নয়। ফৌজদারি কার্যবিধি আইন ছাড়াও ১৯৪৩ সালের পুলিশ রেগুলেশনস (পিআর)-এর প্রবিধান ৩২৪ এর উপ-প্রবিধান (জে) অনুসারে, একজন বন্দি ম্যাজিস্ট্রেটের আদালতে প্রথম হাজির করার তারিখ থেকে ১৫ দিন পর কোনোভাবেই পুলিশ রিমান্ডে থাকবে না।

২০০৪ সালে আমাদের সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ এক মামলার (সিভিল আপিল নং ৫৩/২০০৪) রায়ে প্রসঙ্গক্রমে বলেছেন, গ্রেফতারের তারিখ থেকে ১৫ দিন পরে কোনও ব্যক্তিকে কোনোভাবেই ডিটেনশন কিংবা পুলিশ রিমান্ডে পাঠানো বৈধ নয়। এটিকে শুধু অবৈধ বলেই আপিল বিভাগ ক্ষান্ত হননি। বরং আরও একধাপ এগিয়ে বলেছেন, এর লঙ্ঘন হলে তা সংবিধানের ৩২নং অনুচ্ছেদে প্রদত্ত মৌলিক অধিকার তথা ‘জীবন ও ব্যক্তি-স্বাধীনতার অধিকার রক্ষণ’ বিষয়ক মৌলিক অধিকারের লঙ্ঘন হবে। হবিগঞ্জের নাজমুল হাসান অপু বনাম রাষ্ট্র মামলায় ১৫ দিন পর একজন আসামির রিমান্ড মঞ্জুর করা হলে সাবেক বিচারক ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী আজিজুর রহমান দুলু ২০১৭ সালে এটি হাইকোর্টে চ্যালেঞ্জ করে মামলা দায়ের করেন (ক্রিমিনাল মিস কেস নং ৫৮৭৪৬/ ২০১৭)।

হাইকোর্ট বিভাগের সংশ্লিষ্ট বেঞ্চের মাননীয় বিচারপতিগণ শুনানি শেষে ১৫ দিন পরে আসামিকে রিমান্ড মঞ্জুর করার আদেশ স্থগিত করে দেন। ভারতের সুপ্রিম কোর্টও অনেক মামলায় গ্রেফতারের ১৫ দিন পর রিমান্ড মঞ্জুর করা যাবে না বলে রায় দিয়েছেন। উদাহরণস্বরূপ, Central Bureau Of Investigation vs Anupam J. Kulkarni on 8 May, 1992 AIR 1768, 1992 SCR (3) 158 মামলার কথা উল্লেখ করা যেতে পারে। পরীমণিকে গ্রেফতার করা হয়েছে গত ৪ আগস্ট। সেই মোতাবেক ১৫ দিন শেষ হয় ১৮ আগস্ট। কিন্তু পরীমণির তৃতীয় দফা রিমান্ড আবেদন মঞ্জুর করে পরীমণিকে ১৯ আগস্ট একদিনের রিমান্ড প্রদান করা হয়। এটি ফৌজদারি কার্যবিধি আইন, পুলিশ রেগুলেশনস ও উচ্চ আদালতের রায়ের ব্যত্যয় হয়েছে বলেই প্রতীয়মান হয়।    

বহু বছর সিনেমা দেখা হয়ে ওঠে না। তাই ঢাকাই ছবির নায়িকা পরীমণি সম্পর্কে আমার কোনও ধারণা ছিল না। কিন্তু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও অন্যরা যেভাবে পরীমণির ব্যক্তিগত জীবন কাহিনি নিয়ে প্রচারণা চালিয়েছেন তাতে এখন আমি পরীমণির পূর্ণাঙ্গ জীবনবৃত্তান্ত গরগর করে বলে দিতে পারবো। আলা-ভোলা ধনীর দুলালদের, সচ্চরিত্রবান, স্ত্রী-অন্তপ্রাণ, স্ত্রীর প্রতি অতি বিশ্বস্ত শিল্পপতি-ব্যবসায়ী ও নীতিবান পুলিশ কর্মকর্তাকে পরীমণি কীভাবে তার রূপের জালে ফাঁসিয়ে অনৈতিক কর্মকাণ্ড করতে বাধ্য করেছে। পরীমণি কীভাবে তার মোবাইল ফোন থেকে ভিডিও ফুটেজ ও অডিও রেকর্ড দিয়ে প্রভাবশালীদের ব্ল্যাকমেইল করেছে, এসব কাহিনি এখন আমার জানার পরিধির মধ্যে। প্রশ্ন হলো, পরীমণির বাসায় কিংবা অন্য কোনও জায়গায় অন্তরঙ্গ না হলে প্রভাবশালীদের অডিও, ভিডিও ফুটেজ কীভাবে তৈরি করা সম্ভব হলো?

ব্ল্যাকমেইলিংয়ের অভিযোগ কোনও প্রভাবশালী দিয়েছেন? পরীমণির সঙ্গে কোন প্রভাবশালীদের অন্তরঙ্গতা ছিল? পরীমণির বাসায় মাদকের মজুতের সদ্ব্যবহার প্রভাবশালীরাও করেছেন কিনা? পরীমণির জীবন কাহিনির এ টু জেড প্রচার করা হলেও প্রভাবশালীদের এসব বিষয় আমরা কোনোদিনও জানতে পারবো না। তাদের (প্রভাবশালীদের) নাম গোপন রাখা হচ্ছে  মান-সম্মানের স্বার্থে। তাহলে পরীর মান-সম্মান যে নিলাম হয়ে গেলো, তার কি হবে?

পরীমণির জীবনাচার, নৈতিকতার লঙ্ঘন ও ধর্মের বিধান অনুযায়ী ভয়ংকর অপরাধ হলেও আমাদের তথাকথিত আধুনিকতা ও প্রগতির বিচারে এবং কিছু ক্ষেত্রে আইনের বিধান অনুসারে অপরাধ নয়। মানুষ ভুল-ত্রুটির ঊর্ধ্বে নয়। পরীমণি যদি কোনও ভুল-ত্রুটি-অপরাধ করে থাকে, তাহলে দেশের প্রচলিত আইনে তার বিচার হবে।

মানুষ সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ জীব। স্রষ্টা ও তাঁর সৃষ্টি উভয়ের কাছেই মানুষের সম্মান ও মর্যাদা স্বীকৃত। অপরাধ করলে শাস্তি হবে, কিন্তু অপরাধী হওয়ার কারণে তার মানব মর্যাদা ও সম্মান অস্বীকৃত বা বিলুপ্ত হবে না। কারও বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগে মামলা হলে আদালতে দোষী সাব্যস্ত না হওয়া পর্যন্ত তাকে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করে প্রচারণা চালানো এবং তার ব্যক্তিগত জীবনসহ নানা কাহিনি প্রচার করাও আইনের দৃষ্টিতে অন্যায়। পরীমণি, সরি মণি। আমরা তোমার প্রতি সুবিচার করিনি।

লেখক: অধ্যাপক, আইন বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

ই-মেইল: [email protected]
/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
ঢাবিতে চান্স পাননি ৫৫ বছরের বেলায়েত, চেষ্টা চালাবেন অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে
ঢাবিতে চান্স পাননি ৫৫ বছরের বেলায়েত, চেষ্টা চালাবেন অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে
কী আছে হোয়াটসঅ্যাপের নতুন ফিচারে
কী আছে হোয়াটসঅ্যাপের নতুন ফিচারে
মহাগুরুকে নিয়ে মহাস্বপ্ন দেখছে পশ্চিমবঙ্গ বিজেপি
মহাগুরুকে নিয়ে মহাস্বপ্ন দেখছে পশ্চিমবঙ্গ বিজেপি
ডিপোতে আগুন: তদন্ত শেষ করতে পারেনি ৬ কমিটির পাঁচটি
ডিপোতে আগুন: তদন্ত শেষ করতে পারেনি ৬ কমিটির পাঁচটি
সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ