X
সোমবার, ২৭ জুন ২০২২
১৩ আষাঢ় ১৪২৯

স্কুল যেন এবার আনন্দের হয়

আপডেট : ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১৭:১০

রেজানুর রহমান আমরা কথায় কথায় বলি, শিশুরাই জাতির ভবিষ্যৎ। কিন্তু কথাটা মানি কতজন? তার মানে এটি কারও কারও কাছে কথার কথা। বলার জন্য বলা। এমনকি আমাদের রাষ্ট্র কাঠামোর মধ্যেও কি শিশু-কিশোরদের নিয়ে নতুন কোনও ভাবনা আছে? প্রচারমাধ্যমেও কি আছে পরিকল্পিত কোনও দিকনির্দেশনা? একসময় দেশে কচিকাঁচার আসর, খেলাঘর, চাঁদের হাট, মুকুল ফৌজসহ আরও অনেক সংগঠন ছিল। একটু খেয়াল করলেই দেখবেন আজ যারা সমাজের বিভিন্ন স্তরে নাম করেছেন, বিশেষ করে কবি, সাহিত্যিক, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, অভিনেতা-অভিনেত্রী, তাদের প্রতিভার বিকাশে শিশু-কিশোরদের কোনও না কোনও সংগঠন ব্যাপক ভূমিকা রেখেছে। চাঁদের হাট, কচিকাঁচার আসর, খেলাঘর ছিল এক সময় শিশু-কিশোরদের বিশ্বস্ত ঠিকানা।

কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, শিশু-কিশোরদের এই সংগঠনগুলো এখন আর তেমন কার্যকর নয়। নাম আছে। ভবনও আছে। কিন্তু কারও কারও অস্তিত্বই বিলীনের পথে। তার মানে সত্যটা হলো, দেশে শিশু-কিশোরদের প্রতিভা বিকাশে কার্যকর কোনও সংগঠন নেই।

প্রচারমাধ্যমের কথায় আসি। একটা সময় শিশু-কিশোরদের প্রতিভা বিকাশে অধিকাংশ দৈনিক পত্রিকাকে ঘিরে কোনও কোনও শিশু সংগঠন সক্রিয় ছিল। যেমন, ইত্তেফাক দেখতো কচিকাঁচার আসরকে, বাংলার বাণী দেখতো শাপলা শালুকের আসর। সংবাদ দেখতো খেলাঘরকে, অবজারভার দেখতো চাঁদেরহাটকে, দৈনিক বাংলা দেখতো সাত ভাই চম্পা। একসময়ে বহুল প্রচারিত দৈনিক পত্রিকা আজাদ দেখতো মুকুলের মাহফিল। এরকম আরও অনেক নাম বলা যায় যে সংগঠনগুলো কোনও না কোনও দৈনিক পত্রিকার পৃষ্ঠপোষকতায় শিশু-কিশোরদের প্রতিভা বিকাশে ভূমিকা রেখেছে। অথচ বর্তমান সময়ে দৈনিক পত্রিকাসমূহের এই ভূমিকা খুব একটা দেখা যায় না। সংগঠনের পৃষ্ঠপোষকতা করতে না পারলেও দেশের প্রায় প্রতিটি দৈনিক পত্রিকায় শিশুদের বিশেষ বিভাগ ছিল। ওই বিভাগের আওতায় সপ্তাহে একদিন শিশু-কিশোরদের জন্য গল্প, কবিতা, ছড়া, ভ্রমণ কাহিনিসহ নানা ধরনের লেখা প্রকাশ হতো। এখন অধিকাংশ দৈনিক পত্রিকায় শিশুদের বিভাগ নাই। থাকলেও নিতান্তই দায়সারা গোছের।

এত গেলো মুদ্রণ জগতের কথা। টেলিভিশন মাধ্যমেও কী শিশু-কিশোরদের জন্য বিশেষ কোনও আয়োজন আছে? চট করে কি বলা যাবে বিশেষ কোনও অনুষ্ঠানের নাম! বিটিভিতে একসময় শিশু-কিশোর উপযোগী নানান অনুষ্ঠানমালা প্রচার হতো। এখনও হয়। কিন্তু দেখে মনে হয় পরিকল্পনার অভাব। একদল শিশু-কিশোর একসঙ্গে দাঁড়িয়ে একবার ডানে আরেকবার বামে হেলে দুলে গান গাইছে, বাগানে নাচ করছে, আবৃত্তি করছে... পুরনো আমলের ধ্যান-ধারণা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাবে দেশের প্রায় প্রতিটি পরিবারে কোমলমতি শিশু-কিশোরেরা নিজেরাই নিজেদের জগৎ তৈরি করে নিয়েছে। তাদের এই জগৎ যে কতটা ভয়ংকর এখন হয়তো আমরা টের পাচ্ছি না। যখন টের পাবো তখন হয়তো হা-হুতাশ করা ছাড়া আর করার কিছুই থাকবে না।

বিটিভির কথা বলছিলাম। তবু বিটিভির প্রশংসা করতেই হবে। রাষ্ট্রীয় এই টিভি চ্যানেলটি দায়সারা হলেও শিশু-কিশোরদের নিয়ে ভাবে। আর বাকি সবাই? দেশে এখন ৩০/৩৫টি টেলিভিশন চ্যানেল তাদের প্রচার কার্যক্রম চালাচ্ছে। কয়টি টিভি চ্যানেল শিশু-কিশোরদের উপযোগী অনুষ্ঠান প্রচার করে? হ্যাঁ, দুরন্ত’র কথা বলতেই হবে। আমাদের অনেক সৌভাগ্য যে দেশে শুধু শিশু-কিশোরদের জন্য একটা টেলিভিশন চ্যানেল পেয়েছি। দুরন্ত ভালো করছে। আর সবাই কী করছে? ২৪ ঘণ্টার অনুষ্ঠানমালায় ৩০ মিনিটও কী শিশু-কিশোরদের জন্য রাখা যায় না? সপ্তাহ, পনের দিন অথবা প্রতি মাসেও একবার তো শিশু কিশোর উপযোগী ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান, বুদ্ধিদীপ্ত ভাবনার অনুষ্ঠান প্রতিটি টেলিভিশন চ্যানেলে প্রচার হতে পারে। চ্যানেল আইতে বিশিষ্ট শিশুসাহিত্যিক ফরিদুর রেজা সাগর ও নন্দিত অভিনেতা আফজাল হোসেনের যৌথ প্রয়াস ছোটকাকু সিরিজ, প্রথম আলোর গোল্লাছুট, কিশোর আলো আর নতুন ব্যবস্থাপনায় প্রকাশিত প্রতি মাসের পত্রিকা চাঁদের হাট ছাড়া শিশু-কিশোরদের জন্য উল্লেখযোগ্য কোনও আয়োজন তেমন চোখে পড়ে না। বিশিষ্ট শিশুসাহিত্যিক লুৎফর রহমান রিটন একটা সময় ছোটদের কাগজ নামে শিশুদের জন্য পত্রিকা বের করতেন। পত্রিকাটি বন্ধ। বাংলাদেশ শিশু একাডেমি থেকে ‘শিশু’ নামে একটি পত্রিকা বের হয়। তথ্য ও প্রকাশনা অধিদফতর থেকে ‘নবারুণ’ বের হয় নিয়মিত। কিন্তু শিশুদের প্রতিভা বিকাশে এই পত্রিকাগুলো কতটা ভূমিকা রাখছে তা নিয়ে বিতর্ক হতে পারে। শিশু-কিশোরদের জন্য গড়ে তোলা সংগঠনগুলোই বা কি ভূমিকা রাখছে সেটাও বিতর্কের বিষয়। এই যে করোনাকালে শিশু-কিশোররা বন্দি জীবন কাটালো আমরা তাদের জন্য আদৌ কি কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার কথা ভেবেছি? মোবাইল ফোনের প্রতি আসক্তির ব্যাপারে শিশু কিশোরদের বিরুদ্ধে আমরা অনেকেই অভিযোগের পাহাড় গড়ে তুলেছি। প্রায় প্রতিটি পরিবারে শিশু-কিশোরেরা কমবেশি মোবাইল ফোনে আসক্ত। এজন্য কী তারাই দায়ী। স্কুল বন্ধ, খেলার মাঠ বন্ধ। বন্ধু-সহপাঠীদের সঙ্গে যোগাযোগ নেই। আনন্দে হৈ-হুল্লোড়, ছোটাছুটির সুযোগ নেই।

অনেক বাবা-মা শুধুই বলেন, পড়, হোমওয়ার্ক কর। মোবাইল ধরবে না। কিন্তু ওরা কী পড়বে? হোমওয়ার্ক কোথায়? সারাক্ষণ কি চুপ করে ঘরে বসে থাকা যায়? তবু মোবাইল ফোন ছিল বলে না রক্ষা। গেম খেলা যায়। আলোতেও যাওয়া যায়। অন্ধকারেও যাওয়া যায়। কিন্তু কতজন আলোর দিকে গেছে? এজন্য কি শিশু-কিশোররাই দায়ী? বাবা-মায়েরা কি দায়ী নয়? প্রচারমাধ্যম কি দায়ী নয়? টেলিভিশন চ্যানেল, সংবাদমাধ্যম কি দায়ী নয়? সবচেয়ে বড় কথা– রাষ্ট্র তাদের জন্য আদৌ কি ভেবেছে? রাষ্ট্র যদি প্রতিটি টেলিভিশন চ্যানেলকে পরামর্শ দিতো ২৪ ঘণ্টার অনুষ্ঠানে এক ঘণ্টার জন্য হলেও শিশুদের জন্য শিক্ষা ও আনন্দ অনুষ্ঠান করতে হবে। শিশুদের আনন্দে রাখতে হবে। তাহলে কি শিশু-কিশোরেরা এত অস্থির থাকতো। বোধকরি না।

আশার কথা, দীর্ঘ ১৭ মাস পর স্কুল খুলে যাচ্ছে। শিশু-কিশোরেরা স্কুলে যাওয়ার জন্য উদগ্রীব হয়ে আছে। সরকার স্কুল-কলেজ খোলার ব্যাপার ১৯ দফা নির্দেশনা দিয়েছে। এরমধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো– স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা ও শিশু-কিশোরদের আনন্দের মধ্যে পাঠদানে ব্যস্ত রাখা। স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার ব্যাপারে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো নানান ধরনের উদ্যোগ নিতে শুরু করেছে। বন্ধ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ধোয়ামোছার কাজ শুরু হয়েছে। কিন্তু তাদের জন্য আনন্দ অনুষ্ঠানের ভাবনা কি শুরু হয়েছে? এ ক্ষেত্রে শিশুদের সংগঠনগুলো ভূমিকা রাখতে পারে। নিজ নিজ এলাকার স্কুলে শিক্ষার্থীদের স্বাগত জানানোর জন্য কার্যকর সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করতে পারে। কিন্তু সেটা কি সম্ভব? কারণ, শিশুদের সংগঠনগুলোই তো সংগঠিত না।

আমি সম্প্রতি শিশু-কিশোরদের নিয়ে একটি স্বপ্নজাল রচনা করেছি। অভিনয়ে আগ্রহী একদল শিশু-কিশোর বন্ধু আমার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। মাসব্যাপী একটি নাট্য কর্মশালা হবে ওদের জন্য। ওদের সঙ্গে একটা বৈঠকও হয়েছে আমার। তিনটি জরুরি প্রশ্ন করেছিলাম সবাইকে। ২১ ফেব্রুয়ারি, ২৬ মার্চ, ১৬ ডিসেম্বর- বছরের এই তিনটি দিন নিয়ে প্রশ্ন করেছিলাম। বেশ কয়েকজন সন্তোষজনক জবাব দিতে পারেনি। এখন প্রশ্ন হলো- এটা কি ওই কিশোর-কিশোরীদের ব্যর্থতা? নাকি বাবা-মা, শিক্ষকমণ্ডলীরও দায় আছে এখানে? শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খুলছে। আমরা যেন দায়সারা না হয়ে যাই। আমরা যেন দায়িত্ববানের ভূমিকা পালন করি। শিশু-কিশোর সোনামণিদের জন্য রইলো অনেক শুভকামনা। তোমাদের স্কুল তোমাদের জন্য অপেক্ষা করছে। আনন্দে আসো। আনন্দে পড়ো। অনেক আদর তোমাদের জন্য।

লেখক: কথাসাহিত্যিক, নাট্যকার, সম্পাদক: আনন্দ আলো।

 
 
/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
সংকটে কুড়িগ্রামের বন্যাকবলিতরা, সহায়তা প্রয়োজন
সংকটে কুড়িগ্রামের বন্যাকবলিতরা, সহায়তা প্রয়োজন
স্কুলে শিক্ষার্থীকে হত্যা, জড়িতদের গ্রেফতার দাবিতে বিক্ষোভ
স্কুলে শিক্ষার্থীকে হত্যা, জড়িতদের গ্রেফতার দাবিতে বিক্ষোভ
চতুর্থ ঢেউ ঠেকাতে মাস্ক পরার বিকল্প নেই: ডা. এবিএম আব্দুল্লাহ
চতুর্থ ঢেউ ঠেকাতে মাস্ক পরার বিকল্প নেই: ডা. এবিএম আব্দুল্লাহ
‘জনশুমারিতে হিজড়াদের সঠিক তথ্য উঠে আসবে কি?‘
‘জনশুমারিতে হিজড়াদের সঠিক তথ্য উঠে আসবে কি?‘
সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ