X
সকল বিভাগ
সেকশনস
সকল বিভাগ

নির্বাচন কমিশন তৈরির আইনের চেয়েও যেটি অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ

আপডেট : ০২ জানুয়ারি ২০২২, ১৫:৪২

রুমিন ফারহানা বেশ কিছু দিন ধরে রাজনীতির মাঠ খানিকটা উত্তপ্ত নির্বাচন কমিশন গঠন নিয়ে। আগের দুইবারের মতো রাষ্ট্রপতির সঙ্গে ধারাবাহিকভাবে সংলাপে বসছে নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলগুলো। যদিও আইনমন্ত্রী বহু আগেই ঘোষণা দিয়ে রেখেছেন, এবারও আইন নয়, নির্বাচন কমিশন গঠিত হবে সার্চ কমিটির মাধ্যমে। সার্চ কমিটি গঠনের প্রক্রিয়া নির্ধারিত। সুপ্রিম কোর্টের আপিল এবং হাইকোর্ট বিভাগ থেকে একজন করে বিচারপতি, সরকারি কর্ম কমিশনের চেয়ারম্যান, মহাহিসাব নিরীক্ষক এবং দুই জন নাগরিক সমাজের সদস্য (মোট ৬ জন) নিয়ে গঠিত হবে সার্চ কমিটি।

এই সার্চ কমিটি নির্বাচন কমিশন গঠনের জন্য কিছু নাম প্রস্তাব করবেন রাষ্ট্রপতির কাছে। রাষ্ট্রপতি চাইলে সেই নামগুলো থেকে পছন্দসই ব্যক্তিদের নিয়ে গঠন করবেন নির্বাচন কমিশন।

এখানে বেশ কিছু বিষয় লক্ষণীয়।

এক. সার্চ কমিটি যে ৬ জন ব্যক্তির সমন্বয়ে গঠিত হবে, তার মধ্যে কেবল দুই জন (সরকারি কর্ম কমিশনের চেয়ারম্যান, মহাহিসাব নিরীক্ষক) ইতোমধ্যে সরকার কর্তৃক নিয়োগপ্রাপ্ত। বাকি চার জনও স্থির করবে সরকার। যতই এখানে রাষ্ট্রপতি বলা হোক না কেন, সংবিধানের ৪৮(৩) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী কেবল প্রধানমন্ত্রী এবং প্রধান বিচারপতি নিয়োগ করা ছাড়া রাষ্ট্রপতিকে আর সব কাজ প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শে করতে হয়। আমাদের সংবিধানে রাষ্ট্রপতি এবং প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার এই চরম ভারসাম্যহীনতা একটি বড় দুর্বলতা।

দুই. ইতোমধ্যে বেশ কিছু রাজনৈতিক দল রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সংলাপে বসেছে। তাদের কেউ সার্চ কমিটির সদস্য, কেউ নির্বাচন কমিশনার হিসেবে কিছু নাম প্রস্তাব করে এসেছেন আবার কেউবা নির্বাচন কমিশন গঠনে সার্চ কমিটির পরিবর্তে আইন প্রণয়নের প্রতি জোর দিয়েছেন। অর্থাৎ রাষ্ট্রপতির সঙ্গে আলোচনার কোনও ফিক্সড এজেন্ডা বোঝা যায়নি। যার যে বিষয়ে ইচ্ছামতো মত দিয়ে এসেছেন।

তিন. সার্চ কমিটি নির্বাচন কমিশনার হিসেবে রাষ্ট্রপতির কাছে কাদের নাম প্রস্তাব করছে সেটি জানার কোনও উপায় নেই। সুতরাং কমিশন গঠনে রাষ্ট্রপতি সার্চ কমিটির মনোনীত ব্যক্তিদের রাখছেন কিনা সে প্রশ্ন থেকেই যায়।

চার. রাষ্ট্রপতি সার্চ কমিটির সদস্যদের প্রস্তাব করা নাম থেকেই কমিশন গঠন করেছেন নাকি সরাসরি সরকারের পছন্দসই ব্যক্তিদের নিয়োগ দিয়েছেন তার কোনও নিশ্চয়তা নেই। সুতরাং দেখা যাচ্ছে, সার্চ কমিটি গঠন থেকে শুরু করে নির্বাচন কমিশন গঠন পর্যন্ত পুরোটাই অস্পষ্ট। তবে অস্পষ্টতা যাই থাক না কেন, একটা বিষয় খুব স্পষ্ট- সার্চ কমিটি থেকে শুরু করে নির্বাচন কমিশন গঠন পর্যন্ত সবই হবে সরকারের ইচ্ছায়, তাদের পছন্দের ব্যক্তিদের দ্বারা। এখানে রাষ্ট্রপতি একজন উপলক্ষ মাত্র।   

এরইমধ্যে বিএনপি ছাড়াও সিপিবি, বাসদ এই সংলাপ বর্জন করেছে। যদিও বিএনপির সঙ্গে এই দুই দলের সংলাপ বর্জনের কারণ সম্পূর্ণ ভিন্ন। সিপিবি, বাসদ জানিয়েছে, এর আগেও দুবার নির্বাচন কমিশন গঠন নিয়ে রাষ্ট্রপতির সঙ্গে তাদের আলোচনা হয়েছে, যেখানে তারা বেশ কিছু সুপারিশ তুলে ধরেছেন। তারা চেয়েছেন সংবিধানের ১১৮(১) অনুচ্ছেদের আলোকে নির্বাচন কমিশন গঠনের আইন এবং নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে সুনির্দিষ্ট আলোচনা করতে। কিন্তু সেগুলোর কোনোটিই এবারের আলোচনার এজেন্ডায় নেই। তাই তারা ‘রাষ্ট্রপতির মূল্যবান সময় অপচয়’ করতে চাননি।

সংবিধানের ১১৮(১) অনুচ্ছেদ বলছে– “প্রধান নির্বাচন কমিশনার এবং অনধিক চার জন নির্বাচন কমিশনারকে লইয়া বাংলাদেশের একটি নির্বাচন কমিশন থাকিবে এবং উক্ত বিষয়ে প্রণীত কোন আইনের বিধানাবলী-সাপেক্ষে রাষ্ট্রপতি প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে ও অন্যান্য নির্বাচন কমিশনারকে নিয়োগদান করিবেন”।

এই অনুচ্ছেদ থেকে এটি স্পষ্ট যে নির্বাচন কমিশন গঠনে একটি আইন থাকা বাধ্যতামূলক। বাংলাদেশের দুর্ভাগ্য তার ৫০ বছরের ইতিহাসে কোনও সরকারই এই আইন করার প্রয়োজনীয়তা বোধ করেনি। আইনের মাধ্যমে যদি সার্চ কমিটি গঠন এবং পরবর্তীতে সেটি দ্বারা নির্বাচন কমিশন গঠন করা হতো, তাহলে যে অস্পষ্টতাগুলো এখন আছে তা দূর করা যেত। মজার বিষয় হলো, আইন থাকলেও কিন্তু সরকার তার ইচ্ছামত পছন্দের ব্যক্তিদের দিয়ে নির্বাচন কমিশন গঠন করতে পারে। তাহলে প্রশ্ন হলো আইন প্রণয়নে এত অনীহা কেন? অনীহা এই কারণেই যে সরকার এখন আইন করার মতো ‘আই ওয়াশ’টুকু রাখারও প্রয়োজন বোধ করছে না।

নির্বাচন কমিশন গঠন নিয়ে রাষ্ট্রপতির সংলাপ বিএনপি বর্জন করেছে। এর আগে ২০১২ এবং ২০১৭ সালে দুই দফা সংলাপে বসেছিল বিএনপি। এই দুই সংলাপের ফল হয়েছে ২০১৪ সালের একতরফা আর ২০১৮ সালের মধ্যরাতের নির্বাচন। এবারে বিএনপির সংলাপ বর্জনের কারণ খুব স্পষ্ট। বিএনপি মহাসচিব বলেছেন, নির্বাচন কমিশন গঠনে আইনের প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য কিন্তু তার চাইতে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হলো নির্বাচনকালীন সরকার। নির্বাচনের সময় দেশে কী ধরনের সরকার ক্ষমতায় সেটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইতিহাস বলে, আজ পর্যন্ত দলীয় সরকারের অধীনে একটিও সুষ্ঠু নির্বাচন আমরা করতে পারিনি।

নির্বাচন অনুষ্ঠানে কমিশনের ক্ষমতা সম্পর্কে আছে সংবিধানের ১২০ এবং ১২৬ অনুচ্ছেদে। ১২০ অনুচ্ছেদ বলছে, ‘এই ভাগের অধীন নির্বাচন কমিশনের ওপর ন্যস্ত দায়িত্ব পালনের জন্য যেরূপ কর্মচারীর প্রয়োজন হইবে, নির্বাচন কমিশন অনুরোধ করিলে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন কমিশনকে সেরূপ কর্মচারী প্রদানের ব্যবস্থা করিবেন’। আর ১২৬ অনুচ্ছেদ মতে ‘নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব পালনে সহায়তা করা সকল নির্বাহী কর্তৃপক্ষের কর্তব্য হইবে’। সুতরাং, বাংলাদেশের নির্বাচন কমিশন একেবারে স্বাধীন প্রতিষ্ঠান হিসাবে কাজ করে একটি অবাধ, সুষ্ঠু, অংশগ্রহণমূলক, গ্রহণযোগ্য নির্বাচন করার মতো সাংবিধানিক এবং আইনগত ভিত্তি নেই। সেটা থাকলেও এমন একটি নির্বাচন আয়োজন করা সম্ভব হতো না। কারণ, ক্ষমতাসীনরা চাইলেই নির্বাচনের পথে একের পর এক বাধা তৈরি করতেই পারেন এবং করেছেনও তাই। বাংলাদেশের নিম্ন আদালত নয় কিন্তু উচ্চ আদালত সাংবিধানিকভাবে পুরোপুরি স্বাধীন প্রতিষ্ঠান। কিন্তু সেখানেও কি সবাই ন্যায়বিচার পান? প্রভাবশালী, ক্ষমতাবানদের বিপরীতে সাধারণ মানুষের ভোগান্তির কথা কি আমরা জানি না? রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলায় বিরোধী দলের প্রধান থেকে শুরু করে তৃণমূল নেতাকর্মী পর্যন্ত বিপর্যস্ত। আদালতকে বহু ক্ষেত্রেই নিরপেক্ষ ভূমিকায় দেখা যায়নি।

ধরে নেওয়া যাক, নির্বাচন কমিশন তৈরির আইন করা হলো, যার মাধ্যমে ৫ জন ‘ফেরেশতা’ দিয়ে নির্বাচন কমিশন গঠন করা হলো। সেই কমিশনকে পূর্ণাঙ্গভাবে ক্ষমতায়িত করার জন্য সংবিধান এবং আইনি সুরক্ষাও নিশ্চিত করা হলো। কিন্তু যে ক্ষমতাসীন সরকারের আমলে ২০১৪ এবং বিশেষ করে ২০১৮ সালের নির্বাচনের মতো ভয়ংকর প্রহসন হয়, সেই সরকারের অধীনে নির্বাচন করার ন্যূনতম আস্থা প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক দলগুলোর থাকার কোনও কারণ আছে কি?

আওয়ামী লীগ ১৯৯১ সালের বিএনপি সরকারের সময় মাগুরার উপনির্বাচনে কারচুপির অভিযোগ তুলে পরবর্তী সংসদ নির্বাচনের জন্য তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে মাঠে জ্বালাও-পোড়াও শুরু করে। এখন তারা যেমন বলছেন, নির্বাচন করে নির্বাচন কমিশন, তখন সেটা বলেননি তারা। শক্তিশালী নির্বাচন কমিশনই যদি একটি ভালো নির্বাচনের একমাত্র পূর্বশর্ত হতো, তাহলে আইনের মাধ্যমে একটি শক্তিশালী নির্বাচন কমিশন গঠন এবং সেটাকে সত্যিকারভাবে ক্ষমতায়িত করার জন্য সাংবিধানিক এবং আইনি সংস্কার নিশ্চিতের জন্য আন্দোলন করতো আওয়ামী লীগ। স্বাধীন নির্বাচন কমিশন গঠনের কথা না বলে তখন তারা কেবল তত্ত্বাবধায়ক সরকারের জন্য তীব্র আন্দোলন করেছিল। কারণ, সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য নির্বাচনকালীন সরকারের ধরনটি ছিল অতি গুরুত্বপূর্ণ।    

১৬ নভেম্বর ১৯৯৫ গাইবান্ধায় একটি জনসমাবেশে বিরোধীদলীয় নেত্রী শেখ হাসিনা বলেছিলেন, জনগণের ভাত ও ভোটের অধিকার নিশ্চিত করতে তার দল আন্দোলনে নেমেছে। সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের লক্ষ্যে জনগণ আজ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে ঐক্যবদ্ধ। অন্য কোনও ফর্মুলা গ্রহণযোগ্য হবে না। শেখ হাসিনার যুক্তি ছিল যে বিএনপি পরিচালিত সরকার তো নয়ই, কোনও ক্ষমতাসীন সরকারের অধীনেই মুক্ত ও নিরপেক্ষ নির্বাচন হবে বলে আস্থা রাখা যায় না।

বাংলাদেশের ইতিহাসে যে চারটি নির্বাচন মোটাদাগে গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছিল সেগুলো হলো– ৯১, ৯৬, ২০০১ ও ২০০৮-এর নির্বাচন। এই প্রতিটি নির্বাচন হয়েছিল একটি নির্দলীয়, নিরপেক্ষ সরকারের তত্ত্বাবধানে।

এক মাগুরা নির্বাচন যদি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের জন্য তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রয়োজনীয়তা তৈরি করে, তাহলে বর্তমান বাংলাদেশ, যেখানে একটা ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনও সুষ্ঠু হচ্ছে না, তখন এটা স্রেফ অনিবার্য বিষয়ে পরিণত হয়েছে। গত কয়েক বছরে রাজনৈতিক দলগুলোর পরস্পরের মধ্যে আস্থা, বিশ্বাস, সহিষ্ণুতার পরিস্থিতির উন্নতি তো দূরে থাকুক অবনতি হয়েছে কয়েকগুণ। তাই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রয়োজনীয়তাও বেড়েছে আগের তুলনায় বহুগুণ। সরকার সেটা বোঝে না তা নয়। কিন্তু যেকোনও উপায়ে নির্বাচনে জেতাই যেখানে মুখ্য, সেখানে ন্যায় অন্যায়, উচিত আর অনুচিতের ফারাক বাহুল্য মাত্র।

লেখক: আইনজীবী, সুপ্রিম কোর্ট। সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য ও বিএনপি দলীয় হুইপ।

 

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

মিরপুর টেস্টে পয়েন্টের আশায় বাংলাদেশ 
মিরপুর টেস্টে পয়েন্টের আশায় বাংলাদেশ 
অক্সিজেন ছাড়াই এভারেস্ট জয় করলেন প্রথম বাঙালি নারী পিয়ালী
অক্সিজেন ছাড়াই এভারেস্ট জয় করলেন প্রথম বাঙালি নারী পিয়ালী
চোরাই গরু জবাই করে মাংস বিক্রির অভিযোগ 
চোরাই গরু জবাই করে মাংস বিক্রির অভিযোগ 
হাজী সেলিমের এমপি পদের কী হবে?
হাজী সেলিমের এমপি পদের কী হবে?
সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ