X
শুক্রবার, ০১ জুলাই ২০২২
১৭ আষাঢ় ১৪২৯

নতুন বছরে একটি ভালো কাজের খোঁজে

আপডেট : ১৪ এপ্রিল ২০২২, ১৬:৩০

রেজানুর রহমান

আমার দাদি বলতেন, বছরের প্রথম দিন একটা ভালো কাজ করো। আল্লাহ চাহেত সারা বছর তোমার ভালো কাটবে। দাদিকে জিজ্ঞেস করতাম, ভালো কাজ কী? কোনটা ভালো কাজ? দাদি সরল মনে কিছু সরল কথা বুঝিয়ে দিতেন। ধরো, কোনও মানুষ বিপদে পড়েছে তাকে সাহায্য করা ভালো কাজ। তুমি মিথ্যা বলছো না। সত্যের পক্ষে কথা বলছো– এটা ভালো কাজ। তুমি দুর্নীতি করছো না, অন্যকে ঠকাচ্ছ না, কারও অনিষ্ট করছো না, এটাও ভালো কাজ। সদা সত্য কথা বলবে, মিথ্যুক যারা তাদের সঙ্গে মিশবে না। বড়জনদের শ্রদ্ধা করবে, ছোটদের আদর দেবে, আর মানুষকে ভালোবাসবে... এটাও ভালো কাজ।

ছোট বয়সে দাদির এসব কথা শুনে একটু অবাকই হতাম। মানুষ বিপদে পড়েছে, তাকে সাহায্য করা তো মানুষেরই কর্তব্য। অথচ এই কথা মনে করিয়ে দিতে হচ্ছে কেন? মানুষ মানুষকে সাহায্য করবে, মিথ্যা বলা মহাপাপ। কাজেই মানুষ মিথ্যা বলবে না এটাই তো হওয়া উচিত। দুর্নীতি ভালো কাজ নয়। কাজেই মানুষের তা করা উচিত নয়। মানুষ যদি মানুষ হয় তাহলে সে অন্যকে ঠকাবে কেন? অন্যের অনিষ্ট করবে কেন?

বড়বেলায় এসে দেখলাম, আমার দাদির কথাগুলো রক্ষা করা বেশ কঠিন। বছরের প্রথম দিন একটা ভালো কাজ করবে। দাদির কথা শুনে সেই বয়সে একটা প্রশ্ন মনে উঁকি দিয়েছিল, বছরের প্রথম দিন ভালো কাজ করতে বলছেন কেন দাদি? বছরের অন্যান্য দিন কি তাহলে ভালো কাজ করতে হবে না? তবে এখন বুঝি তার কথার মর্মার্থ। বছরের প্রথম দিন ভালো কাজ করার অর্থই হলো সারা বছর ভালো কাজের জন্য নিজেকে প্রস্তুত রাখা।

এখন প্রশ্ন হলো, ভালো কাজ করা কি খুবই সহজ? ধরা যাক, আমরা যারা এই লেখাটি পড়ছি সবাই একটি করে ভালো কাজ করতে চাই। সবাই সিদ্ধান্ত নিলাম, একজন অসহায় দুস্থ মানুষের পাশে দাঁড়াব। বিপদগ্রস্ত মানুষকে সাহায্য করবো। ইচ্ছে করলে আমরা হয়তো সেটা পারবো। যার যার সামর্থ্য অনুযায়ী একজন দুস্থ অর্থাৎ অভাবগ্রস্ত মানুষকে সাহায্য সহযোগিতা করা যেতেই পারে। প্রচার মাধ্যমে প্রায় প্রতিদিনই অভাবগ্রস্ত মেধাবী গরিব ছাত্রছাত্রীর মানবিক সংবাদ প্রচার ও প্রকাশ হচ্ছে। আমরা তাদের পাশে দাঁড়াতে পারি। দুই বছর পর করোনামুক্ত পরিবেশে এবার পবিত্র ঈদ পালিত হবে। করোনায় অনেকেই নিঃস্ব হয়ে গেছেন। চাকরি, ব্যবসা-বাণিজ্য হারিয়েছেন। অসহায় মানবেতর জীবনযাপন করছেন অনেকে। আমাদের সমাজে তিন স্তরের মানুষ আছে। উচ্চবিত্ত, মধ্যবিত্ত, নিম্নবিত্ত। একটু খেয়াল করলেই দেখবেন, উচ্চবিত্ত ও নিম্নবিত্ত দুই স্তরের মানুষ বেশ সুখেই আছেন। উচ্চবিত্তরা দান খয়রাত করেন। নিম্ন মধ্যবিত্তরা তা অনায়াসে হাত পেতে নেন। লোকলজ্জার ভয়ে মধ্যবিত্তরা কারও দান নিতে চান না। নিদারুণ কষ্টের জীবন তাদের। এই ঈদে আমরা তাদের পাশে দাঁড়াতে পারি। নতুন বছরে এটা ভালো কাজ হতে পারে। অসহায়, বিপদগ্রস্ত মানুষকে সাহায্য করা, মানুষ হয়ে মানুষের পাশে দাঁড়ানো সবচেয়ে ভালো কাজ। কিন্তু আমরা কি সত্যিকার অর্থে মানুষের পাশে দাঁড়াচ্ছি? এই পবিত্র রমজানে অসহায়, দুঃখী মানুষের পাশে দাঁড়ানোই তো আমাদের প্রথম ও পবিত্র কর্ম হওয়া উচিত। অথচ এই রমজান মাসেই আমরা অনেকে মানুষকে ঠকানোর তীব্র প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়েছি। পৃথিবীর অনেক দেশে উৎসব অথবা পার্বণ উপলক্ষে দ্রব্যমূল্যের দাম কমিয়ে দেওয়া হয়। আর আমাদের দেশে পবিত্র রমজান মাসকেই দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির শ্রেষ্ঠ সময় হিসেবে বেছে নেওয়া হয়। দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য সরকারকে নানা কসরত, নিয়মনীতি জারি করতে হয়। তবু কাজ হয় না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ভিডিও ফুটেজে ব্যবসায়ী ও ম্যাজিস্ট্রেটের মধ্যে চোর-পুলিশ খেলা দেখলাম। ভিডিও ফুটেজে দেখা যাচ্ছে দ্রব্যমূল্য সঠিকভাবে বিক্রি হচ্ছে কিনা তা দেখার জন্য একটি বাজারে হাজির হয়েছেন একজন ম্যাজিস্ট্রেটসহ পুলিশ বাহিনীর সদস্যরা। তা দেখে বেশ কয়েকটি দোকানের সাটার বন্ধ করে দোকানিরা পালাতে শুরু করলো। তারা এমনভাবে দৌড়ে পালালো যে অলিম্পিক দৌড়ে তাদের দাঁড় করালে স্বর্ণপদক জিতে আনবে।

দ্রব্যমূল্য সহনীয় পর্যায়ে না থাকলে ক্ষোভ-বিক্ষোভ বাড়তেই থাকে। যদি আমাদের একটা ব্রতই হয় যে এবার বাংলা নববর্ষের প্রথম দিনে সবাই মিলে দ্রব্যমূল্য সহনীয় পর্যায়ে রাখবো। মানুষ হয়ে মানুষকে ঠকাবো না। তা কি আদৌ সম্ভব? মোটেই সম্ভব নয়। দুর্নীতি, অন্যায় রোধ করবো এই শপথ নিলেও তা কি রক্ষা করতে পারবো? বোধকরি না। কারণ, দুর্নীতি এখন সংস্কৃতির অঙ্গ হয়ে উঠেছে। এই দেশে যে যত বড় দুর্নীতিবাজ সেই তত বড় মহান মানুষ। এই দেশে দুর্নীতিবাজরা বেশ সংগঠিত। তারা ইচ্ছে করলেই মোবাইলের একটি এসএমএস মাধ্যমে তিলকে তাল করে তুলতে পারে। পেঁয়াজ, আদা, রসুন, চিনি, লবণ, চাল, তেলসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় সব পণ্যের দাম বাড়িয়ে দিতে পারে। এই দেশে দুর্নীতিবাজদের জোট আছে। তারা সবাই সবাইকে মানে, শ্রদ্ধা করে। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, নীতিবান মানুষের কোনও জোট নেই। নীতিবানরা সবাই সবাইকে মানে না। শ্রদ্ধা সমীহও করে না। ফলে যা হবার তাই হচ্ছে। দুর্নীতিবাজরাই সমাজে দাপট দেখাচ্ছে।

আজ বাংলা নববর্ষের প্রথম দিন। এই লেখাটি হতে পারতো নববর্ষের ইতিহাসভিত্তিক। আকবরি সন গণনা, কীভাবে বাংলা নববর্ষের সূচনা হয়েছিল এই নিয়ে ইতিহাসের পাতা খুলে দেওয়া যেতো। কিন্তু ইতিহাস থেকে আমরা কি আদৌ কোনও শিক্ষা নিই? ছোটবেলায় দেখতাম প্রায় প্রতিটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে ‘হালখাতা’ নামে আনন্দ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হতো। হালখাতা হলো পুরনো দিনের হিসাব মিলিয়ে নতুন বছরের হিসাবের খাতা খোলার দিন। এখন হালখাতা শব্দটিই হারিয়ে যেতে বসেছে। আমার এক বন্ধু চমৎকার একটি কথা বললেন। হালখাতায় তো নতুন বছরের হিসাব খোলার দিন। কিন্তু ব্যবসায়ীরা নতুন বছরের হিসাব খুলবেন কী করে? অনেকে তো আগের বছরের অযৌক্তিক অন্যায়ভাবে দাম বাড়ানোর হিসাবই শেষ করতে পারেননি। হিসাবটা যে অনেক বড়। কাজেই নতুন হিসাবের খাতা খোলার জন্য তো একটু সময় লাগবেই।

তবে এ কথা মানতেই হবে দেশের সব ব্যবসায়ীই কিন্তু দুর্নীতিবাজ নন। ন্যায়নীতিপরায়ণ ব্যবসায়ীও আছেন। তাদের সংখ্যাই হয়তো বেশি। কিন্তু ওই যে কথায় বলে এক বালতি দুধকে নষ্ট করার জন্য এক ফোঁটা লেবুর রসই যথেষ্ট। চিন্তা করে দেখুন এক ফোঁটা লেবুর রসের কি শক্তি। নিমিষেই এক বালতি দুধকে নষ্ট করে দিতে পারে।

আমরা কি একটা নষ্ট সময়কে অতিক্রম করছি? অথচ সামনে তাকালেই তো দেখতে পাচ্ছি দেশে অযুত সম্ভাবনার আলো উঁকি দিচ্ছে। স্বপ্নের পদ্মা সেতু চালু হওয়া এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র। ঢাকার বুকে মেট্রোরেল দৃশ্যমান। চট্টগ্রামে কর্ণফুলী টানেল বাস্তব রূপ পেতে যাচ্ছে। চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত রেললাইন নির্মাণকাজ প্রায় শেষের পথে। আগামীতে ঢাকা থেকে ট্রেনযোগে কক্সবাজার যাওয়া যাবে। উন্নয়ন অগ্রযাত্রার এই মাহেন্দ্রক্ষণে কোথায় যেন একটা আতঙ্ক ও ভয়ের সুরও ধ্বনিত হচ্ছে। সেটা অন্যায়, দুর্নীতি ও অনাচারের ভয়। এই ভয়ের উৎসমুখে কলকাঠি নাড়ছেন দেশেরই একদল দুর্নীতিবাজ মানুষ। তারা মুখে বলে দেশকে ভালোবাসি। কিন্তু অন্তরে তারা বিষকেই গুরুত্ব দেয়। কাজেই এই নববর্ষে এই দুর্নীতিবাজদের নির্মূল করার দৃপ্ত শপথ হওয়া উচিত সবার।

আবার একটি ভালো কাজ প্রসঙ্গে আসি। বাংলা বছরের প্রথম দিন আজ। যুক্তি তর্কে না গিয়ে আসুন না বছরের প্রথম দিনে একটা হলেও ভালো কাজ করি। ভেবে দেখুন দেশের ১৮ কোটি মানুষের মধ্যে এক কোটি মানুষও যদি আজ একটি করে ভালো কাজ করে তাহলে ভালো কাজে ভরে যাবে দেশ। কী ভাবছেন? ভালো কাজ খুঁজে পাচ্ছেন না? এই পবিত্র রমজানে একজন দুস্থ মানুষকেও যদি সহায়তা করতে পারেন সেটাও হবে একটি ভালো কাজ। অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে শিখুন। এটাও ভালো কাজ। কাউকে সাহায্য করতে না পারেন তাকে বিপদে ফেলবেন না। এটাই সবচেয়ে ভালো কাজ। বাংলা নববর্ষে অনেক শুভেচ্ছা সবার জন্য।

শুভ বাংলা নববর্ষ ১৪২৯।

লেখক: কথাসাহিত্যিক, নাট্যকার, সম্পাদক- আনন্দ আলো।

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
খুবিতে তিন দিনব্যাপী আন্তর্জাতিক সম্মেলন শুরু
খুবিতে তিন দিনব্যাপী আন্তর্জাতিক সম্মেলন শুরু
ভারতীয় রুপির রেকর্ড পতন
ভারতীয় রুপির রেকর্ড পতন
‘অফসাইড বিতর্ক’ এড়াতে কাতার বিশ্বকাপে নতুন প্রযুক্তি
‘অফসাইড বিতর্ক’ এড়াতে কাতার বিশ্বকাপে নতুন প্রযুক্তি
দেড় ঘণ্টার রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে প্রাণ গেলো যুবকের
দেড় ঘণ্টার রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে প্রাণ গেলো যুবকের
সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ