X
রবিবার, ০২ অক্টোবর ২০২২
১৭ আশ্বিন ১৪২৯

রাষ্ট্র মেরামতে ‘সরকার পতন আন্দোলন’

মো. জাকির হোসেন
২৩ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১৬:০৩আপডেট : ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১৪:১৮

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধকে কেন্দ্র করে দেশে দেশে মূল্যস্ফীতির সর্প ক্রমেই ফুঁসে উঠছে। ডলার সংকটের বিষাক্ত ছোবলে নীল হয়ে পড়ছে অর্থনীতি। উন্নত অর্থনীতির বাঘা বাঘা অর্থনীতিবিদদের রাতের ঘুম হারাম। ধেয়ে আসছে ভয়ংকর বৈশ্বিক মহামন্দা। মন্দা তস্করের বেশে ছুরি হাতে, নাকি টর্নেডো হয়ে এসে চূর্ণবিচূর্ণ করে যাবে সে নিয়ে চিন্তার ভাঁজ কপালে অর্থনীতিবিদ ও বিশেষজ্ঞদের। বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট ডেভিড ম্যালপাসের শঙ্কা, মহামন্দার মারাত্মক পরিণতি ভোগ করতে হবে উঠতি বাজার ও উন্নয়নশীল অর্থনীতির দেশগুলোকে।

বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির প্রধান ডেভিড বিসলে সতর্ক করে বলেছেন, বিশ্বের প্রায় ৩৪.৫০ কোটি মানুষ অনাহারের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। করোনা মহামারিতে অর্থনৈতিক উদ্যোগ হ্রাস, ক্রমবর্ধমান সংঘাত, জলবায়ু পরিবর্তন, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি এবং ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের কারণে ক্ষুধার ঢেউ ক্ষুধার সুনামিতে পরিণত হয়েছে। বিসলে বলেছেন, খাদ্যপণ্য, জ্বালানি ও সারের মূল্য বৃদ্ধির কারণে সাত কোটি মানুষ অনাহারে মৃত্যুর কাছাকাছি পৌঁছে গেছে। ভয়াবহ বৈশ্বিক সংকটের মাঝেই বাংলাদেশে চোখ রাঙাচ্ছে বিএনপির সরকার পতনের আন্দোলন।

এ যাবৎকালে বাংলাদেশের কোনও রাজনৈতিক আন্দোলনই অহিংস ছিল না। আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে প্রাণহানি ও সম্পদহানি আন্দোলনের অত্যাবশ্যকীয় বৈশিষ্ট্য। সংকটকালে কেন সরকার পতনের আন্দোলন? বিএনপি বলছে, সরকার ১৫ বছরে রাষ্ট্রকাঠামো ও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা পুরোপুরি ধ্বংস করে ফেলেছে। ‘ধ্বংসপ্রাপ্ত’ রাষ্ট্রব্যবস্থা সংস্কার ও ‘গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার’ করতে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটানো জরুরি। আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটিয়ে নিরপেক্ষ, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা করা হবে। ক্ষমতায় গেলে রাজপথের সব দল নিয়ে জাতীয় সরকার গঠন ও জবাবদিহিতামূলক রাষ্ট্র গঠনে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট পার্লামেন্টসহ রাষ্ট্র-রূপান্তরমূলক রাজনৈতিক সংস্কার করা হবে। রাষ্ট্রকাঠামো সংস্কারের লক্ষ্যে সাংবিধানিক সংস্কার কমিশন, প্রশাসনিক সংস্কার কমিশন, বিচার ব্যবস্থার সংস্কারে জুডিসিয়াল কমিশন, সৎ সাংবাদিকতার পরিবেশ নিশ্চিত করতে মিডিয়া কমিশন ও অর্থনৈতিক সংস্কার কমিশন গঠন করা হবে। বিএনপির রোডম্যাপে আরও রয়েছে– গণতন্ত্র ও ভোটাধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে স্থায়ী সাংবিধানিক ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার লক্ষ্যে নির্বাচনকালীন দলনিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তন, প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর নির্বাহী ক্ষমতার ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা, রাষ্ট্রের তিনটি বিভাগের মধ্যে ক্ষমতা, দায়িত্ব ও কর্তব্যের সমন্বয়, স্বাধীন ও শক্তিশালী নির্বাচন কমিশন গঠনের উদ্দেশ্যে নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ আইন সংশোধন, সংসদ সদস্যদের মত প্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ সংশোধন, শুনানির মাধ্যমে সংসদীয় কমিটির ভেটিং সাপেক্ষে রাষ্ট্রীয় ও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোয় নিয়োগ, যোগ্যদের বিচারপতি নিয়োগের লক্ষ্যে ৯৫(গ) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী বিচারপতি নিয়োগ আইন প্রবর্তন। দুর্নীতি প্রতিরোধে ন্যায়পাল নিয়োগ, সব কালাকানুন বাতিল, ক্ষমতার ব্যাপক বিকেন্দ্রীকরণের লক্ষ্যে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোকে অধিকতর স্বাধীন ও শক্তিশালীরূপে গড়ে তোলা, মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের একটি তালিকা প্রণয়ন এবং তাঁদের যথাযথ মর্যাদা ও রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি নিশ্চিতকরণ, জাতীয় সংসদে নারী আসন বৃদ্ধিকরণ ইত্যাদি।

রাষ্ট্র-রূপান্তরের লক্ষ্যে যে সংস্কারের কথা বিএনপি তাদের রূপরেখায় উল্লেখ করেছে তা অবশ্যই প্রশংসার যোগ্য ও কাঙ্ক্ষিতও বটে। কিন্তু ভয় হয়, এসব নিছক মনভোলানো নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি নয় তো? পুর্ণেন্দু পত্রীর ‘কথোপকথন’ কবিতায় প্রেমিকা নন্দিনীকে প্রেমিক শুভঙ্করের সবসময় হারিয়ে ফেলার ভয়। নন্দিনী শুভঙ্করকে অভয় দিয়ে বলছে,

‘কেন আমার কথা শোনো না বলো তো?
আমি কি নির্বাচনের প্রতিশ্রুতি
যে সিংহাসনের হাতলে হাত রাখলেই হারিয়ে যাবে স্মৃতিহীন অন্ধকারে?’

বিএনপির রাষ্ট্র-রূপান্তর রূপরেখাও যে কেবল নির্বাচনের প্রতিশ্রুতি নয়, ক্ষমতার মসনদে হাত রাখলেই হারিয়ে যাবে না তার নিশ্চয়তা দরকার। আর সেজন্য কিছু প্রশ্নের উত্তর খোঁজা জরুরি –

এক. বিএনপি অতীতের ভুলগুলোর জন্য অনুতপ্ত কিনা? জিয়ার শাসন আমলকে বিএনপি এখনও গণতন্ত্র মনে করে কিনা? বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর সংবিধান লঙ্ঘন করে একের পর এক মোশতাক, বিচারপতি সায়েম ও জিয়াউর রহমান স্বঘোষিত রাষ্ট্রপতি হয়েছেন। সংবিধান লঙ্ঘন করে গণতন্ত্র হয় কি? রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের জন্য সংবিধানে বর্ণিত পদ্ধতির বদলে ‘হ্যাঁ, না’ ভোটে জিয়া রাষ্ট্রপতি হয়েছেন। ‘হ্যাঁ, না’ ভোটকে বিএনপি গণতান্ত্রিক পদ্ধতি মনে করে কিনা? এটিকে গণতান্ত্রিক পদ্ধতি মনে করলে আসন্ন জাতীয় নির্বাচন আওয়ামী লীগ সরকার ‘হ্যাঁ, না’ ভোটের ব্যবস্থা করলে বিএনপি তা গণতান্ত্রিক পদ্ধতি বলে মানবে কিনা?

দুই. বিএনপি বলছে, বর্তমান সরকার ১৫ বছরে রাষ্ট্রকাঠামো ও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা পুরোপুরি ধ্বংস করে ফেলেছে। তার মানে বিএনপির শাসন আমলে রাষ্ট্র ও গণতন্ত্র সুরক্ষিত ছিল। এই যদি উপলব্ধি হয় তাহলে বিএনপির এসব রূপরেখা কোনও ফল বয়ে আনবে না।

বিএনপির সময় রাষ্ট্র ও গণতন্ত্র কেমন ছিল তার কিছু উদাহরণ আমি সে সময়ের সংবাদপত্রের শিরোনাম থেকে উল্লেখ করছি– ‘খবরটি লজ্জার অপমানের: ট্রান্সপারেন্সির সূচকে বাংলাদেশ টানা পঞ্চমবার শীর্ষ দুর্নীতিগ্রস্ত দেশ’; ‘দুর্নীতি, বিশ্বব্যাংক টাকা ফেরত চায়’; ‘তারেক, বাবর, হারিছ, মামুন বিএনপির চার মহাদুর্নীতিবাজ’; ‘শিপিং মন্ত্রীর দুর্নীতির অভিযোগ তুলে ডেনমার্ক ২৫০ কোটি টাকার সাহায্য প্রত্যাহার করেছে’; ‘বিমানকে নিঃস্ব করে অবৈধ সম্পদ গড়েছেন শামীম এস্কান্দর’; ‘গ্যাটকোকে কাজ পাইয়ে দিতে টাকা নিয়েছিলেন কোকো’; ‘পুলিশ নিয়োগে দলীয়করণ ও অর্থের লেনদেন হয়েছে’; ‘মামুনের খাম্বা সিন্ডিকেট লুটে নিয়েছে বিদ্যুৎ খাতের হাজার কোটি টাকা’; ‘জোট সরকারের প্রভাবশালীদের ছত্রছায়ায় সমবায় ব্যাংকে দেদার লুট’; ‘ওরিয়েন্টাল ব্যাংকের প্রায় ৫০০ কোটি টাকা আত্মসাৎ’; ‘১০০ প্লটের ৮৪টিই পেলেন বিএনপির মন্ত্রী-সাংসদরা’; ‘দুর্নীতির দায়ে এডিবি বন প্রকল্পে সাত কোটি টাকা সহায়তা বাতিল করেছে’; ‘প্রশাসন বিএনপি-জামায়াতের কব্জায়’; ‘জঙ্গিদের মদতদাতা বিএনপির ৮ মন্ত্রী-সাংসদ’; ‘আওয়ামী লীগ অফিসে ঢুকে পুলিশের তাণ্ডব’; হবিগঞ্জে আওয়ামী লীগের জনসভায় বিস্ফোরণে আরও ৪ জনের মৃত্যু, আহত ৭০’; ‘পুলিশের লাঠিচার্জে নাসিম-মতিয়াসহ আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা আহত’; ‘কলারোয়ায় শেখ হাসিনার গাড়িবহরে হামলা’; ‘সাসংদ আহসানউল্লাহ মাস্টার সন্ত্রাসীদের গুলিতে নিহত’; ‘গ্রেনেড হামলায় সাবেক অর্থমন্ত্রী কিবরিয়া নিহত’।

এসব শিরোনাম কি রাষ্ট্রধ্বংসের আলামত নয়?

তিন. রূপরেখায় উল্লেখ করা হয়েছে গণমানুষের জন্য ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে বিচারিক সংস্কারের জন্য জুডিসিয়াল কমিশন গঠন করা হবে। পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুসহ ২৬ জনকে হত্যা করা হয়। নিহতদের মধ্যে নারী, শিশু এমনকি অন্তঃসত্ত্বা নারীও ছিলেন। এই ২৬ জন মানুষের বিচারের পথ রুদ্ধ করতে জিয়াউর রহমান সংবিধানে ইনডেমনিটি আইনকে অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন।

মানবতা, সভ্যতা ও মানবাধিকারবিরোধী এই আইন সংবিধানে অন্তর্ভুক্তিকে বিএনপি বেআইনি ও ভুল ছিল বলে মনে করেন কিনা? বিএনপির শাসন আমলে বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচারের শেষ ধাপে আপিল বিভাগে ৫ বছর ধরে বিচারকে আটকে রাখা হয়েছিল। একদিনের জন্যও শুনানি হতে পারেনি। প্রয়াত বিএনপি নেতা মওদুদ আহমদ এজন্য বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বকে দায়ী করে অনুশোচনা করেছেন। বিএনপির নেতৃবৃন্দও হত্যার বিচারে বাধা সৃষ্টি করার জন্য অনুশোচনা করেন কিনা?

২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার বিচার বাধাগ্রস্ত করতে তদন্তকে ভিন্ন খাতে পরিচালনা করা হয়েছে, বিএনপি নেতৃবৃন্দ এটা উপলব্ধি করেন কিনা?

চার. বিএনপির শাসন আমলে ৬৩টি জেলার ৪৩৪টি স্থানে জঙ্গিরা একযোগে বোমা হামলা করেছিল। একটি রাষ্ট্রের ৯৯ শতাংশ জেলায় একযোগে বোমা হামলার ঘটনার দ্বিতীয় কোনও নজির পৃথিবীর ইতিহাসে নাই। এর আগের বছর ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট জঙ্গি ও রাষ্ট্রযন্ত্র মিলে আওয়ামী লীগের জনসভায় সামরিক বাহিনীতে ব্যবহৃত গ্রেনেড দিয়ে হামলা করা হয়েছিল।

দলের সভানেত্রী বঙ্গবন্ধুকন্যা বেঁচে গেলেও ২৪ জন নেতাকর্মী নিহত হন। এরও আগে ২০০১ সালের সাতক্ষীরার একটি সিনেমা হলে, এর পরের বছর ২০০২ সালে নাটোরের একটি সিনেমা হলে এবং একই বছরের ৭ ময়মনসিংহের চারটি সিনেমা হলে একযোগে বোমা হামলা করে বেশ কয়েকজন মানুষ হত্যা করা হয়।

২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট সিরিজ বোমা হামলার সাফল্যে অনুপ্রাণিত হয়ে জঙ্গিরা আত্মঘাতী হামলা শুরু করে। অন্ততপক্ষে ১০টি আত্মঘাতী হামলা চালানো হয় তিন মাসের ব্যবধানে। এতে বিচারক, পুলিশ, আইনজীবী, সরকারি কর্মকর্তা, সাংস্কৃতিক কর্মী ও পথচারীসহ ৩০ জন নিহত ও কয়েকশ’ আহত হন। সিরিজ বোমা হামলা ও আত্মঘাতী হামলা আকস্মিকভাবে হয়নি। বোমা হামলার আগে জঙ্গি সংগঠন বিভিন্ন স্থানে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেছে।

তৎকালীন ক্ষমতাসীন বিএনপি-জামায়াতের কয়েকজন নেতা ওই সময় জঙ্গিদের পৃষ্ঠপোষকতা করেছেন বলে একাধিক শীর্ষ জঙ্গি স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে বলেছে। এমনকি তাদের জবানবন্দিতে বেরিয়ে এসেছে জঙ্গিরা তখন এক স্থান থেকে আরেক স্থানে রাষ্ট্রীয় পতাকাবাহী গাড়িতে করে গিয়েছে। বোমা হামলার পর সংবাদপত্রের শিরোনাম হয়েছে হামলার পেছনে ইন্ধনদাতা ছিলেন বিএনপির আট মন্ত্রী ও এমপি। জঙ্গিতোষণ নীতি আত্মঘাতী ভুল ছিল, বিএনপি নেতৃবৃন্দ কি এটি অনুধাবন করেন, নাকি জঙ্গিদের বাঁচাতে ‘ভ্যানিটি ব্যাগে গ্রেনেড বহনের’ তত্ত্বে এখনও বিশ্বাস অটুট রয়েছে?

পাঁচ. বিএনপির রাষ্ট্র-রূপান্তর আন্দোলন সমর্থনের আগে জানতে হবে কোনও রাষ্ট্রের রূপান্তর চান তারা? বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে সৃষ্ট বাংলাদেশ, নাকি তাদের দাবি অনুযায়ী জিয়াউর রহমানের ঘোষণায় সৃষ্ট বাংলাদেশ? যদি ঘোষণায় স্বাধীনতা অর্জন করা যেত তাহলে বেলুচিস্তান, রিপাবলিক অব বায়াফ্রা, কাতালোনিয়াসহ এই উপমহাদেশে অনেক রাষ্ট্র স্বাধীন হয়ে যেত।

বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন, চুয়ান্নর যুক্তফ্রন্ট, বাষট্টির শিক্ষা আন্দোলন, ছেষট্টির ছয় দফা আন্দোলন, আটষট্টির আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা, ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান, সত্তরের নির্বাচন, একাত্তরের ৭ মার্চের বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণ, ২৬ মার্চ বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণা, ১০ এপ্রিল স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র তথা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকালীন সংবিধান প্রণয়ন, ১৭ এপ্রিল মুজিবনগর সরকারের শপথ গ্রহণ এবং ৯ মাসব্যাপী সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের পথ ধরে বাংলাদেশ সৃষ্টি হয়েছে, বিএনপি মুক্তিযুদ্ধের এই ইতিহাস স্বীকার করেন কিনা?

ইতিহাসের এসব বাঁকবদল আমাদের নিরন্তর অনুপ্রেরণার উৎস। আর এর সবকটিতেই রয়েছে বঙ্গবন্ধুর ওতপ্রোত সম্পৃক্ততা। বিএনপি নেতৃবৃন্দ এটি মানেন কিনা? এর কোনোটিকে অস্বীকার করে মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশে বিশ্বাসী হওয়া যায় না। বিএনপি মুক্তিযুদ্ধকালীন সংবিধান স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র মানেন কিনা? যুদ্ধকালীন সংবিধানের ভিত্তিতেই মুজিবনগর সরকার পরিচালিত হয়েছে, বাংলাদেশ সৃষ্টি হয়েছে। এটি মানলে জিয়াকে স্বাধীনতার ঘোষক বলা সংবিধানের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া।

অন্যদিকে, স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রকে অস্বীকার করা মানে বাংলাদেশকেই অস্বীকার করা। বিএনপি এই সত্য মানেন কিনা যে ২৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর পক্ষ থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা ও সশস্ত্র যুদ্ধে জেড ফোর্সের নেতৃত্ব দেওয়া ছাড়া ৫২, ৫৪, ৬২, ৬৬, ৬৮, ৬৯, ৭০, ৭১-এর ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ, ২৬ মার্চ বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণা, ১০ এপ্রিল স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র তথা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকালীন সংবিধান প্রণয়ন, ১৭ এপ্রিল মুজিবনগর সরকারের শপথ গ্রহণ - কোথায়ও জিয়ার সম্পৃক্ততা নেই।

ছয়. নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ, তত্ত্বাবধায়ক সরকার কাদের নিয়ে গঠিত হবে? বিলুপ্ত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উচ্চ আদালতের অবসরপ্রাপ্ত বিচারকগণের মধ্য হতে হতেন। এর ফলে উচ্চ আদালত রাজনীতিকরণের দ্বারা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে? আবারও সেই উচ্চ আদালতে ফিরে যাবো, না অন্য কোনও প্রতিষ্ঠানকে বাছাই করা হবে? কোন সেই প্রতিষ্ঠান, আর সেই প্রতিষ্ঠানও রাজনীতিকরণের মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্ত হবে না তার নিশ্চয়তা কী?

প্রতিষ্ঠানের বদলে প্রত্যেক নির্বাচনে ব্যক্তির ওপর নির্ভরতা তো রাষ্ট্রকেই মারাত্মক ঝুঁকিতে ফেলবে। কারণ, প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা ছাড়া আমাদের বড় দুই দল প্রতিবার কোনও ব্যক্তির নিরপেক্ষতা বিষয়ে একমত হবেন তা কি আদৌ আশা করা যায়?

সাত. বিএনপি গণতন্ত্র প্রাতিষ্ঠানিকীকরণে সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ সংশোধন করতে চান। আমাদের গণতন্ত্রের সমস্যা কেবল সংবিধান নয়। আমাদের রাজনৈতিক দলসমূহের মধ্যে কদাচিৎ গণতন্ত্র চর্চা করা হয়। দলে গণতন্ত্র না থাকলে দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হবে কোন জাদু বলে?

এই তো সেদিন জাতীয় পার্টির সাবেক মহাসচিব, প্রেসিডিয়াম সদস্য মসিউর রহমান রাঙ্গাকে কোনও কারণ দর্শানোর সুযোগ না দিয়ে চেয়ারম্যানের একচ্ছত্র ক্ষমতায় পত্রপাঠ দল থেকে বহিষ্কার করা হলো। বিএনপির গঠনতন্ত্রেও চেয়ারম্যানের এমন একচ্ছত্র ক্ষমতা রয়েছে। দলের চেয়ারম্যান ইচ্ছা করলে কোনও কারণ দর্শানো ব্যতিরেকেই যে কাউকে দল থেকে বহিষ্কার করতে পারবেন।

গঠনতন্ত্রের ৮(খ)(৪) অনুচ্ছেদের ক্ষমতা বলে কেবল ব্যক্তি নয়, চেয়ারম্যান যেকোনও সময় জাতীয় নির্বাহী কমিটি, জাতীয় স্থায়ী কমিটি, বিষয় কমিটিসমূহ এবং চেয়ারম্যান কর্তৃক মনোনীত অন্যান্য কমিটি বাতিল করে দিতে পারেন। বিএনপির গঠনতন্ত্রে সংসদ সদস্যদের স্বাধীন মত প্রকাশের বিরুদ্ধে সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদের চেয়েও কঠোর বিধান রয়েছে। গঠনতন্ত্রের ৫(ঘ)(২) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘দল কর্তৃক মনোনীত কোনও সংসদ সদস্য যদি সংসদে দলের সংসদীয় দলের নেতা/নেত্রীর সম্মতি ছাড়া নিজের নির্দিষ্ট আসন পরিবর্তন করেন বা অন্য দলের সাথে জোট বাঁধেন বা ফ্লোরক্রস করেন বা সংসদের দলীয় অবস্থান পরিপন্থি কোনও কাজ করেন তাহলে উপরোক্ত যেকোনও কার্যের কারণে সেই সংসদ সদস্য এই দল থেকে তাৎক্ষণিকভাবে পদত্যাগ করেছেন বলে গণ্য হবেন।’  

বিএনপি নিজ গঠনতন্ত্র সংশোধন করে ক্ষমতার ভারসাম্য আনলে ক্ষমতায় গিয়ে সংবিধান সংশোধন করবে, এ আশ্বাসে জনগণ ভরসা পাবে। ইংরেজিতে একটা প্রবাদ আছে ‘চ্যারিটি বিগিনস অ্যাট হোম’ (আগে ঘর, তবে তো পর)।

আট. বিএনপি ক্ষমতায় গেলে মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের নতুন তালিকা প্রণয়ন, তাঁদের যথাযথ মর্যাদা ও রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি নিশ্চিতকরণ করা হবে। যাদের কারণে তাঁরা শহীদ হয়েছেন সে গণহত্যাকারী, মানবতাবিরোধী, যুদ্ধাপরাধীদের নিয়ে তো বিএনপি এর আগে সরকার গঠন করেছে, তাদের সাথে এখনও নির্বাচন ও আন্দোলনের জোট রয়েছে। এটি স্ববিরোধী নয় কি?

নয়. ক্ষমতায় গেলে রাজপথের সব দল নিয়ে জাতীয় সরকার গঠন করবে বলে বিএনপির রূপরেখায় উল্লেখ রয়েছে। কিন্তু জাতীয় সরকারের ধারণা ত্রুটিযুক্ত। সংবিধানে জাতীয় সরকার বলতে কিছু নেই, আর রাষ্ট্রবিজ্ঞানে জাতীয় সরকার বলতে কোনও রাষ্ট্রের ক্ষমতাসীন সরকারকেই বোঝায়। বিভিন্ন অভিধানে জাতীয় সরকার বলতে যুদ্ধ কিংবা জাতির সংকটকালে সব রাজনৈতিক দলকে নিয়ে গঠিত সরকারকে বোঝায়। আমাদের মুলুকে রাজপথের দল নিয়ে সরকার গঠন নতুন কিছু নয়। পাকিস্তান আমলে যুক্তফ্রন্ট সরকার গঠিত হয়েছিল।

বাংলাদেশে ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ জাতীয় পার্টির আনোয়ার হোসেন মঞ্জু ও জেএসডির আসম আব্দুর রবকে মন্ত্রী করেছিল। ২০০১ সালে বিএনপি জামাতকে নিয়ে সরকার গঠন করেছিল। ২০০৯ ও ২০১৪ সালে আওয়ামী লীগ জাসদ, সাম্যবাদী দল, ওয়ার্কার্স পার্টি, জাতীয় পার্টিসহ বেশ কয়েকটি দল নিয়ে সরকার গঠন করেছিল। কাজেই বিএনপি যে সরকার গঠন করতে চায় তা জাতীয় সরকার নয়; কোয়ালিশন, যুক্তফ্রন্ট, ঐক্য, সমন্বিত, জোট কিংবা মহাজোট সরকার নাম হতে পারে। কেননা, নির্বাচনে জয়লাভের পর গঠিত সরকার তো সংকটকালীন সরকার নয়।

রাষ্ট্র-রূপান্তরমূলক সংস্কার করতে হলে বিএনপিকে মুক্তিযুদ্ধের সত্যিটাকে মানতে হবে। নিজেদের ও তার মিত্রদের দলের গঠনতন্ত্র সংস্কার করে অগণতান্ত্রিক বিধান সংশোধন করতে হবে। দলে গণতন্ত্রের অনুশীলন করতে হবে। তারও আগে নিজেদের অতীতের ভুল অনুধাবন ও স্বীকার করে আত্মসমালোচনা ও আত্মশুদ্ধির দৃশ্যমান প্রচেষ্টা চালাতে হবে। নিজেদের ভুল অনুধাবন না করলে, সেজন্য অনুশোচনা না হলে কেবল রূপরেখা ঘোষণা করে রাষ্ট্র- রূপান্তর করা যায় না।

লেখক: অধ্যাপক, আইন বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

ই-মেইল: [email protected]

 
 
/এপিএইচ/এমওএস/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
বিশ্ব শিশু দিবস ও জাতীয় কন্যাশিশু দিবসের কর্মসূচিতে যা থাকছে
বিশ্ব শিশু দিবস ও জাতীয় কন্যাশিশু দিবসের কর্মসূচিতে যা থাকছে
দেশের স্বাস্থ্যসেবা বিশ্বমানে উন্নীতে কাজ চলছে: স্বাস্থ্যমন্ত্রী
দেশের স্বাস্থ্যসেবা বিশ্বমানে উন্নীতে কাজ চলছে: স্বাস্থ্যমন্ত্রী
আসিফ-লগ্নজিতার প্রেমে পড়ার গল্প (ভিডিও)
আসিফ-লগ্নজিতার প্রেমে পড়ার গল্প (ভিডিও)
বৈষম্য ঘোচাতে চাকরি জাতীয়করণের দাবি এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের
বৈষম্য ঘোচাতে চাকরি জাতীয়করণের দাবি এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের
সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ