X
বুধবার, ৩০ নভেম্বর ২০২২
১৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৯

শুধু আচার্য নন, গোটা জাতি লজ্জিত

প্রভাষ আমিন
২৪ নভেম্বর ২০২২, ১৯:২৫আপডেট : ২৪ নভেম্বর ২০২২, ১৯:২৫

কয়েক দিন আগে এক বড় ব্যবসায়ীর ছেলের সঙ্গে দেখা। তিনি নিজেও এখন বাবার সঙ্গে ব্যবসায় নেমেছেন। হাত মিলিয়ে নাম বলতেই তিনি আঁতকে উঠলেন। আমি একটু অবাক হলাম। তিনি হাসতে হাসতে বললেন, আমি তো তবু আপনার নাম শুনে দাঁড়িয়ে আছি। আমার ছোট ভাই হলে পড়েই যেতো। পরে হাসতে হাসতে বললেন, প্রভাষ নামে তাদের একজন হাউজ টিউটর ছিলেন। সেই শিক্ষকের কড়া শাসন এখনও তাদের আতঙ্কিত করে। তবে মজা করলেও সেই শিক্ষকের নাম স্মরণ করলেন গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে। এও বললেন, প্রভাষ স্যার ছিলেন বলেই, তার কড়া শাসন ছিল বলেই আমরা পড়ালেখা শিখে মানুষ হয়েছি। নইলে বড়লোকের বখে যাওয়া সন্তানই হতাম। এত বড় ব্যবসায়ীর ছেলেদেরও বাসায় কড়া শাসনে মানুষ হতে হয় জেনে একটু অবাক হলেও ভালোও লাগলো। মনে পড়ে গেলো কাজী কাদের নেওয়াজের লেখা শিক্ষাগুরুর মর্যাদা কবিতার কথা। এক মৌলভি বাদশাহ আলমগীরের সন্তানকে পড়াতেন। একদিন বাদশাহ দেখেন, তার ছেলে পানি ঢালছে আর শিক্ষক নিজের পা পরিষ্কার করছেন। শিক্ষক ভাবলেন, বাদশাহর ছেলেকে দিয়ে পানি ঢালিয়েছেন, আজ বুঝি তার নিস্তার নেই। পরদিন বাদশাহ সেই শিক্ষককে ডেকে পাঠালেন এবং বললেন, তার ছেলে শুধু পানি ঢালছে, শিক্ষকের পা পরিষ্কার করে দিচ্ছে না, এই দৃশ্য দেখে তিনি কষ্ট পেয়েছেন। বিস্মিত মৌলভি বলেছিলেন, ‘আজ হতে চির উন্নত হল শিক্ষাগুরুর শির, সত্যই তুমি মহান উদার বাদশাহ্ আলমগীর।'

এখন তেমন বাদশাহও নেই, তেমন শিক্ষকও নেই। নেই শিক্ষকদের মর্যাদাও। তবে এখনও ছেলেবেলার শিক্ষকদের কথা মনে হলে আমরা ভয় যেমন পাই, শ্রদ্ধায়ও মাথা নুয়ে আসে। কলেজে ওঠার পর শিক্ষকদের প্রতি ভয়টা কমলেও শ্রদ্ধাটা কমেনি। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে শিক্ষকদের অনেকে বন্ধুসুলভ ছিলেন। তবে তাদের প্রজ্ঞা আর সততার কাছে নত থাকতাম আমরা। তবে এখন পরিস্থিতি পাল্টে গেছে। ছাত্র-শিক্ষকের সেই শ্রদ্ধা ভালোবাসার সম্পর্ক আর নেই। ছাত্ররা যেমন আগের চেয়ে অনেক বেশি দুর্বিনীত হয়েছেন, শিক্ষকদের মধ্যেও দৃঢ়তার ঘাটতি প্রবল। সেই ঘাটতিটাই চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিলেন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর আচার্য এবং রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ।

সংসদীয় ব্যবস্থায় রাষ্ট্রপতির মাজার জিয়ারত আর ফিতা কাটা ছাড়া তেমন কিছু করার থাকে না। রাষ্ট্রপতির কোনও নির্বাহী ক্ষমতা নেই। সংসদে তিনি মন্ত্রিসভা অনুমোদিত ভাষণ পাঠ করেন। তবে বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্য হওয়ার সুবাদে রাষ্ট্রপতি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সমাবর্তনে যান এবং ভাষণ দেন। বর্তমান রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদের সমাবর্তন ভাষণগুলোতে হাসির খোরাক যেমন থাকে, থাকে ভাবনার খোরাকও। সুযোগ পেলেই তিনি সমাজের নানা অসঙ্গতি নিয়ে কথা বলেন।

গত ১৯ নভেম্বর (শনিবার) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫৩তম সমাবর্তনে যোগ দিয়েও স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে বিশ্ববিদ্যালয় কিছু শিক্ষক এবং উপাচার্যের তীব্র সমালোচনা করেছেন তিনি। রাষ্ট্রপতি ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর আচার্য মো. আবদুল হামিদ একদম কোটি মানুষের মনের কথাই বলেছেন, ‘সম্মানিত উপাচার্য ও শিক্ষকমণ্ডলী, আপনারা সমাজের সাধারণ মানুষের কাছে নেতৃস্থানীয় ও সম্মানিত ব্যক্তিত্ব। আমরা যখন ছাত্র ছিলাম এবং এর অনেক পরেও বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ও শিক্ষকদের দেখলে বা তাদের কথা শুনলেই শ্রদ্ধায় মাথা নত হয়ে আসতো। কিন্তু ইদানীং কিছু উপাচার্য ও শিক্ষকের কর্মকাণ্ডে সমাজে শিক্ষকদের সম্মানের জায়গাটা ক্রমেই সংকুচিত হয়ে আসছে।’ বিশ্ববিদ্যালয়ের সবচেয়ে মেধাবী শিক্ষার্থীরাই পরে শিক্ষক হওয়ার সুযোগ পান। আর উপাচার্যরা হলেন সেই শিক্ষকদেরও ওপরে, মানে সবার ওপরে। উপাচার্য শব্দটার সঙ্গে মিশে থাকে শ্রদ্ধা, সম্মান আর ভালোবাসা। কিন্তু সম্প্রতি বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যরা নিজেদের আচরণ দিয়ে শ্রদ্ধা, সম্মান আর ভালোবাসার আসনটি ভূলুণ্ঠিত করেছেন। রাষ্ট্রপতি তাঁর বক্তব্যে বলেছেন, ‘একজন উপাচার্যের মূল দায়িত্ব বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ও অ্যাকাডেমিক কার্যক্রমের তত্ত্বাবধান, পরিচালনা, মূল্যায়ন ও উন্নয়নকে ঘিরে। কিন্তু ইদানীং পত্রিকা খুললে মনে হয়, পরিবার-পরিজন ও অনুগতদের চাকরি দেওয়া এবং বিভিন্ন উপায়ে প্রশাসনিক ও আর্থিক সুযোগ-সুবিধা নেওয়াই যেন কিছু উপাচার্যের মূল দায়িত্ব।’ রাষ্ট্রপতি একদম ঠিক বলেছেন। প্রায়ই পত্রিকায় উপাচার্যদের এ ধরনের কাজের খবর পাই। ‘উপাচার্য’ লিখে গুগলে সার্চ দিলেও সম্মানজনক কোনও খবর আসে না। যা আসে, তা পড়লে লজ্জায় মাথা হেঁট হয়ে যায়। আমাদের উপাচার্যদের অনেকে সম্মানজনক এই পদটিকে আখের গোছানোর সিঁড়ি হিসেবে ব্যবহার করেন। উপাচার্যদের অনিয়মের বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীরা প্রায়ই আন্দোলন করেন, ঘেরাও করেন। উপাচার্যদের উদ্ধার করতে পুলিশ লাগে। কোনও কোনও উপাচার্য পেছনের দরজা দিয়ে পালিয়ে বাঁচেন। রংপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য তো ঢাকায় থেকে বিশ্ববিদ্যালয় চালানোর রেকর্ড করেছেন। উপাচার্যদের এই অধঃপতনের মূল কারণ তাদের নিয়োগ প্রক্রিয়া। যোগ্যতা, দক্ষতা, সততা নয়; কোনও পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার একমাত্র যোগ্যতা রাজনৈতিক আনুগত্য।

সমাবর্তনে রাষ্ট্রপতি আরও বলেছেন, ‘অনেক শিক্ষকও বিশ্ববিদ্যালয়ের চাকরিটাকে ঐচ্ছিক মনে করেন। বৈকালিক কোর্স বা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস নেওয়াকেই তাঁরা অগ্রাধিকার দিয়ে থাকেন। ছাত্র-শিক্ষক ও বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশের সঙ্গে এটি খুবই বেমানান।’ বিদ্যালয়, মহাবিদ্যালয়, বিশ্ববিদ্যালয়- সবগুলোই বিদ্যাশিক্ষার জন্য। তবে বিশ্ববিদ্যালয় শুধু সার্টিফিকেট দেওয়ার জন্য নয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল কাজ গবেষণা। কিন্তু প্রাচ্যের অক্সফোর্ড ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের খ্যাতি যতটা না রাজনৈতিক কারণে, গবেষণার কারণে ততটা নয়। সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ‘গবেষণা ও প্রকাশনা মেলা’ অনুষ্ঠিত হয়েছে। সে মেলায় বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক ড. আবুল হুসাইনের একটি গবেষণা নিয়ে তুমুল সমালোচনা হয়।

রসায়নের ওই শিক্ষক মানবদেহ নিয়ে একটি গবেষণা পরিচালনা করেছেন। তিনি গবেষণায় দেখিয়েছেন মানুষের দেহের বিভিন্ন অঙ্গের সঙ্গে আরবি হরফে লেখার মিল রয়েছে। মানুষের অঙ্গের সঙ্গে তিনি আরবিতে আল্লাহ লেখার সাদৃশ্যও দেখিয়েছেন। রাষ্ট্রপতি তার সমাবর্তনের ভাষণে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণার মান নিয়েও তীব্র হতাশা ব্যক্ত করেছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণার বিভিন্ন বিষয় নিয়ে প্রকাশিত সংবাদের কথা উল্লেখ করে রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘তা দেখলে বা শুনলে অনেক সময় আচার্য হিসেবে আমাকেও লজ্জায় পড়তে হয়।’

বাংলাদেশের বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু শিক্ষক ও উপাচার্যের আচরণ শুধু আচার্যকে নয়, গোটা জাতিকেই লজ্জিত করে।

লেখক: হেড অব নিউজ, এটিএন নিউজ

 
 
/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
শুরু হচ্ছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় নাট্যোৎসব
শুরু হচ্ছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় নাট্যোৎসব
চীনের সাবেক প্রেসিডেন্ট জিয়াং জেমিন মারা গেছেন
চীনের সাবেক প্রেসিডেন্ট জিয়াং জেমিন মারা গেছেন
সরকারের শর্ত দেওয়ার দিন শেষ, এখন শর্ত দেবে বিএনপি: গয়েশ্বর
সরকারের শর্ত দেওয়ার দিন শেষ, এখন শর্ত দেবে বিএনপি: গয়েশ্বর
সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ