X
রবিবার, ২১ এপ্রিল ২০২৪
৮ বৈশাখ ১৪৩১

সব সম্ভবের দল জাতীয় পার্টি!

আমীন আল রশীদ
২৯ জানুয়ারি ২০২৪, ১৮:০৫আপডেট : ২৯ জানুয়ারি ২০২৪, ১৮:০৬

জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জি এম কাদেরকে যেদিন দ্বাদশ সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা এবং দলের সিনিয়র নেতা আনিসুল ইসলাম মাহমুদকে উপনেতা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে সংসদ সচিবালয়ের প্রজ্ঞাপন জারি হলো, সেদিনই দলের প্রধান পৃষ্ঠপোষক রওশন এরশাদ সংবাদ সম্মেলনে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান পদ থেকে জি এম কাদের এবং মহাসচিব মুজিবুল হক চুন্নুকে বহিষ্কারের ঘোষণা দেন।

জাতীয় পার্টির ওয়েবসাইটে প্রকাশিত দলের গঠনতন্ত্রে ২৯৯ সদস্যের যে কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির কথা বলা আছে, সেখানে চেয়ারম্যান, প্রেসিডিয়াম সদস্য, মহাসচিব, ভাইস চেয়ারম্যান, যুগ্ম মহাসচিব, সাংগঠনিক সম্পাদক, বিভাগীয় সম্পাদকসহ অন্যান্য পদের উল্লেখ থাকলেও ‘প্রধান পৃষ্ঠপোষক’ বলে কোনও পদ নেই। তার মানে রওশন এরশাদ জাতীয় পার্টির গঠনতন্ত্র অনুযায়ী কোনও বৈধ পদেই নেই। অথচ তিনি দলের চেয়ার‌ম্যান ও মহাসচিবকে বহিষ্কার করে নিজেকে চেয়ারম্যান ঘোষণা করলেন!

জাতীয় পার্টির গঠনতন্ত্রে দলের চেয়ারম্যানকে সর্বপ্রধান কর্মকর্তা, পার্টির ঐক্য, সংহতি ও মর্যাদার প্রতীক হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। গঠনতন্ত্রের অন্য ধারায় যা কিছুই উল্লেখ থাকুক না কেন, জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান বিশেষ ক্ষমতাপ্রাপ্ত থাকবেন বলেও গঠনতন্ত্রে উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ এই ক্ষমতাবলে তিনি প্রয়োজনবোধে প্রতিটি স্তরের কমিটি গঠন, পুনর্গঠন, বাতিল, বিলোপ করতে পারবেন। তিনি যেকোনও পদ সৃষ্টি বা অবলুপ্ত করতে পারবেন। এরকম ক্ষমতাসম্পন্ন একজন ব্যক্তিকে দলের প্রধান পৃষ্ঠপোষক কী করে বহিষ্কার করেন?

গঠনতন্ত্রের ৩৭ ধারায় বলা আছে– ‘কোনো কারণে দেলের চেয়ারম্যানের অপসারণের প্রয়োজন দেখা দিলে প্রেসিডিয়াম জাতীয় কাউন্সিলের বিশেষ অধিবেশন আহ্বান করবে। উক্ত জাতীয় কাউন্সিলের বিশেষ অধিবেশনের একমাত্র বিষয়বস্তু হবে চেয়ারম্যানের অপসারণ সম্পর্কিত দাবি এবং চেয়ারম্যান অপসারণ সম্পর্কিত দাবিতে অপসারণের ব্যাখ্যা সংবলিত কারণ সুস্পষ্টভাবে বর্ণিত থাকবে। জাতীয় কাউন্সিলের মোট সদস্য সংখ্যার দুই-তৃতীয়াংশের ভোট যদি দাবির পক্ষে হয়, তাহলে চেয়ারম্যান অপসারিত হবেন।’ কিন্তু রওশন এরশাদ যে পদে (প্রধান পৃষ্ঠপোষক) আছেন, সেই পদে থেকে তিনি দলের কাউন্সিলের বিশেষ অধিবেশন আহ্বান করতে পারেন না। তিনি অধিবেশন আহ্বানও করেননি। বরং সংবাদ সম্মেলনে তিনি ঘোষণা দিলেন দলের চেয়ারম্যান ও মহাসচিব বহিষ্কার। এটি জাতীয় পার্টির গঠনতন্ত্রই অনুমোদন করে না। রওশন এরশাদের বরং উচিত ছিল তাকে যখন দলের প্রধান পৃষ্ঠপোষক করা হয়, তখন দলের গঠনতন্ত্র সংশোধন করে এই পদটি সংযুক্ত করা এবং প্রধান পৃষ্ঠপোষকের এখতিয়ার ও ক্ষমতা কী হবে—সেটি সুস্পষ্টভাবে গঠনতন্ত্রে অন্তর্ভুক্ত করতে ব্যবস্থা গ্রহণ করা। তিনি সেটি করেননি অথবা প্রধান পৃষ্ঠপোষক পদটি যে জাতীয় পার্টির বর্তমান গঠনতন্ত্র অনুযায়ী বৈধ কোনও পদই নয়, সেটি বোধহয় তিনি নিজেও জানেন না! সম্ভবত, এটি সব সম্ভবের দল জাতীয় পার্টিতেই সম্ভব!

তবে প্রধান পৃষ্ঠপোষক দলের চেয়ারম্যানকে বহিষ্কার করে নিজেকে চেয়ারম্যান ঘোষণা করতে পারেন কিনা—সেটি নিয়ে যতই প্রশ্ন থাকুক, সাম্প্রতিক বছরগুলোয় জাতীয় পার্টির কর্মকাণ্ড দেখে রাজনীতি সচেতন মানুষের মনে এই ধারণা বদ্ধমূল হয়েছে যে জাতীয় পার্টিতে এমন অনেক কিছুই হতে পারে, ‘যা কেউ ভাবেনি আগে’! যেমন, ২০১৪ সালের নির্বাচনের পরে দশম সংসদে তারা একইসঙ্গে সরকারে ও বিরোধী দলে ছিল। পৃথিবীর কোনও সংসদীয় গণতন্ত্রের দেশে এর আগে এমন অদ্ভুত ও উদ্ভট ঘটনা ঘটেছে কিনা সন্দেহ। তাদের এই কর্মকাণ্ডের কারণে রাজনীতিতে ‘সরকারি বিরোধী দল’ শব্দগুচ্ছ জনপরিসরে তুমুল আলোচিত হয়। এসব কারণে অনেকে রসিকতা করে জাতীয় পার্টিকে ‘জাতীয় সার্কাস পার্টি’ বলেও অভিহিত করেন—যে সার্কাসের জন্ম দিতেন দলের স্বয়ং প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ।

তার মৃত্যুর পরে দলীয় প্রধানের পদ নিয়ে তার স্ত্রী রওশন এরশাদ এবং ছোট ভাই জি এম কাদেরের মধ্যে যে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব তৈরি হয়, সেটি রাজনীতির টেবিলে ‘দেবর-ভাবির টানাপড়েন’ বলে অভিহিত হয়। যে টানাপড়েনের মধ্য দিয়ে গত ৭ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে পারেননি রওশন এবং তার ছেলে সাদ। এমনকি দলের প্রভাবশালী নেতা মশিউর রহমান রাঙ্গাও ছিটকে পড়েন। স্বতন্ত্র নির্বাচন করে তিনি অবশ্য হেরে যান। ভোটের ফলাফলে দেখা গেলো, ২০১৮ সালে অনুষ্ঠিত একাদশ জাতীয় সংসদে তারা যে আসন পেয়েছিল, এবার পেয়েছে তার অর্ধেক। মাত্র ১১টি আসন নিয়ে সংসদে তারা বিরোধী দল হতে পারবে কিনা এবং দলের চেয়ারম্যান বিরোধীদলীয় নেতার স্বীকৃতি পাবেন কিনা—তা নিয়েও সংশয় তৈরি হয়। যদিও শেষমেশ স্পিকার তাকে বিরোধীদলীয় নেতার স্বীকৃতি দিয়েছেন। কিন্তু দেবর-ভাবির টানাপড়েনের অবসান হয়নি; বরং বেড়েছে—যার প্রমাণ জি এম কাদেরকে সংসদের বিরোধীদলীয় নেতার স্বীকৃতি দেওয়ার দিনেই রওশন এরশাদের এই সংবাদ সম্মেলন।

প্রশ্ন হলো জাতীয় পার্টির ভবিষ্যৎ কী?

এরশাদের জীবদ্দশাতেই জাতীয় পার্টি চার ভাগে ভাগ হয়েছে। মূল দলের বাইরেও রয়েছে জাতীয় পার্টির সাবেক নেতা ও মন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জুর নেতৃত্বে জাতীয় পার্টি–জেপি (প্রতীক বাইসাইকেল, নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধন নম্বর ২); নাজিউর রহমান মঞ্জুরের নেতৃত্বে গঠিত বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি-বিজেপি (প্রতীক গরুর গাড়ি, নিবন্ধন নং ১৮)। বর্তমান সভাপতি তার ছেলে আন্দালিব রহমান পার্থ এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও জাতীয় পার্টি নেতা কাজী জাফর আহমদের নেতৃত্বে বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি (প্রতীক কাঁঠাল, নিবন্ধন নং ২৮), যার বর্তমান ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ডা. এম এ মুকিত।

২০১৯ সালের জুলাইয়ে জাতীয় পার্টির নেতা হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের মৃত্যুর পরে ওই বছরের ৫ সেপ্টেম্বর তার স্ত্রী রওশন এরশাদ এবং ছোট ভাই জি এম কাদের দুজনই নিজেদের দলের চেয়ারম্যান বলে ঘোষণা দেন। এরশাদের মৃত্যুর পর থেকে দলটির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করছিলেন জি এম কাদের। উপরন্তু এই সময়ে তারা দুজনই সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা হতে চেয়ে স্পিকারের কাছে চিঠি দিয়েছিলেন। তখন রওশন ও কাদেরের মধ্যে একটা সমঝোতা হয় যে রওশন হবেন বিরোধীদলীয় নেতা আর জি এম কাদের হবেন বিরোধীদলীয় উপনেতা ও দলের চেয়ারম্যান। ওই বছরের ২৭ ডিসেম্বর দলীয় কাউন্সিলে ৩ বছরের জন্য দলের চেয়ারম্যান হন জি এম কাদের। কিন্তু সংকট তাতেও কাটেনি।

মাঝখানে এরশাদের সাবেক স্ত্রী বিদিশাও রাজনীতিতে সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। তখন অনেকেরই ধারণা হয়েছিল যে জাতীয় পার্টি হয়তো পঞ্চম খণ্ডে ভাগ হতে যাচ্ছে। কেননা, বিদিশা সংবাদ সম্মেলনে বলেছিলেন, জাতীয় পার্টিতে চমক আসছে এবং তিনিও নিজেকে পার্টির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ঘোষণা দিয়ে একটি কমিটি গঠন করে আলোচনায় এসেছিলেন। যদিও সেই কমিটি হালে পানি পায়নি। অর্থাৎ তিনি যে চমকের কথা বলেছিলেন, সেই চমক দেখানোর মতো রসদ হয়তো জোগাড় করতে পারেননি।

তবে জাতীয় পার্টির সবশেষ চমক অথবা ট্র্যাজেডি হলো বিএনপিবিহীন নির্বাচনেও মাত্র ১১টি আসনে জয়। আওয়ামী লীগ তাদের সমঝোতার মাধ্যমে ২৬টি আসন ছেড়ে দিলেও শেষরক্ষা হয়নি। কেননা, এই ২৬টির মধ্যে সব আসন আনচ্যালেঞ্জড ছিল না। কেননা, সেখানে জাতীয় পার্টির প্রার্থীদের সরাসরি নৌকা না হলেও আওয়ামী লীগেরই স্বতন্ত্র প্রার্থীদের সঙ্গে লড়াই করতে হয়েছে। ফলে নির্বাচনের ফলাফলে এমন বিপর্যয়কে জাতীয় পার্টির সঙ্গে আওয়ামী লীগের ‘বিশ্বাসঘাতকতা’ বলে অভিহিত করেছেন জি এম কাদের। বলেছেন, তাদের ‘কোরবানি দেওয়া হয়েছে।’

তবে যে প্রশ্নটি এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই তা হলো, জাতীয় পার্টির এই পরিণতি কি অবধারিতই ছিল? কেননা, ১৯৮৬ সালে গঠিত হওয়ার পর থেকে ধারাবাহিকভাবে জাতীয় পার্টি যে একক দল হিসেবে দুর্বল থেকে দুর্বলতর হয়েছে, সেটি স্পষ্ট; যার পেছনে তাদের অনেক বেশি সরকার-ঘনিষ্ঠতা এবং দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দলই প্রধানত দায়ী বলে মনে করা হয়।

তাছাড়া নবম সংসদ থেকে আওয়ামী লীগের সঙ্গে জাতীয় পার্টির যে ‘দহরম মহরম’ সেখানে কিছুটা ছন্দপতন হয় ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পরে। এই সংসদে জাতীয় পার্টি সরকারের অংশ হয়নি। তারা বিরোধী দলের ভূমিকায় থাকে। এমনকি সরকারের সঙ্গে তাদের দূরত্ব বাড়তে থাকে এরশাদের মৃত্যুর পরে জাতীয় পার্টির নেতৃত্ব জি এম কাদেরের হাতে যাওয়ার পর থেকে। কেননা, জি এম কাদের বিভিন্ন ইস্যুতে সরকারের সমালোচনা করেছেন। এই সরকারের অধীনে অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন সম্ভব নয় বলেও তিনি মন্তব্য করেন। এমনকি এবারের নির্বাচনে জাতীয় পার্টি অংশ নেবেন কিনা—তা নিয়েও কিছুটা ধোঁয়াশা তৈরি হয়।

অর্থাৎ দশম সংসদে জাতীয় পার্টি যে ধরনের বিরোধী দলের আচরণ করেছে, সেখান থেকে তারা সরে আসতে চায় এবং জি এম কাদেরের অনেক বক্তব্য সরাসরি সরকারকে চ্যালেঞ্জ করে। ক্ষমতাসীনরা হয়তো বিষয়টি ভালো চোখে দেখেনি। যে কারণে এবার জাতীয় পার্টিকে ২৬টি আসন ছেড়ে দেওয়া হলেও এখানে জয়ের শতভাগ নিশ্চয়তা ছিল না। জাতীয় পার্টি যেটিকে ‘বিশ্বাসঘাতকতা’ বলে অভিহিত করছে।

অবশ্য গত তিন মেয়াদে জাতীয় পার্টি আওয়ামী লীগের সঙ্গেই ছিল। এককভাবে তারা শক্তিশালী হওয়ার চেষ্টাও করেনি। যে কারণে আওয়ামী লীগ ছাড় না দিলে তারা কোনও আসনে জিততে পারে না। আওয়ামী লীগ ও বিএনপির বাইরে গিয়ে জাতীয় পার্টির এককভাবে একটি শক্তিশালী দল হয়ে ওঠার যে সম্ভাবনা ছিল, সেই পথে তারা হাঁটেনি। তারা বরং একইসঙ্গে সরকারে এবং বিরোধী দলে থেকে ‘গাছের উপরেরটা এবং তলারটা কুড়াতে’ চেয়েছে। এভাবে ক্ষমতার বলয়ের ভেতরে তথা ক্ষমতাসীন দলের নিয়ন্ত্রণে থেকে কোনও দল শক্তিশালী হতে পারে না। সুতরাং প্রশ্ন হলো, দ্বাদশ সংসদের যাত্রা শুরুর আগেই এই সংসদের প্রধান বিরোধী দল জাতীয় পার্টির ভেতরে যে কোন্দল আরও বেশি প্রকাশ্য হলো, সেটি কি ‘মর্নিং শোজ দ্য ডে’, নাকি ‘শেষ ভালো’র জন্য অপেক্ষা করাই শ্রেয়?

লেখক: কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স এডিটর, নেক্সাস টেলিভিশন।

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
ঢাকা আসছেন কাতারের আমির, সই হবে ১১টি দলিল
ঢাকা আসছেন কাতারের আমির, সই হবে ১১টি দলিল
বেতনের দাবিতে ঢাকা-মুন্সীগঞ্জ সড়ক অবরোধ, শ্রমিক-পুলিশ সংঘর্ষ
বেতনের দাবিতে ঢাকা-মুন্সীগঞ্জ সড়ক অবরোধ, শ্রমিক-পুলিশ সংঘর্ষ
ঘর প্রাকৃতিকভাবে শীতল রাখার ১২ উপায়
ঘর প্রাকৃতিকভাবে শীতল রাখার ১২ উপায়
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ব্যাটারি কমপ্লেক্সের উদ্বোধন করলেন প্রধানমন্ত্রী
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ব্যাটারি কমপ্লেক্সের উদ্বোধন করলেন প্রধানমন্ত্রী
সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ