বাংলাদেশের অর্থনীতিকে যদি একটি চলমান রথের সঙ্গে তুলনা করা হয়, তবে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এসএমই) খাত সেই রথের অদৃশ্য কিন্তু অপরিহার্য চালিকা শক্তি। বাংলাদেশের অর্থনীতি আজ একইসাথে জটিল ও গতিশীল সময় অতিক্রম করছে। একদিকে অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধির স্বপ্ন, টেকসই উন্নয়নের স্বপ্ন, অন্যদিকে বৈশ্বিক অস্থিরতা, মুদ্রাস্ফীতি, রফতানি সংকট সবকিছু মিলিয়ে নতুন নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি হচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে অর্থনীতিকে প্রাণবন্ত রাখার সবচেয়ে কার্যকর খাত হচ্ছে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ও এসএমই খাত।
ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা বলতে বোঝায় এমন উদ্যোক্তা বা ব্যবসায়ী, যিনি সীমিত মূলধন ও স্বল্প কর্মী নিয়ে ব্যবসা শুরু করেন এবং স্থানীয় চাহিদার ভিত্তিতে পণ্য বা সেবা উৎপাদন করেন।
এসএমই খাত মূলত ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পকে বোঝায়, যেখানে ব্যবসার পরিধি তুলনামূলক বড় হলেও সেটি এখনও স্থানীয় বা আঞ্চলিক পর্যায়ে সীমাবদ্ধ থাকে। বাংলাদেশ ব্যাংক ও শিল্প মন্ত্রণালয়ের সংজ্ঞা অনুযায়ী, ক্ষুদ্র শিল্পে সাধারণত ১৬-৫০ জন কর্মী থাকে। মাঝারি শিল্পে কর্মীর সংখ্যা ৫১-৩০০ পর্যন্ত হতে পারে। এই খাতগুলো মূলত টেক্সটাইল, চামড়া, হস্তশিল্প, খাদ্যপ্রক্রিয়াজাতকরণ, প্লাস্টিকস, ফার্নিচার, আইটি সেবা ইত্যাদি প্রভৃতি ক্ষেত্রে বিস্তৃত।
বাংলাদেশে কর্মসংস্থানের সবচেয়ে বড় উৎসই এই খাত। বাংলাদেশের প্রায় ৮০ শতাংশ শ্রমশক্তি সরাসরি বা পরোক্ষভাবে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ও এসএমই খাতের সঙ্গে যুক্ত। বিশেষত গ্রামীণ নারীরা সেলাই, হস্তশিল্প, খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ, পোলট্রি কিংবা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ের মাধ্যমে কর্মসংস্থান পাচ্ছেন। এই খাত নগরমুখী চাপ কমাচ্ছে। স্থানীয়ভাবে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করে, দারিদ্র্য হ্রাসে কার্যকর ভূমিকা রাখছে। নারী উদ্যোক্তা উন্নয়নে এসএমই খাত সবচেয়ে কার্যকর ক্ষেত্র। ক্ষুদ্র ঋণ বা স্বল্প মূলধন দিয়ে নারীরা ছোট ব্যবসা শুরু করছেন, যা পরিবার ও সমাজে তাদের অর্থনৈতিক অবস্থানকে দৃঢ় করছে।
বাংলাদেশে মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) এসএমই খাতের অবদান প্রায় ২৫ শতাংশ থেকে ৩০ শতাংশ। শুধু তাই নয়, দেশের রফতানি আয়ের বড় অংশও এই খাত থেকে আসে। বৃহৎ শিল্প প্রায়ই শহরকেন্দ্রিক হয়। কিন্তু ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প গ্রামের ভেতরেই বাজার তৈরি করে। এতে স্থানীয় কাঁচামাল ব্যবহার হয়, ফলে কৃষি ও শিল্পের মধ্যে একটি সহাবস্থান তৈরি হয়।
প্রতি বছর শ্রমবাজারে প্রায় ২০ লাখ নতুন মানুষ প্রবেশ করে। বৃহৎ শিল্প এত মানুষের জন্য কর্মসংস্থান তৈরি করতে পারে না। এখানে এসএমই খাতই হয়ে ওঠে প্রধান ভরসা। বিশেষ করে গ্রামীণ অর্থনীতির উন্নয়নে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারাই নেতৃত্ব দিচ্ছেন। গ্রামের ব্যবসা ও উদ্যোগ গ্রামীণ আয় বাড়িয়ে দারিদ্র্য হ্রাসে ভূমিকা রাখছে।
এছাড়া বর্তমান সময়ে শহুরে নারীর অনলাইন ব্যবসা আজ তাদের আর্থিক স্বাধীনতার হাতিয়ার হয়ে উঠেছে। তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রায় ৮০ লাখ ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা রয়েছে। এর মধ্যে অনেকেই এখনও নিবন্ধিত নয়, ফলে প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি। নতুন উদ্যোক্তা তৈরির ক্ষেত্রেও এসএমই অগ্রগণ্য, বিশেষ করে তরুণ ও নারীদের ক্ষেত্রে অধিক প্রযোজ্য। অর্থনীতির কাঠামোয় এটি কেবল একটি খাত নয়, বরং জীবনরেখা।
তবে এসএমই খাত বেশ কিছু সংকটে ভুগছে। ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের অনেক সময় ঋণ পেতে বেশ কাঠখোর পোহাতে হয়। কাগজপত্রের জটিলতাও তাদের নিরুৎসাহিত করে। অনেক উদ্যোক্তার ব্যবসায়িক পরিকল্পনা, আর্থিক ব্যবস্থাপনা কিংবা বিপণন কৌশল সম্পর্কে ধারণা কম থাকে। ফলে ব্যবসা দীর্ঘস্থায়ী কিংবা বিস্তৃত হয় না। বড় ব্যবসায়ীদের দাপটে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা টিকে থাকতে হিমশিম খান। আন্তর্জাতিক বাজারেও প্রবেশ করতে পারেন না। ডিজিটাল অর্থনীতিতে খাপ খাওয়ানোর মতো অবকাঠামো ও দক্ষতা অনেক উদ্যোক্তার নেই। উপরন্তু, বাস্তবায়নের অভাব তাদের পথকে আরও কঠিন করে তোলে।
এসব চ্যালেঞ্জ অতিক্রম করা সম্ভব যদি সঠিক কৌশল নেওয়া যায়। প্রথমত, সহজ ঋণপ্রাপ্তি নিশ্চিত করতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে সেই উদ্যোগ ইতোমধ্যে নেওয়া হয়েছে, যা অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক। দ্বিতীয়ত, উদ্যোক্তা উন্নয়নের জন্য প্রশিক্ষণ বাড়াতে হবে। সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে ব্যবসা পরিচালনা, বিপণন, আর্থিক ব্যবস্থাপনা ও ডিজিটাল দক্ষতার ওপর বিশেষ প্রশিক্ষণ জরুরি। তৃতীয়ত, বাজার সম্প্রসারণের দিকে নজর দিতে হবে। স্থানীয় বাজার ছাড়াও আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের সুযোগ তৈরি করতে ট্রেড ফেয়ার, প্রদর্শনী এবং অনলাইন প্ল্যাটফর্ম কাজে লাগাতে হবে। ডিজিটাল অর্থনীতির যুগে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের ই-কমার্স ও ফিনটেকের সাথে যুক্ত করতে হবে। এতে ব্যবসা সহজ হবে, গ্রাহকের কাছে পৌঁছানোর হার বৃদ্ধি পাবে। করছাড়, ভর্তুকি ও নীতিগত সহায়তা বাড়ানো প্রয়োজন। নারী উদ্যোক্তাদের জন্য বিশেষ সহায়তা প্যাকেজও থাকা দরকার, কারণ সঠিক সহায়তা পেলে নারীরাই হবে আগামী দিনের সবচেয়ে শক্তিশালী ব্যবসায়ী শ্রেণি।
সরকার এসএমই খাতকে গুরুত্ব দিয়ে নানা কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের এসএমই ও স্পেশাল প্রোগ্রাম ডিপার্টমেন্ট, যা ক্ষুদ্র, মাঝারি উদ্যোক্তা এবং নারী উদ্যোক্তাদের জন্য বিভিন্ন নীতি ও সহায়ক কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে। এর মধ্যে রয়েছে নানারকম কার্যক্রম যেমন— ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এসএমই) খাতের জন্য নীতি, কৌশল ও গাইডলাইন তৈরি করা। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে উদ্যোক্তাদের জন্য সহজ ঋণপ্রদান প্রক্রিয়ায় নির্দেশনা দেওয়া।
এসএমই উদ্যোক্তাদের জন্য কম সুদে পুনঃঅর্থায়ন স্কিম চালু করা। নারী উদ্যোক্তাদের জন্য বিশেষ ঋণ তহবিল বরাদ্দ করা। কোভিড-১৯ এর সময় ও পরবর্তীতে এসএমই খাতের জন্য বিশেষ প্রণোদনা প্যাকেজ বাস্তবায়ন করেছে। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা যাতে সহজে প্রণোদনার অর্থ পায় তা নিশ্চিত করার জন্য বিশেষ নির্দেশনা জারি করেছে। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান কতটা এসএমই খাতে ঋণ দিচ্ছে তা মনিটর করা।
বাংলাদেশের উন্নয়নের গল্পে তৈরি পোশাক শিল্প ও রেমিট্যান্সকে সবচেয়ে বেশি আলোচিত করা হয়। কিন্তু নীরবে, প্রায় অদৃশ্য শক্তি হিসেবে এসএমই খাত আমাদের অর্থনীতির চাকাকে বেগবান রাখতে সাহায্য করে চলেছে। ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা মানেই ক্ষুদ্র শক্তি নয়, বরং তারা হলো বৃহৎ অর্থনীতির সবচেয়ে শক্ত ভিত্তি। তাই সরকার, কেন্দ্রীয় ব্যাংক, তফসিলি ও অতফশিলি ব্যাংক, উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা ও সমাজ, সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এই খাতকে আরও শক্তিশালী করতে হবে। তাহলেই কর্মসংস্থানের নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে, অর্থনীতি পাবে প্রাণশক্তি, আর বাংলাদেশ সত্যিকার অর্থে অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের পথে এগিয়ে যাবে।
লেখক: অর্থনৈতিক বিশ্লেষক ও যুগ্ম পরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক



