ভর্তি পরীক্ষা পুনঃপ্রবর্তন: বাস্তবতা, বৈষম্য ও সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা

ড. খালিদুর রহমান
১৭ মার্চ ২০২৬, ১৭:৩০আপডেট : ১৭ মার্চ ২০২৬, ১৭:৩০

সংসদে প্রশ্ন উত্থাপন, শিক্ষামন্ত্রীর প্রদত্ত উত্তর এবং সাংবাদিক সম্মেলনে তার বক্তব্যের পর বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থাকে ঘিরে বিতর্কে ভর্তি পরীক্ষার পুনঃপ্রবর্তনের বিষয়টি আবারও গুরুত্ব পাচ্ছে। গত কয়েক বছর ধরে লটারি পদ্ধতিতে শিক্ষার্থী ভর্তি কার্যক্রম পরিচালিত হলেও পুনরায় পরীক্ষাভিত্তিক ব্যবস্থায় ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত সমাজের বিভিন্ন মহলে আলোচনা, সমালোচনা ও উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। তবে বিষয়টি কেবল আবেগ বা তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ার জায়গা থেকে দেখলে চলবে না; বরং বাংলাদেশের সামগ্রিক আর্থ-সামাজিক বাস্তবতা, শিক্ষার মান, প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা এবং ভবিষ্যৎ মানবসম্পদ গঠনের প্রয়োজনীয়তার আলোকে গভীরভাবে বিবেচনা করা জরুরি। 

বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার একটি বড় বাস্তবতা হলো বৈষম্য। শহর ও গ্রাম, সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, ইংরেজি মাধ্যম ও বাংলা মাধ্যম, মাদ্রাসা, এমনকি একই শহরের ভেতরেও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মানে ব্যাপক পার্থক্য বিদ্যমান। এই বৈষম্যের কারণে ‘নামকরা’ বা তুলনামূলক ভালো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তির জন্য একটি তীব্র প্রতিযোগিতা তৈরি হয়েছে। এই প্রতিযোগিতা অস্বীকার করার কোনও সুযোগ নেই, কারণ এটি বাস্তব। লটারি পদ্ধতি এই বাস্তবতাকে পাশ কাটিয়ে একটি কৃত্রিম সমতা তৈরির চেষ্টা করেছিল, কিন্তু তা শিক্ষার গুণগত মানোন্নয়ন বা শিক্ষার্থীদের মেধা বিকাশে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেনি।

প্রশ্ন হলো, একটি শিশু বা শিক্ষার্থীর জীবনের শুরুতেই কি তাকে প্রতিযোগিতার মুখোমুখি করা উচিত? অনেকেই বলেন, এটি শিশুদের ওপর অযাচিত চাপ সৃষ্টি করে। এই উদ্বেগ একেবারেই অমূলক নয়। তবে একইসঙ্গে এটিও সত্য যে, জীবন নিজেই একটি প্রতিযোগিতামূলক ক্ষেত্র। বাংলাদেশের মতো একটি উন্নয়নশীল দেশে, যেখানে সম্পদের সীমাবদ্ধতা রয়েছে এবং সুযোগের তুলনায় প্রার্থী অনেক বেশি, সেখানে প্রতিযোগিতার ধারণা থেকে পুরোপুরি দূরে থাকা বাস্তবসম্মত নয়। বরং সঠিকভাবে পরিচালিত প্রতিযোগিতা শিক্ষার্থীদের মধ্যে অধ্যবসায়, শৃঙ্খলা, লক্ষ্য নির্ধারণ এবং আত্মউন্নয়নের মানসিকতা তৈরি করতে পারে।

ভর্তি পরীক্ষা মূলত প্রতিযোগিতার একটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ, যা শিক্ষার্থীদের সামনে একটি নির্দিষ্ট লক্ষ্য স্থির করে এবং সেই অনুযায়ী প্রস্তুতি নিতে উদ্বুদ্ধ করে। যখন কোনও শিক্ষার্থী বা তার অভিভাবক জানেন যে, একটি নির্দিষ্ট পরীক্ষার মাধ্যমে নিজেকে বা তার সন্তানকে যোগ্যতা প্রমাণ করতে হবে, তখন পড়াশোনার প্রতি স্বাভাবিকভাবেই একটি দায়িত্ববোধ তৈরি হয়। এর ফলস্বরূপ, শিক্ষাজীবনের প্রাথমিক স্তর থেকেই একটি সুশৃঙ্খল অধ্যয়ন অভ্যাস গড়ে ওঠে, যা ভবিষ্যৎ জীবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

লটারি পদ্ধতির সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা হলো এটি মেধা, প্রচেষ্টা ও প্রস্তুতির মূল্যায়ন করে না। একটি শিশুর পরিবার যদি তাকে পড়াশোনার প্রতি উৎসাহিত করে, তাকে নিয়মিত চর্চায় অভ্যস্ত করে তোলে, তবুও লটারির মাধ্যমে তার সেই প্রচেষ্টার কোনো প্রতিফলন ঘটে না। অন্যদিকে, যে শিক্ষার্থী কোনো প্রস্তুতি ছাড়াই অংশ নেয়, তারও সমান সম্ভাবনা থাকে। ফলে একটি ন্যায্য প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ গড়ে ওঠে না। দীর্ঘমেয়াদে এটি শিক্ষার্থীদের মধ্যে উদাসীনতা ও দায়িত্বহীনতার সংস্কৃতি তৈরি করতে পারে।

বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা ও কর্মসংস্থানের বাস্তবতা বিবেচনা করলে বিষয়টি আরও পরিষ্কার হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি, সরকারি চাকরি, বেসরকারি খাতের প্রতিযোগিতা— সব ক্ষেত্রেই পরীক্ষাভিত্তিক বাছাই প্রক্রিয়া বিদ্যমান। সেখানে প্রাথমিক স্তরে সম্পূর্ণভাবে প্রতিযোগিতাহীন একটি পরিবেশ তৈরি করে পরবর্তী স্তরে হঠাৎ করে কঠিন প্রতিযোগিতার মুখোমুখি করা শিক্ষার্থীদের জন্য মানসিকভাবে ধাক্কাস্বরূপ হতে পারে। বরং ধাপে ধাপে প্রতিযোগিতার সঙ্গে পরিচিত হওয়া তাদের জন্য অধিকতর সহায়ক।

তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত রয়েছে। ভর্তি পরীক্ষা মানেই যেন কোচিং-নির্ভরতা, অর্থের প্রভাব, বা বাণিজ্যিকীকরণে পরিণত না হয়। অতীত অভিজ্ঞতা থেকে আমরা জানি, ভর্তি পরীক্ষার সঙ্গে সঙ্গে কোচিং সেন্টারগুলোর প্রসার ঘটে, যা অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষাকে একটি পণ্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। এটি একটি বড় ঝুঁকি, যা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। তাই ভর্তি পরীক্ষা পুনঃপ্রবর্তনের পাশাপাশি একটি শক্তিশালী নিয়ন্ত্রণ কাঠামো গড়ে তোলা অপরিহার্য।

প্রথমত, ভর্তি পরীক্ষার কাঠামো এমন হতে হবে, যা মুখস্ত-নির্ভর না হয়ে বরং মৌলিক ধারণা, যুক্তি ও সাধারণ দক্ষতার ওপর ভিত্তি করে তৈরি হবে। প্রশ্নপত্র যদি এমন হয় যে তা কোনও কোচিংয়ের মাধ্যমে আগাম প্রস্তুত করা যায় না, বরং শিক্ষার্থীর স্বাভাবিক বোধশক্তি ও শেখার সক্ষমতাকে যাচাই করে, তাহলে কোচিং-নির্ভরতা অনেকাংশে কমে আসবে। দ্বিতীয়ত, পরীক্ষার সিলেবাস সীমিত ও স্পষ্ট হতে হবে, যাতে অভিভাবক ও শিক্ষার্থীরা অযথা অতিরিক্ত চাপ অনুভব না করে।

তৃতীয়ত, সরকারকে কঠোরভাবে কোচিং বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। অনিয়ন্ত্রিত কোচিং সেন্টার, প্রশ্ন ফাঁস, আর্থিক লেনদেন— এসবের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করতে হবে। প্রযুক্তির ব্যবহার, ডিজিটাল নজরদারি এবং আইনি ব্যবস্থা জোরদার করে এই খাতকে নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব। ভর্তি পরীক্ষা নিজে সমস্যা নয়, সমস্যা হলো এর অপব্যবহার। সুতরাং, সঠিক নীতিমালা থাকলে এটি একটি কার্যকর মাধ্যম হিসেবে কাজ করতে পারে।

চতুর্থত, ভর্তি পরীক্ষার পাশাপাশি বিকল্প ব্যবস্থা রাখা যেতে পারে। যেমন- নির্দিষ্ট কোটার মাধ্যমে সুবিধাবঞ্চিত, গ্রামীণ বা প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ সুযোগ নিশ্চিত করা। এতে প্রতিযোগিতার পাশাপাশি সামাজিক ন্যায়বিচারও বজায় থাকবে। একইসঙ্গে ক্যাচমেন্ট এরিয়া বা এলাকাভিত্তিক ভর্তি ব্যবস্থাও আংশিকভাবে চালু করা যেতে পারে, যাতে শিক্ষার্থীরা নিজ এলাকার বিদ্যালয়ে সহজে ভর্তি হতে পারে এবং শহরের ওপর চাপ কমে।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে একটি বিষয় বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য, তা হলো অভিভাবকদের মনস্তত্ত্ব। অধিকাংশ অভিভাবকই চান তাদের সন্তান একটি ভালো প্রতিষ্ঠানে পড়ুক। এই চাওয়াকে অস্বীকার করা যায় না। কিন্তু যখন সেই সুযোগ সীমিত হয়, তখন একটি স্বচ্ছ ও গ্রহণযোগ্য বাছাই পদ্ধতি প্রয়োজন হয়। ভর্তি পরীক্ষা সেই স্বচ্ছতার একটি উপায় হতে পারে, যদি তা সুষ্ঠুভাবে পরিচালিত হয়। লটারি পদ্ধতি অনেক ক্ষেত্রে স্বচ্ছ হলেও তা সন্তুষ্টির অনুভূতি তৈরি করতে পারেনি, কারণ এতে ফলাফল সম্পূর্ণভাবে ভাগ্যের ওপর নির্ভরশীল।

এছাড়া, ভর্তি পরীক্ষা শিক্ষার্থীদের মধ্যে আত্মবিশ্বাস তৈরি করতে সাহায্য করে। একটি পরীক্ষায় সফল হওয়া মানে কেবল একটি প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হওয়া নয়; এটি নিজের সক্ষমতার ওপর বিশ্বাস তৈরি করে। এই আত্মবিশ্বাস ভবিষ্যৎ জীবনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অপরদিকে, সম্পূর্ণ ভাগ্যনির্ভর একটি পদ্ধতিতে এই মানসিক শক্তি তৈরি হয় না।

তবে আবারও বলতে হয়, ভর্তি পরীক্ষা যেন শিশুদের ওপর অতিরিক্ত মানসিক চাপ সৃষ্টি না করে। পরীক্ষার ধরন, সময়সীমা, মূল্যায়ন পদ্ধতি—সবকিছুই শিশুদের বয়স ও মানসিক সক্ষমতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে। প্রাথমিক স্তরে পরীক্ষাকে একটি ‘ভীতিকর’ বিষয় না বানিয়ে বরং একটি স্বাভাবিক মূল্যায়ন প্রক্রিয়া হিসেবে উপস্থাপন করতে হবে।

বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের জন্য প্রয়োজন একটি ভারসাম্যপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি। একদিকে প্রতিযোগিতা থাকবে, অপরদিকে থাকবে অন্তর্ভুক্তিমূলক নীতি। একদিকে থাকবে মেধার মূল্যায়ন, অন্যদিকে থাকবে সামাজিক ন্যায়বিচার। ভর্তি পরীক্ষার পুনঃপ্রবর্তন এই ভারসাম্য রক্ষার একটি অংশ হতে পারে, যদি তা সুপরিকল্পিতভাবে বাস্তবায়ন করা হয়।

মোটকথা, শিক্ষা ব্যবস্থার কোনও একক সমাধান নেই। লটারি বা পরীক্ষা— দুটিরই সুবিধা ও সীমাবদ্ধতা রয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশের বর্তমান আর্থ-সামাজিক কাঠামো, সীমিত সুযোগ এবং ক্রমবর্ধমান প্রতিযোগিতার বাস্তবতায় ভর্তি পরীক্ষার একটি নিয়ন্ত্রিত ও সংস্কারকৃত রূপ অধিক কার্যকর হতে পারে। এটি শিক্ষার্থীদের জীবনের শুরুতেই একটি ভিত্তি তৈরি করবে, যা তাদের পরবর্তী পথচলায় সহায়ক হবে।

এখন আবেগ নয়, প্রয়োজন বাস্তবভিত্তিক সিদ্ধান্ত। ভর্তি পরীক্ষাকে ঘিরে যে শঙ্কা সৃষ্টি হয়েছে, তা দূর করা সরকারের দায়িত্ব। যথাযথ নীতি, স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং কার্যকর বাস্তবায়নের মাধ্যমে ভর্তি পরীক্ষাকে একটি ইতিবাচক ও গঠনমূলক প্রক্রিয়ায় রূপ দেওয়া সম্ভব। এটি নিশ্চিত করা গেলে, ভর্তি পরীক্ষা কেবল একটি বাছাই পদ্ধতি হিসেবেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার পুনর্গঠনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপে পরিণত হবে। সুতরাং, সুপরিকল্পিত উদ্যোগ ও কার্যকর নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে ভর্তি পরীক্ষার পুনঃপ্রবর্তন দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে সক্ষম।

লেখক: অধ্যাপক, পরিসংখ্যান বিভাগ, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

/এপিএইচ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের আয়ে ৭.৫% কর নেওয়ার অভিযোগ, স্পষ্ট করার দাবি সারজিসের
কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের আয়ে ৭.৫% কর নেওয়ার অভিযোগ, স্পষ্ট করার দাবি সারজিসের
ভাতের সঙ্গে জমবে মজাদার সরষে সবজি
ভাতের সঙ্গে জমবে মজাদার সরষে সবজি
মার্কিন যুদ্ধবিরতি প্রত্যাখ্যান হিজবুল্লাহর, চলছে ইসরায়েলি হামলা
মার্কিন যুদ্ধবিরতি প্রত্যাখ্যান হিজবুল্লাহর, চলছে ইসরায়েলি হামলা
ভালো কোম্পানি তালিকাভুক্তিতে জোর দেবে নতুন বিএসইসি
ভালো কোম্পানি তালিকাভুক্তিতে জোর দেবে নতুন বিএসইসি
সর্বশেষসর্বাধিক