ঈদুল ফিতর শেষ হয়েছে। ব্যবসায়ীরা আশা করছেন— এ ঈদকে ঘিরে প্রায় ২ লাখ কোটি টাকার বেশি ব্যবসা হয়ে থাকবে। অর্থনীতির একটা বড় অংশজুড়ে রয়েছে ঢাকা শহর। ২ কোটির বেশি লোকসংখ্যার এ শহরে নীরবতা ভেঙে আবারও মানুষ ফিরতে শুরু করবে স্বাভাবিক জীবনে। যে জীবন অনেকটাই অনিয়ন্ত্রিত, অনিরাপদ বা অসম কিন্তু গতিশীল। ঢাকা শহরকে বোঝা সহজ নয়। এ শহর কোনও পরিকল্পিত নকশার নিখুঁত ফল নয়, বরং এটি সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের প্রয়োজন, সংগ্রাম ও অভিযোজনের মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠা এক জীবন্ত বাস্তবতা। ঢাকার অর্থনীতিও তেমনই— অগোছালো কিন্তু বিস্ময়করভাবে সক্রিয়। অর্থনীতির পাঠ্যবইয়ে শহরের কথা বলা হয়— উৎপাদন, ভোগ, বিনিয়োগ আর কর্মসংস্থানের ভাষায়। কিন্তু ঢাকায় এসব ধারণা বাস্তব রূপ পায় ট্রাফিক জ্যাম, ফুটপাতের দোকান, রিকশার প্যাডেল আর ভাড়া বাড়ির সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষের দীর্ঘশ্বাসে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য ঢাকা একটি জীবন্ত পাঠ্যবই— যেখানে নগর অর্থনীতি ও উন্নয়ন তত্ত্বের বাস্তব প্রয়োগ প্রতিনিয়ত দেখা যায়। এ শহর আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, অর্থনীতির কেন্দ্রবিন্দু শেষ পর্যন্ত মানুষই।
দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সবচেয়ে বড় কেন্দ্র হলো ঢাকা জেলা। দেশের মোট কর্মসংস্থানের ৪০ শতাংশ আসে এ জেলা থেকে। দেশের শহুরে জনসংখ্যার ৩২ শতাংশ ও মোট জনসংখ্যার ১১ দশমিক ২ শতাংশ মানুষ ঢাকায় থাকেন। ঢাকা খুবই শিল্পঘন জেলা। দেশের মোট পণ্য রফতানির ৪০ শতাংশের বেশি এ জেলা থেকে আসে। সব মিলিয়ে মোট দেশজ আয়ে (জিডিপি) এককভাবে ৪৬ শতাংশ অবদান রাখছে ঢাকা জেলা। ঢাকা জেলার মানুষের গড়ে মাথাপিছু আয় বর্তমানে ৫ হাজার ১৬৩ মার্কিন ডলার— যা দেশের মানুষের গড় মাথাপিছু আয়ের (২ হাজার ৮২০ মার্কিন ডলার, ২০২৪-২৫) প্রায় দুই গুণের কাছাকাছি। এগুলো সামষ্টিক অর্থনীতির সূচক। এর বাইরে ঢাকা শহরে যে জীবন রয়েছে, তা আরও বর্ণাঢ্য। এ লেখায় তেমনই অনেক ছোট ছোট বিষয় উপস্থাপন করা হয়েছে, যা শহরের মানুষের জীবনকে বিভিন্নভাবে প্রভাবিত করে।
শহরের বেশিরভাগ পণ্যই ভেজালে আক্রান্ত। অন্তত আমাদের তাই বিশ্বাস। এর মধ্যে কেউ কেউ অনলাইনে বাহারি বিজ্ঞাপন দিয়ে ক্রেতাদের আকৃষ্ট করার চেষ্টা করছেন, অনেকক্ষেত্রে তারা সফল। ক্রেতার বিশ্বাস অর্জনের সবচেয়ে ভালো উদাহরণ হচ্ছে— গাভী থেকে সরাসরি দুধ দোহানোর পর বিক্রি করা। ঢাকা শহরের অনেক জায়গায় গরুর মালিক এ উদ্ভাবনী কাজ করে থাকেন। অনেকটা লাইভে এসে দুধ বিক্রি। বলতে দ্বিধা নেই, লাইভ শব্দের প্রতি আমাদের এক ধরনের মুগ্ধতা তৈরি হয়েছে। যেমন,- কোথাও আগুন লাগলে, ম্যানহোলে পড়ে গেলে সেটা লাইভ দেখানো। হয়তো এ ধারণা থেকেই ‘লাইভ পিজা’ বা ‘লাইভ বেকারি’র জন্ম হয়েছে।
ঢাকার ফুটপাত মানেও অর্থনীতির লাইভ ডেমো। একই জায়গায় দিনে চারবার পণ্যের ধরন বদলে যায়। এটাকে আধুনিক অর্থনীতির ভাষায় ‘হাই-ফ্রিকোয়েন্সি ট্রেডিং’ বলা যায়। এখানে সকালবেলা মোজা, দুপুরে চার্জার, সন্ধ্যায় ফুচকা, আর রাতে পিঠা বিক্রি হয়। ঢাকার শ্রমবাজারের একটি বড় অংশ অনানুষ্ঠানিক খাতে নির্ভরশীল। এক হিসাব অনুযায়ী, ঢাকার অনানুষ্ঠানিক খাতে মোট কর্মসংস্থানের প্রায় ৮৫ শতাংশ জড়িত। অর্থাৎ, ঢাকা শহর আসলে নিয়মের চেয়ে বাস্তবতায় বেশি চলে। অর্থনৈতিক অবস্থাকে বুঝার জন্য অনেক সূচক রয়েছে। বোধকরি, ঢাকা শহরকে ব্যাখ্যা করার জন্য ‘চা-সিঙ্গারা সূচক’ সবচেয়ে কার্যকর। কারণ ঢাকার অর্থনৈতিক অবস্থা বুঝার সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য সূচক হলো চা-সিঙ্গারার দাম। একসময় চা ৫ টাকা, সিঙ্গারা ৫ টাকায় বিক্রি হতো। এখন চা ১৫-২০ টাকা, সিঙ্গারা ১০-২০ টাকা। এছাড়া, রিকশা ভাড়ার সূচক দিয়েও ঢাকার জীবনযাত্রার মূল্য পরিমাপ করা যেতে পারে। এগুলো শুধু মুদ্রাস্ফীতির গল্প না, এটা মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মানসিক সমন্বয়।
কার্যত, অর্থনীতির বাইরে যেয়ে জীবনকে বিশ্লেষণ করার সুযোগ নাই। রিকশাচালক, হকার, ক্ষুদ্র সেবা প্রদানকারী— এ মানুষগুলো প্রাতিষ্ঠানিক পরিসংখ্যানের বাইরে থাকলেও নগর অর্থনীতির প্রাণশক্তি। তাদের আয় নগদ, ঝুঁকি বেশি, কিন্তু অবদান অস্বীকার করার সুযোগ নেই। তারা প্রমাণ করে, অর্থনীতি কেবল নীতিমালা দিয়ে চলে না, চলে মানুষের পরিশ্রম আর টিকে থাকার ইচ্ছায়। এখানে ভিক্ষুকদের সংখ্যা অনেক। মৌসুমি ভিক্ষুক বাদ দিলেও এ সংখ্যা অনেক যা কর্মসংস্থানহীন প্রবৃদ্ধিকে চিত্রায়িত করে। প্রায় সব রাস্তায়ই এদের দেখা যায়। মজার বিষয় হচ্ছে, এদের মধ্যে তথাকথিত প্রতিযোগিতা নেই। একজনকে ভিক্ষা দিলে সে পাশের জনকে দেখিয়ে দেয়। এ ভয়ে শহরের অনেকেই ভিক্ষা দিতে আগ্রহী নন। ভিক্ষুক আর ভিউ ব্যবসায়ীদের মতো অটোরিকশা/সিএনজি কিংবা দোকানিরা ক্রেতাদের বিভিন্ন কৌশলে ডাকাডাকি করেন। আমি জানি না, তবে জানতে চাই— এসব ডাকাডাকি কাজ করে কিনা?
বিক্রেতারা বিভিন্ন অজুহাতে বিক্রির যে কৌশল তা কোনোরূপ জ্ঞান ও প্রশিক্ষণ ছাড়াই রপ্ত করেছেন। যেমন- সেদিন তালের ডাব (কচি তালের শাঁস ও এর ভেতরের জল) খেতে গিয়ে শুনি বিক্রেতা বলছেন, এগুলো খেলে নাকি অ্যান্টি টিটেনাস সিরাম (এটিএস) নিতে হয় না। এ তথ্যের সত্যতা যাচাই করিনি। তবে বিক্রেতার কৌশল আমাকে মুগ্ধ করেছে। এরকম অনেক তথ্যেরই বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা নেই। গলার মাপ দিয়ে যেভাবে প্যান্টের কোমরের সাইজ মেপে দেওয়া হয়, তা সত্যিই অবিশ্বাস্য। বিক্রেতারা অনেক সময় লিঙ্গ বৈষম্যের বিষয় সামনে এনেও ক্রেতাদের মনোযোগ আকর্ষণ করেন। সেদিন একপাশে একজন বাদাম, ছোলা, ঝালমুড়ি এবং এর কাছেই একজন ফুচকা, বেল পুরি ও পানি পুরি বিক্রি করছিলেন। দুই বন্ধু কী খাবে, সেটা নিয়ে বাকযুদ্ধ! এর মাঝেই ঝালমুড়ি বিক্রেতা বলে উঠলেন ফুচকা ও বেল পুরিতো মেয়েদের খাবার! লিঙ্গ বৈষম্যের ইস্যু সামনে এনে তিনি প্রভাবিত করতে চাইলেন। লিঙ্গ বৈচিত্র্যের আরেকটি উদাহরণ হলো— দোকানি ও বাসের কনডাক্টরদের মতে মেয়েরা ছেঁড়া নোট নিতে চান না!
বিজ্ঞাপনে বাংলা ভাষার যে প্রকাশ, তাতে অনেকেই বিভ্রান্ত হতে পারেন। একটা বড় সমস্যা হলো বানান ভুল। বাংলা একাডেমি অবশ্য দায় এড়াতে পারে না। কারণ, বাংলা বানান পরিবর্তন করলেও তাদের ব্যাপক মার্কেটিং নেই। ফলে আমরা ভুল বানান নিয়েই পড়ে আছি। অন্য সমস্যা হলো ভাষাগত। এক লোক তেলের বিজ্ঞাপনে ‘চুল উঠে যাবে’ লেখা দেখে তেল ব্যবহার করার পর দোকানে গিয়ে জানতে পারেন—বিক্রেতা মাথা টাক হয়ে যাওয়ার বিষয়ই বুঝিয়েছেন। ‘সুগার ফ্রি’ মানে বুঝাও কষ্টকর!
নাগরিক জীবনের পুরাটাই ঝামেলাপূর্ণ। দোকানিরা মোটরসাইকেল পার্ক করে রাস্তা বন্ধ করে, ব্যবসা করে লোকজনের চলাচলে কষ্ট দেন। দোকানিদের মতো আমরা নিজেরাও একে অন্যকে ঝামেলা দিয়ে যাচ্ছি। রাস্তায় দাঁড়িয়ে আড্ডা দিয়ে, উচ্চস্বরে শব্দ করে, যত্রতত্র ময়লা ফেলে, ইত্যাদি নানাভাবে নাগরিক জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলেছি। মজা করেই বলছি, কাউকে ঝামেলা দিতে চাইলে বড় বড় দোকানে দিয়ে খেয়ে বা কিছু কিনে অন্য কারও নম্বর দিয়ে আসুন। তাতে অনেক অনাকাঙ্ক্ষিত মেসেজ ওখানে যাবে। এক ফগার মেশিনের মেজেসের উৎপাতেই জীবন শেষ! ফগার মেশিনের অনেক মেসেজের নেপথ্যে রয়েছে মশার যন্ত্রণায় অতিষ্ঠ শহরের জীবনের প্রতিচ্ছবি।
ঢাকা শহরের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো— এখানে একই জিনিস বিভিন্ন দামে পাওয়া যায়। যেমন, বার্গার একটি ফাস্ট ফুড হিসেবে সমাজের ধনী শ্রেণির খাবার হিসেবে পরিচিত। কিন্তু গরিবরা এ খাবার থেকে কেন বঞ্চিত হবে? তাই ২০ টাকা থেকে শুরু করে প্রায় হাজার টাকারও বার্গার পাওয়া যায়। শহরের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো সম্পদের সুরক্ষা। বাড়ির গেট তালা দিয়ে, সিসি ক্যামেরা বসিয়ে, এলাকাভিত্তিক পাহারা দিয়েও সুরক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়েছে। বাড়ির সামনে থাকা ফলের গাছ সেক্ষেত্রে একদমই অনিরাপদ। তাই কেউ কেউ তার নারিকেল গাছের ফল মসজিদে দান করে দিচ্ছেন। মানুষের আবেগকে কাজে লাগিয়ে গাছের গায়ে লেখা হয় ‘এগুলো মসজিদের মালিকানাধীন’। অন্তত চোর হতে যাতে নিরাপদ থাকে। উদ্বেগজনক বিষয় হচ্ছে, মসজিদও (বা অন্যান্য ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান) চুরি থেকে নিরাপদ নয়। এসব ভয় আর আশঙ্কার সঙ্গে অনেক অজানা ভয়ও আমাদের মনে ক্রিয়া করে। যেমন, উপর থেকে মাথায় কিছু পড়বে কিনা (মেট্রো রেলের বিয়ারিং, উড়াল সড়কের ইট, ইত্যাদি); ম্যানহোলে পড়ে যাবো কিনা, ভূমিকম্পের ফলে পাশের দালান পড়ে যাবে কিনা ইত্যাদি নানান আশঙ্কার মাঝেই আমাদের জীবন চলমান।
তবে সবচেয়ে আশঙ্কা এবং আতঙ্কের বিষয় হচ্ছে অপরিচ্ছন্নতা। ঢাকা পরিপূর্ণরুপে এক অপরিচ্ছন্ন নগরী। ফুটপাথ, রাস্তাঘাট, খেলার মাঠ, রেস্টুরেন্ট, অফিস, বাসার আশপাশ– প্রায় সব জায়গার পরিস্থিতি অস্বাস্থ্যকর। এ জন্য সম্মিলিতভাবে আমরা সবাই দায়ী। শুধু জানালার কার্নিশ পরীক্ষা করলেই আমাদের দায় পরিষ্কার হয়ে যাবে। যত্রতত্র ময়লা-আবর্জনা ফেলে আমরা পুরা শহরকে ‘ময়লার ঝুড়িতে’ পরিণত করে ফেলেছি। যার ফলে শিশু ও বয়স্করা মৌসুমি সকল রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন। এর সঙ্গে প্রায় প্রতিদিনই সংবাদপত্রের শিরোনামে ঢাকার বাতাস বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত বলে খবর প্রকাশিত হচ্ছে। আসন্ন বর্ষা মৌসুমের পূর্বে সম্ভাব্য ডেঙ্গি ও অন্যান্য মশাবাহিত রোগ থেকে বাঁচতে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা অভিযান এখন সময়ের দাবি।
নগর পরিচালনার অনেক কিছুই আমাদের বোধগম্য নয়। কে যে কিসের জন্য দায়িত্বশীল, সেটা উদ্ধার করতেও অনেক সময় লেগে যেতে পারে। নাগরিক সুবিধা গ্রহণ অনেক পরের বিষয়। রাস্তায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা আবাসিক হোটেলের ভিজিটিং কার্ড দেখে যে কেউ আশ্চর্যান্বিত হতে পারেন। লোকমুখে শুনেছি, এগুলো দিয়ে একধরনের (হানি) ট্র্যাপ করা হয়। অনৈতিক/অসামাজিক কার্যকলাপের লোভে পড়ে কেউ এসব জায়গায় গেলে সর্বস্বান্ত হতে পারেন। আমি শুধু ভাবি এদের নাম, ঠিকানা ও মোবাইল নম্বর থাকা সত্ত্বেও কীভাবে এসব প্রচারণা সম্ভব? এছাড়া, ঢাকার সিনেমা হলগুলোতে ভাসমান যৌনকর্মীদের আনাগোনা রয়েছে বলে মিডিয়ার খবরে জানতে পারা যায়।
শহরের ফুটপাথে গড়ে ওঠা ব্যবসার একটা মনস্তাত্ত্বিক অর্থনীতি রয়েছে। এখানে সাধারণত নিম্ন বা গড় মানের পণ্য বিক্রি হয়। কারণ ক্রেতারা অল্প দামে জিনিস কিনতে চান। তাই ভালো মানের পণ্য ফুটপাথে বিক্রি না-ও হতে পারে। অনেকটা গ্রেশামস ল এর মতো, খারাপ মুদ্রা ভালো মুদ্রাকে বাজার থেকে হটিয়ে দেয় । আবাসন খাতে ঢাকার চিত্র আরও জটিল। সীমিত জমি, দ্রুত নগরায়ন এবং বিনিয়োগ– চাপ শহরকে ক্রমাগত উল্লম্ব করে তুলছে। এতে একদিকে সম্পদের মূল্য বাড়ছে, অপরদিকে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়ছে। এ দ্বন্দ্বই ঢাকার অর্থনীতির বাস্তব রূপ। স্বাভাবিকভাবে, এ শহরের যানজটকে আমরা প্রায়ই উন্নয়নের ব্যর্থতা হিসেবে দেখি। কিন্তু একইসঙ্গে এটি ঢাকার অভিযোজন ক্ষমতারও প্রতিচ্ছবি। স্থবিরতার মাঝেও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড থেমে থাকে না। সময় নষ্ট হলেও মানুষ সেই সময়কে নতুনভাবে কাজে লাগাতে শিখেছে— এটাই ঢাকার অর্থনীতির এক নীরব দক্ষতা। ঢাকা শহরের অর্থনীতি তাই এক দ্বৈত বাস্তবতার প্রতিনিধিত্ব করে— একদিকে উচ্চ প্রবৃদ্ধি ও নগর আকর্ষণ, অপরদিকে অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা ও সামাজিক চাপ।
কর্মসংস্থানহীন প্রবৃদ্ধি থেকে একটি কর্মসংস্থাননির্ভর প্রবৃদ্ধি ও শক্তিশালী অর্থনীতি গড়ে তুলতে ব্যক্তি খাতের বিকাশ অত্যাবশ্যক। কারণ সরকারি খাতে বিনিয়োগ হলে নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হওয়া বেশ কষ্টকর। তবে পরোক্ষভাবে অর্থনীতির অন্যান্য চ্যানেলের মাধ্যমে তা সম্ভব। বিপরীতে, বেসরকারি খাতে বিনিয়োগের মাধ্যমে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে বিভিন্ন রকমের কর্মসংস্থান তৈরি হয়। উদাহরণ দেই— মাছের বাজারে মাছ কাটাকে কেন্দ্র করে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে। মাছের যে আঁশ পাওয়া যায়, সেগুলো মাসিক চুক্তিতে (বাজারভেদে কমবেশি ১০০০ টাকা) বিক্রি হয়। মাছের আঁশ ও অন্যান্য বর্জ্যকে ঘিরে অনেক পণ্য প্রস্তুত হচ্ছে। এটাই ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগের ইতিবাচক দিক।
ইদানিং অনেক চেইন শপগুলোতে দেখা যায়, বড় করে লেখা রয়েছে, ভ্যাট দিতে হবে না বা এখানে ভ্যাট নেই। কার্যত ভ্যাট না দেওয়ার কোনও সুযোগ নাই। আমার মনে হয়, এটি একধরনের ঋণাত্মক মনস্তাত্ত্বিক ধারণা সৃষ্টি করে। যেখানে আয়কর কিংবা ভ্যাট দিতে আমাদের চরম অবহেলা রয়েছে, সেখানে ক্রেতাদের আকৃষ্ট করতে গিয়ে এ কাজ করে মোটাদাগে খারাপ কিছু হয়ে যাচ্ছে। তবে বিশৃঙ্খলার মধ্যেই কোথায় যেন একটা অদৃশ্য ভারসাম্য রয়েছে। যদিও ঢাকা শহরের অর্থনীতি কোনও বইয়ের নিখুঁত গ্রাফের মতো না। এটা বাঁকা, ধাক্কাধাক্কি করা, হর্ন বাজানো, আর ঘাম ঝরানো অর্থনীতি। এ বিশৃঙ্খলার মধ্যেই এক অদ্ভুত ভারসাম্য আছে। ঢাকা শহর প্রমাণ করে — অর্থনীতি শুধু নীতিমালা দিয়ে চলে না, চলে মানুষের সহনশীলতা, অভিযোজন আর চায়ের কাপ দিয়ে। ঢাকা শহরের অর্থনীতি তাই একটি প্যারাডক্স— অদক্ষতা ও প্রাণশক্তির সহাবস্থান। এ নগর আমাদের শেখায়, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি সব সময় প্রাতিষ্ঠানিক শৃঙ্খলার ফল নয়, অনেক সময় এটি মানুষের টিকে থাকার কৌশল।
লেখক: উন্নয়ন অর্থনীতি গবেষক




