ব্যক্তি ও সরকারি খাতে উদ্ভাবন

মোস্তফা মোরশেদ
০৪ এপ্রিল ২০২৬, ১২:০০আপডেট : ০৫ এপ্রিল ২০২৬, ১৪:০১

উদ্ভাবন কোনও বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং উন্নতির একটি প্রক্রিয়া। এটি বিদ্যমান কোনও ধারণা, পরিচালনা পদ্ধতি কিংবা পরিষেবা প্রদানের নতুন উপায়গুলো খুঁজে বের করে। পরবর্তী সময়ে সেগুলোকে অনুসরণ করে প্রচলিত ব্যবস্থায় একীভূত করে। তাই উদ্ভাবন বলতে কেবল নতুন আবিষ্কার নয়, বরং বিদ্যমান ধারণা, প্রক্রিয়া বা প্রযুক্তিকে আরও কার্যকর, সাশ্রয়ী ও অন্তর্ভুক্তিমূলক করে তোলাকে বোঝায়। উদ্ভাবনের সঙ্গে দুটি বিষয় প্রত্যক্ষভাবে সম্পৃক্ত— ঝুঁকি গ্রহণ এবং নতুন প্রযুক্তি ব্যবহার করে সম্পদের সর্বাধিক ব্যবহার নিশ্চিতকরণ। প্রতিযোগিতামূলক বাজার সৃষ্টি তথা অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে উদ্ভাবন গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করে।

উন্নয়ন আলোচনায় উদ্ভাবন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সম্পদ তৈরি এবং বিদ্যমান চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে উদ্ভাবনের প্রয়োজন। বিশেষ করে, পূর্ণ কর্মসংস্থান স্তরের (Full Employment Level of Output) কাছাকাছি দেশগুলোর জন্য এর বিকল্প নেই। কারণ উৎপাদনের উপকরণ, যেমন- জমি, শ্রম, মূলধন ইত্যাদি পরিবর্তন করে উৎপাদিত পণ্য বা সেবা (Output) এর সংখ্যা ও গুণগত পরিমাণ বাড়ানো অনেকাংশে সম্ভব নয়; তাই উদ্ভাবন হয়ে উঠে একমাত্র সমাধান। এটি উন্নত দেশগুলোর জন্য যেমন সত্য তেমনই উন্নয়নশীল বা স্বল্পোন্নত দেশগুলোর জন্যও প্রযোজ্য; কারণ সীমিত সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করাই এখানে প্রধান চ্যালেঞ্জ। পরিবর্তনই একমাত্র ধ্রুবক। অর্থনৈতিক উন্নয়ন, যেমনটি Joseph Schumpeter বুঝতে পেরেছিলেন, কেবল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সাথেই নয়; বরং সমাজ ও অর্থনীতিতে গুণগত পরিবর্তনের সাথেও জড়িত। নতুন পণ্য ও পরিষেবা বিকাশের প্রক্রিয়ায় গুণগত পরিবর্তনের জন্য উদ্ভাবন আবশ্যক। তাছাড়া, জ্ঞান অর্থনীতি একটি philosopher's stone যেখানে উদ্ভাবনের মাধ্যমে জ্ঞান, পণ্য এবং পরিষেবার নতুন ক্ষেত্র তৈরি হয়।

উপরন্তু, ইতিহাস বলছে যে মধ্যম আয়ের দেশ হতে উচ্চ অর্থনীতির দেশে উন্নীত হওয়ার জন্য উদ্ভাবনই একমাত্র কৌশল। পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে খুব কম দেশই কেবল উদ্ভাবন এবং প্রযুক্তিগত অগ্রগতির উপর নির্ভর করে মধ্যম আয়ের ফাঁদ থেকে সফলভাবে বেরিয়ে এসেছে। ১৯৬০ সাল থেকে মাত্র ২৩টি দেশ এ ফাঁদ থেকে বের হতে পেরেছে, যার মূল কারিগর হচ্ছে উদ্ভাবন। পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে এ তালিকা খুবই ছোট; দক্ষিণ কোরিয়া, হংকং, সিঙ্গাপুর, তাইওয়ান। এছাড়া, ইউরোপিয়ান দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে ক্রোয়েশিয়া, সাইপ্রাস, গ্রিস, হাঙ্গেরি, আয়ারল্যান্ড, লাটভিয়া, মাল্টা, পোল্যান্ড, পর্তুগাল, স্লোভেনিয়া ও স্পেন। অন্যান্য দেশগুলো হলো— বাহরাইন, চিলি, ইউকুয়েটেরাল গিনি, ইসরায়েল, মরিশাস, ওমান, সৌদি আরব, সেশেলস (Seychelles) ও উরুগুয়ে। পক্ষান্তরে, ১০৮টি দেশ এখনও এ ফাঁদে আটকে আছে, যার কারণও উদ্ভাবনের অনুপস্থিতি। মধ্যম আয়ের ফাঁদে আটকে যাওয়া দেশগুলো হলো— চীন, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, ব্রাজিল, তুরস্ক, ইত্যাদি।

এ লেখায় মূলত ব্যক্তি ও সরকারি খাতে উদ্ভাবনের তুলনামূলক আলোচনা করার মাধ্যমে কেন সরকারি খাতে উদ্ভাবন কার্যত সম্ভব নয় তা বিবৃত হয়েছে। উদ্ভাবনের ফলে তিনটি বিষয়ে দৃশ্যমান পরিবর্তন হয়; এক. খরচ (cost) কমে, দুই. সময় (time) বাঁচে ও তিন. প্রচেষ্টা বা উদ্যম (effort) কম লাগে। পণ্য উৎপাদন বা সেবা প্রদানে কোনও উদ্যোগ দ্বারা এর যেকোনও একটি বা একের অধিক পরিবর্তন সাধিত হলেই কেবল তাকে উদ্ভাবন বলা যেতে পারে। সাধারণত, প্রতিযোগিতার কারণে বেসরকারি খাতে উদ্ভাবন খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এটি খরচ কমাতে, পণ্যের গুণগত মানোন্নয়ন এবং নতুন বাজার খুলতে সাহায্য করে, যা ব্যবসার সাফল্যের চাবিকাঠি।

বাংলাদেশে বেসরকারি খাতের উদ্ভাবনের একটি উৎকৃষ্ট উদাহরণ হলো বিকাশ, যা মোবাইল নেটওয়ার্কের মাধ্যমে অর্থ স্থানান্তরের একটি মাধ্যম। এটি প্রচলিত ব্যাংকিং ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করে আর্থিক অন্তর্ভুক্তি  সম্প্রসারণে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছে। একইভাবে, কৃষি খাতে অ্যাপভিত্তিক তথ্যসেবা, ই-কমার্স প্ল্যাটফর্ম, ফেসবুক পেজ-ভিত্তিক নারী উদ্যোক্তা, ক্যাশ অন ডেলিভারি, বাসের টিকিট অনলাইন বুকিং এবং হেলথটেক স্টার্টআপ ইত্যাদি ব্যক্তি খাতের উদ্ভাবনের বাস্তব প্রয়োগ। এছাড়া, সাম্প্রতিক সময়ে ডিজিটাল মার্কেটপ্লেস অনেকখানি জায়গা দখল করে নিয়েছে। এ প্রতিষ্ঠানগুলো বাংলাদেশে two-sided market তৈরি করেছে– যা একদিকে ভোক্তা এবং অপরদিকে সরবরাহকারী বা সেবা প্রদানকারীর জন্য কল্যাণকর। যদিও অন্যান্য উন্নত দেশ বিবেচনায় এগুলো নতুন নয়; তবু আমাদের দেশের বাস্তবতায় এসব ক্ষেত্রে ঝুঁকি রয়েছে।

উদ্ভাবনের নেপথ্যের একটি মাত্র কারণ খুঁজে বের করলে দেখা যাবে সেটি হলো— প্রণোদনা বা ওই কাজের পেছনের মূলধনের গল্প। উদ্ভাবনের জন্য প্রণোদনা থাকতে হয়। ঠিক যে কারণে সব দেশেই বেসরকারি খাতের উদ্ভাবনী শক্তি সরকারি খাতের চেয়ে বেশি। বাংলাদেশের অর্থনীতি থেকে যুতসই উদাহরণ দেই। ইদানিং লক্ষ্য করবেন বরিশালের আমড়া পুরাটা বিক্রি হয় না; বরং কেটে কেটে বিক্রি করা হয়। এর প্রধান কারণ, কেটে বিক্রি করলে আমড়ার আকার কিংবা এর অন্যান্য গুনাগুণ পরখ করার সুযোগ থাকে না। ফলে নিম্নমানের আমড়াও বিক্রি করা সম্ভব হচ্ছে। এটা একধরনের উদ্ভাবন যা বিক্রেতাকে শিখাতে হয়নি। কেটে বিক্রি করার তালিকায় পেঁপে, তরমুজসহ আরও ফল রয়েছে। বিক্রেতারা নিজের তাগিদেই এ উদ্ভাবন শিখে নিয়েছেন। মাছ, সবজি, ফলমূলে রঙ মাখিয়ে সতেজ দেখানো বা রঙ্গিন করার যে প্রক্রিয়া, তা বিক্রেতারা হরহামেশাই করছেন। এটা আসলে বাজারের ভেতর থেকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে জন্ম নেওয়া ‘চতুর’ কৌশল যেখানে বিক্রেতা তথ্য বৈষম্য কাজে লাগিয়ে অধিক মুনাফা আহরণ করছেন। তবে এ ধরনের উদ্ভাবনগুলো প্রায়ই নেগেটিভ ওয়েলফেয়ার ইফেক্ট তৈরি করে।

আরও অনেক দৃষ্টান্ত রয়েছে। চা স্টলে যে চামচ দিয়ে চা বানানো হয়, সেটি আসলে লম্বা বোতলের জন্য ব্যবহৃত চামচ (মূলত আচারের জন্য ব্যবহৃত হয়)। চামচ খাটো হলে চা বানাতে দেরি হবে, বিক্রি কম হবে। কাপ বা মগের ওপর ভেজা কাগজ দিয়ে ঢেকে দিয়ে চা সরবরাহ করছেন। পাটের দড়ির এক প্রান্তে আগুন জ্বালিয়ে সিগারেটের আগুন সরবরাহ করছেন। এগুলোই অর্থনীতির উদ্ভাবনী শক্তি। এসব কৌশল খুব ছোট প্রভাবের; কোনও প্রযুক্তি নেই, কোনও অ্যাপ নেই। কিন্তু অর্থনৈতিক দিক থেকে এগুলো অত্যন্ত কার্যকর। উদ্ভাবন দেখতে হলে ঢাকা শহরের ছোট ছোট টং দোকানের দিকে তাকাতে হবে। কী নেই সেসব দোকানে? কত ছোট জায়গায় বসে তারা ব্যবসা পরিচালনা করছেন! লক্ষ্য করলে দেখবেন, উঁচু বিল্ডিং এ বসবাসকারীরা নিচ থেকে বাজার করতে কিংবা কাউকে গেটের চাবি দিতে লম্বা রশির সাহায্য নিয়ে থাকেন। এটাওতো উদ্ভাবন যা কাউকে শিখিয়ে দিতে হয়নি। 

আরও নজির আছে। ঢাকার মেরাদিয়া (বনশ্রী) বাজারে ছাগল বিক্রি হয়। বিক্রেতারা যে জায়গায় ছাগলগুলো বেঁধে রাখেন, সেখানে সঙ্গত কারণে স্থানের অপ্রতুলতার জন্য অনেক ছাগল একসঙ্গে রাখতে হয়। দুটি কারণে সেগুলোর গলায় রশি বেঁধে লম্বালম্বিভাবে আটকে রাখা হয়। এক. লম্বালম্বিভাবে না রেখে তার গলার সঙ্গে সমান্তরালে (সাধারণত যেভাবে আটকানো হয়) রাখলে অনেক বেশি জায়গায় লাগবে। দুই. লম্বালম্বিভাবে রাখলে তারা পরস্পর মারামারি করবে না, কারণ রশি উপর থেকে আটকানোর কারণে নড়তে গেলে গলায় চাপ পড়বে ফলে অল্প জায়গায় অনেক ছাগলকে একসঙ্গে কোনও ঝামেলা ছাড়া রাখা যাবে। এ অবিশ্বাস্য উদ্ভাবনের (যদিও খুবই অমানবিক) জন্য ছাগল বিক্রেতাদের কোথাও জ্ঞান অর্জন কিংবা প্রশিক্ষণ নিতে হয়নি। ঢাকার রাস্তায় যে খাবারের যে বৈচিত্র্য ও বাহারি আয়োজন তার পেছনে রয়েছে উদ্ভাবনের শক্তি। ফেরিওয়ালারা বিভিন্ন রকমের বাদাম, খেজুর, কিসমিস ইত্যাদি একত্র করে ১০ টাকার যে প্যাকেট বিক্রি করেন, তা নিজেরাই উদ্ভাবন করেছেন। ডেন্টাল ফ্লসও ফেরিওয়ালাদের কাছে পাওয়া যায়। মজার বিষয় হচ্ছে, বেশিরভাগ পণ্যের দাম ১০ থেকে ২০ টাকা।

বেসরকারি খাতে উদ্ভাবন একটি সহজাত বিষয়। আবারও উদাহরণ দেই। ঢাকার বেশিরভাগ মাছ বাজারে মাছ কাটার জন্য একদল মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে। শুধুমাত্র এবং শুধুমাত্র ব্যক্তি খাতের বিকাশ হলেই কাঙ্ক্ষিত কর্মসংস্থান তৈরি হবে। নতুন সরকার কর্মসংস্থান সৃষ্টিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছেন— যা আমাদের আশাবাদী করে তোলে। মাছ কাটার ফলে অবশিষ্টাংশ হিসেবে যে মাছের আঁশ পাওয়া যায়, সেগুলো বাজারভেদে বিভিন্ন দামে বিক্রি হয়। প্রতি মাসে এগুলো বিক্রি করে মাছ কাটার পেশাজীবীরা হাজার টাকা করে পেয়ে থাকেন। মাছের আঁশকে কেন্দ্র করে যে ব্যবসা (বিভিন্ন অলংকার, গৃহস্থালি পণ্য তৈরি) গড়ে উঠেছে, তার নেপথ্যে রয়েছে ব্যক্তি খাতের বিকাশ এবং সর্বোপরি উদ্ভাবন।

আমরা জানি, ব্যক্তি ও সরকারি খাতের উদ্দেশ্য ভিন্ন ও সম্পূর্ণ বিপরীত। যেখানে সরকারি খাত এর উদ্দেশ্য ‘সেবা প্রদান’ সেখানে ব্যক্তিখাতের উদ্দেশ্য হলো ‘লাভ সর্বাধিকীকরণ’। মূলত সরকারি খাতে উদ্ভাবনের জন্য কোনও প্রণোদনা নেই। যদিও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের চাহিদা বৃদ্ধি ও চাহিদায় বৈচিত্র্য আসায় উদ্ভাবনের গুরুত্ব বেড়েই চলেছে। ক্রমবর্ধমান বেসরকারি খাতের সাথে পাল্লা দিয়ে সরকারকে আরও গ্রহণযোগ্য করে তুলতে উদ্ভাবনের বিকল্প নাই। ব্যয় হ্রাস সরকারের আকার ছোট করে একে দক্ষ করে তুলতে কিংবা মন্দার সময় দেশকে রক্ষা করতে উদ্ভাবনের উপযোগিতা অনেক। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ২০০৮ সালের মন্দার সময়ে গৃহীত অপ্রচলিত মুদ্রানীতির মাধ্যমে বিভিন্ন দেশ উপকৃত হয়েছে।

সরকারি খাতে উদ্ভাবন হতে পারে নতুন পণ্য ও সেবা সৃষ্টি, প্রশাসনিক সংস্কার, ডিজিটাল সেবা কিংবা কোনও সামাজিক সমাধান। বিশ্বজুড়ে দেখতে পাওয়া অন্তত তিনটি উদাহরণ এক্ষেত্রে প্রণিধানযোগ্য। ওয়েবেরিয়ান ‘আদর্শ ধরণের আমলাতন্ত্র’ দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে সরকারি ব্যবস্থাপনায় এক গভীর রূপান্তর ঘটেছে। বিশেষ করে, ১৯৯০-এর দশকে নিউজিল্যান্ডে নতুন পাবলিক ম্যানেজমেন্ট (এনপিএম) বিকাশের মাধ্যমে। এনপিএম সম্ভবত সরকারি খাতের উদ্ভাবনের সেরা উদাহরণ। এখন এটি সর্বজনস্বীকৃত যে এনপিএম কেবল প্রশাসনিক সংস্কার নয় বরং একটি সাংস্কৃতিক প্রকল্প, যা সরকারি খাতের মূল্যবোধকে নতুন করে বিনির্মাণ করেছে।

এছাড়া, লিসবন কৌশলের (মার্চ ২০০০) পেছনের ধারণাটি হলো— উদ্ভাবন যা ইউরোপীয় কাউন্সিলের অর্থনৈতিক পরিবর্তনের প্রত্যাশিত প্রধান চালিকাশক্তি। আরেকটি উদাহরণ হলো— ডাচ ইন্টিগ্রেটেড এনভায়রনমেন্টাল লাইসেন্স যেখানে বিভিন্ন আইন ও প্রবিধানের উপর ভিত্তি করে বিভিন্ন আইনি বাধ্যবাধকতা মোকাবিলা করে সকল প্রয়োজনীয় পরিবেশগত অনুমতিপত্রকে একটি প্ল্যাটফর্মের মধ্যে নিয়ে আসা হয়েছে। বাংলাদেশের ডিজিটাল জন্মনিবন্ধন ও জাতীয় পরিচয়পত্র ব্যবস্থা সরকারি খাতে উদ্ভাবনের একটি উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত। এ উদ্যোগ রাষ্ট্রীয় সেবা পরিকল্পনা, ভোটার তালিকা, সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি এবং আর্থিক অন্তর্ভুক্তিতে কাঠামোগত পরিবর্তন এনেছে। একইভাবে, ই-জিপি (Electronic Government Procurement) ব্যবস্থা সরকারি ক্রয়ে স্বচ্ছতা ও দক্ষতা বৃদ্ধি করেছে যা দুর্নীতি হ্রাসে সহায়ক হয়েছে।

এত কিছুর পরও প্রশ্ন রয়েই যাচ্ছে যে কেন সরকারি খাতে উদ্ভাবন অনুপস্থিত? এর নেপথ্যে অনেক কারণ রয়েছে। এ আলোচনায় অন্তত সাতটি কারণ উল্লেখ করতে চাই। প্রথমত, প্রণোদনার অভাব। অন্যদিকে, অনেকসময় বাজার অর্থনীতির অপর্যাপ্ত বিকাশও এর জন্য দায়ী। Schumpeter (১৯৪২) এর মতে, বাজার প্রতিযোগিতার অনুপস্থিতি কিছুটা হলেও সরকারি খাতে সীমিত উদ্ভাবনের কারণ।

দ্বিতীয়ত, সরকারি খাতে এমনিতেই প্রয়োজনের তুলনায় অধিক লোক কাজ করে। ফলে একটা বড় অংশের জন্য কাজের প্রান্তিক উপযোগ শূন্য। ফলে এখান থেকে লোকবল সরিয়ে নিলে মোট উৎপাদন ব্যাহত হবে না, যা বেসরকারি খাতের তুলনায় সম্পূর্ণ বিপরীত। এ ধারণা থেকেই ছোট আকারের সরকারের ধারণার জন্ম হয়েছে। ফলে উদ্ভাবনের কারণে যদি কিছু লোকের কাজের প্রয়োজনীয়তা কমে যায় তাহলে কী করা যাবে?

তৃতীয়ত, সরকারি খাতের কর্মচারীদের জন্য কোনও নির্দিষ্ট কাজের বিবরণ নেই। সহজভাবে ধরে নেওয়া যাক যে, ১০ জন কর্মচারী বিশিষ্ট একটি প্রশাসনিক শাখা নাগরিকের জন্য ১০০ ইউনিট উৎপাদন করছে। প্রযুক্তিগত অগ্রগতির মাধ্যমে এখন যদি ৮ জন ব্যক্তি দ্বারা একই উৎপাদন সম্ভব হয়— তাহলে বাকি ২ জনের কাজ বা দায়িত্ব কী হবে? তারা কি আগের মতো সোশ্যাল মিডিয়ায় ব্যস্ত সময় কাটাবে? এ উদ্ভাবনকে ঘিরে আরও অনেক প্রশ্ন উত্থাপিত হতে পারে। ক. এ প্রশাসনিক ইউনিট কি আসলেই তাদের কাজের বিবরণ জানে, যাতে এ দুই ব্যক্তির কাজ আলাদা করা যায়? খ. উদ্ভাবন কি কর্মসংস্থানের প্রশ্ন তোলে? এ দুই ব্যক্তিকে কি অন্য কোনও প্রশাসনিক ইউনিটে স্থানান্তর করা সম্ভব? গ. যদি অব্যবহৃত ২ ব্যক্তি দিয়ে কিছু উৎপাদন করা সম্ভব না হয়, তাহলে উদ্ভাবনের প্রত্যাশিত ফলাফল কী হবে?

চতুর্থত, সরকারি দফতরে উদ্ভাবনকে বিভিন্ন নাম এবং ব্যানারে অনেক বাধার সম্মুখীন হতে হয়। যেমন, পরিবর্তন প্রতিরোধ করার মানসিকতা, অতিরিক্ত আমলাতন্ত্র, বিদ্যমান চিন্তাভাবনা লালন করার কারণে মনস্থাত্তিক বাধা, রুটিন এবং অভিজ্ঞতার ওপর অত্যধিক নির্ভরতা এবং উদ্ভাবন প্রক্রিয়া পরিচালনার ক্ষেত্রে ব্যবস্থাপনার অক্ষমতা, ইত্যাদি।

পঞ্চমত, সরকারি খাত খুবই বৈচিত্র্যময় যেখানে বিভিন্ন ধরনের কাজ সম্পন্ন হয়। সরকারি খাতের জন্য একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হলো— সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া। তাই অনেকসময় এ প্রক্রিয়ায় উদ্ভাবন কার্যকর হয় না। তদুপরি, দীর্ঘ কমান্ড শৃঙ্খলের কারণে সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়াটি বেসরকারি খাতের তুলনায় ধীর হতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে সরকারি কাঠামোর বৃহত্তর আকার উদ্ভাবনের জন্য নেতিবাচক ধারণা তৈরি করে।

ষষ্ঠত, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ উদ্ভাবনের জন্য একটি বাহ্যিক ‘ট্রিগার’ হিসেবে কাজ করে, যা পরিচালনা করাও কঠিন।

সপ্তমত, সম্পদের অভাব বা অপর্যাপ্ততাও উদ্ভাবনকে নিরুৎসাহিত করতে পারে।

উদ্ভাবনের জন্য অর্থনীতির ভেতর থেকে চাহিদা তৈরি হওয়াও জরুরি। একটি চমৎকার উদাহরণ দেই। জাপানের দ্রুত শিল্পায়ন ও মোটরায়নের ফলে ১৯৬০ ও ১৯৭০ এর দশকে শহুরে অঞ্চলে যানবাহনের শব্দ দূষণ একটি গুরুতর সামাজিক সমস্যা হয়ে ওঠে। নতুন এক্সপ্রেসওয়ে ও ভারী ট্রাক চলাচলের কারণে রাস্তার পাশের আবাসিক এলাকায় অতিরিক্ত শব্দ সৃষ্টি হয়— যা জনস্বাস্থ্য ও জীবনমানের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এর পরিপ্রেক্ষিতে জাপান সরকার ও মহাসড়ক কর্তৃপক্ষ বিভিন্ন স্থানে শব্দ প্রতিরোধী দেয়াল বা noise barrier নির্মাণ করে। প্রথম দিকে এসব শব্দ-প্রাচীর কার্যকর হলেও সেগুলো শহরের দৃশ্যমানতা ও নান্দনিকতাকে ব্যাহত করেছিল। ফলে নগর পরিকল্পনাবিদ, স্থপতি এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে এ নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়— কীভাবে শব্দ কমানো যায়, আবার শহরের খোলা ভাব ও দৃষ্টিসীমাও বজায় রাখা যায়। এ দ্বন্দ্বের সমাধানে জাপান ধীরে ধীরে কংক্রিট দেয়ালের বদলে স্বচ্ছ ও আধা-স্বচ্ছ শব্দ-প্রাচীর, সবুজ বাফার জোন এবং উন্নত সড়ক ও টায়ার প্রযুক্তি ব্যবহার শুরু করে।

পরবর্তীকালে উদ্ভাবনের আলোকে সরকার যানবাহনের উৎসেই শব্দ কমানোর দিকে জোর দেয়— কঠোর শব্দমানদণ্ড, উন্নত ইঞ্জিন প্রযুক্তি এবং পরবর্তীকালে হাইব্রিড ও বৈদ্যুতিক যানবাহনের প্রসার ঘটানো হয়। এর ফলে শব্দ দূষণ নিয়ন্ত্রণ আর শুধু অবকাঠামোগত সমাধান নয়, বরং প্রযুক্তি, নকশা ও নীতির সমন্বিত ফল হয়ে ওঠে। জাপানের এ অভিজ্ঞতা দেখায় যে, আধুনিক নগর সমস্যার সমাধান কোনও একক পদক্ষেপে সম্ভব নয়, বরং সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্যতা প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনের মাধ্যমে নগর নকশার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করাই টেকসই সমাধানের পথ।

বাস্তবিক অর্থে, উদ্ভাবনের ক্ষেত্রে দুটি জায়গায় সরকার মনোযোগ দিতে পারে; ‘পরিষেবা স্তর’ ও ‘নীতি স্তর’। পরিষেবা পণ্য উৎপাদন প্রক্রিয়ার নতুন বৈশিষ্ট্য বা নকশা প্রণয়ন, পরিষেবা প্রদানের নতুন বা পরিবর্তিত উপায়, অন্যান্য সংস্থার সাথে সমন্বয়ে নতুন বা পরিবর্তিত উপায় ও কৌশল প্রয়োগের মাধ্যমে পরিষেবা স্তরের উদ্ভাবন সম্ভব হতে পারে। অপরদিকে, নীতিগত স্তরের উদ্ভাবনকে নিম্নলিখিত বৈশিষ্ট্যগুলির দ্বারা চিহ্নিত করা যেতে পারে: নতুন বা পরিবর্তিত নীতি এবং নীতিগত উপকরণ, কার্যক্রম সংগঠিত বা পরিচালনার নতুন বা পরিবর্তিত উপায়, অন্যান্য সংস্থার সঙ্গে মিথষ্ক্রিয়ায় নতুন বা উন্নত উপায় ইত্যাদি।

উদ্ভাবনকে সাধারণত নতুন প্রযুক্তি, স্টার্টআপ বা বেসরকারি উদ্যোগের সঙ্গে বেশি যুক্ত করা হয় এবং প্রায়শই ব্যক্তি বা বেসরকারি খাতের একক কৃতিত্ব হিসেবে উপস্থাপন করা হয়, যেখানে সরকারি খাতের ভূমিকা তুলনামূলকভাবে অবমূল্যায়িত থাকে। কিন্তু বাস্তবে উদ্ভাবন কেবল ব্যক্তি বা বেসরকারি খাতের একচেটিয়া বিষয় নয়; বরং রাষ্ট্র ও সরকারি খাতের সক্রিয় অংশগ্রহণে টেকসই উদ্ভাবন হয়ে থাকে। মূলত ব্যক্তি ও সরকারি খাতে উদ্ভাবন একটি পারস্পরিক নির্ভরশীল প্রক্রিয়া যা উন্নয়ন রাষ্ট্রের মৌলিক ভিত্তি গড়ে তোলে। ব্যক্তি ও সরকারি খাত— এ দুই স্তম্ভের পারস্পরিক সম্পর্কই একটি দেশের জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতি, সামাজিক অগ্রগতি এবং দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের ভিত রচনা করে। উদ্ভাবনকে ব্যক্তি বনাম রাষ্ট্রের দ্বন্দ্ব হিসেবে নয়; বরং যৌথ উন্নয়ন প্রকল্প হিসেবে বিবেচনা করাই সমসাময়িক উন্নয়ন চিন্তার মূল শিক্ষা।

লেখক: উন্নয়ন অর্থনীতি গবেষক

/এপিএইচ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
জুলাই কুস্তিগিরদের আগাম অভিনন্দন, মাইর একটাও মাটিতে পড়বে না: মাহফুজ আলম
জুলাই কুস্তিগিরদের আগাম অভিনন্দন, মাইর একটাও মাটিতে পড়বে না: মাহফুজ আলম
টিভিতে আজকের খেলা (৩ আগস্ট, ২০২৬)
টিভিতে আজকের খেলা (৩ আগস্ট, ২০২৬)
সম্পত্তির বিরোধের জেরে বিচারকের বিরুদ্ধে হয়রানি করার অভিযোগ
সম্পত্তির বিরোধের জেরে বিচারকের বিরুদ্ধে হয়রানি করার অভিযোগ
মতপ্রকাশের জন্য শিক্ষককে শাস্তি দেওয়া যায় না: বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্ক
মতপ্রকাশের জন্য শিক্ষককে শাস্তি দেওয়া যায় না: বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্ক
সর্বশেষসর্বাধিক