আমাদের দেশে প্রায়শই শিশু শিক্ষার্থীদের নিষ্ঠুর নির্যাতনের চিত্র, সংবাদ ও ভিডিও মেইন স্ট্রিম মিডিয়া এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় ব্যাপকভাবে প্রচারিত হতে দেখা যায়। শুধু মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন নয়, পাশবিক নির্যাতনের খবরও পাওয়া যায় বিস্তর। বিভিন্ন ছবি ও ভিডিওতে এমন দৃশ্য দেখা যায় যে শিশুর সারা গায়ে বেত্রাঘাতের চিহ্ন লাল/কালো দাগ হয়ে ফুলে উঠেছে! কারও নাক, চোখ, কান, মাথা ফাটিয়ে রক্তাক্ত করে দেওয়া হয়েছে! শিশুর মাথা বেঞ্চের নিচে আটকে দিয়ে গায়ে অগণিত বেত্রাঘাত করা হচ্ছে! একজনে শিশুর হাতে-পায়ে ধরে রেখেছে, অপরজন সর্বশক্তি দিয়ে উপর্যুপরি বেত্রাঘাত করছে! পায়ে দড়ি বেঁধে মাথা নিচে দিয়ে শিশুকে ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছে! নির্যাতনে মৃতপ্রায় হয়ে শিশুশিক্ষার্থী হাসপাতালে কাতরাচ্ছে! এসব শিশুর কান্নায় হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হওয়ার উপক্রম হচ্ছে!
এসব নিষ্ঠুর দৃশ্য-চিত্রে বেশিরভাগ ব্যক্তিগত আক্রোশের বহিঃপ্রকাশ চরমভাবে লক্ষণীয় হয়। আক্রমণের ধরন দেখে মনে হয়, চির শত্রুকে হাতে পেয়ে চিরতরে নিঃশেষ করে দেওয়ার জন্য মরিয়া হয়ে নেমে পড়েছে! কারও কল্যাণ প্রত্যাশা করলে, কারও প্রতি বিন্দুমাত্র স্নেহ থাকলে, মায়া থাকলে, মমতা থাকলে, ভালোবাসা থাকলে, সহানুভূতি থাকলে— এমন নির্মমভাবে সর্বশক্তি দিয়ে বিরামহীন অগণিত আঘাত করা অসম্ভব। যিনি প্রকৃত শিক্ষক বা হুজুর, প্রকৃত মানুষ তিনি কখনোই শিশুদের প্রতি, শিক্ষার্থীদের প্রতি, এমন নির্মম হতে পারেন না, নিষ্ঠুর হতে পারেন না, অমানবিক হতে পারেন না, পাশবিক হতে পারেন না।
এসব আঘাত শিশুশিক্ষার্থীরা যে কেবল অঙ্গে বা শরীরে পায় তা নয়; তাদের কোমল হৃদয়ে সবচেয়ে বেশি স্থায়ী হয় এই নিষ্ঠুরতার ও পাশবিকতার দাগ! এ কারণে তারা ট্রমাটাইজড থাকতে পারে আজীবন। নির্যাতন সহ্য করতে বা মেনে নিতে না পেরে শিক্ষায় পিছিয়ে পড়ে বা শিক্ষাজীবন থেকে ঝরে পড়ে অনেকেই। যারা টিকে যায় বা পালিয়ে যেতে পারে না বা যাওয়ার জায়গা থাকে না, তারা নির্যাতনের শিকার হয়ে, নিরানন্দে নিমজ্জিত হয়ে, ভয়ে তটস্থ হয়ে, শিক্ষার নামে যা-ই নেয় তার বেশির ভাগই মনে নেয় না, মেনে নেয়। ফলে ওই শিক্ষা সার্থকভাবে সঞ্চারিত হয় না সকল শিক্ষার্থীর অন্তরে, মননে, মগজে। হয় না তাদের সঠিক শিক্ষা অর্জন তথা ‘আচরণের স্থায়ী অনুকূল পরিবর্তন’। যেমন- অনুকূল পরিবর্তন হয়নি আলোচিত নির্যাতনকারী শিক্ষক বা হুজুরদের এবং নিষ্ঠুর নির্যাতন সমর্থনকারীদের।
শিক্ষকতা পেশায় নিয়োজিত কতিপয় অশিক্ষক এ ধরনের অপকর্মে বেশি জড়িত। বিশেষ করে অনুমোদনহীন ও সরকারি নিয়ন্ত্রণহীন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে শিশুশিক্ষার্থীদের নিষ্ঠুর নির্যাতন সর্বাধিক হয়ে থাকে। এর মধ্যে আবাসিক স্কুল ও মাদ্রাসায় থাকা ছেলে-মেয়েদের মানসিক, শারীরিক ও পাশবিক নির্যাতনের মাত্রা চরমে! অগণিত নির্যাতনের শতকরা দু’একটি হয়ত আমরা জানতে পারি। বাদবাকি নির্যাতিত শিশুরা এমনকি তাদের অভিভাবকরাও মুখ খোলে না আরও বেশি নির্যাতনের ভয়ে। সরকারি, সরকার অনুমোদিত ও বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানের শিশুশিক্ষার্থীরাও শতভাগ নির্যাতনমুক্ত নয়।
এসব অনুমোদনহীন স্কুল ও মাদ্রাসায় শিক্ষক নিয়োগের মানসম্পন্ন কোনও মানদণ্ড প্রতিষ্ঠিত নেই। ফলে যে কেউ বা কয়েকজন মিলে একটি প্রতিষ্ঠান তৈরি করে নিজেরাই শিক্ষক বা হুজুর হয়ে যান। তাদের অনেকেরই সরকার স্বীকৃত শিক্ষাসনদ নেই বা কাঙ্ক্ষিত শিক্ষাগত যোগ্যতা নেই। বিশেষ করে আধুনিক শিক্ষাবিজ্ঞান ও শিশুমনোবিজ্ঞান সম্পর্কে তাদের তেমন কোনও ধারণাই নেই। বিজ্ঞানসম্মত পাঠদানের কোনও প্রশিক্ষণ নেই। শিক্ষার্থীদের বুঝিয়ে, যুক্তি দিয়ে, উৎসাহ দিয়ে, উদ্দীপনা দিয়ে, বৈজ্ঞানিক কৌশলে নিয়ন্ত্রণ করার কোনও যোগ্যতাই তাদের নেই। শিক্ষার্থী নির্যাতনবিরোধী সরকারি আইনও তারা জানেন না, মানেন না, জানতে চান না। বরং এগুলোর গুরুত্ব অস্বীকার করেন।
শিক্ষাবিজ্ঞান ও শিশুমনোবিজ্ঞান সম্পর্কে অজ্ঞ থাকার কারণে এবং শিক্ষকতা সম্পর্কিত প্রশিক্ষণ না থাকার কারণে তারা মনে করেন— সুশিক্ষার জন্য প্রেষণার চেয়ে শাসন-বারণ অধিক কার্যকর। তাদের কেউ কেউ এমনও যুক্তি দিয়ে থাকেন যে, আমাদের যারা শিক্ষা দিয়েছেন, তারা আরও বেশি পিটিয়েছেন। তবেই তো আমরা মানুষ হয়েছি। আসলে তারা কতটুকু মানুষ হয়েছে সেটি প্রশ্নবিদ্ধ! কেননা, যিনি মানুষ হয়ে উঠবেন, মানবিক হয়ে উঠবেন, বিবেকবান হয়ে উঠবেন, প্রকৃত ধর্মপ্রাণ হয়ে উঠবেন— তার দ্বারা শিক্ষার নামে শিশুশিক্ষার্থী নির্যাতিত হবে না, নিষ্পাপ শিশুদের নির্যাতন সমর্থিত হবে না, কখনোই কোনও অন্যায় হবে না। তাদের অজ্ঞতা এমন মাত্রায় যে, তারা শাসন এবং নির্যাতনের পার্থক্য বুঝে না, বুঝালেও মানে না। তারা মনে করে, মানসিক ও শারীরিকভাবে শিশুদের অপমান করে, অপদস্থ করে, বকাবকি করে, সর্বশক্তি দিয়ে পিটিয়ে নিষ্ঠুর নির্যাতন করে কোনও কিছু করতে বা না করতে বাধ্য করাই শাসন করা। অর্থাৎ তাদের বক্তব্য অনুসারে নির্যাতন করাই শাসন করা বা শাসন করাই নির্যাতন করা— যা সম্পূর্ণ ভ্রান্ত ধারণা।
প্রকৃতপক্ষে শিশু শিক্ষার্থীদের শাসন করা হচ্ছে— আদর দ্বারা, নিয়ম দ্বারা, যুক্তি দ্বারা, জ্ঞান দ্বারা, উৎসাহ দ্বারা, উদ্দীপনা দ্বারা, পরামর্শ দ্বারা, পুরস্কার দ্বারা, অনুকরণ দ্বারা, অনুসরণ দ্বারা, অনুশীলন দ্বারা মন্দ মুক্ত ও ভালো যুক্ত করা। এর জন্য শিক্ষকের থাকতে হয় বিষয় জ্ঞানের পাশাপাশি শিক্ষকতা সম্পর্কিত অনেক জ্ঞান ও প্রশিক্ষণ। তদুপরি থাকতে হয় অনেক ধৈর্য, বুদ্ধিমত্তা, ব্যক্তিত্ব, নৈতিকতা, যৌক্তিকতা, সহমর্মিতা, আন্তরিকতা ইত্যাদি। শিক্ষকদের এমন গুণ না থাকলে শিক্ষার্থীরা শিখবে কোথা থেকে? আমাদের সমাজে ও অধিকাংশ পরিবারে তো উল্টা চিত্রই বেশি। যেসব শিক্ষক/হুজুরের এমন যোগ্যতা ও দক্ষতা নেই, তারা শিক্ষার্থীদের নির্যাতন করাকেই পাঠদানের সহজ কৌশল মনে করে ও প্রয়োগ করে।
দুঃখজনক হলেও সত্য যে এসব বিবেকহীন নিষ্ঠুর শিক্ষক/হুজুরদের বিরুদ্ধে যতটা প্রতিবাদ, প্রতিরোধ, প্রতিকার থাকা উচিত, ততটা আমাদের দেশে নেই। অথচ এসব অশিক্ষকদের অপকর্মে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা ও শিক্ষক সমাজ বারবার ঘৃণিত হয়, বিতর্কিত হয়, অপমানিত হয়, ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তথাপি তারা নিজেদের দোষ স্বীকার করে না। কিছু বলতে গেলে শত্রু মনে করে। তাই সঠিক শাস্তি নিশ্চিত করে, অশিক্ষকদের নিশ্চিহ্ন করে, সব ধরনের শিক্ষাক্ষেত্র শিক্ষার্থীদের জন্য নিরাপদ করে, সুশিক্ষিত জাতি গড়ে তোলার জন্য সবাই বিশেষকরে প্রকৃত শিক্ষক-হুজুর, নেতা-কর্মী, জনপ্রতিনিধি, আমলা ও সরকারের সক্রিয় হওয়া অত্যন্ত জরুরি।
সারা দেশের আনাচে-কানাচে অবস্থিত ছোট-বড় সব ধরনের শিক্ষাকেন্দ্র বা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আনতে হবে সরকারি নিয়ন্ত্রণে। উচ্চশিক্ষিত ভালো মানুষদের ও সচেতন অভিভাবকদের অংশগ্রহণে বৃদ্ধি করতে হবে কমিউনিটি পার্টিসিপেশন। এতিম, অসহায় ও হতদরিদ্র শিশুদের সব দায়িত্ব নিতে হবে সমাজ ও রাষ্ট্রের।
সঠিকভাবে বাছাই করে ও আধুনিক প্রশিক্ষণ দিয়ে নিশ্চিত করতে হবে শিক্ষকদের ন্যূনতম যোগ্যতা ও দক্ষতা। প্রয়োজনে গোল্ডেন হ্যান্ডশেক দিয়ে করতে হবে ছাঁটাই। মনে রাখতে হবে, যুগের পরিবর্তনের কারণেই বর্তমান শিশুরা আগের শিশুদের মতো নয়। তাই বর্তমান শিশুদের পাঠদান ও নিয়ন্ত্রণ আগের মত সহজ ও মোটা বুদ্ধির কাজ নয়, অত্যন্ত সূক্ষ্ম, কঠিন ও মনস্তাত্ত্বিক কাজ। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে স্থাপন করতে হবে পর্যাপ্ত অভিযোগ বাক্স ও সিসি ক্যামেরা। এগুলোর নিয়ন্ত্রণ ও তদারকি রাখতে হবে সরকার ও অভিভাবক তথা কমিউনিটির হাতে। আবাসিক শিশুশিক্ষার্থীদের সাপ্তাহিক ও অন্যান্য ছুটিকালে পাঠাতে হবে পরিবারের সান্নিধ্যে। প্রতি সপ্তাহে অন্তত একবার একান্তে স্বাধীনভাবে কথা বলার সুযোগ দিতে হবে তাদের অভিভাবক বা আপনজনের সঙ্গে এবং সরকারি ও কমিউনিটি প্রতিনিধির সঙ্গে। সর্বোপরি সঠিকভাবে প্রচার ও প্রয়োগ করতে হবে শিক্ষার্থী নির্যাতনবিরোধী আইনসহ সংশ্লিষ্ট সকল সরকারি আইন।
মো. রহমত উল্লাহ্: সাবেক অধ্যক্ষ, শিশুসাহিত্যিক ও শিক্ষা গবেষক
Email: [email protected]




