কেন থামানো যাচ্ছে না মব ভায়োলেন্স?

সুলতানা স্বাতী
১৯ এপ্রিল ২০২৬, ১৪:০০আপডেট : ২০ এপ্রিল ২০২৬, ১৪:১১

কোরিয়ান সিরিজ ‘অল অফ আস আর ডেড’ দেখেছেন? একটি ভাইরাস একজন মানুষের শরীরে ঢুকে যায়। সে যাকেই কামড়ায়, সেই মানুষটিও জম্বিতে পরিণত হয়। এরপর তারা মরিয়া হয়ে ওঠে—আরও মানুষকে সংক্রমিত করার জন্য। একসময় অবস্থা এমন হয়, পুরো এলাকা ভরে যায় জম্বিতে। তারা একসাথে দৌড়ায়, চিৎকার করে, পাগলের মতো ছুটে যায় এক-দুই জন সুস্থ মানুষের পেছনে। সহপাঠী, বন্ধু, শত্রু, কোনও বাছ-বিচার নাই। তাদের একটাই লক্ষ্য—আক্রমণ।

এই সিরিজটি আমি দেখেছিলাম আমার ছেলের সঙ্গে বসে। যখন দেখেছিলাম, তখন দেশে মবের রাজত্ব কায়েম ছিল। প্রতিটা পর্ব দেখার সময় চারপাশে ঘটে যাওয়া মব সহিংসতাগুলোর কথা ভেবে শিউরে উঠছিলাম। এই জম্বিদের সঙ্গে মবকারীদের কি কোনও পার্থক্য আছে? এক একটি মবের ঘটনা মনে করে দেখুন। সেখানে মানুষও যেন জম্বির মতোই আচরণ করে। নিয়ন্ত্রণহীন, উত্তেজিত, আক্রমণাত্মক। কাউকে মারার জন্য, কিছু একটা ভাঙার জন্য—আরও ভয়ংকর হয়ে ওঠে এই মবকারীরা। জম্বিদের শরীরে না হয় ভাইরাস ঢুকে যাওয়ায় তারা পাগলের মতো আচরণ করে। কিন্তু মবের মধ্যে থাকা মানুষগুলো কেন উন্মত্ত হয়ে ওঠে? কেন মানুষ হঠাৎ করেই ভয়ংকর হয়ে ওঠে? কিংবা বলা চলে, একা একজন মানুষ হয়তো একেবারেই নিরীহ। কিন্তু দলের মধ্যে ঢুকেই কেন সে হয়ে ওঠে হিংস্র, আক্রমণাত্মক ও নিয়ন্ত্রণহীন?

ফরাসি সমাজ-মনোবিজ্ঞানী গুস্তাভ লে বোঁ তার ক্রাউড সাইকোলজি তত্ত্বে বলেছেন, মব বলতে বোঝায়—একটি উত্তেজিত, নিয়ন্ত্রণহীন জনতা, যারা আবেগের বশে সহিংস বা আক্রমণাত্মক আচরণ করে। এই ধারণাটি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি বলেছেন, ভিড়ের মধ্যে মানুষ তার ব্যক্তিগত বিচারশক্তি হারিয়ে ফেলে এবং আবেগ দ্বারা চালিত হয়। মব বা জনতার সহিংসতা সাধারণত তখন ঘটে, যখন অনেক মানুষ একসঙ্গে আবেগে বা উত্তেজনায় সিদ্ধান্ত নেয়। একে সমাজবিজ্ঞানে ‘সমষ্টিগত আচরণ’ বলা হয়। আর এই আচরণ সাধারণত কয়েকটি কারণে শক্তিশালী হয়ে ওঠে।

এক. গুজব

‘অল অফ আস আর ডেড’ সিরিজে জম্বি হওয়ার পেছনে ছিল ‘জোনাস ভাইরাস’। আর আমাদের দেশে মব ভায়োলেন্সের মূল ভাইরাস হলো ‘গুজব’ আর ‘উসকানি’। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটা অস্পষ্ট পোস্ট বা জনৈক ব্যক্তির চিৎকার (ভয়েস মেসেজ বা লাইভ ভিডিও) বা আহ্বান- মুহূর্তের মধ্যে কয়েকশত সুস্থ মানুষকে মানসিক জম্বিতে রূপান্তরিত করে ফেলে। জম্বিরা যেমন চিন্তা করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে, মবকারীরাও ঠিক তেমনই হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে পড়ে। তখন তাদের কাছে রক্তমাংসের মানুষটা আর মানুষ থাকে না, স্রেফ একটা লক্ষ্যবস্তু হয়ে দাঁড়ায়। প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার পুড়িয়ে দেওয়ার ঘটনায় এই বিষয়টা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

অনেকেই মনে করেন, মব নেতৃত্বহীন। কিন্তু এই ঘটনা প্রমাণ করেছে আসলে ‘মব লিডার’ থাকে— যদিও তা আনুষ্ঠানিক নয়। এই অনানুষ্ঠানিক নেতারা পরিস্থিতি দ্রুত উত্তপ্ত করে। এছাড়া ভিড়ের মধ্যে কিছু মানুষ থাকে যারা স্লোগান দেয়, প্রথম আঘাত করে এবং অন্যদের উসকায়। ফলে দেখা যায়, মব ধীরে তৈরি হয় না বরং একটি পোস্টও মুহূর্তেই শত শত মানুষকে উত্তেজিত করে তুলতে পারে। আর ১০-১৫ মিনিটেই ভিড় সহিংস হয়ে উঠতে পারে।

দুই. ভিড়ের মনস্তত্ত্ব

সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, একা একজন মানুষ যখন কোনও অপরাধ করতে যায়, তার মনে বিচার ধরা পড়া বা শাস্তির ভয় থাকে। কিন্তু যখন সে মবের অংশ হয়, তখন তার ব্যক্তিগত পরিচয় বিলীন হয়ে যায়। একে বলা হয় ‘ব্যক্তিসত্তার বিলোপ বা পরিচয়হীনতা’। সে তখন ভাবে আমি একা তো মারছি না, সবাই মারছে; তাই দায়ও সবার। এই যৌথ অপরাধবোধহীনতা তাকে জম্বিদের মতোই ভয়ংকর করে তোলে।

যখন অনেক মানুষ একসঙ্গে থাকে—কেউই নিজেকে পুরোপুরি দায়ী মনে করে না। ফলে অপরাধ করাটা সহজ হয়ে যায়। যদি মানুষ দেখে, মব করে অনেকে পার পেয়ে যাচ্ছে, দ্রুত বিচার হচ্ছে না। তাহলে ভয় কমে যায়। ‘আমারও কিছু হবে না’—এমন ভাব তৈরি হয়। এছাড়া ‘আইনে দিলে বিচার হবে না। এখনই শাস্তি দেওয়া উচিত’—এই মানসিকতা মানুষকে আইন নিজের হাতে নিতে প্ররোচিত করে।

তিন. অমানবিকীকরণ

সিরিজটিতে দেখা যায়, নিজের প্রিয় বন্ধু বা সহপাঠী যখন জম্বি হয়ে যায়, সে আর বন্ধু থাকে না—হয়ে ওঠে ভয়ংকর শত্রু। মব ভায়োলেন্সের ক্ষেত্রেও এই একই প্রক্রিয়া কাজ করে। একে বলা হয় অমানবিকীকরণ। কোনও একজনকে ‘চোর’, ‘ছেলেধরা’ বা ‘পাপী’ ট্যাগ দিয়ে দিলে, ভিড়ের মানুষগুলো তাকে আর মানুষ হিসেবে দেখে না। সে তখন শুধুই ওই ট্যাগধারী হয়ে যায়। অথচ ঘটনার সময় অনেকেই থাকে। কেউ ভিডিও করে, কেউ দাঁড়িয়ে দেখে। খুব কম মানুষ থামাতে এগিয়ে আসে। আর সবচেয়ে ভয়ংকর দিক হলো—মবে অংশ নেওয়া অনেক মানুষ পরে বুঝতেই পারে না সে কীভাবে এর অংশ হয়ে গেলো? কারণ সেই মুহূর্তে সে ‘আমি’ থাকে না— সে হয়ে যায় ‘আমরা’।

কারা মব করে?

এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সত্যটি হলো—মব কোনও নির্দিষ্ট শ্রেণির মানুষের কাজ নয়। মবকারীরা কোনও নির্দিষ্ট ‘খারাপ’ মানুষের দল নয়। শিক্ষিত বা অশিক্ষিত—দুই শ্রেণির মানুষই মবে থাকতে পারে। দরিদ্র বা মধ্যবিত্ত—সবাই অংশ নিতে পারে। এমনকি সাধারণত শান্ত স্বভাবের মানুষ যাদের আমরা প্রতিদিন দেখি, তারাও মবের অংশ হয়ে যেতে পারে। অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছরে একের পর এক মব সন্ত্রাসের ঘটনায় মানুষ যখন বিপর্যস্ত হয়ে উঠছিল, তখন নির্বাচন তাদের মনে কিছুটা হলেও স্বস্তি আনে। আর বিএনপি সরকার গঠনের পরদিনই নতুন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহ উদ্দিন আহমদ ঘোষণা দেন—‘মব কালচার শেষ’। এর ফলে জনমনে আস্থা ফিরে আসে।  কিন্তু মব ভায়োলেন্স কি শেষ হয়েছে?

দিন কয়েক আগে রাজধানীর শাহবাগে আড্ডারত কয়েকজন নারী-পুরুষকে ‘সমকামী’, ‘ট্রান্সজেন্ডার’ আখ্যা দিয়ে মব সৃষ্টি করে, তাদের ওপর হামলা হয়। পরদিন কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলায় স্থানীয়ভাবে পীর হিসেবে পরিচিত একজনকে তার দরবারে ঢুকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। পুরোনো একটি ভিডিও সামনে এনে তার বিরুদ্ধে ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে এই হামলা হয়। ফলে প্রশ্ন উঠতে পারে, এই উন্মত্ততা বা মব ভায়োলেন্স থামানো যাচ্ছে না কেন?

এর উত্তর লুকিয়ে আছে আমাদের বিচারব্যবস্থার দীর্ঘসূত্রতা এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির অভাবে। ভাইরাসের প্রতিষেধক না থাকলে তা মহামারি আকার ধারণ করে, তেমনই মব ভায়োলেন্সের বিরুদ্ধে যদি কঠোর আইনি ব্যবস্থা না নেওয়া হয়, তবে এটিও মহামারির মতো ছড়িয়ে পড়ে। কোনও দেশের বিচার ব্যবস্থা শক্ত না হলে মানুষের মনে এক ধরনের ভয়ও কাজ করে। যেমন- ‘আমাদের এলাকায় অপরাধ বাড়ছে। আমরা নিরাপদ না’—এই ভয় মানুষকে আক্রমণাত্মক করে তোলে। সমাজের ভেতরের ক্ষোভ ও হতাশা, বেকারত্ব, বৈষম্য ও দীর্ঘদিনের অসন্তোষ বা জমে থাকা আবেগ মবের মধ্যে হঠাৎ বিস্ফোরিত হয়। কারণ এটি শুধু আইনশৃঙ্খলার সমস্যা না। এটি একটি সমষ্টিগত মানসিক ও সামাজিক সংকট।

এছাড়া আমাদের পারিবারিক ও সামাজিক অবক্ষয় এবং শিক্ষাব্যবস্থার অবনতি মব ভায়োলেন্স অব্যাহত থাকার একটা বড় কারণ। পরিবার একজন মানুষের প্রথম স্কুল। অথচ আমাদের পরিবারগুলোতে বেশিরভাগ সময়ই সহিষ্ণুতা বা অন্যের প্রতি শ্রদ্ধার শিক্ষা দেওয়া হয় না। ছোটবেলা থেকেই যদি পরিবারে অন্য ধর্ম, বর্ণ বা ভিন্ন মতাদর্শের মানুষকে ‘শত্রু বা খারাপ’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়, তবে শিশুর মনে ঘৃণার বীজ ঢুকে যায়। অনেক পরিবারে শিশুকে ‘ভয়’ দেখিয়ে বড় করা হয়। এই ভয়ই বড় হয়ে অন্যের প্রতি ‘আগ্রাসন’ হিসেবে প্রকাশ পায়।

আমাদের প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থা কেবল জিপিএ-৫ বা ভালো রেজাল্টমুখী। এখানে সহমর্মিতার শিক্ষা খুব কম। স্কুলগুলো শেখায় মুখস্থ করতে, প্রশ্ন করতে নয়। ফলে ১০ জন মিলে যখন কাউকে মারতে যায়, তখন শিক্ষিত যুবকটিও ভিড়ের সাথে যোগ দেয়; সে প্রশ্ন করতে শেখে না—কেন মারছি?

পাঠ্যপুস্তকে মানবিক মূল্যবোধ এবং নাগরিক অধিকারের চেয়ে তথ্যের ভার বেশি থাকে। ফলে শিক্ষার্থীরা আইন বা মানবাধিকার সম্পর্কে সচেতন হয়ে গড়ে ওঠে না। আমাদের সংস্কৃতিতে অনেক সময় আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়াকে বীরত্ব হিসেবে দেখানো হয়। অনেক সিনেমা বা নাটকে দেখানো হয়—নায়ক একাই ভিলেনকে জনসম্মুখে শাস্তি দিচ্ছে, আর সাধারণ মানুষ হাততালি দিচ্ছে। এই ধরনের ‘পপুলার কালচার’ মানুষের মনে এই ধারণা ঢুকিয়ে দেয় যে তাৎক্ষণিক বিচার করাই সঠিক।

এছাড়া আমরা ছোটবেলা থেকেই সহিংসতা দেখে বড় হই। ফলে অন্যকে আঘাত করা আমাদের কাছে অনেকটা স্বাভাবিক হয়ে যায়।

তবে বর্তমান সময়ের সবচেয়ে ভয়ংকর ব্যাপার হলো সোশ্যাল মিডিয়ার ব্যবহার। আমাদের শিশুরা বা তরুণরা কীভাবে ইন্টারনেট ব্যবহার করবে, সেই শিক্ষা বা পারিবারিক তদারকি নেই। ফলে একটি ভিডিও বা একটি পোস্টকে তারা সত্যি মনে করে আর সেটা দেখেই উত্তেজিত হয়ে ওঠে। ফলে দেখা যাচ্ছে, মবের শিকড় আসলে আমাদের সমাজের গভীরে ঢুকে গেছে। যদি আমরা এই মব-ভাইরাস থেকে নিজেদের রক্ষা করতে চাই, তবে কেবল আইনের শাসন দিয়ে তা সম্ভব নয়। প্রয়োজন পারিবারিকভাবে মূল্যবোধের শিক্ষা। জম্বিরা নিয়ন্ত্রণহীন, কারণ তাদের মস্তিষ্কে ভাইরাস। কিন্তু আমরা তো মানুষ, আমাদের তো বিবেক আছে। যখন আমরা ভিড়ের স্রোতে গা না ভাসিয়ে নিজের বিবেককে প্রশ্ন করতে শিখবো, তখন থেকেই হয়তো এই ‘মব ভায়োলেন্স’ নামক সামাজিক ভাইরাসের অবসান ঘটতে থাকবে।

লেখক: সাংবাদিক

/এপিএইচ/এমওএফ/ 

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
কালোটাকা ও সম্পদ-কর থেকে সরে আসছে সরকার
প্রবাসীদের জন্য সুখবরকালোটাকা ও সম্পদ-কর থেকে সরে আসছে সরকার
প্রবাসীসহ সব বাংলাদেশি বিনিয়োগকারীদের প্রণোদনা দেবে সরকার
প্রবাসীসহ সব বাংলাদেশি বিনিয়োগকারীদের প্রণোদনা দেবে সরকার
সব দলকে রাজনীতি করতে দিতে চায় বিএনপি, এর মধ্যে আ.লীগ কি আছে?
সব দলকে রাজনীতি করতে দিতে চায় বিএনপি, এর মধ্যে আ.লীগ কি আছে?
ইকরার মৃত্যু: জামিন পেলেন অভিনেতা জাহের আলভীর মা
ইকরার মৃত্যু: জামিন পেলেন অভিনেতা জাহের আলভীর মা
সর্বশেষসর্বাধিক