দুই মহাদেশের ‘ফুটবলযুদ্ধ’ বিশ্ব-কাঁপে

সাইদুর রহমান শামীম
১৩ জুন ২০২৬, ১০:০০আপডেট : ১৩ জুন ২০২৬, ১০:০৯

স্বাধীনতার শতবর্ষপূর্তি পালন করতে ল্যাটিন আমেরিকার দেশ উরুগুয়ে ফিফার উদ্যোগে প্রথম ফুটবলের বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপ আয়োজন করে ১৯৩০ সালে, যা পরবর্তীতে ফুটবলের বিশ্বকাপ বা ‘গ্রেটেস্ট শো অন আর্থ’ হিসেবে সারা দুনিয়ার স্বীকৃতি পায়। প্রথম আসরে অংশ নেওয়ার জন্য ল্যাটিন আমেরিকার সাত, নর্থ আমেরিকার দুই এবং ইউরোপের চারসহ ফিফা মাত্র ১৩টি দেশকে আমন্ত্রণ জানায় মূলত আর্থিক সীমাবদ্ধতা ও অনুন্নত যাতায়াত ব্যবস্থার কারণে। ‘ফুটবল বিশ্বকাপ’ নামে যে চারাটি রোপিত হয়েছিল ৯৬ বছর আগে আজ তা বিশাল মহীরুহে পরিণত জনপ্রিয়তা, বাণিজ্যিক সাফল্য এবং আধুনিক ধ্যান-ধারণার সফল প্রয়োগে।

অংশগ্রহণকারী মহাদেশের সংখ্যা, দল বেড়েছে। তবে শুরু থেকে আজ অবধি ফুটবলের বিশ্বকাপ মানেই দুই মহাদেশ, ল্যাটিন আমেরিকা ও ইউরোপের মাঠে আধিপত্য প্রতিষ্ঠার লড়াই। ২২ আসরের ১২টিতে ইউরোপের দেশ জিতেছে বিশ্ব-শিরোপা। দশবার ল্যাটিন আমেরিকায় গেছে স্বপ্নের ট্রফি। আফ্রিকা এবং এশিয়ার সেরা পারফরম্যান্স মরক্কো ও সাউথ কোরিয়ার একবার করে সেমিফাইনাল খেলা। ল্যাটিন আমেরিকা ও ইউরোপ, দুই মহাদেশ বহন করছে দুই ঘরানার ফুটবল দর্শন। ফুটবলের আঁতুড়ঘর ইংল্যান্ড, প্রচলনের সঙ্গী ইউরোপ। ইউরোপের ঔপনিবেশিক শাসকদের যুদ্ধজাহাজে চড়ে ফুটবল এসেছে এশিয়া, আফ্রিকায়, গেছে আটলান্টিকের ওপারের ল্যাটিন এবং নর্থ আমেরিকায়।

শাসকদের শোষণের জবাব দিতে ল্যাটিনরা ফুটবলকে অস্ত্র হিসাবে বেছে নেয়। সৃজনশীলতা, সম্মোহনী ড্রিবলিং, চোখজুড়ানো স্টাইল দিয়ে ল্যাটিনরা ফুটবলকে তুলেছে অনন্য উচ্চতায়। উরুগুয়ে, আর্জেন্টিনা, ব্রাজিলের শহরতলির বস্তির ঘিঞ্জি এলাকা থেকে যুগে যুগে উঠে আসছে পেলে, ম্যারাডোনা, সক্রেটিস, মেসি, জিকো রোনালদো, রোনালদিনিয়ো, সুয়ারেজের মতো সৃজনশীল ফুটবল নক্ষত্ররা। ক্ষুধা আর দারিদ্র্য নিয়ে বেড়ে ওঠা এরা ফুটবলকে আঁকড়ে ধরে জীবনে নানা সময়ে পাওয়া তুচ্ছতাচ্ছিল্য-বঞ্চনার জবাব দিয়েছেন।

এক বা একাধিক ফুটবলারের অতুলনীয় প্রতিভার ওপর ভর করে গড়ে ওঠে ল্যাটিন আমেরিকার একেক প্রজন্মের একেকটি দল। ফুটবলের প্রতি তীব্র ভালোবাসার তাগিদ থেকে তারা পাসিং ও ড্রিবলিংয়ে এনেছিলেন সম্মোহনী সৃজনশীলতা। ক্রমাগত আক্রমণকে তারা সাফল্য ও ভক্তদের মনজয়ের একমাত্র পথ বলে বিশ্বাস করেন। তুলনায় ইউরোপের ফুটবল দর্শন একেবারে ভিন্ন ঘরানার। শারীরিক সক্ষমতার সর্বোচ্চ ব্যবহার, কৌশল ও গেমপ্ল্যান নিয়ে ক্রমাগত গবেষণা ও অগ্রগতি, কট্টর পেশাদারিত্ব হলো ইউরোপীয় ফুটবল দর্শনের শেষ কথা। ইউরোপীয়রা ফুটবল খেলে মস্তিষ্ক দিয়ে, আবেগের উপস্থিতি অতটা তীব্র নয়। ফুটবলকে তারা ফলাফলনির্ভর একটি দলগত খেলা ভাবে। প্রতিপক্ষকে হারাতে না পারলেও হারা চলবে না, এই মন্ত্রে ইউরোপীয়রা সবার আগে নিজেদের ডিফেন্স সুরক্ষিত করে এবং সুযোগ বুঝে প্রতিপক্ষের রক্ষণে ঝাঁপিয়ে পড়ে। এই কৌশলের ক্রমাগত উৎকর্ষতা এসেছে কাউন্টার অ্যাটাক, দ্রুতগতির পজিশনাল প্লে, অ্যাটাকে ট্রানজিশন এবং ইনডিভিজুয়াল ও জোনাল প্রেসিংয়ের সফল প্রয়োগ ও হাইলাইন ডিফেন্স সিস্টেমে। তাই বলে ইউরোপীয় ফুটবল একেবারই ডিফেন্সিভ এবং শক্তি ও গতিনির্ভর, ব্যাপারটা তেমন নয়।

ইউরোপ ফুটবলে বারবার বিপ্লব এনেছে এবং আনছে। পঞ্চাশের দশকে পুসকাস, হিদেকুটির অপ্রতিরোধ্য হাঙ্গেরির ফুটবল শৈলীর উত্তরসূরি সত্তরের ইয়োহান ক্রুয়েফের নেতৃত্বে এসেছে নেদারল্যান্ডসের টোটাল ফুটবল। সেই ধারা বহন করেছে ক্রুয়েফের একদার দল বার্সেলোনার কোচ গার্দিওলার পরীক্ষা-নিরীক্ষা। এরই ধারাবাহিকতায় ২০১০-এর বিশ্বকাপে কোচ ডেল বস্ক’র স্প্যানিয়ার্ডরা টিকিটাকার কৌশলে বিশ্ব জয় করে। ইউরোপীয়দের প্রেসিং-কাউন্টার প্রেসিং, ট্রানজিশন অব অ্যাটাকের স্টাইলের সাথে ল্যাটিন আমেরিকার সৃজনশীলতাকে যোগ করে ৩৬ বছর পর আর্জেন্টিনাকে তৃতীয় বিশ্বকাপ এনে দেন কোচ লিওনেল স্ক্যালোনি।

২০২২ বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার পারফরম্যান্সে দেখা গেছে আঁটোসাঁটো রক্ষণের সাথে আক্রমণের অপূর্ব যোগসূত্র, ট্যাকটিক্যাল ফ্লেক্সিবিলিটি এবং ফলদায়ক অসাধারণ কাউন্টার অ্যাটাক। কোয়ার্টার ফাইনাল, সেমিফাইনাল এমনকি ফাইনালে তিন ধরনের ফরমেশনে একাদশ সাজিয়ে ‘লা-আলবিসেলেস্তেরা প্রতিপক্ষকে বোকা বানিয়েছে। ফুটবল বিশ্ব মুগ্ধ চোখে দেখেছে ইউরোপের ট্যাকটিকাল ভেরিয়েশনের জবাবে স্ক্যালোনির আর্জেন্টিনার ট্রানজিশান অব স্ট্র্যাটেজি। মূলত আর্জেন্টিনা ও স্ক্যালোনির এই বিশ্বজয় তাদের নিকটতম প্রতিদ্ব›দ্বী ব্রাজিলকে উৎসাহ দিয়েছে বাস্তববাদী হতে। নিজেদের যোগো বোনিতো বা সাম্বা ফুটবলের সাথে ইউরোপীয় স্টাইলের সমন্বয় ঘটাতে এতদিন রক্ষণশীলতা দেখানো ব্রাজিল এবার ভরসা করেছে ইউরোপের দুঁদে ট্যাকটিশিয়ান কার্লো আনচেলত্তির ওপর।

২০০২-এর পেন্টা জয়ের পর গত দুই যুগে সেলেসাওরা পাঁচ বিশ্বকাপের চারটিতে বিদায় নিয়েছে কোয়ার্টার ফাইনাল থেকে ২০১৪-এর দেশের মাটিতে ইউরোপের পাওয়ার হাউজ জার্মানির কাছে সেমিফাইনালে নাকাল হয়ে। ২০০২-এর পরের পাঁচ আসরের চারটিতে ট্রফি জিতেছে ইউরোপীয় দেশ। একবিংশ শতাব্দীতে ইউরোপীয়দের এই একচ্ছত্র আধিপত্যের পেছনে শক্তিশালী ঘরোয়া ও ক্লাব কাঠামো, তুখোড় পেশাদারিত্ব রেখেছে গুরুত্বপূর্ণ অবদান।

ক্লাব বা জাতীয় পর্যায়ে উন্নত পেশাদারী অবকাঠামো, ক্রীড়াবিজ্ঞানের সাহায্যে কৌশলগত অগ্রগতির গবেষণার সৌজন্যে ইউরোপে ফুটবল শিল্প এখন লাভজনক বিনিয়োগে পরিণত হয়েছে। ইউরোপের শীর্ষ ক্লাবগুলোর ইয়ুথ অ্যাকাডেমি ও ট্যালেন্ট হান্ট কর্মসূচি এখন তাদের উপমহাদেশের গন্ডি পেরিয়ে ল্যাটিন আমেরিকা, আফ্রিকা পর্যন্ত বিস্তৃত।

আর্জেন্টাইন শহর রোসারিও’র নিভৃতে লিওনেল মেসির মতো বিস্ময়কর প্রতিভার আবিষ্কার ও বিশ্ব-তারকায় পরিণত করার কৃতিত্ব বার্সেলোনার ইয়ুথ অ্যাকাডেমি ‘লা-মাসিয়ার’। একইভাবে ব্রাজিলের নেইমার, ভিনি, এনড্রিক, রডরিগো কিংবা উরুগুইয়ান ক্লাব পেনারল থেকে ইউরোপের মহাতারকা বনে যাওয়া ফ্রেডরিক ভালভার্দের রাজসিক উত্থানে স্প্যানিশ জায়ান্ট রিয়াল মাদ্রিদের স্কাউট টিম ‘ক্যাস্টিলার’ অবদান গুরুত্বপূর্ণ। এভাবেই ল্যাটিন আমেরিকার প্রতিভাবান কিশোররা বিকশিত হচ্ছে ইউরোপের কট্টর পেশাদারি সার্কিটে।

ইউরোপে তরুণ ফুটবলার রফতানি করে অর্থনীতি হয়তো চাঙা হচ্ছে, তবে ল্যাটিন আমেরিকার ঘরোয়া ফুটবলের আসর প্রতিদ্বন্দ্বিতা আকর্ষণ হারাচ্ছে। পৃথিবীর সেরা ক্লাব ফুটবলের আসরে সেরা ফুটবলারদের সাথে খেলে ইউরোপের ফুটবলাররা নিজেদের শানিত করছেন।

অন্যদিকে ব্যস্ত ও ক্লান্তিকর ইউরোপের ক্লাব মৌসুম শেষে ল্যাটিন আমেরিকান তারকারা জাতীয় দলের হয়ে যখন ইউরোপীয় দলের মুখোমুখি হয়, তখন দেশের হয়ে নিজেকে উজাড় করে দেওয়ার মতো উদ্যম থাকে না। ফুটবলের কালো মানিক পেলে অবসর নেওয়ার আগে দেশের বাইরে কোনও ক্লাবের হয়ে খেলেননি বলেই ইউরোপের কাছে তার স্কিল ছিল অপার রহস্যময়। তার সময়কালে সেলেসাওরা হেসেখেলেই তিন-তিনবার বিশ্বকাপ জিতেছে।

সময় বদলেছে , অভাবিত উন্নতি হয়েছে বিজ্ঞান-প্রযুক্তির। তার সঙ্গে পা মেলাতে পারেনি বলে ব্রাজিলকে ইউরোপের কোচ নিয়োগ দিতে হয়েছে। প্রথম আসরের চ্যাম্পিয়ন একদার পরাশক্তি উরুগুয়েকে ধুঁকতে হচ্ছে। অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জন করা এশিয়ার সৌদি আরব নিজেদের প্রো-লিগে করছে বিপুল বিনিয়োগ। কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত পিএসজি, ম্যানচেস্টার সিটির মতো ইউরোপের এলিট ক্লাবের মালিকানা কিনে সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনায় ভবিষ্যতে নিজেদের ফুটবলকে বিশ্বমানে তুলতে চাইছে। সব কিছু মিলিয়ে আগামী দিনের ফুটবল একটি স্বতন্ত্র বিনিয়োগ ও ব্যবসা হিসাবে সবার জন্যই অনেক বেশি চ্যালেঞ্জিং।

লেখক: স্পোর্টস এডিটর, চ্যানেল আই

/এফআইআর/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
এবছর হজে গিয়ে ৫০ বাংলাদেশির মৃত্যু
এবছর হজে গিয়ে ৫০ বাংলাদেশির মৃত্যু
ময়মনসিংহ মেডিক্যালে হাম উপসর্গে আরেক শিশুর মৃত্যু
ময়মনসিংহ মেডিক্যালে হাম উপসর্গে আরেক শিশুর মৃত্যু
সামনে তহবিল আরও কমতে পারে: পররাষ্ট্রমন্ত্রী
সামনে তহবিল আরও কমতে পারে: পররাষ্ট্রমন্ত্রী
কক্সবাজারে প্রধানমন্ত্রী, পাতিলী-মাছুয়াখালী খাল খনন উদ্বোধন
কক্সবাজারে প্রধানমন্ত্রী, পাতিলী-মাছুয়াখালী খাল খনন উদ্বোধন
সর্বশেষসর্বাধিক