বেশ কয়েকদিন আগে আমাদের কিংবদন্তী সংগীত শিল্পী রুনা লায়লাকে তাঁর শিল্পী জীবনের ৬২ বছরে প্রথমবারের মতো শিল্পকলায় গান গাওয়ার ছবি এবং খবর দেখে, কয়েকজনকে একটা প্রশ্ন করেছিলাম। প্রশ্নটা ছিল– এতো বড় শিল্পী, এতো বছর সংগীত সাধনা করলেন, কিন্তু সংগীত নিয়ে কিছু লিখলেন না কেন?
দুয়েকজন আমাকে ভর্ৎসনাও করলেন। বললেন, লেখকেরা কেন কুংফু-কারাতে শেখে না? আমি হাসলাম; আমি তাদের হয়তো বিষয়টা বোঝাতে পারিনি।
আমি সংগীতের তেমন কিছু বুঝি না। কিন্তু গান যা শুনেছি, তাতে আমার মনে হয়েছে– সংগীত একটা গভীর শাস্ত্র, নিজের আত্মার সঙ্গে যোগের মন্ত্র। নিজের সঙ্গে কথা বলার ভাষা সংগীতচর্চার চাইতে আর সুন্দর কিছু হতে পারে না।
আমার কাছে আসলেই মনে হয়েছে, যারা সংগীতসাধনা করেন, তাদের হাতের কলম তেমনটা চলেনি; তারা তাদের সাধনাপ্রাপ্ত জ্ঞান সমাজের আর সবার কাছে ছড়িয়ে দেওয়ার তাগিদ তারা অনুভব করেননি।
বাংলাদেশে সংগীত নিয়ে কোনো লেখালেখি নেই, তা কথা আমি বলবো না। আমাদের এখানে ‘সংগীত সাংবাদিকতা’ আছে বেশ প্রবলভাবেই। প্রতিদিনই খবরের কাগজে বা কিছু ম্যাগাজিনে নতুন গান, শিল্পীর সাক্ষাৎকার, কনসার্ট, পুরস্কার, অ্যালবাম প্রকাশ কিংবা ইউটিউবের ভিউ নিয়ে খবর বেরুচ্ছে। কিন্তু এসবের বেশির ভাগই তথ্যভিত্তিক সংবাদ বা প্রচারণামূলক লেখা। প্রকৃত অর্থে সংগীত নিয়ে গভীর বিশ্লেষণ, সমালোচনা, গবেষণা এবং চিন্তাশীল লেখালেখি এখনো খুবই সীমিত। ‘সীমিত’ শব্দটা ভদ্রতার খাতিরে বললাম– আসলে ‘নেই’। ‘সংগীত সাংবাদিকতা’কে আমি সংগীত নিয়ে গভীর লেখালিখি মনে করি না।
এই কথাটাই আমি বলতে চেয়েছি।
একটা ভাষার সাহিত্য যেমন শুধু লেখকের কারণে সমৃদ্ধ হয় না, তেমনি সংগীতও শুধু শিল্পীদের কারণে বিকশিত হয় না। সাহিত্যকে এগিয়ে নেয় সমালোচক, গবেষক, কলামিস্ট ও প্রাবন্ধিকরা। সিনেমাকে সমৃদ্ধ করেন চলচ্চিত্র বিশ্লেষকরা। সংগীতের ক্ষেত্রেও একই কথা খাটে। শিল্পীর পাশাপাশি প্রয়োজন এমন লেখকদের, যারা গানকে শুধু শোনেন না, বোঝেনও; শুধু প্রশংসা করেন না, অনেক প্রশ্নও করেন, গানের পেছনের অনেক গল্পও বলেন।
এই সুযোগে আমার নিজের গান শোনা এবং গানের পেছনের গল্পগুলো জানার গল্প বলি। আমার ছোটমামা ওবায়দুর রশীদ নেন্টুর বাংলা আর হিন্দি গানে অবসেশন ছিল। মফস্বলে থাকার কারণে সেই লেইট-সেভেন্টি ও আর্লি-এইট্টিতে তাঁর কাছে ইংরেজি গান পৌঁছেনি। কিশোর, লতা, হেমন্ত, মান্না, সতীনাথ, সন্ধ্যা, আরোতি, কানন দেবী, শ্যামল। তার কালেকশনে শত শত ক্যাসেট ছিল। নানাবাড়ি গেলে আমি তাঁর বিছানায় শুয়ে সারাদিন এসব গান শুনতাম। মামা আমাকে তার কাছে ভালো লাগে সেইসব গান এবং গায়ক-গায়িকাদের জীবন নিয়ে ইতিহাস ও জীবনী শোনাতেন।
আমি নিজেও মফস্বলের ছেলে এবং ক্যাডেট কলেজে পড়তে গিয়ে প্রথম ইংরেজি গান শুনেছি এবং তা নিয়ে জেনেছি। আমাদের সেই বালকবেলায় আমাদের এক বন্ধু আওসাফ রহমানের কাছ থেকেই আমি প্রথম ইংরেজি গান সম্পর্কে জানি এবং শুনি। আওসাফ সেই বয়সেই কেমন করে যেন ইংরেজি সব গানের পেছনের গল্পগুলো জানতো। রড স্টুয়ার্ট কেন এবং কোন প্রেক্ষাপটে ‘প্যাশন’ আর ‘আই অ্যাম সেইলিং’ গানগুলো গেয়েছিলেন সেই গল্প আমাকে শুনিয়েছিল। রড স্টুয়ার্ট এবং আরো অনেক ইংরেজ-আমেরিকান সংগীত শিল্পীদের নিয়েও আওসাফ অনেক জানতো। আমাদের এই বন্ধুর কাছ থেকেই আমি আমেরিকান এবং ইংলিশ কান্ট্রি মিউজিক নিয়ে জেনেছিলাম।
আমাদের ছেলেবেলার আরেক বন্ধু মুহিব্বুল আবরারের অবসেশন ছিল ভূপেন হাজারিকার গান। ভূপেনের সব গান তার মুখস্থ। তার কাছ থেকে এই অহমীয়া সংগীত শিল্পীর জীবন ও ইতিহাস জেনেছিলাম।
আমার সংগীত নিয়ে আগ্রহটা এই সংগীতপ্রেমীদের সাথে বন্ধুত্বের কারণেই রচিত হয়েছে।
আরেকবার বলি - আমাদের সংবাদমাধ্যম অনেক তথ্য দিচ্ছে। একটা নতুন গান রিলিজ হলে আমরা জানতে পারছি যে কে গেয়েছেন, কোথায় ভিডিও করা হয়েছে, কত দিনে কত লাখ ভিউ হয়েছে। এগুলো খুব আয়েশি প্রতিবেদন। তবে গানের কথায় নতুন কী আছে, সুরে মৌলিকত্ব কতটা, অর্কেস্ট্রা কতটা পরিণত, শিল্পীর কণ্ঠ গানটাকে আবেগী করতে পেরেছে কিনা বা গানটা বাংলা সঙ্গীতে নতুন কিছু যোগ করতে পারলো কিনা।
বিশ্বের অনেক দেশেই একটা গান বা অ্যালবাম নিয়ে অনেক বিশ্লেষণ লেখা হয়। ওডের এমন হাজারো পত্র-পত্রিকা আছে। সেখানে গানের কথা, সুর, বাদ্যযন্ত্রের ব্যবহার, রেকর্ডিং, শিল্পীর আগের কাজের সাথে তুলনা, এমনকি গানটার সামাজিক প্রভাবও আলোচিত হয়। ওদের লেখাগুলো পড়লে মনে হয়, সংগীতকে শুধু বিনোদন হিসেবে নয়, একটা সাংস্কৃতিক দলিল হিসেবেও বিবেচনা করা হয়। ইংল্যান্ডের ‘ফাইনান্সিয়্যাল টাইমস’ ও ‘দ্য ইকোনোমিস্ট’ এবং আমেরিকার ‘নিউ ইয়র্ক টাইমস’ ও ‘নিউইয়র্কার’ পড়লেই এসব বোঝা যায়।
বাংলাদেশেও এমন লেখালিখির অনেক বড় সুযোগ রয়েছে। হ্যাঁ, অনেক বই লেখা হয়েছে। ফেরদৌসি রহমান নিজে বই লিখেছেন। প্রথম আলোর সম্পাদক মতিউর রহমানের রুনা লায়লাকে নিয়ে বই আছে। আবদুল আলীমের জীবন ও গান নিয়ে লিখেছেন বাসুদেব বিশ্বাস। আজম খানকে নিয়ে লিখেছেন হক ফারুক ও মিলু আমান। মিলু আমান ও হক ফারুক বাংলার রক মেটাল নিয়েও লিখেছেন। বাংলা আকাদেমিতে বাংলাদেশের ব্যান্ড সংগীত আন্দোলন নিয়েও বই আছে। আমি সঞ্জীব চৌধুরী ও কুমার বিশ্বজিৎ-কে নিয়েও বই পড়েছি। বাকি সব গানের বই।
ছায়ানটের সনজীদা খাতুন রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে এবং নিজের সংগীত-জীবন নিয়ে বই লিখেছেন। কিন্তু ছায়ানট ইশকুলে কী আর কেউ নেই যে সংগীত নিয়ে নিয়মিত পত্র-পত্রিকায় লিখবেন? তারা কী শুধু গানের মাস্টারই রয়ে যাবেন? এর মধ্যে থেকে কী একজনও ‘সংগীত-কলামিস্ট’ হয়ে উঠবেন না?
আমি আশা করি, গান ও অ্যালবামের আলোচনা-সমালোচনা সংবাদমাধ্যমে নিয়মিত থাকুক। একটা গান মানসম্মত হয়েছে? না হয়নি? কেন ভালো হয়েছে? কোথায় দুর্বলতা আছে, কোন অংশটি নতুন, কোন অংশটি পুনরাবৃত্তি? এমন অনেক আলোচনা হতে পারে। এতে যেমন পাঠক-দর্শক সংগীতকে আরও গভীরভাবে বুঝবেন, শিল্পীরা নিজেদের গঠনমূলক মূল্যায়নের সুযোগ পাবেন এবং একই সাথে সঙ্গীতের একটা সংস্কৃতি গড়ে উঠবে। সারা দেশের মানুষ সংগীত নিয়ে জানবে, ভালোবাসবে।
আমি গানগুলোর জন্মকাহিনি জানতে চাই। একটা বিখ্যাত গান কোথায় লেখা হয়েছিল? কোন ঘটনার প্রেরণায় গীতিকার কথাগুলো লিখেছিলেন? সুরটি কীভাবে তৈরি হয়েছিল? প্রথম রেকর্ডিংয়ে কারা ছিলেন? গানটা জনপ্রিয় হবে, তা কি তখন কেউ ভেবেছিলেন? এসব গল্প শুধু কৌতূহল মেটায় না, ভবিষ্যতের জন্য সঙ্গীতের ইতিহাসও সংরক্ষণ করবে। ভারতীয় অনেক সংগীত শিল্পীর জীবনী পড়লে এসব জানা যায়। শিল্পীরা লাইভ গান গাওয়ার সময়ও এসব গল্প বলেন, কিন্তু কেউ লেখেন না।
আমি বাংলাদেশের সংগীতের ইতিহাস নিয়ে ধারাবাহিক লেখা চাই। স্বাধীনতার পর সংগীত কীভাবে বদলেছে? সিনেমার গান কেমনটা বদলেছে। ব্যান্ড সংগীতের উত্থান কীভাবে হলো? ক্যাসেটের যুগ কীভাবে শেষ হলো? ইউটিউব, স্ট্রিমিং ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কীভাবে গান শোনার অভ্যাস বদলে দিল? এসব নিয়ে গবেষণাধর্মী লেখা নেই বললেই চলে। অথচ এগুলোই আমাদের ভবিষ্যতের গবেষকদের জন্য মূল্যবান দলিল হয়ে থাকবে।
আমি মনে করি সংগীতকে সাহিত্য হিসেবেও পড়া যায়। একটা গানের কথা অনেক সময় একটা কবিতার মতো শক্তিশালী হতে পারে। একটা জনপ্রিয় গানের শব্দচয়ন, উপমা, রূপক কিংবা ভাষার পরিবর্তন বিশ্লেষণ করলে আমরা সময়ের পরিবর্তনও বুঝতে পারি। নব্বইয়ের দশকের প্রেমের গান আর আজকের প্রেমের গানের ভাষা কি এক? শহুরে জীবনের প্রভাব কি গানের শব্দ বদলে দিয়েছে? এসব নিয়েও লেখা যেতে পারে।
সংগীতকে যদি আমরা সমাজের আয়না হিসেবে দেখি, তাহলে তো লেখার অনেক কিছুই আছে। আমাদের গানে কেন গ্রামের গল্প কমে যাচ্ছে কেন? কেন শহর, একাকীত্ব ও ব্যক্তিগত জীবনের গল্প বাড়ছে? রাজনৈতিক আন্দোলন, ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ কিংবা সামাজিক পরিবর্তনের সময় গান কী ভূমিকা রেখেছে? এসব বিষয় নিয়ে লিখলেই সঙ্গীতের মধ্যে দিয়েই সমাজকে নতুন করে দেখতে পারি।
হ্যাঁ; সঙ্গীতের একটা অর্থনীতিও আছে। একটা গান গেয়ে একজন শিল্পী কত আয় করেন? গীতিকার, সুরকার ও সংগীত পরিচালক কি যথাযথ রয়্যালটি পান? ইউটিউব, স্পটিফাই বা অন্যান্য স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্ম শিল্পীদের জীবনে কী পরিবর্তন এনেছে? কনসার্টের বাজার কত বড়? তরুণ শিল্পীরা, সাউন্ড ইঞ্জিনিয়াররা, মিক্সিং ইঞ্জিনিয়ার, অ্যারেঞ্জার, গিটারিস্ট, ড্রামার, বেজিস্ট কিংবা কীবোর্ডিস্ট শুধু এই পেশে থেকেই জীবিকা নির্বাহ করতে পারেন? এসব নিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন লেখা যেতে পারে।
আমাদের এখানে কনসার্ট সমালোচনা নেই। আমাদের সংবাদে সাধারণত লেখা হয়, অমুক শিল্পী জমকালো পরিবেশনায় দর্শকদের মাতিয়ে তুলেছেন। কিন্তু কনসার্টের শব্দব্যবস্থা কেমন ছিল, শিল্পীর লাইভ পারফরম্যান্স কতটা শক্তিশালী ছিল, গান নির্বাচন কতটা উপযুক্ত ছিল, দর্শকের সঙ্গে তার কানেকশন কেমন ছিল তা লেখার প্রসঙ্গ হতে পারে।
আমি আরো জানতে চাই বাংলাদেশে কোন সংগীতধারা হারিয়ে যাচ্ছে। ভাটিয়ালি, ভাওয়াইয়া, জারি, সারি, পালাগান এবং আমাদের আদিবাসী সংগীতের বর্তমান অবস্থা কী? কোন কোন শিল্পী এখনো এই ধারাগুলো ধরে রেখেছেন? নতুন প্রজন্মের কাছে এগুলো কেমন ভাবে পৌঁছুচ্ছে? আমাদের ছেলেমেয়েরা কী সংগীত শিখছে?
অনেক কথা বলে ফেললাম। আমাদের সংগীত-সাংবাদিকতা অনেক ভালো হচ্ছে, কিন্তু সবই প্রচারণামূলক, গভীর লেখালিখি নেই, সুস্থ সমালোচনা নেই, সংগীত-কলামিস্ট নেই।
শেষ করার আগে ফিরে আসি রুনা লায়লা কাছে। ধরে নিলাম তিনি লিখতে চান না, শুধুই গাইতে চান। কিন্তু তিনি ছাড়াও আরও অনেক সংগীত শিল্পী আছেন। তারা সবাই-ই কী শুধু গাইতেই চান? সংগীত নিয়ে লিখতে চান না?
লেখক: কথাসাহিত্যিক।
[email protected]




