বাংলাদেশের রাজনীতি যে কতটা উন্নত হয়েছে, তার প্রমাণ খুঁজতে আর সংসদে যেতে হবে না, রাজনৈতিক ইশতেহার পড়তে হবে না, নেতাদের বক্তৃতা শুনতেও হবে না। ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়ায় গেলেই যথেষ্ট। সেখানে রাজনীতির নতুন উচ্চতা আবিষ্কৃত হয়েছে। অথবা বলা ভালো, রাজনীতির নতুন গভীরতা। মুরগির বিষ্ঠা নিয়ে সংঘাত।
এতদিন আমরা জানতাম রাজনীতি হয় আদর্শ নিয়ে, ক্ষমতা নিয়ে, চেয়ার নিয়ে, মন্ত্রণালয় নিয়ে, টেন্ডার নিয়ে, পদ-পদবি নিয়ে। এখন বুঝলাম রাজনীতির আসল রস আরও নিচে। একেবারে মুরগির খোপ পর্যন্ত। সেখানে মুরগি ডিম পাড়ে, আর মানুষ তার বিষ্ঠার ভাগ নিয়ে লড়াই করে। মুরগির অবশ্য এতে কোনও দোষ নেই। সে খায়, ডিম দেয়, বিষ্ঠা দেয় এবং রাজনীতির সবচেয়ে নির্লিপ্ত চরিত্র হিসেবে নিজের কাজ করে যায়। মানুষই তার বিষ্ঠাকে সম্পদে উন্নীত করে ফেলেছে।
ফুলবাড়িয়ার কাহালগাঁও বাজারে মুরগির বিষ্ঠা নিয়ে বিএনপি ও জামায়াতের নেতাকর্মীদের দ্বন্দ্বের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, বিষয়টি শুধু কথাকাটাকাটিতে সীমাবদ্ধ থাকেনি। হাতবোমা বিস্ফোরণ, ব্যাংকের তালা ভাঙা, টাকা লুট, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও যানবাহন ভাঙচুর পর্যন্ত গড়িয়েছে। অর্থাৎ বিষ্ঠার ভাগাভাগি করতে গিয়ে রাজনীতি এমন জায়গায় পৌঁছেছে, যেখানে বিষ্ঠা রয়ে গেছে মুরগির, কিন্তু দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে মানুষের।
একসময় বলা হতো রাজনীতি হচ্ছে জনগণের সেবা। এখন মনে হচ্ছে সংজ্ঞাটি একটু আধুনিকীকরণ করা দরকার। রাজনীতি হচ্ছে জনগণের সম্পদ কে কতটা নিজের পকেটে সেবা হিসেবে নিতে পারে, তার প্রতিযোগিতা। আর যদি সম্পদটি মুরগির বিষ্ঠাও হয়, তাতেও আপত্তি নেই। কারণ ক্ষমতার গন্ধে সবকিছুই সুগন্ধি।
খবর অনুযায়ী, আওয়ামী লীগের সময় আওয়ামী লীগের লোকজন বিনা মূল্যে ওই বিষ্ঠা নিয়ে বিক্রি করতেন। আওয়ামী লীগের পতনের পর সেই দায়িত্ব নেন বিএনপির নেতাকর্মীরা। এরপর ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ফুলবাড়িয়ায় জামায়াতের প্রার্থী জয়ী হওয়ার পর প্রশ্ন উঠেছে, এখন বিষ্ঠা কার?
এ এক মহাদার্শনিক প্রশ্ন। সক্রেটিস বেঁচে থাকলে হয়তো বলতেন, নিজেকে জানো। প্লেটো বলতেন আদর্শ রাষ্ট্র গড়ো। আর ফুলবাড়িয়ার বাস্তবতা দেখে আধুনিক রাজনীতির ছাত্র বলবে, আগে জেনে নাও—মুরগির বিষ্ঠা কার।
এখানে গণতন্ত্রের একটি চমৎকার নমুনাও পাওয়া যাচ্ছে। জনগণ ভোট দিয়ে প্রতিনিধি নির্বাচন করেছেন। প্রতিনিধি নির্বাচিত হওয়ার পর এখন জনগণের কী প্রয়োজন? তাদের ভোটের বিনিময়ে তারা রাষ্ট্রের নীতি পাবে, উন্নয়ন পাবে, নিরাপত্তা পাবে, কর্মসংস্থান পাবে, নাকি মুরগির বিষ্ঠার ভাগ পাবে, সেটিই এখন গবেষণার বিষয়।
একসময় রাজনীতিতে বলা হতো জনগণের ভাগ্য পরিবর্তন করবো। এখন মনে হচ্ছে জনগণের ভাগ্য তো দূরের কথা, মুরগির বিষ্ঠার ভাগ্যই আগে পরিবর্তন হয়েছে। যে বিষ্ঠা এতদিন বিনা মূল্যে পড়ে থাকতো, সেটি এখন রাজনৈতিক অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ। প্রতি দেড় মাসে ছয়টি শেড থেকে প্রায় আট লাখ টাকার বিষ্ঠা উৎপাদন হয় বলে কোম্পানির ব্যবস্থাপক জানিয়েছেন। অর্থাৎ মুরগিরা নিয়মিত উৎপাদন করছে এবং রাজনৈতিক দলগুলো নিয়মিত তার বণ্টন নিয়ে চিন্তিত। দেশের অর্থনীতিতে মুরগির অবদান নিয়ে এতদিন আমরা ডিম ও মাংসের কথা বলতাম। এখন থেকে বিষ্ঠাকেও জাতীয় সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে।
একটি কথা মনে পড়ে, চোরে না শোনে ধর্মের কাহিনি। তবে এখানে সমস্যা আরও গুরুতর। এখানে ধর্মের কাহিনি শোনানোর লোকও বিষ্ঠার ভাগ নিয়ে ব্যস্ত বলে অভিযোগ। ফলে ধর্ম, আদর্শ, নীতি, নৈতিকতা সবকিছুই আপাতত মুরগির খোপের বাইরে রেখে দিতে হচ্ছে।
সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো, বিষ্ঠাটি নাকি কোম্পানি বিনা মূল্যে দিয়ে দেয়। অর্থাৎ এখানে মূলধন বিনিয়োগ শূন্য, উৎপাদন খরচ শূন্য, সংগ্রহের খরচ সামান্য, কিন্তু রাজনৈতিক মূল্য আকাশচুম্বী। এমন ব্যবসা বাংলাদেশের কোনও স্টক এক্সচেঞ্জেও নেই। যে সম্পদ বিনা মূল্যে পাওয়া যায়, তার দখল নিয়ে যদি হাতবোমা ফাটে, ব্যাংকের তালা ভাঙে, টাকা উধাও হয়, গাড়ি ভাঙে, তাহলে বুঝতে হবে সম্পদটি আর সাধারণ সম্পদ নেই। সেটি ক্ষমতার প্রতীক হয়ে গেছে।
বাংলাদেশের রাজনীতির একটি পুরোনো নিয়ম আছে। ক্ষমতায় যে থাকে, তার চারপাশে সুবিধাভোগীরা থাকে। ক্ষমতা বদলালে সুবিধাভোগীরাও জামা বদলায়। আগে যারা বিষ্ঠা নিতেন, তারা এখন হয়তো বিরোধী। যারা আগে দূরে ছিলেন, তারা এখন বিষ্ঠার কাছাকাছি। অর্থাৎ আদর্শ বদলায়নি, শুধু বিষ্ঠা সংগ্রহকারীর পরিচয় বদলেছে।
এখানে একটি বড় ভুল আমরা করে ফেলি। আমরা ভাবি, দল-বদল মানে আদর্শ বদল। আসলে অনেক সময় দল-বদল মানে শুধু সুবিধার ঠিকানা বদল। গতকাল যে দরজা দিয়ে ঢোকা যেত না, আজ সেই দরজা খুলে গেছে। গতকাল যে সম্পদ অন্যের ছিল, আজ সেটি নিজেদের অধিকার বলে মনে হচ্ছে। আর কাল ক্ষমতার পালাবদল হলে আজকের অধিকার আবার কালকের অন্য কারও অধিকার হয়ে যাবে।
তাই প্রশ্নটি বিএনপি বনাম জামায়াত নয়। প্রশ্নটি আরও গভীর। প্রশ্ন হলো, রাজনীতি কি সত্যিই আদর্শের জন্য, নাকি যার হাতে ক্ষমতার চাবি, তার হাতে বিষ্ঠার ট্রাকের চাবিও থাকবে?
অভিযোগ অনুযায়ী, প্রায় দুই শতাধিক জামায়াত ও শিবিরের নেতাকর্মী বাস, অটোরিকশা ও মাহিন্দ্রা করে কোম্পানিতে গিয়ে দুই ট্রাক মুরগির বিষ্ঠা নিয়ে যান। প্রশ্ন হলো, দুই ট্রাক বিষ্ঠা নিতে এত লোক লাগে কেন? মুরগির বিষ্ঠা সংগ্রহের জন্য যদি দুই শতাধিক রাজনৈতিক কর্মী লাগে, তাহলে দেশের উন্নয়ন সংগ্রহ করতে কতজন লাগবে? বেকারত্ব সংগ্রহ করতে? দুর্নীতি সংগ্রহ করতে? জনদুর্ভোগ সংগ্রহ করতে? এসব কাজে কি দলীয় কর্মীদের কখনও এমন উৎসাহ দেখা যাবে?
আমাদের রাজনীতিতে অবশ্য এমন রূপান্তর নতুন নয়। স্লোগান দিয়ে শুরু, ক্ষমতা দিয়ে বিস্তার, দখল দিয়ে প্রতিষ্ঠা, আর শেষে সম্পদে পরিণত হওয়া। আগে জমি, খাল, বাজার, ঘাট, বালু, পাথর, টেন্ডার, পরিবহন এসব নিয়ে খবর হতো। এখন মুরগির বিষ্ঠা সেই তালিকায় জায়গা করে নিয়েছে। এরপর মানুষের বিষ্ঠা পর্যন্ত গড়ালেও অবাক হওয়ার কিছূ নেই!
এ ঘটনার সবচেয়ে করুণ দিক হলো, রাজনীতি এখানে হাস্যকর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ভয়ংকরও হয়েছে। মুরগির বিষ্ঠা নিয়ে দ্বন্দ্ব যদি বোমা, লুটপাট ও ভাঙচুরে গড়ায়, তাহলে সমস্যা বিষ্ঠায় নয়, মানুষের রাজনৈতিক চরিত্রে। যে সমাজে সামান্য সম্পদের ভাগ নিয়ে অস্ত্রের প্রয়োজন হয়, সেখানে বড় সম্পদের ভাগ কীভাবে হয়, তা বুঝতে বিশেষজ্ঞ হওয়ার দরকার নেই।
আমাদের প্রবচন আছে, লোভে পাপ, পাপে মৃত্যু। কিন্তু আধুনিক রাজনৈতিক সংস্করণটি সম্ভবত হবে, লোভে বিষ্ঠা, বিষ্ঠায় ক্ষমতা, ক্ষমতায় দখল, দখলে মামলা, মামলায় জেল। তারপর আবার নতুন নির্বাচন। নতুন নেতা। নতুন ভাগাভাগি এবং সম্ভবত নতুন কোনও বিষ্ঠা।
তবে রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য ঘটনাটি একটি বড় শিক্ষা হতে পারে। তারা যদি সত্যিই জনগণের কল্যাণ চান, তাহলে মুরগির বিষ্ঠা নিয়ে যুদ্ধ না করে তার বাজার ব্যবস্থাপনা নিয়ে নীতিমালা করতে পারেন। কারা নেবে, কত নেবে, কীভাবে নেবে, কীভাবে বিক্রি হবে, তার স্বচ্ছ ব্যবস্থা করা যায়। প্রয়োজনে সংসদে মুরগির বিষ্ঠা সংরক্ষণ ও বণ্টন আইন পাস করা যেতে পারে। একটি নিয়ন্ত্রক কমিশনও করা যেতে পারে। নাম হতে পারে জাতীয় পোলট্রি বিষ্ঠা নিয়ন্ত্রণ কমিশন। চেয়ারম্যান, সদস্য, গাড়ি, অফিস, জনবল সবই থাকবে। শুধু বিষ্ঠা থাকবে না। কারণ সেটি ইতোমধ্যে রাজনৈতিক কর্মীরা নিয়ে যাবেন।
আরও ভালো হয়, যদি রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদের নির্বাচনি ইশতেহারে বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করে। বলা যেতে পারে, ক্ষমতায় গেলে প্রতিটি এলাকায় জনগণের ন্যায্য বিষ্ঠা অধিকার নিশ্চিত করা হবে। কেউ আর বিনা মূল্যের বিষ্ঠা থেকে বঞ্চিত হবে না। সব বিষ্ঠা হবে জনগণের। তবে কে সংগ্রহ করবে, সেটি দলীয় কমিটি নির্ধারণ করবে। তখন হয়তো আমাদের রাজনীতি সত্যিই নতুন উচ্চতায় উঠবে।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি মুরগির বিষ্ঠার নয়। প্রশ্নটি আমাদের লোভের। যে রাজনীতি মানুষের অধিকার রক্ষার কথা বলে, সেই রাজনীতি যদি বিনা মূল্যের মুরগির বিষ্ঠার দখল নিয়েও হাতবোমা ফাটায়, ব্যাংকের তালা ভাঙে এবং বাজার তছনছ করে, তাহলে রাজনীতির অভিধানে আদর্শ শব্দটির পাশে বন্ধনীতে একটি নতুন অর্থ যোগ করা দরকার!
লেখক: গণমাধ্যমকর্মী ও কলামিস্ট




