পর্যটন অর্থনীতি-৬: বিশ্বের সফল দেশগুলো আমাদের কী শিক্ষা দেয় 

সালেক উদ্দিন
০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৪:০০আপডেট : ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৪:০০

বাংলাদেশের পর্যটন নিয়ে আলোচনা শুরু হলেই একটি কথা প্রায় সর্বসম্মতিক্রমে উচ্চারিত হয়—এই দেশের সম্ভাবনা অসাধারণ। বিশ্বের দীর্ঘতম প্রাকৃতিক সমুদ্রসৈকত, পৃথিবীর বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন, বৈচিত্র্যময় পাহাড়ি অঞ্চল, শত শত নদী, সমৃদ্ধ লোকসংস্কৃতি, প্রত্নতাত্ত্বিক ঐতিহ্য এবং অনন্য খাদ্যসংস্কৃতি—সব মিলিয়ে পর্যটনের জন্য প্রয়োজনীয় প্রায় সব উপাদানই আমাদের রয়েছে। কিন্তু আন্তর্জাতিক পর্যটন অর্থনীতির একটি মৌলিক বাস্তবতা হলো, সম্ভাবনা কখনও সাফল্যের নিশ্চয়তা নয়।

পৃথিবীতে এমন বহু দেশ রয়েছে, যাদের সম্পদ বাংলাদেশের তুলনায় কম। কিন্তু তারা পর্যটনকে জাতীয় অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তিতে পরিণত করেছে। আবার এমন দেশও আছে, যাদের বিপুল প্রাকৃতিক সম্পদ থাকা সত্ত্বেও পর্যটন খাত প্রত্যাশিত উচ্চতায় পৌঁছাতে পারেনি।

সুতরাং, বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি হলো—বিশ্বের সফল দেশগুলো কী করেছে, যা আমরা এখনও করতে পারিনি? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে। পর্যটনের সাফল্য মূলত সম্পদের ওপর নয়, সম্পদ ব্যবস্থাপনার ওপর নির্ভর করে। প্রকৃতি সুযোগ দেয়, কিন্তু পরিকল্পনা সেই সুযোগকে অর্থনীতিতে রূপান্তর করে।

সিঙ্গাপুরের উদাহরণ দিয়ে শুরু করা যাক। বিশ্ব পর্যটনের অন্যতম সফল গন্তব্য সিঙ্গাপুরের কোনও দীর্ঘ সমুদ্রসৈকত নেই, নেই বিশাল পাহাড় কিংবা বিস্তৃত বনভূমি। স্বাধীনতার সময় দেশটি প্রাকৃতিক সম্পদের দিক থেকে ছিল অত্যন্ত সীমিত। কিন্তু তারা খুব দ্রুত বুঝতে পেরেছিল যে পর্যটক কেবল প্রকৃতি দেখতে আসে না— সে নিরাপত্তা, দক্ষতা, পরিচ্ছন্নতা এবং স্মরণীয় অভিজ্ঞতা খুঁজে।

ফলে তারা পরিকল্পিত নগরায়ণ, বিশ্বমানের বিমানবন্দর, আধুনিক গণপরিবহন, প্রযুক্তিনির্ভর সেবা এবং অভিজ্ঞতাভিত্তিক পর্যটন পণ্য গড়ে তুলেছে। আজ Marina Bay, Sentosa Island কিংবা Gardens by the Bay শুধু স্থাপনা নয়—এগুলো সুশাসন, পরিকল্পনা এবং উদ্ভাবনের প্রতীক। বাংলাদেশের জন্য সিঙ্গাপুরের শিক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রাকৃতিক সম্পদ থাকা যথেষ্ট নয়— সেই সম্পদকে বিশ্বমানের অভিজ্ঞতায় রূপ দিতে হবে।

থাইল্যান্ডের গল্প ভিন্ন। ১৯৮০-এর দশকে থাইল্যান্ড দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার একটি সাধারণ উন্নয়নশীল দেশ ছিল। কিন্তু তারা পর্যটনকে জাতীয় অর্থনৈতিক কৌশলের কেন্দ্রে নিয়ে আসে। আজ দেশটি প্রতিবছর কয়েক কোটি আন্তর্জাতিক পর্যটক আকর্ষণ করে এবং পর্যটন তাদের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান খাত।

থাইল্যান্ডের সাফল্যের পেছনে তিনটি বিষয় বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য ব্র্যান্ডিং, অভিজ্ঞতা এবং ধারাবাহিকতা। “Amazing Thailand” কেবল একটি স্লোগান নয়—এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রীয় ব্র্যান্ডিং কৌশল। তারা সমুদ্রসৈকত, সংস্কৃতি, খাদ্য, উৎসব, চিকিৎসা পর্যটন,অ্যাডভেঞ্চার পর্যটন এবং রাতের অর্থনীতিকে একটি সমন্বিত কাঠামোর মধ্যে নিয়ে এসেছে।

বাংলাদেশের জন্য এখানে একটি বড় শিক্ষা রয়েছে। কক্সবাজারকে শুধু সমুদ্রসৈকত হিসেবে নয়, একটি পূর্ণাঙ্গ অভিজ্ঞতা অঞ্চল হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। সিলেটকে শুধু চা-বাগানের অঞ্চল হিসেবে নয়, প্রকৃতি ও সংস্কৃতির সমন্বিত অভিজ্ঞতা হিসেবে উপস্থাপন করতে হবে। সুন্দরবনকে শুধু বন নয়, বিশ্বের অন্যতম অনন্য প্রকৃতি—অভিজ্ঞতা হিসেবে ব্র্যান্ড করতে হবে।

মালদ্বীপের সাফল্য আবার অন্য ধরনের। তাদের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো— পর্যটনের সাফল্য সবসময় পর্যটকের সংখ্যার ওপর নির্ভর করে না। মাত্র কয়েক লাখ জনসংখ্যার একটি দ্বীপরাষ্ট্র আজ বিশ্বের অন্যতম উচ্চ-আয় পর্যটন অর্থনীতিতে পরিণত হয়েছে। কারণ তারা “Mass Tourism” নয়, “High-Value Tourism” কৌশল অনুসরণ করেছে।

একটি দ্বীপে একটি রিসোর্ট, সীমিত সংখ্যক অতিথি, উচ্চমানের সেবা এবং পরিবেশ সংরক্ষণ— এই নীতির ফলে তারা কম পর্যটক থেকেও বেশি আয় করতে সক্ষম হয়েছে। বাংলাদেশের সেন্ট মার্টিন, মহেশখালী কিংবা উপকূলীয় দ্বীপাঞ্চলের ক্ষেত্রে এই শিক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পরিবেশ ধ্বংস করে অনিয়ন্ত্রিত পর্যটনের চেয়ে সীমিত, পরিকল্পিত এবং উচ্চমূল্যের পর্যটন অনেক বেশি লাভজনক ও টেকসই হতে পারে।

মালয়েশিয়া আমাদের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়। তারা পর্যটনকে একটি একক পণ্যে সীমাবদ্ধ রাখেনি। প্রকৃতি, দ্বীপ, আধুনিক নগরজীবন, চিকিৎসা পর্যটন, কেনাকাটা, সংস্কৃতি এবং খাদ্য—সবকিছুকে একত্র করে একটি বহুমাত্রিক পর্যটন অর্থনীতি তৈরি করেছে।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও একই সম্ভাবনা বিদ্যমান। একজন পর্যটক যদি একই সফরে কক্সবাজারের সমুদ্র, বান্দরবানের পাহাড়, সিলেটের প্রকৃতি এবং সোনারগাঁওয়ের ইতিহাস উপভোগ করতে পারেন, তাহলে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম বৈচিত্র্যময় পর্যটন গন্তব্যে পরিণত হতে পারে।

সংযুক্ত আরব আমিরাতের অভিজ্ঞতা আরও তাৎপর্যপূর্ণ। মাত্র কয়েক দশক আগে দুবাই ছিল একটি ছোট উপসাগরীয় বাণিজ্যকেন্দ্র। আজ এটি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পর্যটন ও ব্যবসায়িক হাব। দুবাইয়ের সাফল্যের মূল কারণ ছিল একটি স্পষ্ট দৃষ্টিভঙ্গি। তারা বুঝেছিল, তেলের ওপর নির্ভরতা দীর্ঘমেয়াদে যথেষ্ট নয়। ফলে তারা বিমান যোগাযোগ, পর্যটন অবকাঠামো, আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডিং এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ গড়ে তোলে।

Burj Khalifa, Palm Jumeirah কিংবা Dubai Shopping Festival কেবল পর্যটন আকর্ষণ নয়—এগুলো একটি রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত চিন্তার ফল।  বাংলাদেশের জন্য এখানেও একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা রয়েছে— বড় সাফল্য অর্জন করতে হলে বড় চিন্তা করতে হয়। ক্ষুদ্র প্রকল্প দিয়ে আংশিক উন্নতি সম্ভব, কিন্তু আন্তর্জাতিক পর্যটন মানচিত্রে জায়গা করে নিতে হলে সমন্বিত মাস্টারপ্ল্যান অপরিহার্য। ভারত ও তুরস্কের অভিজ্ঞতা আমাদের আরেকটি দিক দেখায়।

তারা ইতিহাস, সংস্কৃতি এবং ঐতিহ্যকে অর্থনৈতিক সম্পদে পরিণত করেছে। আগ্রা,ন জয়পুর, বারাণসী, ইস্তাম্বুল কিংবা কাপাডোসিয়া শুধু শহর নয়— এগুলো গল্প, ইতিহাস এবং পরিচয়ের কেন্দ্র। বাংলাদেশেও পাহাড়পুর, মহাস্থানগড়, ময়নামতি, ষাটগম্বুজ মসজিদ, পানাম নগর এবং পুরান ঢাকা রয়েছে। কিন্তু এখনো আমরা এসব সম্পদকে আন্তর্জাতিক মানের Heritage Tourism Product-এ রূপ দিতে পারিনি।

আধুনিক পর্যটন অর্থনীতির আরেকটি বড় শিক্ষা এসেছে জাপান থেকে। জাপান দেখিয়েছে যে নিরাপত্তা, শৃঙ্খলা, প্রযুক্তি এবং সেবার মান একটি দেশের পর্যটন ব্র্যান্ডকে কতটা শক্তিশালী করতে পারে। অনেক পর্যটক জাপানে শুধু দর্শনীয় স্থান দেখার জন্য নয়, বরং একটি নির্ভরযোগ্য ও সুশৃঙ্খল অভিজ্ঞতার জন্য ভ্রমণ করেন।

এখানেই বাংলাদেশের জন্য একটি মৌলিক শিক্ষা রয়েছে। পর্যটন উন্নয়নের ভিত্তি হলো আস্থা। একজন পর্যটক যদি নিজেকে নিরাপদ মনে না করেন, তাহলে সবচেয়ে সুন্দর গন্তব্যও তার কাছে আকর্ষণ হারায়। বিশ্বের সফল দেশগুলোর অভিজ্ঞতা বিশ্লেষণ করলে চারটি সাধারণ সূত্র স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

প্রথমত, নিরাপত্তা ও সুশাসন। দ্বিতীয়ত, আধুনিক যোগাযোগ ও অবকাঠামো। তৃতীয়ত, অভিজ্ঞতাভিত্তিক পর্যটন পণ্য। চতুর্থত, শক্তিশালী আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডিং ও বিপণন। লক্ষ করার বিষয় হলো, এই চারটি ক্ষেত্র নিয়েই আমরা ইতোমধ্যে এই ধারাবাহিকের পূর্ববর্তী পর্বগুলোতে আলোচনা করেছি। অর্থাৎ বিশ্বের সফল দেশগুলোর অভিজ্ঞতা এবং বাংলাদেশের করণীয়ের মধ্যে মৌলিক কোনও পার্থক্য নেই। পার্থক্য শুধু বাস্তবায়নের।

বাংলাদেশের সামনে তাই সুযোগটি এখনো উন্মুক্ত। আমাদের রয়েছে বিশ্বের দীর্ঘতম প্রাকৃতিক সমুদ্রসৈকত। রয়েছে সুন্দরবনের মতো বৈশ্বিক প্রাকৃতিক ঐতিহ্য। রয়েছে পাহাড়, নদী, দ্বীপ, প্রত্নসম্পদ, লোকসংস্কৃতি এবং অসাধারণ আতিথেয়তা। বিশ্বের বহু দেশ যেসব সম্পদের জন্য কৃত্রিম বিনিয়োগ করেছে, সেসব সম্পদ প্রকৃতি আমাদের হাতে তুলে দিয়েছে।

এখন প্রয়োজন সেই সম্পদকে অর্থনৈতিক শক্তিতে রূপান্তর করার রাষ্ট্রিক সক্ষমতা। কারণ বিশ্বের সফল দেশগুলোর ইতিহাস একটি বিষয় স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে—পর্যটন কোনও অলৌকিক ঘটনা নয়, কোনও ভাগ্যের বিষয়ও নয়। এটি পরিকল্পনা, বিনিয়োগ, নিরাপত্তা, মানবসম্পদ এবং ধারাবাহিক বাস্তবায়নের ফল।

বাংলাদেশের সামনে তাই আজ মূল প্রশ্নটি আর সম্ভাবনার নয়। প্রশ্নটি হলো—আমরা কি বিশ্বের সফল দেশগুলোর শিক্ষা গ্রহণ করে পর্যটনকে আগামী দশকগুলোর অন্যতম জাতীয় অর্থনৈতিক শক্তিতে পরিণত করতে প্রস্তুত?

যদি প্রস্তুত হই, তাহলে পর্যটন শুধু একটি শিল্প হবে না; এটি হতে পারে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক বহুমুখীকরণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং বৈশ্বিক পরিচয় নির্মাণের অন্যতম শক্তিশালী হাতিয়ার।

লেখক: সামাজিক-রাজনৈতিক বিশ্লেষক, কলামিস্ট, জীবন সদস্য, বাংলা একাডেমি

 

/এপিএইচ/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
বাথরু‌মে ছাত্রীকে নিয়ে যৌন হয়রানি, প্রাথমিকের শিক্ষক আটক
বাথরু‌মে ছাত্রীকে নিয়ে যৌন হয়রানি, প্রাথমিকের শিক্ষক আটক
লজ্জার হার, ৭ ক্রিকেটার ও কোচকে ফেরত পাঠালো পাকিস্তান
লজ্জার হার, ৭ ক্রিকেটার ও কোচকে ফেরত পাঠালো পাকিস্তান
১০ কেজি ওজন কমাতে ডায়েটিশিয়ানের ৮ সহজ কৌশল
১০ কেজি ওজন কমাতে ডায়েটিশিয়ানের ৮ সহজ কৌশল
রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি: তথ্য উপদেষ্টা
রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি: তথ্য উপদেষ্টা
সর্বশেষসর্বাধিক