কখনও কাউকে প্রশ্ন করেননি এমন মানুষ পাওয়া যাবে কিনা সন্দেহ। তবে কিছু প্রশ্ন আছে কালজয়ী। যেমন- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর ‘প্রশ্ন’ কবিতায় লিখেছিলেন—‘আমি যে দেখেছি প্রতিকারহীন শক্তের অপরাধে/ বিচারের বাণী নীরবে নিভৃতে কাঁদে…যাহারা তোমার বিষাইছে বায়ু/ নিভাইছে তব আলো/ তুমি কী তাদের ক্ষমা করিয়াছ? তুমি কী বেসেছ ভালো?’!’
কিছু প্রশ্ন আছে অন্তর ঝাঁঝরা করে চোখে জল আনার মতো। যেমন- একরামের কন্যার প্রশ্ন। একরাম (কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলার কাউন্সিলর, যিনি ২০১৮ সালের ২৬ মে নিহত হন) ক্রসফায়ারে নিহত হওয়ার ঠিক আগের মুহূর্তে মোবাইল ফোনে তার মেয়ের সাথে কথা বলার সময় মেয়েটা প্রশ্ন করেছিল—‘বাবা তুমি কাঁদতেছ কেন’?
আছে ঐতিহ্যবাহী সেই সাহসী প্রশ্ন যখন কেউ রাজাকে জিজ্ঞাসা করে— ‘রাজা তোর কাপড় কোথায়?’ আছে সেই অমীমাংসিত প্রশ্ন যেটা লালন সাঁইজী মৃত্যুর ঠিক আগে জানতে চেয়েছিলেন—‘কেউ কি আমায় চিনলো? কেউ কি আমায় বুঝলো’?
এমন অনেক প্রশ্ন সামনে আনা যায়। আসলে প্রশ্ন এবং উত্তর আমার প্রিয় বিষয়। স্কুল-কলেজ জীবনে উত্তর শিখতে হতো শিক্ষক বা বাবার পেটান থেকে বাঁচার জন্য। প্রেমিকার কাছে একটা প্রশ্নের উত্তর বারবার শোনার পরেও সাধ মিটতো না। যেমন-‘তুমি কি সত্যি সত্যি আমায় ভালোবাসো?’ বয়সের সাথে সাথে এবং সময়ভেদে প্রশ্নের ধরন বদলায়। যেমন- অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ইউনূস সাহেবের আমলে সেরা প্রশ্ন ছিল এমন প্রশ্ন—এখন কীসের হাত থেকে বাঁচার জন্য উত্তর খুঁজছেন?
উত্তর: ‘মব জাস্টিসের’ হাত থেকে বাঁচার জন্য। ধরুন, আমাকে জেলে নেওয়া হবে। আমি নিরাপদে সেখানে যেতে চাইবো। যাবার আগে কেউ গায়ে হাত তুলবে না বা জুতার মালা পরাবে না, অথবা পচা ডিম ছুড়ে মারবে না!
তবে প্রশ্ন করার কিছু খারাপ দিকও আছে। একটা অন্তর্বর্তী ও একটা বর্তমান সময়ের প্রশ্ন দিয়ে উদাহরণ দেই।
প্রশ্ন করার সবচেয়ে খারাপ দিক কী?
উত্তর: চাকরি হারানোর ভয়! (অন্তর্বর্তী সময়ে সংস্কৃতিবিষয়ক উপদেষ্টাকে প্রশ্ন করে তিন সাংবাদিক চাকরি হারিয়েছিলেন)
বর্তমানের প্রশ্ন: মাননীয় পররাষ্ট্র্র প্রতিমন্ত্রী আপনি কী দ্বৈত পাসপোর্টের অধিকারী?
উত্তর: কে প্রশ্ন করছে? কার এত জ্বালা?
কখনও-সখনও প্রশ্ন করার পর আপনার উদ্দেশ্য নিয়েও প্রশ্ন উঠতে পারে। অন্তর্বর্তী সময়ের প্রশ্ন তুললে আপনাকে কেউ কেউ ফ্যাসিস্ট ট্যাগও দিয়ে ফেলতে পারে। তাই একটা সুরক্ষামূলক প্রশ্ন করে যাই।
প্রশ্ন: অন্তর্বর্তী’র সবচেয়ে ভালো দুটি কাজ কী?
উত্তর: ড. মাহফুজ এখন আর গান গাচ্ছেন না! হিরো আলমও এখন গান কম গাচ্ছেন, নাটক সিনেমা কম করছেন, নাচানাচিটা বেশি বেশি করছেন! তবে ওই আমলে স্লোগানও নতুন মাত্রা পেয়েছিল, যেমন- জামায়াত শিবির পাকিস্তানি/ তুমিও জানো আমিও জানি!
আমরা আসলে অনেক কিছইু জানি না। নেতা, মন্ত্রী, আমলারা আমাদের চেয়ে অনেক বেশি জানেন। যদি জানতে চান, প্রশ্ন: বিদ্যুতের কী অবস্থা? এত ঘন ঘন লোডশেডিং হচ্ছে কেন? গ্যাস নিয়ে এমন গ্যাসাগেসি হচ্ছে কেন?
উত্তর: দুটো কারণে এই অবস্থা। শেখ হাসিনা ও ইন্ডিয়া। এক ও দুই বসিয়ে আপনি সিরিয়াল সাজাবেন আপনার মতো করে!
নেতা-মন্ত্রী-আমলাদের কথাবার্তা থেকে এমন উত্তর পাওয়া যায়। তবে কোনও কোনও প্রশ্নের উত্তর সহজে পাবেন না, কিংবা সময় মতো পাবেন না। যেমন- প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ইন্ডিয়া সফরে যাবেন কী যাবেন না? চলুন, আমরা সব প্রশ্নের উত্তর নিয়ে মাথা না ঘামাই। আমরা প্রশ্ন মিশ্রিত কিছু কৌতুক নিয়ে ভাবি।
প্রশ্ন: কাশফুল, সাদা মেঘ, দেবদাস, পার্বতী আর চন্দ্রমুখীর ভেতর মিল কোথায়? উত্তর: সবই ‘শরৎ’-এর সৃষ্টি! প্রশ্ন: আমেরিকা হোক আর মক্কা হোক—এদের সঙ্গে কী চুক্তি করা ঠিক হয়েছে?
উত্তর: অবশ্যই ঠিক হয়েছে। বাংলাদেশি, সে শ্রমিক হোক আর মন্ত্রী হোক, বিদেশ গমন ও ভ্রমণে তাদের আসক্তি আছে! তাই বিদেশের সঙ্গে চুক্তি করা খারাপ না।
প্রশ্ন: নতজানু জিনিসটা কী?
উত্তর: আপনাকে চুক্তি দিয়া বোঝাই। আপনি যদি ভারতের সাথে চুক্তি করেন, তাহলে অবশ্যই এটা নতজানু পররাষ্ট্রনীতি ও চুক্তি। কিন্তু একই চুক্তি যদি আমেরিকার সাথে করেন, সেটা নতজানু না, শিরদাঁড়া সংবলিত!
প্রশ্ন: ছেলে আর মেয়েদের জীবনের মধ্যে পার্থক্য কী?
উত্তর: মেয়েদের জীবন ফুলের মতো। সুবাসিত। ঠিক রাষ্ট্র ক্ষমতার মতো। আর ছেলেদের জীবন আইক্কাওয়ালা বাঁশের মতো। দুই-তিনটা গোড়ালি আর অগণিত কঞ্চি লইয়া থাকতে হয়! আসলে প্রশ্ন সংবলিত এই লেখার ‘মোরাল অব দ্য স্টোরি কী? মোরাল অব দ্য স্টোরি হচ্ছে—কিছু প্রশ্নের উত্তর এড়িয়ে যাওয়া যায় না। সেগুলো খুঁজতে হয়, মানুষকে সময় মতো সঠিক উত্তর জানাতে হয়। না হলে এই প্রশ্নগুলো ক্ষমতাকেই নাড়িয়ে দেয়। শেখ হাসিনার আমলে সাংবাদিক দম্পতি সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ড, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আবু বকর হত্যা মামলা, কিংবা কুমিল্লার তনু ধর্ষণ ও হত্যা মামলা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছিল। সেসব প্রশ্নের উত্তর আজও মেলেনি। তেমনিভাবে রংপুর জিলা স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী ও তার পরিবারের বাকি তিন সদস্যের হত্যাকাণ্ড (২০২৬-এর ২২ আগস্ট রাতে, রংপুরের মাছুয়াপাড়ার দাসপাড়ায় এই হত্যাকাণ্ড ঘটে) নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
নিচের প্রশ্নগুলো মানুষের মনে উদয় হয়েছে— পত্রিকা টেলিভিশন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘুরে বেড়াচ্ছে। আশা করি, কোনও না কোনও দিন এসব প্রশ্নের উত্তর মিলবে। কেউ না কেউ এসব প্রশ্নের উত্তর লিখে শূন্যস্থান পূরণ করতে পারবেন! সেই আশা নিয়ে এই নিচের প্রশ্নগুলো তুলে দিলাম! উত্তর কি কোনোদিন মিলবে?
শূন্য. রাত ২টা ৪০-এর সময় গণপতি সাহেবের স্ত্রী তার বোনকে রিং দিয়েছিলেন, যা তার বোন ধরেননি। তিনি কি আর কাউকে রিং দিয়েছিলেন?
এক. সম্পূরক প্রশ্ন হচ্ছে গণপতি সাহেব যদি প্রথম খুন হন সেটা কখন? সময়টা জানা জরুরি। ওনার স্ত্রী কি খুনের ঘটনা দেখেছিলেন? চিৎকার চেঁচামেচি করা কি স্বাভাবিক ছিল না?
দুই. নিজ বাড়ির ছাদে ইয়াবা খেতে দুজনকে কখন প্রথম দেখেন গণপতি চক্রবর্তী? ইয়াবা যারা খায় তাদের সর্বোচ্চ রেকর্ড কতটা? একনাগাড়ে কতটা খাওয়া যায়? সীমান্তের বাসায় দুটো ইয়াবা খেয়ে ‘সেইফ জোন’ ছেড়ে ঝুঁকি নিয়ে আবার গণপতি সাহেবের বাসার ছাদে কেন যেতে হবে?
তিন. কোনও গবেষণা কি আছে যে দুইটা ইয়াবা খাবার পরে ছাদে ওঠা যায় কিনা, বা চার-পাঁচটা ইয়াবা খেলে চার খুন করার মতো শক্তি ভর করে কিনা?
চার. তাড়াহুড়ো করে পুলিশ কর্মকর্তাদের সংবাদ সম্মেলন, কান্না, আবার বদলি হয়ে যাওয়া কীসের লক্ষণ? জজ মিঞার গল্পের ধারাবাহিকতা?
পাঁচ. চার খুনের পর বিশ্রাম নেওয়া, শসা-খেজুর খাওয়া, সোনাদানা পরীক্ষা করা, জুমার নামাজ পর্যন্ত হিন্দু অধ্যুষিত এলাকায় অপেক্ষা করা স্বাভাবিক ঘটনা না।
ছয়. পুলিশ কর্মকর্তা ও সিদ্ধাথের্র (যে কিনা খুনের ঘটনায় সম্পৃক্ত থাকার জবানবন্দি দিয়েছে) শার্ট বদল হলো কখন? সিদ্ধার্থের বাবা বলেছিলেন, পুলিশ তুলে নেওয়ার সময়ে সিদ্ধার্থ নাকি গেঞ্জি পরা ছিল! সিদ্ধার্থের আয় কেমন? সে কি আড়ংয়ের শার্ট ইফোর্ট করতে পারে?
সাত. যে মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থকে ইয়াবা খাবার কথা বলে আটক ও ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি নেওয়া হলো, মেডিক্যাল টেস্টে তাদের শরীরে মাদক নেওয়ার আলামত পাওয়া যায়নি! তাহলে? কেন রিমান্ডে না নিয়ে জবানবন্দির পর তাড়াহুড়ো করে তাদের জেলে পাঠানো হয়েছিল?
যতদূর জানি (আরবি বা ইংরেজি মিডিয়াম নিয়ে আমার তেমন ধারণা নেই) স্কুল জীবনের শুরু থেকেই মাতৃভাষা পড়ানো হয়। গল্প-কবিতাও পড়ানো হয়। গল্পের ফাঁকফোকর পড়ানো হয় না। পুলিশদের জন্য গল্পের ফাঁকফোকর পড়াটা জরুরি। না হলে পুলিশি গল্পে জজ মিঞারা চলে আসবে ফাঁকফোকর দিয়ে!
লেখক: রম্যলেখক




