আইন যখন নিজের মনে হয় না 

ফাইয়াজউদ্দিন আহমদ
০২ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ আপডেট : ০২ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০

টানা যানজটে হাঁসফাঁস করা কোনও মোড়ে দাঁড়িয়ে যখন আমরা দেখি একজন মানুষ নিশ্চিন্তে ট্রাফিক সংকেত ভেঙে চলে যাচ্ছেন, তখন আমরা প্রায়ই বিরক্তি নিয়ে নিজেদের প্রশ্ন করি; আমাদের দেশের মানুষ কেন কোনও নিয়ম মানতে চায় না? সাধারণ সড়কের নিয়ম ভাঙা থেকে শুরু করে নিত্যদিনের নানা প্রশাসনিক কাজ ফাঁকি দেওয়া; সবকিছুতেই আইন এড়িয়ে যাওয়ার এক প্রচ্ছন্ন চেষ্টা চোখে পড়ে। কিন্তু একটু থমকে দাঁড়িয়ে যদি নিজের মনকে জিজ্ঞাসা করি, মানুষ কি সত্যিই নিয়ম ভেঙে আনন্দ পায়? নাকি আমাদের ব্যবস্থার ভেতরেই এমন কোনও বিষয় লুকিয়ে আছে, যা মানুষকে আইনের ওপর থেকে ভরসা তুলে নিতে বাধ্য করে?

আইন মেনে চলার আসল প্রেরণা কোনও দিন লাঠি বা পুলিশের ভয়ে আসে না, আসে মানুষের বোধ এবং বিশ্বাস থেকে। ‘ন্যায়বিচারের বাণী নীরবে নিভৃতে কাঁদে, শক্তি যখন ক্ষমতার মোহে অন্ধ হয়ে বাঁধে।’ যখন আইন সাধারণ মানুষের অধিকার আর মুখের হাসিকে পাহারা না দিয়ে কেবল ক্ষমতা দেখানোর বা ভয় পাওয়ার হাতিয়ার হয়ে ওঠে, তখন মানুষ আর সেই আইনকে নিজের বলে ভাবতে পারে না। তখন নিয়ম ভাঙাটা মানুষের কাছে কেবল আইন অমান্য করা থাকে না; তা হয়ে ওঠে নিজের প্রতি হতে থাকা অন্যায় আর অবহেলার বিরুদ্ধে ভেতরের এক নীরব অভিমান ও প্রতিবাদ।

ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক টম আর টাইলার ১৯৯০ সালে প্রকাশিত তার ‘হোয়াই পিপল ওবে দ্য ল’ বইয়ে মানুষের এই গভীর মনস্তত্ত্ব তুলে ধরেছেন। দীর্ঘ গবেষণার পর তিনি দেখান, জরিমানার পরিমাণ বাড়িয়ে কিংবা শাস্তির ভয় দেখিয়ে মানুষকে সাময়িকভাবে আটকে রাখা গেলেও দীর্ঘমেয়াদে অপরাধ কমানো যায় না। মানুষ কেবল তখনই নিজের তাগিদে আইন মেনে চলে, যখন সে দেখে আইনি ব্যবস্থাটি নিরপেক্ষ, দুর্নীতিমুক্ত এবং তার কষ্ট ও আত্মসম্মানকে সম্মান জানাচ্ছে। অধ্যাপক টাইলার একে বলেছেন, ‘প্রক্রিয়াগত ন্যায়বিচার’। যখন সাধারণ মানুষ বুঝতে পারে যে রাষ্ট্র তাকে বিন্দুমাত্র অবহেলা করছে না, তখন সে নিজেই আইন মেনে চলাকে তার নাগরিক দায়িত্ব মনে করে।

আমাদের প্রতিদিনের জীবনের দিকে তাকালেই এই সত্যিটা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ঘামে ভিজে রোদে পোড়া রাস্তার মোড়ে যখন একজন সাধারণ বাইকচালক বা রিকশাচালক সিগন্যালে দাঁড়িয়ে থাকেন, আর তার পাশ দিয়ে কোনও ক্ষমতাধর মানুষের গাড়ি উল্টো পথে বা সংকেত ভেঙে নিশ্চিন্তে বেরিয়ে যায়, তখন ওই সাধারণ লোকটি মনে মনে ভাবেন, যে নিয়ম কেবল দুর্বল মানুষের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়, তা একা মেনে চলার অর্থ নিজেকে ছোট করা। ‘যেখানে আসিছে এক হয়ে যায় সব বাধা-ব্যবধান’। আইন যখন সমাজে ক্ষমতার ফারাক মুছে দিয়ে সবাইকে একই ছাতার নিচে আনতে পারে না, তখনই মানুষের মনে আইন ভাঙার প্রবণতা তৈরি হয়।

একই ঘটনা ঘটে যখন নিজের কষ্টার্জিত আয়ের কর মেটাতে গিয়ে কোনও সাধারণ নাগরিক সরকারি কর অফিসে মাসের পর মাস দরজায় দরজায় ঘোরেন। চোখের সামনে যখন তিনি দেখেন—বড় বড় কোটিপতিরা শত শত কোটি টাকার কর ফাঁকি দিয়ে দিব্যি ঘুরে বেড়াচ্ছেন, আর সামান্য ভুলের জন্য তাকে হয়রানি করা হচ্ছে, তখন আইনি ব্যবস্থার ওপর থেকে তার মন পুরোপুরি উঠে যায়। মানুষ তখন ভাবতে শুরু করে, সৎ থাকা মানেই যেন শাস্তি পাওয়া। জোর করে বা শাস্তি দিয়ে এই হতাশা দূর করা সম্ভব নয়। মানুষ তখনই স্বতঃস্ফূর্তভাবে সরকারকে কর দেবে কিংবা আইন মানবে, যখন সে অনুভব করবে যে, তার কষ্টের টাকার প্রতি রাষ্ট্র শ্রদ্ধাশীল এবং তা তার নিজের ও পরিবারের সেবা, পরিষেবা, বা নিরাপত্তার কাজে লাগছে।

একটি আইন কীভাবে তৈরি হচ্ছে, তার ওপরও নির্ভর করে মানুষ তা কতটা গ্রহণ করবে, মেনে নেবে। আমাদের দেশে বেশিরভাগ আইনের খসড়া তৈরি হয় শীতাতপ-নিয়ন্ত্রিত বন্ধ ঘরে, সাধারণ মানুষের অজান্তে। অথচ যাদের জীবনের ওপর সেই আইনের প্রভাব পড়বে—সেই কৃষক, শ্রমিক, ছোট ব্যবসায়ী বা পথচারীদের সেখানে কোনও মতামত থাকে না। ভারতে ২০১৪ সালে ‘প্রাক-আইন প্রণয়ন পরামর্শ নীতি’ এনে আইনের খসড়া ৩০ দিন জনগণের মতামতের জন্য উন্মুক্ত রাখার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। দক্ষিণ কোরিয়াতেও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে আইনের খসড়ায় নাগরিকদের মতামত বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। যে আইনে নিজের কষ্ট আর চাহিদার প্রতিফলন থাকে না, মানুষ তাকে নিজের সুরক্ষা ভাববে কীভাবে?

এই অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসার জন্য রাষ্ট্র ও সরকারকে একদম নতুনভাবে চিন্তা করতে হবে। কোনও নতুন আইন পাস করার আগে উন্মুক্ত আলোচনার আয়োজন করতে হবে, যাতে সাধারণ মানুষ বুঝতে পারে এই সিদ্ধান্ত তাদের জীবনকে সহজ করতেই নেওয়া হচ্ছে। আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোকে দলীয় কিংবা রাজনৈতিক প্রভাবের ঊর্ধ্বে এনে সম্পূর্ণ পেশাদার করতে হবে। যেদিন সাধারণ মানুষ দেখবে যে, বড় কোনও প্রভাবশালী ব্যক্তি অপরাধ করলেও পুলিশ বা আদালত তাকে এক চুলও ছাড় দিচ্ছে না, সেদিন থেকে রাষ্ট্র আর জনগণের মধ্যে নতুন এক ভালোবাসার সম্পর্ক তৈরি হবে। সরকার যদি এই স্বচ্ছতা এনে দিতে পারে, তবে মানুষকে নিয়ম মানাতে আর লাঠি কিংবা জরিমানা ব্যবহার করতে হবে না।

আমাদের দেশের বিজ্ঞ বিচারক ও আইনজীবীদের ভূমিকা এখানে সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। আদালতের বারান্দায় জমে থাকা লাখ লাখ মামলার জট কেবল কতগুলো কাগজের ফাইল নয়, তার পেছনে আটকে আছে লাখ লাখ মানুষের চোখের জল ও সংসারের টানাপড়েন। বছরের পর বছর আদালতে ঘুরে নিঃস্ব হতে থাকা একটি পরিবার যখন বিচার পায় না, তখন তারা ধীরে ধীরে আইন ও আদালতের ওপর থেকে আশা হারিয়ে ফেলে। বিজ্ঞ বিচারক ও আইনজীবীরা যদি আন্তরিকতার সাথে মামলা পরিচালনার দীর্ঘসূত্রতা কমিয়ে আনেন এবং আদালতের প্রতিটি দরজাকে সহজ ও হয়রানিমুক্ত করেন, তবে সাধারণ মানুষের কাছে তারাই হবেন সবচেয়ে বড় ভরসাস্থল। মানুষ বিশ্বাস করতে শুরু করবে যে অন্যায় হলে বিচার পাওয়ার একটা নিশ্চিত আশ্রয় এখনও বেঁচে আছে।

একইসঙ্গে আমাদের শিক্ষাবিদ, সুশীল সমাজ ও গণমাধ্যমকেও মানুষের পাশে দাঁড়াতে হবে। সুশীল সমাজকে প্রথাগত আলোচনার বাইরে গিয়ে প্রান্তিক মানুষের আইনি সুরক্ষার পক্ষে কথা বলতে হবে। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর গবেষকদের উচিত কেতাবী পড়াশোনার বাইরে এসে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের আসল দুঃখ-কষ্টের সাথে সামঞ্জস্য রেখে আইনি সংস্কার নিয়ে গবেষণা করা। আর গণমাধ্যমকে কেবল অপরাধের খবর পরিবেশন না করে দেখাদেখি করতে হবে কীভাবে একটা সাধারণ মানুষের জীবন আইনি জটিলতায় পিষে যাচ্ছে। গণমাধ্যম যখন কোনও নিঃস্ব মানুষের আইনি লড়াইয়ের পাশে দাঁড়াবে, তখন পুরো সমাজ অন্যায়ের বিরুদ্ধে এক জোট হতে শিখবে।

‘মানুষের ভেতরের আলোই তাকে সব অন্ধকার পেরিয়ে সঠিক পথ দেখায়’। আমাদের সন্তানদের যদি ছোটবেলা থেকেই ভালোবাসার সাথে শেখানো হয় যে, ট্রাফিক নিয়ম মেনে চলা কিংবা আশপাশের পরিবেশ পরিষ্কার রাখা কোনও পুলিশের ভয়ে নয়, বরং অন্যান্য নাগরিক ও দেশের মানুষের প্রতি দায়িত্ব ও ভালোবাসার প্রকাশ; তবে সেই সন্তান বড় হয়ে কোনও দিন স্বেচ্ছায় আইন ভাঙতে পারবে না। নিয়ম মেনে চলায় কোনও পরাধীনতা নেই, বরং অন্য মানুষের অধিকার রক্ষা করার মাধ্যমেই নিজের জীবন ও স্বাধীনতা সুরক্ষিত থাকে।

আইনের শাসন কোনও কঠিন বইয়ের শুকনো কথা কিংবা দূর আকাশের তারা নয়; এটি হলো দিনশেষে শান্তিতে বাড়ি ফিরে প্রিয়জনের মুখটি দেখার নিশ্চিন্ত নিশ্চয়তা। যে দেশ আর যে সমাজ তার মানুষকে পরম মায়ায় জড়িয়ে ধরে বলতে পারে, ‘তোমাকে রক্ষা করার জন্য এই আইন প্রস্তুত আছে, এখানে তুমি সম্পূর্ণ নিরাপদ’— সেই দেশে কোনও মানুষ ইচ্ছা করে অপরাধের পথে পা বাড়ায় না। যেদিন আমাদের বিচারক, আইনজীবী, রাজনীতিবিদ ও সাধারণ নাগরিক একে অপরের হাত ধরে সকল মানুষের মনের ভালোবাসায় এক হয়ে মিলবে, সেদিন আর কাউকে শাসন করতে হবে না; সেদিন আইন হয়ে উঠবে আমাদের জীবন ও আত্মসম্মানের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য আশ্রয়।

লেখক: আইনের গবেষক এবং উন্নয়নকর্মী

/এপিএইচ/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
হঠাৎ কেন বন্ধ দিল্লির ১১ মেট্রো স্টেশন?
হঠাৎ কেন বন্ধ দিল্লির ১১ মেট্রো স্টেশন?
ঠাকুরগাঁওয়ে কৃষক কার্ড বিতরণ শুরু, প্রথম ধাপে পাচ্ছেন আড়াই হাজারের বেশি কৃষক
ঠাকুরগাঁওয়ে কৃষক কার্ড বিতরণ শুরু, প্রথম ধাপে পাচ্ছেন আড়াই হাজারের বেশি কৃষক
ভিসা সহায়তা দিতে ঢাকায় আসছে রোমানিয়ার টিম 
ভিসা সহায়তা দিতে ঢাকায় আসছে রোমানিয়ার টিম 
যন্তর মন্তর সিলগালা, ১৬৩ ধারা জারি
যন্তর মন্তর সিলগালা, ১৬৩ ধারা জারি
সর্বশেষ সর্বাধিক