ঢাকার একটা দেয়াল নিয়ে সমস্যা কাটছে না। মনে হচ্ছে, একটা ভালো কাজ করতে গিয়ে নগর কর্তৃপক্ষ মহাবিপাকে পড়ে গেছে। মাঝখান দিয়ে প্রয়াত সঞ্জীব চৌধুরীর প্রতিকৃতি নিয়ে হয়ে গেলো টানা-হেঁচড়া, যা ছিল অনভিপ্রেত। দেয়াল ঘিরে এই নাটকীয় ঘটনা প্রবাহ শুধু যে নগর কর্তৃপক্ষের বিচক্ষণতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে, তাই নয়; এখানে বাংলাদেশের সামাজিক-রাজনৈতিক-মনস্তাত্ত্বিক একটি সমস্যার দিকেও ইঙ্গিত করছে।
বাংলাদেশের নানা সমস্যার মধ্যে একটা হচ্ছে তার দুটো ‘বয়স।’ স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের বয়স মাত্র ৫৫ বছর; কিন্তু বাংলা ভাষা এবং সংস্কৃতির ভিত্তিতে বাঙালি জাতির বয়স বহু পুরনো। এই দুই-এর মধ্যে খাপ খাওয়ানো কোনও সমস্যা হওয়ার কথা নয়। কিন্তু ধর্মীয় বিভাজন এবং সমাজ ও রাজনীতিতে তার প্রভাব এই সহজ কাজটা দুরূহ করে তুলেছে।
সেগুনবাগিচায় শিল্পকলা একাডেমীর দেয়ালের কথাটাই ধরা যাক। ঢাকা নগর কর্তৃপক্ষ সিদ্ধান্ত নিলো, সড়কের পাশে ফুটপাথ থেকে হকার সরিয়ে দিয়ে দেয়ালটা সুন্দর করে সাজাবে। ভালো কথা। তারা সিদ্ধান্ত নিলো, শুধু উজ্জ্বল রং দিয়ে না সাজিয়ে তার সঙ্গে দেশের কিছু বরেণ্য ব্যক্তির প্রতিকৃতি আঁকা হবে। আরও ভালো কথা। কিন্তু ফ্যাসাদ বাঁধলো কার প্রতিকৃতি, তা নিয়ে। এখানে প্রশ্ন উঠলো, ‘দেশ’ বলতে কী বুঝি, বরেণ্য ব্যক্তিগুলো বরেণ্য হলেও তাঁরা কি আসলেই ‘আমাদের?’ এখানে ‘আমাদের' বলতেই বা আমরা কী বোঝাচ্ছি?
দেশের বয়স মাত্র ৫৫ বছর, তাই ‘বরেণ্য’ ব্যক্তি খুঁজে পাওয়াও দুষ্কর। কথাটা শুনতে একটু খারাপ লাগলেও, অসত্য নয়। একজন কবি, সাহিত্যিক, সংগীত শিল্পী, রাজনিতিক, বুদ্ধিজীবীকে যেকোনও সমাজে ‘বরেণ্য’ বলে গণ্য হতে সময় লাগে। বর্তমান সময়ে অনেক জীবিত বা মৃত ব্যক্তি আছেন, যারা প্রবলভাবে জনপ্রিয়; কিন্তু তাদের বরেণ্য বা দ্রুপদি পর্যায়ে পৌঁছাতে সময় লাগবে, অনেক সময়।
শেক্সপিয়ার থেকে নজরুল
পশ্চিমা বিশ্বে এই বিষয়টি তেমন বিতর্কের সৃষ্টি করে না। ব্রিটেনের দ্য বিটলস বা আমেরিকার এলভিস প্রেসলি নিঃসন্দেহে পশ্চিমা বিশ্বে সবচেয়ে জনপ্রিয় আধুনিক সংগীত শিল্পী। কিন্তু যখন মুদ্রায় বা জাতীয় পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ স্থানে প্রতিকৃতি দেওয়া হয়, তখন তারা ফিরে যায় তাদের ধ্রুপদী যুগে। সংগীত বলুন, সাহিত্য বলুন, বা চিত্রকর্ম বলুন। ব্রিটেনের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন চার্চিলকে অনেকেই পছন্দ করেন না। কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ব্রিটেনকে নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য পার্লামেন্ট স্কয়ারে তাঁর বিশাল মূর্তি বা ৫ পাউন্ড নোটে তাঁর ছবি নিয়ে খুব একটা বিতর্ক হয় না (যদিও অতি-বামপন্থী তরুণরা মাঝে-মধ্যে চার্চিলের মূর্তিতে লাল রং মেখে দেয়, কারণ তাদের দৃষ্টিতে চার্চিল ছিলেন বর্ণবাদী সাম্রাজ্যবাদের প্রতীক।)
বরেণ্য ও জনপ্রিয়, এই দুই ক্যাটেগোরির মধ্যে যে বিশাল পার্থক্য রয়েছে, সেটা অনেকে বোঝেন না, বা বুঝেও না বোঝার ভান করেন। এই পার্থক্য জনপ্রিয় ব্যক্তিদের অসম্মান করে না। বরং, তাদের অনুসারীদের বুঝিয়ে দেয় যে, তাদেরও সময় আসবে। কিন্তু তার আগে দেখতে হবে, আজকে যারা জনপ্রিয়, যেমন লেখক হুমায়ুন আহমেদ বা কবি আল মাহমুদ, তাদের কর্ম ১০০ বছর পরেও প্রাসঙ্গিক থাকবে কি না। তাদের কর্ম কি ১০০ বছর পরেও স্কুল-কলেজে পাঠ করা হবে, যেমন পড়ানো হয় উইলিয়াম শেক্সপিয়ার বা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বা কাজি নজরুল ইসলামের সাহিত্য? জনপ্রিয়তার গণ্ডি পেরিয়ে ধ্রুপদী পর্যায়ে পৌঁছাতে ব্যক্তির কর্মকে টিকে থাকবে হবে তাঁর তিরোধানের শতবছর পরেও।
সেই বিচারে সঞ্জীব চৌধুরীর প্রতিকৃতি রবীন্দ্রনাথ বা নজরুলের পাশে শোভা পায় না। কিন্তু সেই দেয়াল বেগম রোকেয়া বা জিবনান্দ দাশ-এর জন্য উপযুক্ত স্থান, কেননা তাঁরা সত্যিকার অর্থে বরেণ্য। কিন্তু এখানে সঞ্জীব চৌধুরীর প্রতি অন্যায়ও করা হয়েছে। দেয়ালে তাঁকে রাখার পক্ষে যদি যুক্তি থেকেই থাকতো, তাহলে সরানো হলোই বা কেন? একবার রেখে সমালোচনার মুখে সরিয়ে ফেলে যে প্রয়াত শিল্পির স্মৃতিকে অপমান করা হলো, সেটা হয়তো কর্তৃপক্ষর মাথায় ঢুকছে না।
দেয়ালের গভীর সমস্যা
নগর কর্তৃপক্ষ চাইলে জনপ্রিয় লেখক, সংগীতশিল্পী, অভিনয় শিল্পীদের প্রতিকৃতি দিয়ে পুরো একটি বা দুটি দেয়াল সাজাতে পারতেন। সেখানে সঞ্জীব চৌধুরীর পাশে আইয়ুব বাচ্চু, আজম খান, হুমায়ুন ফরিদী, আল মাহমুদ, শামসুর রহমান, ফরিদা ইয়াসমিন, জহির রায়হানের মতো জনপ্রিয় কিন্তু প্রয়াত ব্যক্তির প্রতিকৃতি স্থান পেতে পারে।
তবে এখানেও যে সমস্যা হবে না, তা নয়। কারণ, জনপ্রিয় ব্যক্তি অনেক আছেন এবং যারা বাদ পরবেন তাদের কেন রাখা হলো না, তা নিয়ে শুরু হবে আরেক বিতর্ক। দেশে এখন যে প্রকট বিভাজন আর অসহিষ্ণুতার মহামারি চলছে, তাতে মানুষ অল্পত্বেই মারমুখী হয়ে উঠছে।
তবে এই দেয়াল আরও গভীর একটি সমস্যা উন্মোচন করেছে। স্বাধীনতার ৫৫ বছর পরেও দেশ ও জাতির আত্মপরিচয় বা আইডেন্টিটি নিয়ে বিতর্ক যে এখন থামেনি, তা আবারও চোখে আঙ্গুল দিয়ে বোঝানো হলো। থামা তো দূরে থাক, ২০২৪ সালের পর সেই বিতর্ক কৃত্রিম উপায়ে আবারো চাঙ্গা করা হচ্ছে।
শিল্প, সাহিত্য, সঙ্গীত, চলচিত্র, এই সবই জাতির সাংস্কৃতিক জীবনের অংশ। এখানে ভাষা এবং সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য মুখ্য ভূমিকা পালন করে, যদিও সেই ঐতিহ্য গড়ে তুলতে ইতিহাসের বিভিন্ন পর্বে ধর্ম বড় প্রভাব রাখে। বাংলাদেশে মানুষ যখন তার সংস্কৃতির শেকড় খুঁজবে, যখন তাদের নিজেদের বরেণ্য ব্যক্তির নাম এবং কর্ম স্মরণ করতে চাইবে, তখন রাষ্ট্রীয় সীমানা তাদের বেঁধে রাখতে পারবেনা। বাংলাদেশের সংস্কৃতি স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্মের পড়ে শুরু হয়নি। দেশের মনিষীদের সন্ধানে বের হলে অনেক নাম আসবে যারা মনে-প্রাণে বাঙালি কিন্তু যাদের কর্ম স্বাধীন বাংলাদেশের জন্মের আগেই সম্পন্ন হয়েছে।
বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক জগতের বরেণ্য ব্যক্তিদের সন্ধান পেতে শুধু ১৯৭১ নয়, বিংশ শতাব্দীর বাইরে গিয়ে দেখতে হবে। সেখানে ১৯৪৭ সালে ভারত ভাগের পর কার জন্মস্থান নতুন সীমান্তের কোন দিকে পড়লো, সেটা নিয়ে বিতর্কের কোন স্থান থাকা উচিত নয়।
সর্বকালের শ্রেষ্ঠ বাঙালি
তবে ১৯৭১ যে বাংলাদেশের মানুষের হৃদয়ে একটা বিশাল চিহ্ন রেখে গেছে, সেটা বোঝা যায় ২০০৪ সালে বিবিসি বাংলার এক অভিজ্ঞতার দিকে তাকালে।
বিবিসি বাংলার পরিকল্পনা ছিল শ্রোতা জরিপের মাধ্যমে বরেণ্য ব্যক্তিদের নিয়ে একটি অনুষ্ঠানমালা তৈরি করা। শ্রোতাদের জন্য একটি প্রশ্ন রাখা হলো, আপনার মতে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি কে? তবে শুধু একটা নাম নয়; কুড়ি জনের তালিকা করে, প্রত্যেক বরেণ্য ব্যক্তির জীবনের ওপর রেডিও ফিচার তৈরির সিদ্ধান্ত নেয়া হলো। তালিকা থেকে বোঝা যায় যে, অন্তত বিবিসি বাংলা রেডিও শ্রোতারা “শ্রেষ্ঠ বাঙালি” নির্বাচনে বর্তমান রাষ্ট্রীয় সীমানাকে বিবেচনায় রাখেনি। তাঁরা ধর্মীয় এবং রাজনৈতিক বিভাজনের ঊর্ধ্বে গিয়ে নিজেদের মানুষ খুঁজেছেন।
সম্প্রচারের তারিখ ঠিক করতে গিয়ে আসলো অপ্রত্যাশিত এক চমক। দিন গুণে দেখা গেল, মার্চ ২৬ থেকে ১৪ এপ্রিল ঠিক ২০ দিন। অর্থাৎ এই সময়টা ধরতে পারলে “সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি” নিয়ে ধারাবাহিক অনুষ্ঠানমালা বাংলাদেশের স্বাধীনতা দিবসে শুরু করে বাংলা নববর্ষের দিন, অর্থাৎ পহেলা বৈশাখ শেষ করা যায়। এই অনুষ্ঠানমালার জন্য এর চেয়ে উপযুক্ত সময় আর কী হতে পারে?
শ্রোতাদের মতামত অনুযায়ী করা তালিকায় প্রথম স্থানে আসেন শেখ মুজিবুর রহমান; দ্বিতীয়স্থানে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর; তারপর কাজি নজরুল ইসলাম, এ এক ফজলুল হক, সুভাষ চন্দ্র বোস, বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত; এরপর জগদীশ চন্দ্র বোস, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, আব্দুল হামিদ খান ভাসানি, রাজা রাম মোহন রায়, তিতুমীর, লালন ফকির, সত্যজিৎ রায়, অমর্ত্য সেন, ২১ ফেব্রুয়ারির শহীদ, ড. মুহাম্মাদ শহিদুল্লাহ, স্বামী বিবেকানন্দ, অতীশ দীপঙ্কর, জিয়াউর রহমান এবং হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী।
এই জরিপ নিয়ে যে বিতর্ক হয়নি, তা নয়। ইসলামপন্থী কিছু পত্রিকা এই জরিপের পেছনে “ব্রাহ্মণ্যবাদী ষড়যন্ত্র” খুঁজে পেয়েছিল; একজন অতি-বামপন্থী সম্পাদক আবার এই তালিকা প্রকাশের মাধ্যমে তৎকালীন বিএনপি সরকারের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের আন্দোলন চাঙ্গা করার প্রচেষ্টা দেখতে পেয়েছেন। তবে বিবিসিতে আমার এক কলিগ শুধু অবাক হয়েছিলেন।
বিবিসির হিন্দি বিভাগের তৎকালীন প্রধান অচলা শর্মা, যিনি শুধুমাত্র শরৎচন্দ্রের বই পড়ার জন্য বাংলা শিখেছিলেন, আমার কাছে তাঁর বিস্ময় প্রকাশ করলেন। “রবীন্দ্রনাথ এক নম্বরে আসলো না কেন?” তিন জানতে চাইলেন। আমি আমার বিশ্লেষণ দিলাম। “এই জরিপ ৪০ বছর আগে হলে রবীন্দ্রনাথ নিঃসন্দেহে শ্রেষ্ঠ বাঙালি নির্বাচিত হতেন। কিন্তু এই ৪০ বছরে বাংলাদেশের জন্ম হয়েছে এবং বাঙালিদের প্রথম স্বাধীন রাষ্ট্রর স্থপতি হিসেবে শ্রোতাদের মনে মুজিবের স্থান রবীন্দ্রনাথের ওপরে চলে গেছে।”
লেখক একজন সাংবাদিক এবং পডকাস্টার।
ইমেইল: [email protected]