প্রসঙ্গ: আওয়ামী লীগ ও ড. জাফর ইকবাল

Send
আফরিন নুসরাত
প্রকাশিত : ১৫:২২, মে ২০, ২০১৫ | সর্বশেষ আপডেট : ১৮:৪৭, মার্চ ১৮, ২০১৭

আফরিন নুসরাতগত কয়েকদিন ধরে একটি ইস্যু নিয়ে তোলপাড় হচ্ছে বাংলাদেশে। বেশ কিছুদিন আগে সিলেটের একজন ‘অতি উৎসাহী’ সাংসদ জাফর ইকবাল স্যারকে নিয়ে আপত্তিকর বক্তব্য দেওয়ায় দেশজুড়ে সমালোচনার ঝড় ওঠে। পরে ব্লগার ইস্যু নিয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও প্রযুক্তি বিষয়ক উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয়ের দেওয়া বক্তব্য নিয়ে সমালোচনা করায় এই সাংসদ ব্যক্তি উদ্যোগে স্যারের বিরুদ্ধে মিছিল সমাবেশ করেন বলে বিভিন্ন মিডিয়ার খবরে জানা যায়।
এই মিছিলের অধিকাংশ লোকদের সঙ্গে স্থানীয় সাংবাদিকরা কথা বলে জানতে পারেন যে, তারা সজীব ওয়াজেদ জয় কী বলেছেন এবং স্যার কী মন্তব্য করেছেন তা জানেন না! কিন্তু স্থানীয় এমপির প্ররোচনায় অথবা তাকে খুশী করতে এক শ্রেণির অসাধু লোক ড. জাফর ইকবালের বিরুদ্ধে উঠেপড়ে লেগেছেন। বাঙালি ধর্মপ্রাণ এবং তাদের এই স্পর্শকাতর জায়গা নিয়ে খুব সহজেই রাজনীতি করা যায়। অতীতে তার অনেক উদাহরণ আমরা দেখেছি। খুব বেশিদিন আগের কথা নয়, যুদ্ধাপরাধী হিসেবে আদালতে দণ্ডপ্রাপ্ত আসামী দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীকে চাঁদে দেখতে পারার খবরটি কারও অজানা নয়। সেখানেও আশ্রয় নেওয়া হয়েছিল কূট-কৌশলের। গ্রামের অসচেতন এবং অশিক্ষিত মানুষ এই গুজবে বিশ্বাস করেছিলেন। তাদের বলা হয়েছিল আল্লামা সাঈদীকে আল্লাহ্‌র অশেষ রহমতে চাঁদে দেখা গিয়েছে। যারা দেখতে পাচ্ছেন, তারা আল্লাহর মুমিন বান্দা। আর যারা দেখতে পাচ্ছেন না, তারা কাফের! তাদের জন্য ভয়ানক পরিস্থিতি অপেক্ষা করছে আগামী দিনগুলোতে। গ্রামের ধর্মপ্রাণ মানুষ তখন ভয়ে হোক, সঙ্কোচে হোক অথবা কান কথায় বিশ্বাস করে বলেছিল, তারা সাঈদীকে চাঁদে দেখেছে!
২.
ইদানিং আরেকটা ইস্যু নিয়ে মানুষকে বোকা বানানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। আর সেটা হচ্ছে ব্লগার ইস্যু। ‘ব্লগার’ শব্দটা এখন ‘নাস্তিক’ শব্দের প্রতিশব্দ! বাংলাদেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারী মানুষের সংখ্যা যেমন বেড়েছে, সমান তালে বেড়েছে সাম্প্রদায়িক উস্কানি দেওয়াসহ ধর্মীয় বিষয়গুলো নিয়ে বিতর্কের পরিধি! ব্লগ বিষয়টি আসলে কী এটা বাংলাদেশের খুব কম সংখ্যক মানুষই বোঝেন এবং জানেন। ব্লগে নানান বিষয়ে মানুষ তাদের মতামত প্রকাশ করেন, গল্প লেখেন, ভ্রমণ কাহিনী ইত্যাদি ছাড়াও হয় সাহিত্য চর্চা। এক কথায় বলা যেতে পারে যে, মুক্ত চিন্তার ভার্চুয়াল ভার্সন হচ্ছে ব্লগ! কিন্তু ইদানিং ব্লগ নিয়ে এমনভাবে বিভ্রান্তি তৈরি করা হচ্ছে যে,  ব্লগ মানেই হচ্ছে বিধর্মীয় বিষয়। এখানে ধর্ম নিয়ে গালিগালাজ এবং কটূক্তি করা হয়, এমন একটা ধারণা উগ্র-মৌলবাদীরা মানুষের কাছে পৌঁছে দিচ্ছে বিরামহীনভাবে। দুঃখজনক হলেও সত্যি যে, তারা এতে সফলও হচ্ছেন।

অতি সম্প্রতি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও প্রযুক্তিবিষয়ক উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয়ের দেওয়া এক বক্তব্য নিয়ে ড. জাফর ইকবাল স্যার সমালোচনা করেছেন। এই বিতর্ক নিয়ে বাংলা ট্রিবিউনে "সজীব ওয়াজেদ, জাফর ইকবাল এবং ‘স্পর্শকাতর’ ব্লগার ইস্যু" শিরোনামে কলাম লিখেছেন শিক্ষক এবং সাংবাদিক আনিস আলমগীর।

এসব ঘটনার পরেই সিলেটের সেই সাংসদের অনুসারীরা জাফর ইকবাল স্যারকে নাস্তিক আখ্যা দিয়ে মিছিল করেছে। সন্দেহ করা যেতে পারে যে, ব্যক্তিগত শত্রুতার জের ধরে এই কাজটি এমপি সাহেব হয়তো করে থাকতে পারেন। কিন্তু সমস্যাটা হচ্ছে, যেহেতু তিনি একজন জনপ্রতিনিধি এবং ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ থেকে মনোনয়ন নিয়ে সাংসদ নির্বাচিত হয়েছেন, তাই তার এহেন কর্মকাণ্ড আওয়ামী লীগের জন্য বিব্রতকর হতেই পারে। আমার জানা মতে, সিলেট ছাড়া এই ধরনের প্রতিবাদ মিছিল আর কোথাও হয়নি। এখানে লক্ষ্যণীয়, খুব সুক্ষ্মভাবে এই ঘটনাকে পূঁজি করে আওয়ামী লীগ এবং জাফর ইকবাল স্যারকে পরস্পরের বিরোধী বলে অপপ্রচারের প্রয়াস চালাচ্ছে একটি মহল। এক্ষেত্রে একজন জনপ্রতিনিধি হলেও তার বক্তব্য যে আওয়ামী লীগের বক্তব্য নয়, তা অনেকেই বুঝতে চাইছেন না অথবা বুঝলেও বিভিন্ন প্রশ্ন ছুড়ে দিতে প্রয়াস পাচ্ছেন।

ধরা যাক, ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবে কোনও ইস্যু নিয়ে আমি আমার অবস্থান থেকে বক্তব্য দিলাম! কিন্তু সেই বক্তব্য কোনওভাবেই ছাত্রলীগের সাংগঠনিক বক্তব্য হবে না। কারণ আমি সংগঠনের  মুখপাত্র নই! নিয়ম অনুযায়ী সংগঠনের সভাপতি এবং সাধারণ সম্পাদক মুখপাত্রের ভূমিকায় থাকেন এবং তাদের বক্তব্যই সংগঠনের বক্তব্য বলে বিবেচিত হয়। আমার বক্তব্য যদি অশোভন হয়, তাহলে নিঃসন্দেহে তা সংগঠনকে বিব্রত করবে, কিন্তু এই দায় অবশ্যই সংগঠন নেবে না। ভুলে গেলে চলবে না, দল এবং সরকার এক কথা নয়। আওয়ামী লীগ অন্য যেকোনও দলের মতই একটি স্বতন্ত্র দল এবং এই দলের রয়েছে শীর্ষস্থানীয় নেতৃবৃন্দ বা হাই-কমান্ড। আওয়ামী লীগের সভানেত্রী দেশের প্রধানমন্ত্রী হওয়ায় দলের মুখপাত্রের দায়িত্বে রয়েছেন কেন্দ্রীয় অন্য নেতারা। সভাপতির নির্দেশ অনুযায়ী তারা বিভিন্ন ইস্যুতে বিবৃতি বা বক্তব্য প্রদান করে থাকেন। দলীয় একজন জনপ্রতিনিধির সাথে দলের সম্পর্কটা নিবিড়। কারণ দলের মনোনয়ন পেয়েই তারা সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। এক্ষেত্রে ব্যতিক্রম হিসেবে স্বতন্ত্র প্রার্থীর বিষয়টাও আমাদের মাথায় রাখা উচিত। কেউ আজ এমপি আছেন তো কাল নাও থাকতে পারেন। তবে দল ঠিকই থেকে যাবে। সুতরাং বিশেষ কোনও এলাকার কোনও ব্যক্তির এই নির্বুদ্ধিতার দায় সংগঠনের নয় বলেই বিবেচিত হওয়া উচিত।

ঠিক একইভাবে দলীয় বক্তব্য এবং সরকারি বক্তব্য এক কথা নয়। দল নির্দিষ্ট মতালম্বীদের হলেও সরকার প্রজাতন্ত্রের সবার। উদাহরণ হিসেবে বিশ্ব রাজনীতির দিকে তাকালে আমরা এর অসংখ্য প্রমাণ দেখতে পাই।

২০১৪ সালের ১৫ জুলাই সুইডেন পার্লামেন্টের উগ্র ডানপন্থী দলের কেন্দ্রীয় সদস্য আন্না হগভালসের এক বক্তব্যকে দলের বক্তব্য নয় বলে সাংবাদিক সম্মেলন ডেকে বলেছিল দলটির কেদ্রীয় পরিষদ। আন্না হগভালস বলেছিলেন,‘‘নারীদের উচিত হবে না অহেতুক কান্নাকাটি করে পাড়া মাথায় তোলা যদি তারা দাম্পত্যজীবনের কোলাহলের কারণে নিপীড়িত হন।’’ তার এই বক্তব্যের পরে সুইডেনের নারী সমাজ ভীষণ ক্ষীপ্ত হয় এবং ডানপন্থী সুইডেন ডেমোক্র্যাটরা খুব বিব্রতবোধ করে। সঙ্গে-সঙ্গেই আন্নার বক্তব্যের সাথে দ্বিমত পোষণ করে বিষয়টি জনগণকে অবহিত করে দলটি।

৩০ জানুয়ারি ২০১১ সালের ঘটনা। আমেরিকার গ্রাউন্ড জিরো মসজিদ নির্মাণের উদ্যোক্তারা তাদের নতুন ইমামের এক বক্তব্যে বিব্রত হয়ে প্রকাশ্যে তার বক্তব্যকে তাদের বক্তব্য নয় বলে ঘোষণা দিয়েছিল। গ্রাউন্ড জিরো মসজিদের নতুন ইমাম আহদামি এক বয়ানে বলেছিলেন, ‘‘যারা গে বা হোমো-সেক্সুয়্যাল, তারা সম্ভবত নিজেরাই ছোটবেলায় একইভাবে যৌন হয়রানির শিকার হয়েছিলেন। যারা একবার মুসলিম ধর্ম ত্যাগ করে অন্য ধর্ম গ্রহণ করেন, তাদের কারাদণ্ড দেওয়া উচিত।’’ স্বভাবতই এই সাম্প্রদায়িক মনগড়া বক্তব্যে কম্যুনিটির সবাই বিব্রত হয়েছিলেন এবং তারা ঐক্যবদ্ধ হয়ে প্রেস বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে ইমামের বক্তব্যের সাথে দ্বিমত পোষণ করা ছাড়াও ইমামের বক্তব্যের প্রতি নিন্দা জ্ঞাপন করেছিলেন।

উন্নত সভ্য বিশ্বে গণতন্ত্রের এই চর্চাটি খুব স্বাভাবিক। এতে একটি সমাজের বা দেশের জনগণের সাথে প্রশাসনের মতৈক্যের জায়গাটা আরো সুদৃঢ় হয় এবং অহেতুক ভুল বোঝাবুঝির অবসান হয়। উন্নত গণতান্ত্রিক সভ্য দেশগুলোতে এই চর্চার আরও ভুরি ভুরি উদাহরণ দেওয়া যাবে।

আমি বিশ্বাস করি, সজীব ওয়াজেদ জয় নিজেও জাফর ইকবাল স্যারকে তার অভিভাবক হিসেবেই মূল্যায়ন করেন। সংবাদ উপস্থাপনের ত্রুটির কারণে যে ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি হয়েছে, সেটা শুধুই সাময়িক একটি ঘটনা মাত্র। এখানে কোনওভাবেই অতি প্রতিক্রিয়া দেখানের সুযোগ নেই, যদিও বিভিন্ন মাধ্যম সে চেষ্টা চালাচ্ছে। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ গুণীজনদের প্রাপ্য সম্মান দিতে জানে এবং আমাদের সবার প্রিয় জাফর ইকবাল স্যারের বেলায়ও তার ব্যত্যয় ঘটবে না।

লেখক: সাংগঠনিক সম্পাদক, কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদ, বাংলাদেশ ছাত্রলীগ

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ