বিনিময়, বিচ্ছিন্নতা আর বন্ধুত্ব

Send
বাধন অধিকারী
প্রকাশিত : ১৭:৩৭, আগস্ট ০৬, ২০১৭ | সর্বশেষ আপডেট : ১৭:৫৬, আগস্ট ০৬, ২০১৭

বাধন অধিকারীআমার কৈশোরের ঘনিষ্ঠতম বন্ধু মিথুন ‘বন্ধুত্ব’কে ডাকে ‘এক হৃদয়ে অন্য হৃদয়ের রামধনু’ নামে। ইন্টারমিডিয়েট পড়ি যখন, তখন আমরা দু’জনই যৌথ খামারের স্বপ্নে বিভোর, কাতর সমাজ বদলের রোমান্টিক স্বপ্নে। পেরিয়ে গেছে ১৪ বছর। আমি আর মিথুন একই শহরে থাকি। দেখা হয় বছরে ৩/৪ বার। ফোনে কথা হয় না বললেই চলে। ফেসবুকে চ্যাট করার প্রশ্নই ওঠে না। দিবস আর জন্মদিনে ছক মেপে আমাদের স্মরণও করতে হয় না পরস্পরকে। তবে এখনও মিথুন আমার সর্বশ্রেষ্ঠ বন্ধু। তাই আমাদের যোগাযোগ ঘটে হৃদয়ের সিগনালে, মানবীয় পৃথিবীর আকাশ তার সাক্ষী হয়ে থাকে সম্ভবত! বন্ধুত্বের প্রশ্ন উঠলেই তাই ‘মিথুন’ নামটি আমার কাছে অপরিহার্য বাস্তবতা আকারে হাজির হয়।
আমরা যাকে রক্তের সম্পর্ক কিংবা আত্মীয়তা নামে চিনি, মা-বাবা-চাচা-মামা-শ্বশুর-শাশুড়ি নামে যাদের ডাকি, তাদের সঙ্গে আমাদের সম্পর্কসূত্রটি গড়ে ওঠে পরিবার নামের পৃথিবীর প্রাচীনতম ও শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরে। পুরুষতান্ত্রিক ব্যক্তিমালিকানা টিকে রাখতে যে পরিবারব্যবস্থা আরোপিত হয়েছিল আমাদের সমাজে। পরিবার-ব্যবস্থার মাধ্যমে স্থাপিত সম্পর্ক তাই এক ধরনের বাধ্যবাধকতা, এক ধরনের প্রথা, এক ধরনের আরোপন। এখানে এক ধরনের শর্তের উপস্থিতি থাকে। থাকে নৈতিকতার ছক, সমাজের রীতি আর রাষ্ট্রের আইনকানুন। আমার বিবেচনায় বন্ধুত্বই পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ সম্পর্ক। বলতে গেলে, এটিই সম্ভবত সব থেকে মানবীয় সম্পর্ক। কেননা এই সম্পর্কসূত্রকে শর্তের মাপকাঠিতে বিচার করা যায় না। হিসেবের ফ্রেমে তাকে বাঁধা যায় না। সম্পর্কের ক্ষেত্রে নৈতিকতা কিংবা আর কোনও প্রশ্ন আরোপ করা যায় না।
বন্ধুত্বের সঙ্গে দিবস শব্দটি জড়িয়ে যাওয়ার সময়টি ৩০ দশক। কেউ কেউ বলেন, বন্ধুত্ব দিবসের ইতিহাসের সূচনা যুক্তরাষ্ট্রে। আগস্টের প্রথম শনিবার সরকার কর্তৃক এক মার্কিন নাগরিককে হত্যার প্রতিবাদে পরের দিন স্বেচ্ছামৃত্যুকে বেছে নেন তার এক বন্ধু। সেই অনুপ্রেরণায় আমেরিকান কংগ্রেসে ১৯৩৫ সালে আগস্টের প্রথম রবিবারকে বন্ধু দিবস হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত নেন। কেউ আবার বলেন, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহতা, বিশৃঙ্খলা ও হিংস্রতা যে রাজনৈতিক ও সামাজিক বিচ্ছিন্নতা আর অবক্ষয়ের জন্ম দিয়েছিল তা রুখতেই বন্ধুত্বকে দিবসের ফ্রেমে বাঁধা হয়েছিল।

তবে কারও পক্ষে অস্বীকার করা কঠিন, বন্ধুত্বকে দিবসের ফ্রেমে বন্দী করার বিষয়টির সঙ্গে বাণিজ্যিকতার একটা বড়সড় সংযোগ রয়েছে। ৩০ দশকের মাঝামাঝি কোনও এক ২ আগস্টকে বন্ধু দিবস হিসেবে ঘোষণা করে, ওই দিনটিতে নিজ নিজ বন্ধুদের শুভেচ্ছা কার্ড, ফুল ও উপহার দেওয়ার জন্য মার্কিন জনসাধারণের প্রতি আহ্বান জানিয়েছিলেন হলমার্ক কার্ডের প্রতিষ্ঠাতা ও কর্ণধার হাওয়ার্ড হল। আর এই সম্পূর্ণ বিষয়টির প্রচারের দায়িত্ব নিয়েছিল দেশটির ‘গ্রিটিং কার্ড ন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশন’। তবে ৩০ মানে তো সেই গ্রট ডিপ্রেশনের যুগ। বিশ্ব অর্থনীতির সেই মহামন্দার যুগে ক্রেতার অভাবে মুখ থুবড়ে পড়েছিল বাণিজ্যিক উদ্যেশ্যে গড়ে তোলা ওই ‘বন্ধু দিবস’প্রথা।

তবে আজকের নব্য উদারবাদী বাজার ব্যবস্থায় বন্ধুত্বের প্রশ্নটি বিনিময় আর বাণিজ্যিকতার সঙ্গে যেন অত্যাবশ্যক সম্পর্ক রচনা করে ফেলেছে। বন্ধুত্ব মানে আজ দিবসের আয়োজন, নানান ধারার দামি গিফট বিনিময়, নানান ধারার উন্নত যাপনের কথিত আনন্দ। আজকের যুগে আমাদের বন্ধুত্ব উদযাপিত হয় স্কাইপ আর ফেসবুক চ্যাটবক্সে, ফাস্টফুডের দোকান কিংবা হলমার্কের গিফট শপের বদান্যতায়। এসব দেখতে থাকি, যাপনের বাধ্যবাধকতা উদযাপন করতে থাকি আর আমার কার্ল মার্ক্সকে মনে পড়ে। আমার কৌশর-উত্তীর্ণ সময়ে যে মার্ক্স আমার জীবনপথের দিশা হয়েছিলেন নিজের খুব অজান্তেই। আমার জন্য সময়টা আক্ষরিক অর্থে ছিল মার্ক্স-আচ্ছন্নতার। আজ আমি ওই জার্মান ভদ্রলোকের প্রশ্নে পর্যালোচনাহীন নির্বিচারী নই, তবু তার কমিউনিস্ট ইশতেহার আমার কাছে আজও পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম কবিতা।

প্রায় স্মৃতি থেকেই আমি ইশতেহারের বক্তব্যের একাংশ বলতে পারি। এতো নগ্ন বাস্তবতা হাজির করেছিলেন মার্ক্স-এঙ্গেলস... ইশতেহারে তারা লিখেছিলেন,  বুর্জোয়া শ্রেণি যেখানেই প্রাধান্য পেয়েছে, সেখানেই সমস্ত সামন্ততান্ত্রিক, পিতৃতান্ত্রিক ও প্রকৃতি-শোভন সম্পর্ক শেষ করে দিয়েছে, তা এরা ছিঁড়ে ফেলেছে নির্মমভাবে। মানুষের সাথে মানুষের অনাবৃত স্বার্থের বন্ধন, নির্বিকার ‘নগদ টাকার’ বাঁধন ছাড়া আর কিছুই এরা বাকি রাখেনি। আত্মসর্বস্ব হিসেব-নিকেশের বরফজলে ডুবিয়ে দিয়েছে ধর্মীয় উন্মাদনার স্বর্গীয় ভাবোচ্ছাস। লোকের ব্যক্তিমূল্যকে এরা পরিণত করেছে বিনিময়মূল্যে...

স্বার্থের বন্ধন অনাবৃত হয়েছে আরও, ব্যক্তিমূল্য পরিণত হয়েছে বিনিময়মূল্যে। এই বিনিময় শব্দটিই বন্ধুত্বের বিপরীতে আজ আমার লিখবার প্রেরণা হয়ে হাজির হলো হঠাৎ, বন্ধু দিবস জানতে পারার পর। ব্যক্তিমূল্য যেমন করে বিনিময়মূল্যে রূপান্তরিত হয়েছে, তেমনি করে আজকের যুগের ব্যক্তিসম্পর্ক রূপান্তরিত হয়েছে বিনিময়জনিত সম্পর্কে। আজ তাই এতো এতো যোগাযোগপ্রযুক্তি, এতো এতো সংযুক্তির মাধ্যম সত্ত্বেও বন্ধুত্বের বড্ড অভাব। আজ তাই সারাক্ষণ ভার্চুয়াল মিডিয়ায় মানুষের আনাগোনা সত্ত্বেও সব্বাই বড্ড একা। আজ তাই দিবসকে উপজীব্য করতে হয় বন্দুত্বের। কারণ? কারণটা বিনিময়। কারণটা লেনদেন।

প্রাতিষ্ঠানিক সম্পর্ক চর্চার সুপ্রাচীন প্রতিষ্ঠান হিসেবে পারিবারিক সম্পর্কে স্বার্থের বন্ধন নতুন কিছু নয়। জমি-সম্পত্তি নিয়ে খুনাখুনির প্রাবল্য আমাদের চোখে সইয়ে গেছে। স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কেও স্বার্থগত প্রশ্নটা কেমন করে বিরাজিত থাকে, তাও আমরা দেখেছি। বিতর্ক উসকে দেওয়ার ইচ্ছে নেই বলে আলাপ তুলতে  চাই না। শুধু বলি, ৫০ পেরিয়ে যাওয়া পুরুষদের কমবেশি সবাই স্ত্রী-কে ছাড়া থাকতে পারেন না; কেননা তখন এসে তারা টের পায়, নারী ছাড়া তার জগতটা কতো অন্ধকার, কতোটা তারা অপূর্ণ পৃথিবীতে টিকে থাকার ক্ষেত্রে। ছেড়ে থাকতে না পারাই ভালোবাসা নামে স্বীকৃত হয়, আসলে তো সেটা টিকে থাকার স্বার্থ। আর নারীর বাস্তবতা? পেশাযাপন করেন না, এমন নারীদের অনেককে দেখেছি, স্বামীর মৃত্যর পর তাদের আহাজারির প্রধানতম ভাষা: ‘আমার এখন কী হবে’।

প্রাতিষ্ঠানিক সম্পর্কের বাইরে ‘বন্ধুত্ব’ প্রশ্নটি তাই খুবই সম্ভাবনাময় এক সম্পর্কসূত্র। সত্যিকারের মানবীয় সম্পর্ক রচনার পথে ‘বন্ধুত্ব’ই একমাত্র শর্তহীন। তবে দিবসের ফ্রেম কিংবা অন্য কোনও সূত্রে তাকেও বন্দি করার চেষ্টা চলমান। কে কয়দিন দামি রেস্টুরেন্টে খাওয়াল, কে কয়টা গিফট দিল, কে নিয়ম করে খোঁজখবর রাখল; এইসবই তো আজকে বন্ধুত্ব, তাই না? না, এসব হলো লেনদেনের প্রশ্ন। এসব প্রশ্ন বিনিময়ের। দেখা না হলেও আমি আর লেখার সূচনায় উল্লেখিত আমার বন্ধুজন মিথুন ভেতরে ভেতরে সম্পর্কিত থাকি, আমাদের অনুভবে রামধনুর সংযুক্তি। আমাদের হৃদয়ে বাধ্যবাধকতাহীন, হিসেবহীন, লেনদেনহীন মানবীয়তার বোধ। আমাদের চেতনায় মানবিক সমাজ নির্মাণের প্রেরণা আর অঙ্গীকারের যন্ত্রণা। তাকেই সঙ্গী করে আমরা আমাদের কৌশরের যৌথতার অলীক স্বপ্নকে আজকের সাপেক্ষে পুননির্মাণ করি। স্বপ্ন আর স্মৃতি নিয়ে আমরা ভবিষ্যতের দিশা খুঁজি। আমাদের বন্ধু দিবস লাগে না, গিফট লাগে না, ফোন লাগে না, এসএমএস লাগে না, কিচ্ছু লাগে না।   

সকাল বেলায় সাইবার স্পেসে বিচরণ করতে গিয়ে কোথাও একটা বিজ্ঞাপন দেখলাম। সম্ভবত এমন বলছে, বন্ধুত্বের ‘মূল্য’ মূল্য দিয়ে বিচার করা যায় না। ভাবতে থাকি, হায়রে বন্ধুত্বের হাল। মূল্য প্রশ্নটি বিচার না করে পারে না। বন্ধুহীন বিচ্ছিন্ন আত্মরতির যুগ এটা, লেনদেনকে বন্ধুত্ব ভাবার আত্মসুখ উদযাপনের যুগ। আমার মতো, আমার বন্ধু মিথুনের মতো করে যারা লেনদেন আর বিনিময়কে বন্ধুত্ব হিসেবে মেনে নিতে পারেনি, অন্ধ বাজারের এই যুগপর্ব তাদের জন্য খুব কষ্টের আর বিপন্নতার। এই ঐতিহাসিক নিয়তির বন্ধন, এই বাজারের যুগ, জীবিকার তাগিদে বিক্রি করতে থাকা সংবাদ-বিদ্যা আর একাকীত্বের অনুভব নিয়ে বিষণ্ন গোধূলি বেলায় আমাদের মতো মানুষের অস্তিত্বের প্রতিটি শিরায়-উপশিরায় আরেক গোধূলি নামতে থাকে ধীরে ধীরে। অনুভবের গাঢ়তায় রাঙিয়ে নিই তাকে, আর ভাবতে থাকি, একদিন নিশ্চয়...

তবু ঠিক দেখতে পাই, অন্ধ হয়নি দিনকাল, ভোরে প্রতিদিন যথারীতি সূর্য ওঠে এবং তাকে কাল ফের উঠতেই হবে। আবার গোধূলিও কিন্তু প্রতিদিনকার! পুরনো এক জেষ্ঠ-বন্ধু আমার, নামোল্লেখ না করে বলি- তাকে যখনই বলতাম কান্নার ঢেউ আঁচড়ে পড়লে তিনি তার সমস্ত সত্যিকারের কান্নাগুলো দিয়ে দিতে চাইতেন আমাকে! যিনি এটা করতেন, মন খারাপ আর কান্নার সাথে তার নিত্য অভিমান। আমি বলতাম, কান্না জমে, মন খারাপ জমে দেখবেন, একদিন ঠিক বিপ্লব হবে! তিনি আমার চিন্তাকে অস্বস্তিকর ভাবনা আখ্যা দিয়েছিলেন। তবে বিপন্ন-বিচ্ছিন্ন সময়ের উৎপাত হিসেবে আমি নিজেকে চিনতে চেষ্টা করি সবসময়। কান্নার সাথেও তাই কোনও অভিমান নেই আমার। লেনদেন আর বিনিময়ের নির্বিচারি স্বার্থের  বন্ধনের এই নিষ্ঠুর একাকীত্বের যুগপর্বে কান্না আমার বন্ধু, হতাশা আমার প্রিয়তম কেউ, মন খারাপ আমার সহোদরা, বিষণ্নতা আমার মাটি, আর আমি আমার মায়ের নাড়ীর কাছে চলে যাই কখনও কখনও।

ঢাকা নামের যে রাজধানী শহরে আমার বাধ্যতামূলক যাপন, সেখানে রাস্তায় মানুষের গায়ের উপর দিয়ে মানুষ হেঁটে যায়।  মানুষের সময় নেই, তাকে পৌঁছাতেই হবে অভীষ্টে, একটু দেরী তো পিঁছিয়ে পড়া। মানুষ তাই দৌঁড়ায় মানুষের গায়ের উপর দিয়ে। কিন্তু আমি জানি, এই মানুষেরাই একদিন সবাই মিলে দৌঁড়াতে অস্বীকৃতি জানাবে। সৃজন আর ভালোবাসার যৌথ সমাজ, মুক্ত সমাজ, প্রেম আর বন্ধুতার সমাজ, অভিমান আর অনুযোগের সমাজ, কবিতা আর গানের সমাজ, কাঁটাতারের বেড়াহীন বিশ্বসমাজ, বৈচিত্র্য আর অনুভবে ভরা সৌন্দর্যের সমাজ তাই একদিন বাস্তব হবে। কান্না জমে জমে একদিন প্রতিরোধ হবে, ফেসবুকের রাত জাগা একাকীত্বগুলো একদিন একজায়গায় হবে...

আমি বিশ্বাস করি, একদিন বিনিময় আর লেনদেনের যুগের অবসান হবে। দিবসের ফ্রেম অতিক্রম করে হবে সত্যিকারের বন্ধুত্ব।

লেখক: ইনচার্জ, ইন্টারন্যাশনাল ডেস্ক, বাংলা ট্রিবিউন

 

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ